রোহিঙ্গা সংকট ও তার দুরূহ সমাধান

আগের সংবাদ

লন্ডনে আনিসুল হকের জানাজা

পরের সংবাদ

পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে সরকার কাজ করছে

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১, ২০১৭ , ৮:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ১, ২০১৭, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ

‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’র দুই দশক পূর্ণ হলো আজ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর ফলে প্রায় সুদীর্ঘ ২২ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হয়। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি পাহাড়িদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। চুক্তির বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে ভোরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন ভোরের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার তানভীর আহমেদ

পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই দশক পূর্ণ সম্পর্কে নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক পূর্ণ হলো। পার্বত্য শান্তি চুক্তির অধিকাংশ ধারা পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং কয়েকটি ধারা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

তিনি বলেন, শান্তি চুক্তি ৪ খণ্ডে বিভক্ত। ‘ক’ খণ্ডে ৪টি, ‘খ’ খণ্ডে ৩৫টি, ‘গ’ খণ্ডে ১৪টি এবং ‘ঘ’ খণ্ডে ১৯টি অর্থাৎ সর্বমোট ৭২টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে মোট ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত, ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। এই সংঘাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বহু লোক হতাহত হয়। হাজার হাজার উপজাতি জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল এক অশান্ত জনপদ। ১৯৭৫ পরবর্তী ১৯৯৬ পর্যন্ত সরকারগুলো তাদের ভ্রান্তনীতির কারণে এবং আন্তরিকতার অভাবে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি।

চুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শান্তি চুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাগুলো বাস্তবায়ন এবং পার্বত্য এলাকার সর্বস্তরের জনগণের উন্নয়নে নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার যথাযথভাবে পার্বত্যবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।

ভারত প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩টি উপজাতীয় শরণার্থী পরিবারের ৬৪ হাজার সদস্যকে ইতোমধ্যেই পুনর্বাসিত করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। ২০ বছর আগে যারা চাকরির স্থান ত্যাগ করেছিল তাদের পুনরায় চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের শর্ত শিথিল করে তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।

পর্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সাল থেকে অদ্যাবধি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পরপর ৫টি ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে। ভূমি সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ পাস করা হয়েছে। এই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ সম্পর্কে আঞ্চলিক পরিষদ উত্থাপিত আপত্তিগুলো বিবেচনা করে এই আইনের সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই এলাকার জনগণের ভূমির অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে শিগগিরই ভূমি জরিপ করা সম্ভব হবে এবং ভূমি কমিশন কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে সক্ষম হবে।

পার্বত্য এলাকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শান্তি চুক্তির পর বিভিন্ন ধরনের ১৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সমতলের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা বলবৎ রয়েছে। ৩টি পার্বত্য জেলায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক চালু করা হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারাকে বজায় রেখে এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পার্বত্য পর্যটন শিল্প বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রাখার সব প্রচেষ্টা সরকারের রয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরো জানান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে দেশি এবং বিদেশি এনজিওগুলোর কার্যক্রম, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পার্বত্যাঞ্চলে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ সড়ক, অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান, অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্বত্যাঞ্চলে মোতায়েনরত সেনাবাহিনীকে ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাসে প্রত্যাবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তিন পার্বত্য জেলায় ৪১ হাজার ৮৪৭ জনকে বয়স্ক ভাতা, ২২ হাজার ৪১০ জনকে বিধবা ভাতা, সাত হাজার ৩১১ জনকে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ৯৮১ জন প্রতিবন্ধীকে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে এক হাজার ৪৬টি সমিতির মাধ্যমে ৫২ হাজার ১৭২ জন সদস্যের দারিদ্র্য বিমোচন তথা জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৬২৩টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ২৫৭ কোটি ২১ লাখ টাকায় ৩ হাজার ৯০৬টি স্কিম বাস্তবায়ন হয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ শান্তি চুক্তির পর ৪০টি নতুন বিদ্যালয় স্থাপন এবং ১০০টি বিদ্যালয় মেরামত/সংস্কার করা হয়েছে। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ৩২ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় ক্ষুদ্র যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।