ঢাকায় কমনওয়েলথ আইনমন্ত্রী সম্মেলন ১৬ অক্টোবর শুরু

আগের সংবাদ

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করায় ছয় কিশোরী পুরস্কৃত

পরের সংবাদ

নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে শ্যাম মানেকশ

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১১, ২০১৭ , ৯:২০ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০১৭, ৯:২৪ অপরাহ্ণ

শহিদুল ইসলাম

সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এক.

শহিদুল ইসলাম

তিনি ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যৌথ বাহিনীর প্রধান। সম্ভবত ৭ ডিসেম্বর থেকে রেডিওর মারফত তিনি নিয়াজির প্রতি আহ্বান জানাতে শুরু করেন ‘আত্মসমর্পণ করুন।’ তার সে আওয়াজ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ এবং এক কোটি শরণার্থীর মনে আশার আলো ছড়িয়েছিল, তেমনি উপমহাদেশের অনেকের মনে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল। শত্রু-মিত্র এমন কেউ ছিলেন না যারা তার সে গলা শোনেননি। আজ হয়তো অনেকেই তার নাম জানেন না। ১৯৯৮ সালের ১১ নভেম্বর ওয়েলিংটনের ‘ডিফেন্স সার্ভিসেস কলেজ’ ‘নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার’ ওপর একটি বক্তৃতা দিতে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তিনি সেদিন যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা সর্বজনীন সত্যি। তা কেবল কোনো একটি বিশেষ দেশ বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তা যে কোনো দেশের যে কোনো সময়ের বাস্তবতার জন্য প্রযোজ্য। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন যে, মাত্র কিছুদিন আগে তিনি যুবসমাজের ওপর একটি বক্তৃতা দিয়ে এলেন। কেউই আজ আর যুবসমাজের ওপর সন্তুষ্ট নন। সবাই মনে করেন যে দেশের যুবসমাজ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না। এ বিষয়ে তারা আমার মতামত জানতে চান। আমি বলি এ দেশের যুবসমাজ হতাশ, অসন্তুষ্ট ও কিংকর্ত্যবিমূঢ়। তারা বুঝতে পারেন না তাদের দেশের এই যবুথবু, বিশৃঙ্খল অবস্থা কেন সৃষ্টি হলো। এর জন্য দায়ী কারা, তারা তা জানতে চান। তারা যদি রাত জেগে পড়াশোনা করতে চান, দেখা যায় বিদ্যুৎ নেই। এর জন্য দায়ী কে? তারা নন। তারা স্নান করতে গেলে দেখেন পানি নেই। এর জন্য দায়ী কে তারা জানতে চান। তারা নন। তারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চান, বলা হয় আসন নেই। তারা জানতে চান এর জন্য দায়ী কে? তারা নন। তারা বলেন যে আমাদের দেশটি নাকি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘মধ্যমণি’ ছিল। সেই উজ্জ্বল ‘মধ্যমণির’ কী হলো?

দুই.
পুরনো রাজনীতিবিদদের এখন আর এ অজুহাত দেখানো সম্ভব নয় যে ২৫০ বছরের সাম্রাজ্যবাদী শাসন আমাদের এ অবস্থার জন্য দায়ী। তারা প্রশ্ন তুলবে ব্রিটিশ পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আপনারা কী করেছেন? তারা প্রশ্ন তুলবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও হংকংও তো সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ ছিল। আজ তাদের উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিন। জার্মানি ও জাপানের কথা বলবে। এ দুটি দেশ সাড়ে চার বছর যুদ্ধ করেছিল। শিল্প-কলকারখানাসহ সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তদুপরি তাদের বিপুল পরিমাণে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। তারপরও দেশ দুটি আজ যে উন্নতি করেছে, সেদিকে দেখুন। যুবসমাজ এসব প্রশ্নের উত্তর চান। আমার এর উত্তর দেয়া উচিত। সমস্যার মূলে রয়েছে নেতৃত্বের সংকট। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি কেবল রাজনৈতিক সংকটের কথা বলছি না। অবশ্যই নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। জীবনের সর্বস্তরে নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা ক্রীড়া সংগঠনের সর্বত্রই সংকট রয়েছে। যেদিকে তাকাবেন দেখবেন নেতৃত্বের সংকট। আমি জানি নেতৃত্ব জন্মগ্রহণ করে না। তৈরি করতে হয়। অনেকে মনে করেন নেতৃত্ব জন্মলাভ করে। আমাদের জনসংখ্যা ৯৬০ মিলিয়ন এবং আমরা প্রতি বছর ১৭ মিলিয়ন মানুষের জন্ম দিচ্ছি যা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার সমান। তবু কেন এই নেতৃত্বের দুর্ভিক্ষ। সুতরাং আপনারা যারা আজো বিশ্বাস করেন নেতৃত্ব জন্মগ্রহণ করে, আমি কি তাদের অনুরোধ করতে পারি যে আপনারা পরিবার-পরিকল্পনা পরিত্যাগ করুন, পিলগুলো ছুড়ে ফেলে দিন, জন্মনিয়ন্ত্রণের সব উপায় সরিয়ে রাখুন এবং সবার জন্য সন্তান উৎপাদনের ওপর বিধিনিষেধ উন্মুক্ত করে দিন। তাহলে সম্ভবত কোনোদিন একজন নেতা জন্মলাভ করতেও পারেন।

‘সমস্যার মূলে রয়েছে নেতৃত্বের সংকট। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি কেবল রাজনৈতিক সংকটের কথা বলছি না। অবশ্যই নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। জীবনের সর্বস্তরে নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা ক্রীড়া সংগঠনের সর্বত্রই সংকট রয়েছে। যেদিকে তাকাবেন দেখবেন নেতৃত্বের সংকট। আমি জানি নেতৃত্ব জন্মগ্রহণ করে না। তৈরি করতে হয়।’

তিন.
সুতরাং নেতৃত্ব যদি জন্মলাভ না করে তাহলে কি নেতৃত্ব তৈরি করা যায়? আমি মনে করি যায়। আমাকে এমন একজন পুরুষ বা নারী দিন, যাদের সাধারণ জ্ঞান আছে, আর আছে নম্রতা, আমি তাদের নেতা তৈরি করে দিতে পারি। এ বিষয়েই আমি আপনাদের সঙ্গে আলাপ করতে চাই। নেতৃত্বের গুণাবলি কী? প্রথমত, একজন নেতার প্রধান গুণ হলো তার পেশাদারি জ্ঞান ও পেশাদারি দক্ষতা। আপনারা আমার সঙ্গে একমত হবেন যে কেউ পেশাদারিত্ব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। তিনি একজন প্রধানমন্ত্রী কিংবা একজন শিল্পপতি অথবা একজন ফিল্ড মার্শালের সন্তান হোন না কেন! পেশাদারি জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। তার জন্য দরকার কঠোর পরিশ্রম ও সার্বক্ষণিক পড়াশোনা। প্রযুক্তিগতভাবে অতিদ্রুত উন্নয়নের পথে আপনাদের দেশে আপনারা কখনোই যথেষ্ট পেশাদারি জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন না। তা অর্জনের জন্য আপনাদের সব সময় লেগে থাকতে হবে। দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা যাদের ওপর ন্যস্ত, আপনাদের সেসব নেতারা কি অন্তর থেকে বলতে পারবেন যে তারা কখনো যুদ্ধের ইতিহাস অথবা যুদ্ধের কৌশল কিংবা যুদ্ধাস্ত্রের উন্নয়নের ওপর একখানা বই পড়েছেন? তারা কি একটা মর্টার আর একটা মোটরের পার্থক্য বুঝতে পারেন। একটি বন্দুকের সঙ্গে আর একটি বন্দুকের? একজন গেরিলার সঙ্গে একটি গরিলার? যদিও তাদের একটি অংশের সঙ্গে গরিলার মিল রয়েছে।
পেশাদারি জ্ঞান ও দক্ষতা নেতৃত্বের জন্য অপরিহার্য। যতক্ষণ তুমি বুঝতে পারছ না তুমি কী বলছ, যতক্ষণ তুমি তোমার পেশা কী বুঝতে না পারছ, ততক্ষণ তুমি কখনোই একজন নেতা হতে পারবে না। আপনারা নিশ্চয়ই আশ্চর্য হচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল এসব কথা বলছে কেন? আপনারা যেখানেই যাবেন, দেখবেন একেকজন নেতা আপনাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাস্তা বন্ধ। তাদের গাড়ি আছে, সে গাড়ির জন্য রাস্তা উন্মুক্ত। মহোদয়গণ, তারা নেতা নন। তারা একজন পুরুষ বা নারী মাত্র, নেতার ছদ্মবেশ ধারণ করে আছে; নিজেদের জন্য তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।
চার.
নেতৃত্বের জন্য আর যেটি দরকার তাহলো একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মতো মানসিক ক্ষমতা এবং সেই সিদ্ধান্তের পূর্ণ দায়িত্ব স্বীকার করার মতো দায়িত্ববোধ। ‘মানুষ কেন সিদ্ধান্ত নেয় না’- এ প্রশ্ন কি কখনো আপনাদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে? উত্তর খুব সহজ। এর কারণ হলো, তাদের পেশাদারিত্বের অভাব অথবা সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার আশঙ্কায় তারা ভীত এবং তার বোঝা তাদেরই বহন করতে হবে। গড়ের নিয়মানুসারে আপনি যদি দশটি সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে পাঁচটি সত্য হওয়ার সম্ভাবনা। যদি আপনার পেশাদারি জ্ঞান ও দক্ষতা বেশি থাকে তাহলে ন’টিই সত্য হতে পারে। আর যেটা সত্য হলো না, সেটা আপনার অধস্তন কোনো অফিসার বা সহকর্মী ত্রæটিমুক্ত করতে পারে। কিন্তু আপনি যদি আদৌ কোনো সিদ্ধান্ত না নেন, তাহলে আপনি ভুল করবেন। কিছু করার চেয়ে কিছু না করা আরো খারাপ। কাজ করলেই ভুল শনাক্ত হয় এবং তা সংশোধনের উপায় থাকে। কিন্তু কাজ না করলে সে সুযোগ থাকে না। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় প্রধানমন্ত্রী যদি তা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতেন, তাহলে ১৮০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না। কিন্তু সেহেতু তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, সে জন্য দেশের অন্তত ১৮০ মিলিয়ন মানুষ আমাদের পছন্দ করে না।
পাঁচ.
আমি যখন সেনাপ্রধান ছিলাম, তখন সেনাসদস্যদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম ‘এ ব্যাপারে তোমরা কী করেছ?’ সাধারণত যে উত্তর পেতাম, ‘স্যার, আমরা ভাবছি… এখনও মনস্থির করতে পারিনি।’ আমি স্বমূর্তি ধারণ করতাম। মহিলারা যদি আমার ভাষার জন্য ক্ষমা করেন, তাহলে বলতাম, ‘তোমরা যদি সত্যি বোকা হতে চাও, তাহলে যত তাড়াতাড়ি পার বোকা হও। মনে রেখ তোমরাই ভবিষ্যতের সিনিয়র স্টাফ অফিসার। ভবিষ্যতের কমান্ডার। একটি সিদ্ধান্ত নাও এবং তার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করার মনোভাব তৈরি কর। অন্য সহকর্মী বা অধস্তনদের ওপর চাপিয়ে দিও না।’
ছয়.
নেতৃত্বের জন্য আর কী দরকার? সম্পূর্ণ সততা, সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা। মানুষ নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়। যারা ভাগ্যবান, যারা হাজার হাজার মানুষকে পরিচালনা করেন, তারা এটা ভালোভাবেই জানেন। কেউ শাস্তি পেতে চান না। তা সত্তে¡ও একজন ভালোভাবেই তার শাস্তি মেনে নেবেন যদি জানেন সে অন্য কেউ একই দোষে একই শাস্তি পেয়েছেন তার পেছনে শক্তিশালী গডফাদার থাকা সত্তে¡ও। এটা খুবই জরুরি। চাকরির ক্ষেত্রে কেউই অবজ্ঞার শিকার হতে চান না। কেউ চাইবে না নিচ থেকে কাউকে প্রমোশন দিয়ে তার ওপরে স্থান দিক। তারচেয়ে উন্নত কাউকে যদি নিয়মানুযায়ী প্রমোশন দেয়া হয়, সে হয়তো তা মেনে নিতে আপত্তি করবে না। কিন্তু স্টাফ কলেজের প্রধানের কোনো আত্মীয় কিংবা কোনো মন্ত্রী বা ফিল্ড মার্শালের সর্বশেষ গার্লফ্রেন্ডের স্নেহভাজন কাউকে সে মেনে নেবে না।
সাত.
ভারতে আমরা খুব চাপের মধ্যে থাকি। সরকারি চাপ, উচ্চপদস্থ অফিসারের চাপ, পারিবারিক চাপ, স্ত্রী, ভাই-ভাতিজা, আত্মীয়-স্বজন, গার্লফ্রেন্ডের চাপ। আমরা সেইসব চাপ এড়িয়ে চলতে অক্ষম। এবারে নৈতিক ও দৈহিক সাহসের কথায় আসি। আমি জানি না এই দুটোর কোনটা বেশি প্রয়োজনীয়। আমি যখন নিম্নপদস্থ অফিসার ও সেনাসদস্যদের সামনে কথা বলি, তখন আমি দৈহিক শক্তির ওপর জোর দেই কিন্তু আজ আপনাদের সামনে আমি নৈতিক শক্তির ওপর গুরুত্ব দেব। নৈতিক শক্তি বলতে কী বুঝি? সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করাই হলো নৈতিক শিক্ষা। একজন ‘হ্যাঁ-হুজুর’ গোছের অনুগত মানুষ বড় মারাত্মক। তিনি অনেক ওপরে উঠতে পারেন, তিনি যা খুশি তা করতে পারেন, কিন্তু একজন নেতা হতে পারেন না। কারণ তিনি তার ঊর্ধ্বতনের দ্বারা ব্যবহৃত হতে পারেন, সহকর্মীদের অপছন্দের মানুষে পরিণত হতে পারেন, অধস্তনদের ঘৃণার পাত্র হতে পারেন। এসব ‘হ্যাঁ-হুজুর’রা খুবই তুচ্ছ মানুষ।
আট.
উদাহরণ হিসেবে তিনি তার জীবনের একটি নৈতিক শক্তির উল্লেখ করেন-
১৯৭১ সালে পাকিস্তান পূর্ব-পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ করেছে, লাখ লাখ শরণার্থী ভারতের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী ২৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভা আহ্বান করেছেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিদেশমন্ত্রী সরদার শরণ সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি. জগজীবন রাম, কৃষিমন্ত্রী ফখরুদ্দীন আলি আহমেদ, অর্থমন্ত্রী মি. যশোবন্ত সিং। আমাকেও (শ্যাম) উপস্থিত থাকতে আদেশ দেয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী ভীষণ রাগান্বিত। কারণ পশ্চিম বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি। সেখানে তারা অসহায়ত্বের সঙ্গে জানান যে তারা বুঝতে পারছেন না, তারা কী করবেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি কিছু করতে চাই।’
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি আমাকে কী করতে বলেন?’
তিনি বললেন, ‘আমি চাই আপনি পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করুন।’
আমি বলি, ‘আপনি কি বুঝতে পারছেন তার অর্থ যুদ্ধ?
তিনি বললেন, ‘যদি যুদ্ধ হয়ও, আমি কিছু মনে করি না।’
বোকার মতো স্বাভাবিকভাবে আমি বলি, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি বাইবেল পড়েছেন?’ তখন পাঞ্জাবি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর সঙ্গে বাইবেলের সম্পর্ক কী?’ আমি বলি, ‘প্রথম বই, প্রথম অধ্যায়, প্রথম প্যারগ্রাফ, প্রথম বাক্যে ঈশ্বর বলেন, সবকিছু আলোয় ভরে যাক (খবঃ ঃযবৎব নব ষরমযঃ) এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আলোয় ভরে গেল। আপনি বিষয়টা একটু ঘুরিয়ে বিবেচনা করুন এবং বলুন ‘যুদ্ধ হোক’ (খবঃ ঃযবৎব নব ধিৎ) এবং যুদ্ধ হবে। আপনি কি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?’ আজ ২৮ এপ্রিল হিমালয়ের গিরিপথ খুলে যাচ্ছে। যদি চীনারা আমাদের হুমকি দেয়, আমাকে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে।’
শরণ সিং আমার দিকে চাইলেন এবং তার পাঞ্জাবি ইংরেজিতে বললেন, ‘চীন কি হুমকি দেবে?’
আমি বলি, ‘আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনিই তা আমাকে বলবেন।’
তারপর আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, গত বছর আপনি পশ্চিম বাংলায় নির্বাচন করতে চাইলেন এবং কম্যুনিস্টরা জিতুক সেটা আপনি চাননি। আপনি আমাকে প্রতিটা গ্রাম-শহরে সেনা মোতায়েন করতে বললেন। আমার হাতে তখন ভারী অস্ত্রহীন দুই ডিভিশন সৈন্য মাত্র। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আরো সৈন্য ও ভারী অস্ত্র পশ্চিম বাংলার যথাস্থানে প্রেরণ করতে কম করেও একমাস সময় লাগবে। এর জন্য আপনাকে প্রতিটি রাস্তা, ট্রেন, ট্রাক, ওয়াগান প্রয়োজন হবে। তখন আমরা পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও যুক্ত প্রদেশে চাষাবাদ শুরু করতে চলেছি। আপনি তা বন্ধ করতে পারতেন না।’
তারপর আমি কৃষিমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলি, ‘তারপর দেশে যদি দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, মানুষ আপনাকেই দোষারোপ করতো।’ তারপর আমি বলি, ‘ভারী অস্ত্রের মধ্যে মাত্র ১৩টি ট্যাংক কার্যক্ষম আছে।’ আমার বন্ধু অর্থমন্ত্রী বললেন, ‘শ্যাম, মাত্র ১৩টি কেন?’
‘কারণ তুমি অর্থমন্ত্রী। গত এক বছর ধরে আমি টাকা চাইছি এবং তুমি বলে আসছ টাকা নেই। সেই জন্য।’
তারপর আমি প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখন এপ্রিলের শেষ। আক্রমণের জন্য আমি যখন প্রস্তুত হব, তখন পূর্ব পাকিস্তানে বর্ষাকাল শুরু হয়ে যায়। সেখানে যখন বৃষ্টি হয়, সেটা কেবল বৃষ্টি নয়। অঝোরে বৃষ্টি পড়ে। নদীগুলো সাগরের রূপ ধারণ করে। আপনি যদি সে নদীর তীরে দাঁড়ান, অন্য পাড় দেখতে পাবেন না। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে। তখন আমার চলাচল কেবল সড়কগুলোর ওপর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। এয়ারফোর্স আমাকে সাপোর্ট দিতে পারবে না। আপনি যদি আমাকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করতে বলেন তাহলে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি যে আমাদের পরাজয় একশ ভাগ নিশ্চিত।’
প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনি সরকার। আপনি আমাকে আদেশ দিন।’
প্রিয় মহোদয়গণ, এমন রাগী নারী আমি খুব দেখেছি। আমার স্ত্রীকেও আমি তার দলে ফেলি। তিনি রাগে লাল হয়ে গেলেন। আমি বললাম, ‘দেখা যাক কী ঘটে।’ তিনি ঘুরে তাকালেন এবং বললেন, ‘আজ বিকেল চারটায় মন্ত্রিপরিষদ বসবে।’
সবাই বেরিয়ে গেলেন। জুনিয়র হিসেবে আমি যখন সবার শেষে বেরুচ্ছি তখন তিনি বললেন, ‘চিফ, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন।’ আমি তার দিকে তাকালাম। বললাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি মুখ খোলার আগে মানসিক ও দৈহিক স্বাস্থ্যগত কারণে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে কি পছন্দ করবেন?’
‘না। বসুন। শ্যাম, আপনি যা বললেন তা কি সত্য?’
‘হ্যাঁ, আপনাকে সত্য বলা আমার কর্তব্য। যুদ্ধ করাই আমার কাজ, পরাজয়ের জন্য নয়, জেতার জন্য।’

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।