মহিলা আ.লীগের জরুরি সভা ১০ অক্টোবর

আগের সংবাদ

ওয়ানডেতে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল : শন পোলক

পরের সংবাদ

শেখ হাসিনাকে ঘিরে যে বাংলাদেশ

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৯, ২০১৭ , ৯:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০১৭, ৩:৩৬ অপরাহ্ণ

মমতাজউদ্দীন পাোয়ারী

অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

বাংলাদেশ এক অখণ্ড ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রব্যবস্থা হলেও এর রাজনীতি কখনো অভিন্ন লক্ষ্যাভিমুখী বাংলাদেশ গড়ার মতো আদর্শ ও নেতৃত্ব নির্ভর ছিল না। গণতন্ত্রে এটি স্বাভাবিক বলেই জানতে হবে, মানতে হবে বলে শুনি। কিন্তু আমাদের দেশে গণতন্ত্রকে কত ধরনের সমস্যা, সংকট, বিপদ ও ষড়যন্ত্রের ব্যুহ ভেদ করে যাত্রা শুরুর দিনক্ষণ থেকে চলতে হয়েছে তা নির্মোহভাবে ভাবলে দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক এবং সৃষ্টিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির চাইতে প্রতিক্রিয়াশীল, দায়িত্বহীন, বাংলাদেশবিরোধী আদর্শের অপশক্তির উত্থানই ঘটেছে হু হু করে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত উগ্র, হঠকারী, বিভ্রান্ত এবং দিকভ্রান্ত দল ও গোষ্ঠীর উত্থানই ঘটছিল দ্রæততার সঙ্গে। কেননা, এই পথটি অনেক সহজ, সাধারণ জনগণকে মূলধারার রাজনীতি থেকে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এদের ‘অপরাজনীতি’ মস্তবড় ভ‚মিকা রাখে।

জনগণকে নানা বিষয়ে ভুল ও বিকৃত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা কত সহজ হয়েছিল সেটি আমরা সেই সময় দেখেছি। যারা এই অপরাজনীতির বাঁশি হাতে হাতে নিয়ে তখন রাজনীতির ময়দানে সুর তুলছিলেন, তাদের সুর শুনতে শুনতে অনেক তরুণ, সাধারণ মানুষ তখন বিমোহিত হলেন, হ্যামিলনের বংশীবাদকের সুরে এতটাই তারা উন্মত্ত হয়ে গেল যে, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার পর অবধারিত মৃত্যুর কথাও তারা ভুলে গিয়েছিল। ১৯৭৫-এর আগে এমন একটি অবস্থা তৈরি হলো, যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়া, সাধারণ মানুষের মুখে অন্ন দেয়ার ব্যবস্থা করা, মৌলিক চাহিদা পূরণের উদ্যোগসমূহ নেয়া, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও জাতির মননে প্রবেশের ব্যবস্থা করার জটিল অথচ প্রয়োজনীয় কাজসমূহ করার গুরুত্ব উপলব্ধিতে অনেকেরই চরম ঘাটতি ছিল, আমাদের সম্মুখের বিপদসমূহ নিয়ে আমাদের অনেকেরই কোনো সতর্ক অবস্থান ছিল না।

আমরা বিশ্বাস করতে চাইনি, এমন ভঙ্গুর অবস্থার ভেতরে অসংখ্য ষড়যন্ত্রকারী, রাষ্ট্রবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সব কিছু তছনছ করে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে, দেশটাকে উল্টোপথে নিয়ে যেতে দলবদ্ধ হচ্ছে। এদের পেছনে একদিকে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ বিরোধী মহল শক্তি, অর্থবিত্ত ও পরামর্শ দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নানা বিভ্রান্তি ও সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে জনমানসকে বিষিয়ে তোলা হচ্ছে।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, কোনো সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রই বিঘোষিত আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। আধুনিক গণতান্ত্রিক আদর্শের রাষ্ট্র গঠনের জন্য এসব দেশকে দীর্ঘদিন ধীরে ধীরে পথ চলা ছাড়া রাতারাতি অর্জনের কোনো বাস্তবতাই বিরাজ করেনি। ফলে তাড়াহুড়া, চটজলদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। কেননা এমন আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য যে পাটাতনের আবশ্যকতা রয়েছে- তা এগুলোতে অনুপস্থিত ছিল। আমাদের ক্ষেত্রে তো বলাই বাহুল্য। ব্রিটিশ শাসন শেষে ২৩ বছরের পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে উত্তরণ ঘটেছে ভৌগোলিক এবং স্বাধীন রাষ্ট্র নামকরণের মধ্যে, কিন্তু শোষণহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি তখনো আমাদের ছিল স্বপ্নের বিষয়, যা বঙ্গবন্ধু তখন দেখাচ্ছিলেন, একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছিলেন।

‘দিন বদলের ইশতেহার’ দিয়ে ২০০৯ থেকে বাংলাদেশকে কৃষি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, যন্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নানা খাতে বদলে দেয়ার পরিকল্পনা একে একে বাস্তবায়ন করলেন। …বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে তিনিই নতুন করে উদ্ভাসিত করে দিলেন। সর্বশেষ মিয়ানমারের ভয়ঙ্কর আচরণের বিরুদ্ধে তিনি কৌশল এবং নীতিতে বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিসরে মানবিক ও যৌক্তিক যে জায়গায়  নিয়ে গেলেন তা বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে।

সংবিধান রচনা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ, পুরাতন ঔপনিবেশিক, আধা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্বয়ম্ভর রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার যাত্রা শুরু করলেন। তাকে ঘিরে গড়ে উঠছিল একটি নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা- যা সংবিধানসহ নানা আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেত্রে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই রাষ্ট্র গড়ার চিন্তা না বুঝেছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থাকা একটি অংশ, না বুঝেছিল বাইরের বেশির ভাগ উদীয়মান ও বিদ্যমান রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিবর্গও। ফলে সুযোগ নিল ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী- যারা পেছনে, আড়ালে, গোপনে রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আইয়ুব খান যেভাবে ১৯৫০ সাল থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ক্ষমতা গ্রহণের, ১৯৫৮ সালে সেটি বাস্তবায়ন করেছিল রক্তপাতহীনভাবে। কেননা পাকিস্তানে তখন এমন কোনো নেতা ছিলেন না যিনি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ার জন্য কাজ করছিলেন। দ্বিতীয়ত ও তৃতীয় সারির নেতা দিয়ে জিন্নাহ-উত্তর পাকিস্তান চলছিল- কেমন চলছিল- তা একটু স্মরণ করলেই মনে পড়বে। তাই আইয়ুব খানকে ক্ষমতা দখল করতে কারো গায়ে টোকাও দিতে হয়নি, এমনিতেই পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করতে ব্যস্ত নেতারা পাকিস্তান গড়ার শপথ ভঙ্গ করলেন।

বাংলাদেশে তো তেমন অবস্থা ছিল না। এখানে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল নেতা তাদের পথের প্রধান শত্রু ছিল। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার পথ স্তব্ধ করতে হলে প্রথমে বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, কামরুজ্জামানসহ বেশ কিছু নেতা ছিলেন- যাদের চিরকালের জন্য সরাতে হবে। সেই মিশন-ভিশন নিয়েই ষড়যন্ত্রকারীরা প্রস্তুতি নিয়েছিল। সেখানে নেপথ্যের মূল নায়ক সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপটে আসেননি, তিনি এসেছেন খোন্দকার মোশতাক ব্যর্থ হওয়ার পর, মোশতাককে দিয়ে জেলহত্যার নারকীয় ঘটনা শেষ করিয়ে। একটা ‘রোমান্টিক বিপ্লববাদী’ আবহ তৈরি করিয়ে যে যাত্রা ৭ নভেম্বর-উত্তর (১৯৭৫) থেকে শুরু করা হয়েছিল তা ছিল হ্যামিলনের বংশীবাদকের নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটাকে জীবন্ত সলিল সমাধীকরণের ষড়যন্ত্র। সেটি বুঝতে তখনো অনেকে ব্যর্থ ছিল, এখনো রাষ্ট্র রাজনীতিতে ১৯৭৫-এর ‘রোমান্টিক খেলার’ নেপথ্য ঘটনা বুঝতে অনেকেই অক্ষম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ‘রোমান্টিক’ নানা নামে বিভ্রান্ত করা হলো, সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতিকে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যক্ষ মদদে দৃশ্যমান, একত্রীকরণ এবং শক্তিশালী করা হলো। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করিয়ে ‘গণতান্ত্রিক’ চরিত্রদানের ব্যবস্থা করা হলো, ‘আবিভর্‚ত’ নেতার পরিবর্তন ঘটানো হলো ততদিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ দূরের বিষয় হয়ে গেল, সুবিধাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা চাষাবাদের তরিতরকারিতে বাজার সয়লাব হয়ে গেল, মূলধারার রাজনীতি শুধু বিভাজিতই নয়, নানা বিভ্রান্তি ও দিগভ্রান্তিতে দুর্বলও হয়ে গেল।

সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার বৃহত্তর সমাজ-মাঠে এতটাই ঘটে গেল যে, রাজনীতিতে এর ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ নিয়ে নেপথ্যের শক্তিকে খুব বেশি ভাবতে হয়নি, ১৯৯১-এর নির্বাচনে কত অনায়াসে সেই শক্তিই ‘বিজয়ী’ হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে গেল। একেই বলে প্রতিক্রিয়াশীলতার রাজনীতিকরণ- যা গভীর ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, মন ভোলানো, পথ ভোলানো, রোমান্টিকতা, বিপ্লবীপনা ইত্যাদি বাহ্যিক হাজারো ছলচাতুরিতে ভরা ছিল, কিন্তু ভেতরটা ছিল একটি সাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাজনীতির নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশে সেই ধারার নেতা হিসেবে প্রথমে জিয়াউর রহমান এবং তার চারপাশের আদর্শহীন, উগ্র হঠকারী রাজনীতির নেতা, আমলা, সামরিক-বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ জড়ো হলেন, এরপর হু. মু. এরশাদ ধারার নতুন সংস্করণ করলেন, চ‚ড়ান্তভাবে খালেদা জিয়াকে অগ্রভাগে রেখে দৃশ্যত রাজনৈতিক ও ‘গণতান্ত্রিক’ রূপ দেয়া হয়েছে।

তিনি এখন ১৯৭৫-উত্তর পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল নেতৃত্ব প্রদান করছেন। তার দুই ‘নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শাসন’ মেয়াদে বাংলাদেশ ক্রমেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধারায় ধাবিত হয়েছিল, ১৯৯১-৯৬ সালে কিছুটা ‘গণতান্ত্রিক দোদুল্যমানতা’ থাকলেও ২০০১-২০০৬ সালে শক্ত হাতেই জঙ্গিবাদী ধারায় বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন; এর জন্য ১৯৯৬-২০০১ সালে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল, ১৯৯৯ সালে জামায়াত ও ইসলামি ঐক্যজোটসহ সব ডানপন্থীদের নিয়ে ঐক্যজোট করা হলো, ২০০১ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আপসহীন নেত্রীর স্বরূপটি উন্মোচন করেছেন, সব অসাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করার আয়োজন সম্পন্ন করা হচ্ছিল। তখন পশ্চিমের অনেক দেশের মিডিয়া থেকেই বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো আর একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হচ্ছিল। এটি মূলত আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারার বিপরীত শক্তির রাজনীতিরই ফসল, সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভর করে চললে জঙ্গিবাদই তার শেষ ভরসা হতে পারে, গণতন্ত্র নয়। এই ধারার অবস্থান থেকে বিএনপি একচুলও সরে আসেনি। ফলে ভবিষ্যতে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ আবারো সেই বিপজ্জনক পথেই পরিচালিত হবে- এ নিয়ে সন্দেহ থাকার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরে আসার পর আওয়ামী লীগে পুনরুজ্জীবন ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হলো।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি তখন ছিন্নভিন্ন, বিভ্রান্ত, দিকভ্রান্ত, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ। আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্বৈরাচারবিরোধী ১৫ দলীয় ঐক্যও ছিল ইস্যুভিত্তিক, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পুনর্মূল্যায়ন তাতে খুব একটা ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ জীবনে যে সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রূপান্তর ঘটে গিয়েছিল- তা না আওয়ামী লীগ, না বামতাত্তি¡ক দলগুলো, না বুদ্ধিবৃত্তিক মহল উদঘাটন করার চেষ্টা করেছিল। ফলে ১৯৭১-এর নির্বাচনে ঘটে গেল চরম বিপর্যয়। এখান থেকে বিভ্রান্তির দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো। শেখ হাসিনাকে অনেক পেছনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো।

১৯৯৬ সালে কৌশলী রাজনীতির সামান্য জয় দিয়েই শেখ হাসিনার রাষ্ট্র নেতৃত্ব দেয়ার যাত্রা শুরু হলো। এটি তার নতুন উত্তরণও বটে। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ধারার পুনরুজ্জীবন ঘটানোর উদ্যোগ নিলেন। ১৯৭৫-এ যা থামিয়ে দেয়া হলো, ১৯৯৬-এর জুন-পরবর্তী সময়ে তার পুনরুজ্জীবনের কঠিন দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিলেন। সংবিধান থেকে ইনডেনমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি থেকে শিক্ষাব্যবস্থা তথা শিক্ষার্থীদের মুক্ত করা, ভারতের সঙ্গে গঙ্গাচুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার দেশের প্রচলিত আইনে সম্পন্ন করা, দেশে অসাম্প্রদায়িক ধারার বিকাশে অনুক‚ল পরিবেশ সৃষ্টি, অর্থনীতিতে গতিময়তা আনয়নসহ নানা কাজে শেখ হাসিনা যেসব উদ্যোগ নিলেন তার ফলে বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ মূলধারায় ফিরে আসার সম্ভাবনা স্পষ্ট হলো। এটি ডানপন্থার শক্তি বুঝতে পেরেই আটঘাট বেঁধে ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রস্তুতি নিয়ে নেমে পড়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল কোনো মহলই সেই গণতান্ত্রিক অভুত্থানের পরিকল্পনাটি আগে থেকে বুঝতে পারেনি, বুঝেছে ২০০১-পরবর্তী সময়ে।

শেখ হাসিনা এই আট বছর জীবন-ঝুঁকির চ‚ড়ান্ত পর্বে ছিলেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন। তবে তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তখন নতুনভাবে সমৃদ্ধ হলো। তিনি বাংলাদেশকে বদলে দেয়ার মিশন-ভিশন নিয়েই ২০০৮-এর নির্বাচনে অবতীর্ণ হলেন। তিনি অভ‚তপূর্ব জয় পেলেন। ‘দিন বদলের ইশতেহার’ দিয়ে ২০০৯ থেকে বাংলাদেশকে কৃষি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, যন্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নানা খাতে বদলে দেয়ার পরিকল্পনা একে একে বাস্তবায়ন করলেন। ভারতের সঙ্গে ৭০ বছরের অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানও করলেন, সমুদ্রসীমা নিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায় করলেন, দেশটাকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করলেন, জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করলেন, কারো কাছে মাথানত না করে স্বাধীনভাবে চলার, আত্মমর্যাদার অবস্থান অনুসরণ করলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেশে-বিদেশে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে তিনিই নতুন করে উদ্ভাসিত করে দিলেন। সর্বশেষ মিয়ানমারের ভয়ঙ্কর আচরণের বিরুদ্ধে তিনি কৌশল এবং নীতিতে বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিসরে মানবিক ও যৌক্তিক যে জায়গায় নিয়ে গেলেন তা বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে বিভাজিত রাজনীতিতে ঈর্ষাপরাণয়নতা প্রবল, আদর্শ ও যুক্তিবাদ দুর্বল। তাদের কাছে এর মূল্য বা মূল্যায়ন আশা করা যায় না, তারা তা করেনও না। বরং তারা প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার একটি ব্যর্থচিত্র আঁকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা তা এঁকে শান্তিতে থাক। কিন্তু যারা বাংলাদেশকে নিয়ে সম্মুখে এগিয়ে যেতে চান তাদের বোধহয় এখন আর ভুল করার ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে সচেতনভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা