অনন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আগের সংবাদ

অর্থনীতি ও নৈতিকতা : জনকেন্দ্রিক উন্নয়নের সন্ধানে

পরের সংবাদ

হিসাব মেলাতে পারছি না?

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১২, ২০১৮ , ৬:৫৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০১৮, ৬:৫৪ অপরাহ্ণ

শিতাংশু গুহ

কলাম লেখক

আসাম থেকে বাঙালি মুসলমানদের তাড়িয়ে দেয়ার সংবাদে সবাই উদ্বিগ্ন। আসাম নতুন নাগরিকত্ব তালিকা করেছে, তাতে অনেক মুসলমান বাদ পড়েছে। এদের খেদিয়ে দেয়া হবে? আসাম এদের বাঙালি অনুপ্রবেশকারী বলছে। কেউ কেউ বলছে, আসলে কিচ্ছু হবে না, ২০১৯-এ ভারতে নির্বাচন, তাই একটু ‘মুসলমান খেদাও’ ডাক উঠেছে। মমতা বলেছেন, ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না’। প্রশ্ন হলো- এত লোক তাড়িয়ে দেয়া কি সম্ভব?

মিডিয়া মোগল কৃষ্ণাঙ্গ টিভি ব্যক্তিত্ব অপরাহ উইনফ্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে তিনি জানিয়েছেন, আপাতত তার তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। হোয়াইট হাউস বলেছে, সি ইজ ওয়েলকাম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আই লাইক হার। অপরাহ উইনফ্রে প্রার্থী হবেন কি হবেন না সেটা পরের প্রশ্ন, কিন্তু মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী হয়েছেন। কেন জানি মনে হলো, সত্যি যদি তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তাকে না আবার জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবের মতো বিদায় নিতে হয়? অনেকের মতে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সে দিন যদি দেশে ফিরে এসে ক্ষমতা না নিতেন তাহলে হয়তো ভালো হতো। তিনি থাকতেন সবার মধ্যমণি। হয়তো তাই, কিন্তু সে দিনের পরিস্থিতিতে ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুকে নিতেই হতো, দেশবাসী মানতো না?

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের সে দিন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে খোলা জিপের ওপর বঙ্গবন্ধুকে দেখার। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে দিন ফিরে আসেন সে দিনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম ফার্মগেটের অদূরে ‘সংশয়’-এর কাছে। ‘সংশয়’ বাড়িটি এখনো আছে কিনা জানি না, কিন্তু ওটি ছিল জগন্নাথ কলেজের জাঁদরেল প্রিন্সিপাল সাঈদুর রহমানের বাড়ি; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে তার ভ‚মিকা ছিল অনন্য।

বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাকিস্তানকে বাঁশ দিয়েছেন। এখন সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছেন। এতে ভারতের খুশি হওয়ার কথা। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতির প্রশ্নে জাতিসংঘে ভোটাভুটিতে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, এতে কেউ খুশি, কেউ অখুশি! তবে আসাম থেকে বাঙালি মুসলমানদের তাড়িয়ে দেয়ার সংবাদে সবাই উদ্বিগ্ন। আসাম নতুন নাগরিকত্ব তালিকা করেছে, তাতে অনেক মুসলমান বাদ পড়েছে। এদের খেদিয়ে দেয়া হবে? আসাম এদের বাঙালি অনুপ্রবেশকারী বলছে। কেউ কেউ বলছে, আসলে কিচ্ছু হবে না, ২০১৯-এ ভারতে নির্বাচন, তাই একটু ‘মুসলমান খেদাও’ ডাক উঠেছে। মমতা বলেছেন, ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না’। প্রশ্ন হলো- এত লোক তাড়িয়ে দেয়া কি সম্ভব? এরা যাবে কোথায়? এদের গন্তব্য কি বাংলাদেশ? একজন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ডাম্প করেছে; ভারত ডাম্প করবে অসমীয়াদের; আর পাকিস্তান তো অনেক আগেই বিহারিদের ডাম্প করে রেখেছে। তার প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি ডাম্পিং অঞ্চল? সুন্দর প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর নেই? তবে আমাদের অভয় বাণী শুনিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, তিনি অসমীয়া মুসলমানদের তার রাজ্যে স্থান দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। তার এই ইচ্ছে, ভালো কি মন্দ অথবা পশ্চিমবঙ্গবাসী মানবে কিনা সেটা ভিন্ন প্রশ্ন।

অনেকেই উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন বা কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নরিয়েগার কথা মনে হয় ভুলে যাননি, এরা বিভিন্ন সময়ে যথেষ্ট ‘ফাউল’ কথাবার্তা বলতেন। আমেরিকা পরে দুজনকেই ধরে নিয়ে এসেছিল। এ সময়ে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং ইল মাঝেমধ্যে বেশ উল্টাপাল্টা বকছেন! নতুন বছরে তিনি বলেছেন, তার দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের বোমার ‘বোতাম’ এখন তার টেবিলে এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো শহরে হামলা চালাতে সক্ষম। মার্কিন সমর দপ্তর অবশ্য বলেছে, উত্তর কোরিয়ার সেই ক্ষমতা নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমার টেবিলের পারমাণবিক বোতামটি’ অনেক বড়। মিডিয়া অবশ্য এরপর তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলেছে, আসলে ট্রাম্পের টেবিলে এমন কোনো ‘বোতাম’ নেই? মিডিয়া জানায়, ট্রাম্প নিঃসন্দেহে পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু সেটা বোতাম টিপে নয়, বরং প্রটোকলের মাধ্যমে। তিনি শুধু সিদ্ধান্ত দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে অন্যরা। অনেকেই ভাবছেন, যুক্তরাষ্ট-উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ কি হবে? একই প্রশ্ন, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কি যুদ্ধ হবে? আপাতত ভারত-চীন যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই, কিন্তু ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সম্ভবনা কি উড়িয়ে দেয়া যায়? অন্তত সীমিত যুদ্ধ? ২০১৯-এ ভারতে নির্বাচন, মোদি ম্যাজিক আগের মতো কাজ করছে না। জিততে হলে, মোদিকে কি যুদ্ধ অথবা রাম মন্দির একটাতে হাত দিতে হবে?

এদিকে ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা। এক সময় বাদশার নামডাক ছিল, এখন জনতা পিছে নেই, তবে বাদশা বিচ্যুতি দেখে অবাক হতে হয়। পত্রিকা সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, কিন্তু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা? পুলিশ ইতোমধ্যে শ্যামল দত্তের বাড়িতে হানা দিয়েছে! অবাক হওয়ার পালা, আমাদের পুলিশ কবে এমন একটিভ হলো? শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে ত্বরিত তৎপরতায় মনে হচ্ছে, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়?’ কিছু ধর্মান্ধ গোষ্ঠী শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে সমাবেশও করেছে। ট্রাম্পের ঠেলা খেয়ে ধর্মান্ধ পাকিস্তানিরা এখন বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলছে, নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ‘আমরাই বাংলাদেশকে আলাদা করেছি’। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে মৌলবাদীদের ঠ্যালা খেয়ে শ্যামল দত্ত বা অন্য প্রগতিশীলদের মুখ বন্ধ করে থাকতে হবে? বঙ্গবন্ধু বলতে বলতে আমাদের মুখে ফেনা উঠছে, কিন্তু আজকের বাংলাদেশ কি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ? মৌলবাদ যেখানে প্রগতিশীল শক্তিকে ডিক্টেট করছে, প্রতিদিন হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, সেটা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হয় কী করে? বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ব্লগাররা হয় পালিয়ে বেড়াচ্ছে নয়তো বা আসাদ নূরের মতো জেলে? আর মৌলবাদীরা বুক চিতিয়ে হাঁটছে?

সূর্যবার্তার সুমি খান লিখেছেন, ক্রোধের আগুন বুকে নিয়ে এই পোস্ট লিখছি : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নার্সেস ইনস্টিটিউটের প্রভাষক মিসেস অঞ্জলী দেবী চৌধুরীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অঞ্জলী সকালে তেলিপট্টির বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে চারজন যুবক তাকে পেছন থেকে কুপিয়ে হত্যা করে। সন্দেহের আগুন ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর দিকে? কারণ কিছুদিন আগে নার্সের পোশাকে হিজাব আমদানির দাবিতে বিক্ষোভের প্রতিবাদে যারা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, অঞ্জলী ছিলেন তাদের অগ্রগামী। আগুন তো শুধু সুমির বুকেই জ্বলছে না, বরং প্রগতিশীলদের বুকেই এ আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে! আর কত? একটি প্রগতিশীল সরকার ক্ষমতায়, কিন্তু সবকিছু যেন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে? কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছি না? এ কোন বাংলাদেশ? তার চেয়ে ট্রাম্পের শরণাপন্ন হই, তিনি বলেছেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় গুণের একটি হচ্ছে আমি মানসিকভাবে খুবই ধীরস্থির। আমি একজন ব্যবসায়ী থেকে টিভি তারকা এবং তারপর প্রেসিডেন্ট হয়েছি, এটাই প্রমাণ করে যে, আমি শুধু বুদ্ধিমান নই, একজন জিনিয়াস’। ট্রাম্প নিজের ঢোল নিজে বাজাতে পছন্দ করেন, তা নতুন নয়? তবে এ মুহূর্তে তিনি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, তা হলো- ‘এতদিন ছিল ফেইক নিউজ, এখন এসেছে ফেইক বুক’। ট্রাম্প ‘ফেইক’ নিয়ে থাকুক, আমরা আসল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়’ ফিরি না কেন?

১০ জানুয়ারি ২০১৮। নিউইয়র্ক।
শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।