বিশ্ব ইজতেমা

আগের সংবাদ

হিসাব মেলাতে পারছি না?

পরের সংবাদ

অনন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১২, ২০১৮ , ৬:৪৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০১৮, ৬:৪৪ অপরাহ্ণ

আহমেদ সুমন

গবেষক। প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হলো গতকাল। ২০০১ সাল থেকে এ দিনটিকে কর্তৃপক্ষ ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করছেন। তৎকালীন উপাচার্য খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুল বায়েস ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের প্রচলন করেন। তৎকালীন সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. এম এ মতিন বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে ১২ জানুয়ারি দিনটিকে বিশ^বিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করেন। এখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়। অধ্যাপক আবদুল বায়েস এ ক্ষেত্রে পথিকৃত। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রচলন অধ্যাপক আবদুল বায়েস শুরু করলেও আরেক খ্যাতিমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৯৬ সালের ১২ জানুয়ারি ২৫ বছর পূর্তি উৎসব পালন করেন। বিশিষ্ট রসায়নবিদ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি ‘গৌরবের ৪০ বছর পূর্তি উৎসব’ করে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন।

বলা প্রয়োজন যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স স্বাধীন বাংলাদেশের সমান। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে দেশের অন্যতম প্রধান এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খানিকটা আলোচনা করতে চাই। ইংরেজ শাসনামলেই পূর্ববাংলায় একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষিত হওয়ার পরে অখণ্ড ভারতের প্রধান প্রশাসক লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। এ সময় নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহসহ আরো অনেকে পূর্ববাংলার মানুষের জন্য একটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি জানান। ইংরেজ সরকার উপর্যুপরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন পূর্ববাংলার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। ১৯২১ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, কৃষি, প্রকৌশল ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার সালনায়। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাভার এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন স্থান নির্বাচন করা হয়। সাভারের ওপর দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে। এই মহাসড়কের পশ্চিম পাশে নির্ধারণ করা হয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্থান। এর পাশে রয়েছে ডেইরি ফার্ম, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভার সেনানিবাস ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প প্রধান হিসেবে ড. সুরত আলী খানকে নিয়োগ করা হয়। ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান সরকার এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজউদ্দিন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রিয়ার এডমিরাল এস এম আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর উদ্বোধন করেন। তবে এর আগেই ৪ জানুয়ারি অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম ব্যাচে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৫০ জন। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট পাস করা হয়। এই এ্যাক্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’। ৬৯৭.৫৬ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫টি অনুষদের অধীনে ৩৩টি বিভাগ চালু আছে। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ), ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং ও ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। আবাসিক হল ১৬টি। এর মধ্যে নির্মাণাধীন রয়েছে ৩টি। ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১৫ হাজার।

৪৭ বছরের পথ পরিক্রমায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণার নানা ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’ নির্মাণের মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চার অনন্য নজির স্থাপন করা হয়েছে এখানে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির এ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ গবেষণা কেন্দ্রে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেনের তত্ত্বাবধানে এখানে কীটপতঙ্গের জিনের ডিএনএ বারকোডিং করা হচ্ছে, যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব এবং প্রতুতত্ত্ব বিভাগ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম খোলা হয়। কলা ও মানবিকী অনুষদভুক্ত এ দুটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও প্রাগ্রসর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তমঞ্চ’ বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম, যা উপাচার্য অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সময়ে নির্মাণ করা হয়। ১৯৮০ সালে সেলিম আল দীন রচিত ‘শকুন্তলা’ নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে এই মুক্তমঞ্চের যাত্রা শুরু হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী প্রীতিলতার নামে হলের নামকরণ, ভাষা আন্দোলনের স্মারক ভাস্কর্য ‘অমর একুশ’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আল বেরুনী, বিশিষ্ট সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, ভাষা শহীদ সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারের নামে হলের নামকরণ, মওলানা ভাসানীর নামে ‘মওলানা ভাসানী হল’, জাতির জনকের নামে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ হলের নামকরণ, ঘাতক দালাল নির্র্মূল আন্দোলনের পুরোধা নেত্রী জাহানারা ইমামের নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃত কবি সুফিয়া কামালের নামে হলের নামকরণ, বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাদানকারী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নামে ছাত্রী হলের নামকরণের মধ্য দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।

দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সাংবাদিকতা স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রচলন হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম ‘সাংবাদিক সমিতি’ গড়ে তোলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন সংগঠনগুলোর একীভূত সংগঠন ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হয়। প্রাকৃতিক জলাধার এবং অতিথি পাখির অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য অবদান সবারই জানা। পাখিমেলা এবং প্রজাপতি মেলা আয়োজনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য কীর্তি দেশজুড়ে সমাদৃত। বাংলাদেশে এ দুুটি মেলা এখানেই প্রথম চালু হয়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজের তত্ত্বাবধানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিপন্নপ্রায় বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ কেন্দ্র (ডব্লিউআরসি), অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন প্রজাপতি পার্ক এবং অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার কীটপতঙ্গ প্রতিপালন ও পরীক্ষা কেন্দ্র (আইআরইএস) স্থাপন করেছেন, যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এ তিনটি গবেষণা প্রকল্প দেশ-বিদেশে প্রশংসা লাভ করেছে।

ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন এবং অর্জনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য কীর্তি রয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই মৌলবাদী ছাত্ররাজনীতি এখনো নিষিদ্ধ আছে। ১৯৮৯ সালে শহীদ সালাম বরকত হলের এক আবাসিক ছাত্র মৌলবাদী শিবির চক্রের হামলায় নিহত হওয়ার পর সেই সময়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য এ ক্যাম্পাসে মৌলবাদী ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা লাঠি হাতে ছাত্র হলে প্রবেশ করে যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত ছাত্রদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করার অনন্য নজির স্থাপন করে। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে দেশের মধ্যে প্রথম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী অভিযোগ সেল’ গঠিত হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু কিশোরদের জন্য ‘আনন্দশালা’ স্কুল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম খোলা হয়েছে। পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খবির উদ্দিন যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনার ভাগাড় না দিয়ে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে তা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপন্ন করার প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। ড. খবির উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পানি শোধনাগারও নির্মাণ করেছেন। এই দুটি প্রকল্পই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনন্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে নতুন আরো একটি বছরের দিকে অগ্রসরমান। সংশ্লিষ্ট সবাই মনে করেন যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য কীর্তি সাধনে এবং নতুনত্বে সাফল্য অর্জনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে।

আহমেদ সুমন : গবেষক। প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জাবি।