সতর্কতাই পারে ব্লু হোয়েলের থাবা থেকে তরুণদের বাঁচাতে

আগের সংবাদ

জামায়াতের ডাকা হরতাল জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে : ওবায়দুল কাদের

পরের সংবাদ

নির্বাসিত রোহিঙ্গা ও বিপজ্জনক রাজনীতি

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১২, ২০১৭ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১৩, ২০১৭, ৬:২১ অপরাহ্ণ

রণেশ মৈত্র

রাজনীতিক, কলাম লেখক

রণেশ মৈত্র

এই দফায় ঠিক কত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন বা আসতে বাধ্য হয়েছেন, আজতক তার সঠিক সংখ্যা কেউই বলতে পারছেন না। তবে গণমাধ্যমগুলো বলছে, সংখ্যাটি চার লাখের কিছু বেশি। একই সঙ্গে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের আসার স্রোত যেন থামছেই না। তারা বিরামহীনভাবে আসছেন। এই আসার প্রক্রিয়া যে কবে নাগাদ শেষ হবে তা অনুমান করাও দুরূহ এবং যেহেতু আসার প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না। সেই একই কারণে তাদের ফিরবার প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে আর কবেই বা শেষ হবে তাও বলা অত্যন্ত কঠিন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম ও বর্বর অত্যাচারের কাহিনী আজ বিশ্বের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত। তারা গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে তাদেরই আরাকান নামক প্রদেশে। অজস্র মানুষকে গুলি করে মেরেছে এবং মারছে যেন মুড়ি-মুড়কির মতো। নারী ধর্ষণের সংখ্যা কল্পনাতীতভবে বেশি। রোহিঙ্গা নারী যত সংখ্যক বাংলাদেশে এসেছেন, প্রায় তার ৬০ থেকে ৮০ ভাগই ওই দেশের বর্বর সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত এবং এই ধর্ষণ তারা চালাচ্ছে দীর্ঘকাল ধরেই যেন ওই মহিলারা গণিমতের মাল।

যে বিপুল সংখ্যক মহিলা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন তাদের প্রায় সবারই কোলে একাধিক শিশু। আবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, আগত রোহিঙ্গা মহিলাদের মধ্যে গত দিনগুলোতে প্রায় ছয়শ জন সন্তান প্রসব করেছেন। এখন কতজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলা অবশিষ্ট রয়েছেন সে সংখ্যা হলো প্রায় বিশ হাজার। এভাবে জনসংখ্যা, শিশুর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়তেই থাকবে।
অর্থাৎ একদিকে বিপুল সংখ্যক প্রসূতি মহিলা অপর দিকে তার কয়েকগুণ শিশুর জীবন, তাদের স্বাস্থ্য, শিশুদের পিতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ সবই অজানা। তবে যেহেতু তারা বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাই তাদের চিকিৎসা-পথ্যাদির দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তেছে। কিন্তু কোথায় হবে চিকিৎসা? হাসপাতাল কোথায়? যেসব হাসপাতাল পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে তার আসন সংখ্যা এবং রোগী, প্রসূতি শিশুর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য ভয়াবহ রকমে বেশি।

তদুপরি ওই এলাকার আদি বাসিন্দারা যারা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে কয়েকটি বছর ধরে ওখানে আশ্রয় নিয়ে চলেছেন সর্বমোট যাদের আজ দাঁড়িয়েছে আট থেকে দশ লাখে তাদের এই বিপুল সংখ্যার কাছে ওই স্থানীয় আদি বাসিন্দারা আজ মারাত্মক এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছেন। তারা তাদের রোগীদের নিয়েই বা যাবেন কোথায়? সবকিছু মিলিয়ে ভাবলে এটা বুঝতে কারো বিন্দুমাত্র সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে ওই এলাকায় নতুন করে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু আগে থেকে আসা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু এবং আদি বাসিন্দা নারী-পুরুষ-শিশু-সবাই এক মারাত্মক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের শিকারে পরিণত হয়েছেন। দ্রুতই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওই অঞ্চলে বেশ কিছু সংখ্যক স্থায়ী-অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ এবং জরুরি ভিত্তিতে আরো বেশ কিছু মেডিক্যাল টিম পাঠাতে পারেন। তদুপরি নতুন কিছু অধিক সংখ্যক আসন সম্পন্ন হাসপাতাল জরুরি ভিত্তিতে নির্মাণ প্রকল্পও হাতে নেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

মুসলিম বিশ্বের অনৈক্যের ফলেই রোহিঙ্গারা আজো নির্যাতিত। এ কথা ফলাও করে প্রচার করা সত্ত্বেও কি মুসলিম বিশ্ব একমত হয়েছে শুধু ইরান ও তুরস্ক ছাড়া? এই রাজনীতির অন্তর্নিহিত অর্থগুলো স্পষ্টভাবে উদঘাটন করা প্রয়োজন। জামায়াত, হেফাজত প্রভৃতি আজ পাকিস্তানি আইএসআইয়ের মদদে ওই দাবি তুলছে বহুদিন ধরেই তারা এ ব্যাপারে সচেষ্ট।

 

অসুস্থ সবার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের স্বল্পতা, দুষ্প্রাপ্যতা ও দুর্মূল্যতাও সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। এ বিষয়টিও জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই দেখতে হবে এবং বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোকেও এই পরিস্থিতিতে বিস্তর ওষুধ সামগ্রী নিয়ে মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে এলে সমস্যাটির সুরাহা কিছুটা সহজ হতে পারে। দুর্যোগ শুধু স্বাস্থ্যখাতেই নেমে আসেনি। সর্বাধিক সংকট সম্ভবত রোহিঙ্গা রিফিউজিদের আবাসন ও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে। তদুপরি পথঘাট, খাবার ও নৈমিত্তিক কাজে ব্যবহারের পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃপ্রণালি, টয়লেট সবকিছু ব্যাপারেই যেন এক হ-য-ব-র-ল অবস্থা। রাতারাতি যেমন এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় তেমনি আবার একই সঙ্গে একাধিক সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে শুরু না করলে যতই বিলম্ব হবে ততই সমস্যাগুলো জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠবে।

প্রথমে যদি আবাসন সমস্যার কথা বলি, বিশেষ করে এবারের এই দীর্ঘায়িত বর্ষাকালে, তা হলে দেখব ওই লাখ লাখ রোহিঙ্গার এখনো অনেকেরই আবাস খোলা আকাশের নিচে। সেখানে নদী-পুকুরও নেই, টিউবওয়েল নেই, রান্নার গ্যাস বা স্টোভও নেই। গাছের মরা ডালপালা বা ছোট ছোট আস্ত গাছই যেন জ্বালানি। মাটির ওপরে ওগুলো জ্বালিয়েই রান্নাবান্না করা হচ্ছে। সুপেয় বা বিশুদ্ধ পানি দূরের কথা, মোটামুটি পানযোগ্য পানিও দুষ্প্রাপ্য। অনবরত বৃষ্টি নেমে তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। বাড়তি কাপড়চোপড়ও তাদের নেই। এহেন পরিস্থিতিতে কারো পক্ষেই কি সুস্থ থাকা বাস্তবে সম্ভব? ভালোভাবে রান্নাবান্না করে খাওয়া-দাওয়ার কাজ সমাধা করা যেতে পারে? সাংবাদিকদের ক্যামেরায়ই তো এগুলো ফুটে উঠছে।

ছবিতে দেখা যায়, রাস্তার ধার দিয়ে কিছু কিছু অস্থায়ী ঘর নির্মিত হচ্ছে। এ যাবৎ এমন যত ঘর নির্মিত হয়েছে বা যে সংখ্যক গুচ্ছগ্রাম ওই এলাকায় রয়েছে তাতেই বা কতজনের আবাসন সমস্যা মেটানো সম্ভব?
অপরদিকে শুনছি সমুদ্রের মধ্যে একটি দ্বীপে তাদের স্থানান্তরিত করে একত্রে রাখার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। আইডিয়াটা নিশ্চিতভাবেই ভালো কিন্তু বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারে।
ত্রাণ বিতরণের ব্যাপারে এই নিবন্ধটি লেখা পর্যন্ত (২৩/০৯/১৭) দুপুরে জানা গেল, কোনো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা তখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। নানা এজেন্সি, সরকারি-বেসরকারি, কেউ কম, কেউ বেশি পরিমাণে ত্রাণ নিয়ে ছুটছেন ওই এলাকায়। কিন্তু কেন্দ্রীভ‚ত ব্যবস্থা যেমন জেলা প্রশাসক-উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন বিশ্বাসী নারী-পুরুষ মিলে একটি সমন্বিত সংস্থা গড়ে তুলতে পারলে হয়তো শৃঙ্খলায় আনা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে সব ত্রাণসামগ্রী তাদের হাতে পৌঁছাতে হবে এবং ভলান্টিয়ার ও পুলিশ মিলে বিতরণকালীন শৃঙ্খলা বিধান করতে হবে। ইতোমধ্যে ওই এলাকায় সামরিক বাহিনী পাঠানো হচ্ছে আশা করি তাদের সহায়তায় কাজগুলোর সমন্বয় সাধন এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে। এ কথা ঠিক নিজ হাতে ত্রাণ দেয়ার আগ্রহ থাকে সবারই। তাতে কারা দিলেন তা প্রচারও হয় যার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কিন্তু ওই ক্ষুদ্র এলাকায় অগোছালো অবস্থায় অত বিপুল সংখ্যক অভুক্ত-অর্ধভুক্ত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের মধ্যে নিজেরা অপরিচিত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ বিতরণ সুশৃঙ্খলভাবে করা অত্যন্ত দুরূহ। সে কারণেই কেন্দ্রীভ‚ত সংগঠিত বিতরণ ব্যবস্থা অপরিহার্য।

উদ্বেগজনক খবর হলো অতীতে আসা রোহিঙ্গারাও নাকি ব্যাপকভাবে এবারের ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নিচ্ছেন সদ্য আসা রিফিউজি হিসেবে পরিচয় দিয়ে। এ ক্ষেত্রে পরিচিতির প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন যারা এসেছেন তাদের নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করে বিশেষ এক ধরনের পরিচিতিপত্র দেয়া হচ্ছে কিন্তু অত্যন্ত ধীরগতিতে। জনবল ও যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কারণে কাজে গতি সঞ্চার হচ্ছে না। কিন্তু ত্রাণ দ্রব্যের যেখানে স্বল্পতা এবং গ্রহীতা যেখানে বিপুল সংখ্যক সেখানে রেজিস্ট্রেশনে দ্রæতগতির সঞ্চারে কালবিলম্ব করা হলে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ত্রাণ বিতরণ ছাড়াও ওই কার্ড আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হবে। এমনকি যখন তাদের দেশে ফেরত পাঠানো শুরু হবে তখনো ওই কার্ড দেখতে চাইবেন মিয়ানমারের কর্মকর্তারা।
রোহিঙ্গারা নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর। যারা তা করছেন, তারা সম্ভবত আর ফিরে যেতে চান না। চান তাদের পূর্বসূরিদের মতো এ দেশেই থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে। অথবা চান নানা গোপন এবং অপরাধমূলক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়তে। সরকার অবশ্য এ ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীকে তৎপর থাকার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা নিজ নিজ ক্যাম্প ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে না পারেন। চেক পোস্টও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেকগুলো একই লক্ষ্যে। কিন্তু

দালাল নিয়োগ করে মাঠঘাট দিয়ে চলে গেলে তো সহজে ধরা যাবে না। তাই ক্যাম্পে বিশেষ পাহারা নানা কারণেই প্রয়োজন। তবে যারা পাহারা দেবেন তাদের ব্যবহার যেন বন্ধুসুলভ হয় প্রভু বা শত্রু সুলভ না হয়ে।
যেসব ত্রাণসামগ্রী দেয়া হয়ে থাকে তার বাইরেও নিশ্চয়ই তাদের অনেক কিছু কিনে খেতে হয়। সেগুলোর ক্রয়ক্ষমতা তার সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ অত্যন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে যারা আছেন এদিকে এবং আরো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ভেবে সময় থাকতেই তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন আশা করি।

ইতোমধ্যে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে মিয়ানমার সরকারের উপদেষ্টা (তাকে ওই দেশের সেনাবাহিনী, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। তার দল বিজয়ী হওয়া সত্তে¡ও) অং সান সু কি বেতার ভাষণ দিলেন যা শুনে গোটা পৃথিবীই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে খুশি হয়েছে ওই দেশের সেনাবাহিনী এবং তাদের সমর্থক মগ ও অন্যরা। হতে পারে ভাষণের খসড়াটিতে সেনাপ্রধানের অনুমোদন নিতে হয়েছিল। অর্থাৎ অং সান সু কি কার্যত মিয়ানমার সরকারের ক্ষমতাহীন বেসামরিক নেত্রী।
একদিকে যেমন সারা বিশ্বে মিয়ানমার সরকার, তার সেনাবাহিনী ও অং সান সু কি মারাত্মকভাবে নিন্দিত হচ্ছেন তেমনই আবার চীন কর্তৃক প্রশংসিতও। রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রও তাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। শুধু ইরান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ব্যতিক্রম। মালয়েশিয়ায় তো সু কির বিচার হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গা নির্যাতনের কারণে। আন্তর্জাতিক এই প্রেক্ষাপটটি সামনে রাখলে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের পরিসমাপ্তি বা তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন যে সহজ নয় তা উপলব্ধি করা যায়।

অপর পক্ষে বাংলাদেশে নানা-রাজনৈতিক শক্তির রোহিঙ্গা রাজনীতিও লক্ষণীয়। যে তথাকথিত ইসলাম দরদি দলগুলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে পাকিস্তান রক্ষার ‘পবিত্র’ ব্রত নিয়ে বর্বর পাকবাহিনীর সহায়তা করতে উঠেপড়ে লেগেছিল, এ দেশের দেশপ্রেমিক কোটি কোটি স্বাধীনতাকামী মানুষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে সক্রিয় সহায়তা করেছিল, ৩০ লাখ বাঙালিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল, ৪/৫ লাখ বাঙালি বিবাহিত-অবিবাহিত নারীকে ধর্ষণের জন্য তুলে নিয়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল সেই জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম আজ রাস্তায় নেমেছে রোহিঙ্গাদের সমর্থন করার নামে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যকে একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ হিসেবে কায়েমের সেøাগান নিয়ে। তারা ওই দাবিতে বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নেয়ার চেষ্টায় এ দেশের রাজপথে ব্যানার, ফেস্টুন ও নানা স্লোগান নিয়ে পথে নেমেছে।

আসলে এতে শক্তিশালী হচ্ছে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর হাত। ‘আরসা’ (আরাকান স্যালভেশন আর্মি) সংক্রান্ত দাবি প্রতিষ্ঠা করার সুযোগেই করে দিচ্ছে ওই তথাকথিত রোহিঙ্গা দরদিরা। তারা আরো বলছে- ‘ইসলামি উম্মাহ এক হও’। হয়েছে কি কোনো দিন তারা কোনো ন্যায্য দাবিতে? মুসলিম বিশ্ব কি এক হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্যালেস্টাইনি মুক্তি সংগ্রামে? দাঁড়িয়েছিল কি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির সপক্ষে? এবার রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নির্মম ও বর্বর জুলুম-অত্যাচারের বিপক্ষে কি দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব, তার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বিশ্ব, পাকিস্তান প্রভৃতি?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মুসলিম বিশ্বের অনৈক্যের ফলেই রোহিঙ্গারা আজো নির্যাতিত। এ কথা ফলাও করে প্রচার করা সত্তে¡ও কি মুসলিম বিশ্ব একমত হয়েছে শুধু ইরান ও তুরস্ক ছাড়া? এই রাজনীতির অন্তর্নিহিত অর্থগুলো স্পষ্টভাবে উদঘাটন করা প্রয়োজন। জামায়াত, হেফাজত প্রভৃতি আজ পাকিস্তানি আইএসআইয়ের মদদে ওই দাবি তুলছে বহুদিন ধরেই তারা এ ব্যাপারে সচেষ্ট। বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকাগুলোতে বহুকাল ধরে পাকিস্তানের হাইকমিশনার আইএসের এজেন্টরা ওই লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। পাকিস্তানি এই ষড়যন্ত্র কদাপি আমরা যেন না ভুলে যাই। আরসা বা আরাকান স্যালভেশন আর্মি নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের আদৌ অস্তিত্ব নেই বলে উড়িয়ে দিলে হবে না বরং শক্তিশালী গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এর সত্যতা/অসত্যতা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আজ বাংলাদেশ সরকারের ওপর পড়ছে। দফায় দফায় বছর বছর রোহিঙ্গা শরণার্থী লাখে লাখে ঢুকবার পেছনে অজুহাত তৈরিতেও নেপথ্যে কারা রসদ জোগাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সে তথ্য উদঘাটন অতীব জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।

অপরদিকে ব্রিটিশ সরকার সমর্থন জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের প্রদর্শিত শরণার্থী রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণকে। তারা অর্থনৈতিক সহায়তা দেবেন রোহিঙ্গাদের প্রতি ত্রাণ হিসেবে অপরপক্ষে সু কিকে ইউনিসনের ঘোষিত সম্মাননা প্রদান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের প্রতি তার ও তার দেশের সেনাবাহিনীর বর্বর ও অকথ্য নির্যাতনের কারণে। একই কারণে ব্রিটিশ সরকার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও বাতিল করেছেন। সর্বশেষ জানা যায়, আমেরিকাও শরণার্থী রোহিঙ্গাদের জন্য যথেষ্ট ত্রাণ-মঞ্জুরি প্রদান করতে সম্মত হয়েছেন। ভারত সরকারও ত্রাণকার্যে এগিয়ে এসেছেন। সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারত সরকারের মনোভাব জানিয়েছেন। এসব থেকে প্রশ্ন তো করাই যেতে পারে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতিদের যে, ওপরের ওই দেশগুলোর সহায়তা নেয়া কি জায়েজ হবে? তারা তো ইসলামি উম্মাহর কেউ নন।

অপরদিকে দুঃখজনক খবর প্রায় পাঁচ শতাধিক মিয়ানমারের হিন্দুও রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে বাংলাদেশে এসে ত্রাণ শিবিরে থাকাকালে বলেছে, তারাও নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমার ছেড়েছে। তবে তারা আর মিয়ানমারে ফিরে যেতে সাহস পান না, নিরাপত্তা না থাকার আশঙ্কায় তারা শঙ্কিত। আবার বাংলাদেশেও তারা নিরাপদ বোধ করেন না বলে তারা ভারতে যেতে ইচ্ছুক স্থায়ীভাবে। বাংলাদেশে কেন তারা নিরাপদ রোধ করছেন না, সরকারকেই তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে ভারতমুখী নয়, মিয়ানমারে ফেরত যেতে উদ্বুদ্ধও করতে হবে অন্য সব রোহিঙ্গার সঙ্গে। এভাবেই সমস্যাটি সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাধানে বিশ্ববাসী সমর্থন হবেন।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক, কলাম লেখক।
raneshmaitra@gmail.com

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা