সেই স্বৈরাচারও এত খারাপ ছিল না: ফখরুল

আগের সংবাদ

খালাস পেলেন দণ্ডপ্রাপ্ত সেই সাবেক সিভিল সার্জন

পরের সংবাদ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা কি ঝিমিয়ে পড়ছে?

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৭ , ৭:৩৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ৬, ২০১৭, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে বোঝাপড়া হয়েছে তা যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। একে উইন-উইন মার্কা চুক্তি বলার সুযোগ একেবারেই নেই। এমন একটি চুক্তি যাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই লাভবান হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে তেমন কিছু হওয়ার কথা নয়। এই চুক্তিতে কোনো উইন বা লাভ জাতীয় কিছু যদি থাকে তা পাওয়ার কথা রোহিঙ্গাদের। সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ও অবিচারের শিকার তারাই। বাংলাদেশ তাদের মিয়ানমারে ফেরত দিতে পারলে তারও লাভ হবে, ঠিক। কিন্তু মিয়ানমারের জন্য উইনটা কী? অথচ এখন বলাবলি হচ্ছে যে, আসলে মিয়ানমার ও তার জাতিবিনাশী রোহিঙ্গানীতিই জিতেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে এসে গর্বের সঙ্গে বলেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো।’

দেখা যাচ্ছে, শুধু যেনতেন প্রকারে কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারলেই সংকটের সমাধান বলে তিনি মনে করছেন। কিন্তু কীভাবে, কতজনকে, কোথায়, কবে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমার সরকারকে আদৌ বিশ্বাস করছে কিনা, দেশটির অভ্যন্তরীণ জাতিবিদ্বেষী হিংসাত্মক পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা, এ রকম নৃশংস ঘটনা ও দেশান্তরের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে কিনা এবং জাতিবিনাশী পদক্ষেপ বন্ধে তাদের সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী- এসব গুরুত্ব পায়নি। সে কারণে এসব প্রশ্নের যেনতেন উত্তর এই সমঝোতা দলিলে পাওয়া যাবে, কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে মিয়ানমার সরকারকে যেখানে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যে রোহিঙ্গা নির্যাতন ও উচ্ছেদকে স্পষ্টই মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে ফেলা হচ্ছে, সে বিষয়ে এ বোঝাপড়া-চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমার সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও রোহিঙ্গা সংকটের আশানুরূপ সমাধান হচ্ছে না। দেখা যাক, মিয়ানমারের আসল রোহিঙ্গানীতিটি কী?

মিয়ানমারে যা হচ্ছে তা যেকোনো সংজ্ঞায় নিখাদ গণহত্যা। দুনিয়ার যে কেউ তা বুঝলেও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও তাদের বিশ্বশান্তির দূত সু কি তা বুঝতে পারছেন না, অন্তত সে রকম একটা ভান করছেন। বিশ্বমঞ্চে অভিনয় করছেন যেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না, তারা তো রোহিঙ্গা বলে কারো অস্তিত্বই স্বীকার করেন না। সু কি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদেরও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করতে অনুরোধ করেছেন। সুতরাং বার্মায় যেন কিছুই হচ্ছে না। বাংলা প্রবাদে আছে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। অথচ সু কি ও তার সামরিক নেতারা শাক দিয়ে গণহত্যা ঢাকার চেষ্টা করছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- বার্মায় এ গণহত্যা কোনো হঠাৎ উদ্ভূত ঘটনা নয়, এটি সেখানকার সামরিক বাহিনী-পরিচালিত সরকারের একটি নীলনকশার বাস্তবায়ন।

যাতে করে জাতিগত নিধনযজ্ঞের এই নীলনকশাটি বোঝা না যায়, সে জন্য মিয়ানমার সরকার নানা রকম ছলছুতার আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে তাদের একটি বহুল ব্যবহৃত প্রচার-কৌশল হচ্ছে বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটের কারণ হিসেবে রোহিঙ্গা বাহিনী দ্বারা তাদের পুলিশ-সৈন্যদের ওপর হামলাকে দেখানো। অথচ যে রোহিঙ্গারা এই হামলায় জড়িত তাদের সঙ্গে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা মুসলমানের কোনো সম্পর্ক নেই। রোহিঙ্গা মুসলমানদেরও একটা বড় অংশ সু কির নেতৃত্বের সমর্থক। কিন্তু বার্মার সৈন্য ও পুলিশের ওপর হামলাকে তারা বিরাট করে তুলে ধরে দেশের সব রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যার অভিযানে নেমেছে।

দেশ থেকে পালানো ছাড়া তাদের কারো বেঁচে থাকার সব উপায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হামলাই এর কারণ। যা এক ডাহা মিথ্যা।

নিশ্চয়ই সৈন্য ও পুলিশের ওপর হামলা বার্মার সরকারকে রোহিঙ্গা নিধনের নীলনকশা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু নীলনকশাটি আগেই তৈরি আর তার বাস্তবায়নও হচ্ছে আগে থেকেই। রোহিঙ্গা বাহিনীর হামলা সব রোহিঙ্গা মুসলমান নির্মূলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দ্রুত গতিতে শেষ করার অজুহাত হিসেবে কাজে লাগছে। রোহিঙ্গা সংগঠন কর্তৃক হামলা ও তার জবাবে সেনাবাহিনীর হামলার মধ্যে মাত্রা ও পরিমাণগত বিরাট পার্থক্য বিদ্যমান। সহজেই বোঝা যায়, গণহত্যার এই অভিযানটি এক দিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি রয়েছে যা একটি জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূলের উদ্দেশ্যে তৈরি। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক ২০১৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ‘বেআইনি হত্যা, বাছবিচারহীন আক্রমণ, সম্পদ ধ্বংস, সাহায্য ও সেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা সবই রোহিঙ্গা জাতি নির্যাতনের জন্য বহু দশকব্যাপী তৈরি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার একটা অংশ। বর্তমান সংকট নিরসনের জন্য সরকারি কমিশন গঠন ও তদন্তের চেয়ে বেশি কিছু লাগবে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এমনকি ৯ অক্টোবরের আগে থেকেই ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত ব্যাপক বিস্তৃত বৈষম্যমূলক নীতি ও চর্চা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয় কর্তৃক প্রাপ্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, হত্যা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, ইচ্ছেমতো আটকে রাখা, অত্যাচার, পেটানো ও অন্যসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো একটি বিশেষ ধর্মের ও জাতির মানুষকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।’

সুতরাং ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে যেসব ঘটনা উপস্থাপিত হয়েছে তাতে সব নির্যাতনের শিকার একটি বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। আবার জানা যায়, সামরিক কর্মকর্তা ও সৈন্যরা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে নির্যাতনের সময় বলে থাকে, দেশটি থেকে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করা হবে। এই জাতিগত নিধনযজ্ঞ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য রাখাইন গ্রামের বৌদ্ধ লোকজনকেও নিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা বাহিনীতে চাকরি দিয়ে বা কখনো অস্ত্র ও সামরিক পোশাক দিয়ে এই নিধনযজ্ঞে লাগানো হচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা তাদের এমন অনেক বৌদ্ধ প্রতিবেশীকে অস্ত্র হাতে নিধনযজ্ঞে চিহ্নিত করতে পেরেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের কর্মকর্তা প্রমিলা প্যাটেন বলেছেন, রোহিঙ্গা নারীদের ওপর সৈন্যদের যৌন নির্যাতন যুদ্ধাপরাধের শামিল। এসবেরও উদ্দেশ্য রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা। বার্মায় গণহত্যার একটি সরকারি পরিকল্পনা যে বাস্তবায়িত হচ্ছে এসব থেকে তা স্পষ্ট।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সরকারের কাছে এই প্রতিবেদন দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যেই রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়ে যায়। যা বর্তমানে হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে দেশটি থেকে সমূলে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে রূপ নিয়েছে। রোহিঙ্গা নিধনের নীলনকশা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির পুরো সুবিধা নিচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী পরিচালিত সরকার। কার লাভ হচ্ছে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায়, পরিস্থিতির পেছনে কোন শক্তির হাত বেশি।

কমিশনের চেয়ারম্যান কফি আনানের কথায় এই প্রতিবেদনটির সম্ভাবনা ছিল ‘রাখাইন রাজ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ চিহ্নিত করার।’ প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো যেত। এর ফলে রোহিঙ্গা জাতি নিধনের নীলনকশা বাস্তবায়নও সম্ভব হতো না। স্বভাবতই প্রশ্ন- মিয়ানমারে কোন শক্তি সেখানে জাতিগত বৈষম্যের নীতি অব্যাহত রাখতে চায় ও পরিস্থিতি এমন খারাপ করতে চায় যাতে রাখাইনে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি বজায় থাকে?

যে শক্তি এই গণহত্যা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে সু কিকে রাষ্ট্রের মাথা হিসেবে পেয়ে তাদের বেশ লাভ হয়েছে। এতে সু কির কতখানি লোকসান হয়েছে বলা মুশকিল, তবে তার নাম ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এটুকু বলা যায়। গণহত্যার নীলনকশা থেকে মিয়ানমার সরকারকে সরানোর সহজ কাজ হবে না। এ জন্য বেশি মাত্রায় আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন। একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের জন্য ‘উইন’ বা লাভজনক পরিস্থিতিই তৈরি করতে পারে। রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে সাফল্য লাভের পর এ রকম চুক্তি মিয়ানমার সরকারের তেমন মাথাব্যথার কারণ হবে না। এই চুক্তির সব দিক মিয়ানমার সরকার কীভাবে ও কতটা পালন করবে, কতটা এড়িয়ে যাবে ও কতখানি করবে না- এখন তা লক্ষ করার বিষয়।

আলমগীর খান : লেখক।