স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসে রক্তাক্ত স্মরণ

আগের সংবাদ

তারেককে নিয়ে আ. লীগের দাবি বানোয়াট : বিএনপি

পরের সংবাদ

বিএনপির ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে!

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮ , ৮:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ

শেখর দত্ত

রাজনীতিক, কলাম লেখক

তারেক জিয়া কার্যকরী চেয়ারপারসন হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো সাপোর্ট পাওয়া এখন দিল্লি দুরস্তর মতো ব্যাপার-স্যাপার হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির বিচ্ছিন্নতা চরমে উঠবে। সব মিলিয়ে বিএনপি এখন দাঁড়িয়ে আছে ক্রস রোডে। বিএনপি আন্দোলনের দল নয়- এই পরীক্ষিত কথাটাকে যদি মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারে বিএনপি, তবে দলটির ভবিষ্যৎ আছে। আর যদি না পারে তবে দুর্ভোগ দুর্দশা ভাঙন বিচ্ছিন্নতা যে ভাগ্যে রয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

চেতনায় প্রত্যাশা

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হলে কী হবে, এটা ছিল গত বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত মানুষের মাঝে প্রশ্ন। নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ও অনুমান করা হচ্ছিল। পরপর দুইবার ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মতো জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর এবং নিরীহ মানুষের মৃত্যুসহ নাশকতামূলক কাজ আবারো শুরু হয় কিনা, তা নিয়ে জনগণের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগ কাজ করছিল। নেত্রী গ্রেপ্তার হলে বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোট কোন ধরনের কর্মসূচি নিয়ে অন্দোলনে নামবে, বিক্ষোভ মিছিল হরতাল অবরোধ প্রভৃতি কী ধরনের কর্মসূচি দেবে, গণমানুষ রাস্তায় নামবে কি না প্রভৃতি ধরনের প্রশ্ন মানুষের মধ্যে ছিল না। সর্বত্র ছিল একই প্রশ্ন, গণ্ডগোল হবে কি না? আসলে বিগত সময়ের কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনকে গণ্ডগোলের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। এটা তো সবারই জানা, আন্দোলন মানে সরকারের মামলা-গ্রেপ্তার, লাঠি-গুলি-টিয়ারগ্যাস উপেক্ষা করে রাস্তায় জনগণের বিক্ষুব্ধ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো আর গণ্ডগোল মনে হচ্ছে ভয়-শঙ্কায় মানুষের ঘরে থাকা। নিজ কৃতকর্মের কারণেই বিএনপি মানুষকে রাস্তায় বের করতে পারছে না, ঘরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে কোনো দল ও জোটের জন্য এমনটা হওয়া দুর্ভাগ্যজনক ও ক্ষতিকর।

প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক অঙ্গনে বলা হয়ে থাকে বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। ক্ষমতার সোনার চামচ নিয়ে জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা দল। বাস্তবে এটা কোনো অপপ্রচার নয়, চলমান রাজনীতির অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ। জন্মের পর বিএনপি প্রথম বিপদে পড়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চট্টগ্রাম গিয়ে নিজ হাতে সাজানো সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী সদস্যদের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হওয়ার প্রায় ১০ মাস পর। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন। তখন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। কিন্তু এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে কোনো প্রতিবাদ ছাড়া রাষ্ট্রপতি সাত্তার যেমন বঙ্গভবন থেকে মাথা নত করে বের হয়ে যান, তেমনি বিএনপি দলটিও কোনো প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামে না।

তখনকার ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, মাত্র তিন বছর আগে দলছুট প্রতিক্রিয়াপন্থি সুবিধাবাদীদের নিয়ে বিএনপি দলটি সরকারি দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। নতুন দল তাই প্রতিবাদ করতে পারেনি বিষয়টা এমন ছিল না। এর প্রধান কারণ বিএনপির সরকার ও দল ছিল তখন নৈতিকভাবে বিধ্বস্ত ও খণ্ডবিখণ্ড। তাই এমন লেজ গুটানো ভাব ছিল বিএনপির। প্রসঙ্গত, সাত্তার ক্ষমতায় থাকতেই বিএনপি সরকারের দুই সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এ টি বারী ও জামালউদ্দিন, মন্ত্রী নুরুল হক ও ওবায়দুর রহমানসহ অনেকেই দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হন। যুব কমপ্লেক্স ও গ্রাম সরকারের অত্যাচার-নিপীড়ন ও লুটপাটে মানুষ ছিল দিশাহারা। যুবমন্ত্রী  আবুল কাশেম ও কুখ্যাত খুনি ইমদু নাটক বিএনপির মেরুদণ্ড সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেয়। ফলে আন্দোলন দূরে থাক, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা প্রবাদটি হয় বিএনপি জন্য প্রযোজ্য। দ্রুতই দলটি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। ওই পর্যায়ে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে বিএনপি তখনকার মতো রক্ষা পায়।

প্রকৃত বিচারে  এরশাদবিরোধী ১৫ দল ও ৭ দলের (পরবর্তী সময়ে ৮ দল ৭ দল ও ৫ দল) আন্দোলন বিএনপিকে চাঙ্গা করে তোলে। তখনকার ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, স্বৈরাচারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের মূল স্রোতধারা ছিল ১৫ দল। বিএনপির গায়ে তাই দমন ও নির্যাতনের টোকাটি লাগেনি। ক্ষুদ্র এ কলামে বেশি লেখার সুযোগ নেই বিধায় এটুকু বলেই এ পর্যায় শেষ করছি যে, রাজনীতির নানা ঘোরপ্যাঁচ ও ঘাত-প্রতিঘাতে শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ক্ষমতা হারিয়ে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০০১ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জিতেছিল ঠিকই। কিন্তু ওই বিজয় আনয়নে আন্দোলনের কোনো ভ‚মিকা ছিল না; প্রাসাদ ষড়যন্ত্র-চক্রান্তই প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।

তারপর বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০৬ সালে যখন আর্মি ও নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল সমাজ ব্যাকড ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের জরুরি আইনের সরকার দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখনো কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি ব্যর্থ হয়। লেজ গুটানোর দিক থেকে রাষ্ট্রপতি সাত্তার ও রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আয়নার এপিঠ ওপিঠ। প্রকৃত বিচারে ওই অসংবিধানিক সরকার যদি ‘মাইনাস টু’ পলেসি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রথমে গ্রেপ্তার না করত তবে বিএনপির জন্য আন্দোলন করা দূরে থাক আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোটাই ছিল অসম্ভব। বিএনপি-জামায়াত তখন আওয়ামী লীগ পরিচালিত আন্দোলনে লিপ সার্ভিস দেয়া ছাড়া কোনো ভ‚মিকা রাখেনি। নৈতিক বল ছাড়া আন্দোলন হয় না। দলটির ওপর কিংবা নিচে তখন ঐক্যবদ্ধ নৈতিক অবস্থান একেবারই নড়বড়ে ছিল। ওই সময়ে দলের দ্বিতীয় নেতা এবং প্রজেকটেড প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মামলা মোকাবেলা না করে সমঝোতার মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে।

সবশেষে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন বয়কট করে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে যা করেছে তা আন্দোলন নয়, স্রেফ আইনবিরোধী সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কাজ। এর জন্যই হাস্যকরভাবে পরাজিত হওয়ার পর তখন হরতাল  ও অবরোধ তুলে নেয়ার  ঘোষণা পর্যন্ত ওই দল দিতে পারেনি। তারপর বিএনপি আর মাঠে বা রাস্তায় নামতে পারেনি। কেবলই পিছিয়েছে। তত্ত¡াবধায়ক সরকার থেকে গেছে সহায়ক সরকারে। সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন থেকে গেছে সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনার আহ্বানে। প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পত্রপত্রিকার খবরাখবর থেকে জানা গিয়েছিল, আন্দোলন যেহেতু করতে পারছিল না বিএনপি, তাই দলীয় নেতারা নাকি শ্রেয় মনে করছিলেন নেত্রীর জেলে যাওয়া। তাতে যদি সহানুভূতির কারণে আন্দোলন দানা বাধে। এই চিন্তা থেকেই ২৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে ২০ দলীয় জোটের সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জিয়া অরফানেজ মামলার রায় নেতিবাচক হলে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন শুরু করা হবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তাতেও গুড়ে বালি পড়েছে।  খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়ার পর কয়েক দিন কেটে গেলেও বিএনপি আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে কিংবা জামায়াতসহ সাথীদেরও নামাতে পারেনি।

এমনটা যে করতে পারবে না, তা ওই দলের নেতারা খালেদা জিয়া গ্রেপ্তারের পরপরই বুঝে নিয়েছিলেন। তাই প্রথমেই ঘটনার মধ্যে পানি ঢেলে দিয়েছেন। চুপসে গেছেন বিএনপি নেতারা। যদি তা না হতো তবে খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়ার পর পরই মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলতেন না, রায়ের আগে নেত্রী নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরতে ও শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যেতে বলেছেন। পাঠকরা স্মরণ করুন নেত্রী খালেদা জিয়া ও নেতাদের আগের জ্বালাময়ী হম্বিতম্বি বক্তৃতার কথা। এক দফা আন্দোলনে সরকারকে উৎখাত না করে তাদের ঘরে ফেরার কথা ছিল না। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, ধৈর্য ও শান্ত থাকার কথা বা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ল জেলে যাওয়ার পর, আগে ওই কথাগুলো মনে থাকল না কেন?

কতটুকু হতভম্ব ও চুপসে গেছে বিএনপি, তা লক্ষ করা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি ওই দল আয়োজিত জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তৃতা বিবেচনায় নিলে। ওই দিন রাতে কলামটা লেখার জন্য অনলাইন পত্রিকা খুলে দেখলাম। তিনি বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে নিয়েই নির্বাচন হবে। তাকে ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। তার নেতৃত্বে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। আমরা চাই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। যে আন্দোলন চলছে, তাকে দমিয়ে রাখা যাবে না। আগামীতে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।’ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে নির্বাচনে যাবে না, এমন স্পষ্ট কথা এখন  আর বলছে না বিএনপি। এক দফা কিংবা সরকার উৎখাতের কথাও বলছে না। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনে অংশ নেয়ার ওপরই জোর দিচ্ছে।

ভাবটা এই খালেদা জিয়াকে ছেড়ে দেয়া হোক, বিএনপি নির্বাচনে যাবে। এটা কার না জানা যে, আন্দোলন যখন দানা বেঁধে অগ্রসর হয় তখন আন্দোলনকারীরা দাবি আরো অগ্রসর করে এবং সরকার পশ্চাৎপসরণে বাধ্য হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উল্টো। বিএনপি পিছাচ্ছে দাবির প্রশ্নে। আর সরকার আরো কঠোর হচ্ছে। জানা যাচ্ছে, ৩টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে আর ৩৪টি মামলা রয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এবং তা নিষ্পত্তির দিকে যাবে। অবস্থা যা তাতে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়া বন্দিই থাকুন আর মুক্তই থাকুন, সংবিধানের ভিত্তিতে নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপির আর কোনো উপায় থাকছে না। এক নেত্রী ক্ষমতায় থেকে আরেক নেত্রীকে জেলে নেবে, এটা খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে চিন্তাও করা যেত না। নির্বাচন অতি সন্নিকটে রেখে বর্তমান পর্যায়ে এসে দেখা গেল, সরকারি দল ও জোট বিএনপি দল ও জোটকে একেবারেই বেকায়দা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়  ফেলে দিয়েছে। বিএনপি যেমন দল তাতে নির্বাচনের বছরে ক্ষমতা সামনে না দেখলে ওই ভাব কাটিয়ে চাঙ্গা হবে, এমনটা ভাবা যাচ্ছে না।

বিএনপি দল যে কতটা বিপর্যয় ও অসহায়ত্বের মধ্যে আছে তা অনুধাবন করা যাবে, প্রবাসে থাকা ফৌজদারি মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত তারেক রহমানকে অস্থায়ী চেয়ারপারসন করার ভেতর দিয়ে। রাজনৈতিক দলে এমন নিয়ম চালু আছে, প্রধান নেতা বিদেশে বা জেলে গেলে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়া। বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা গেল এই নিয়ম কার্যকর থাকছে না। কিছুদিন আগে খালেদা জিয়া যখন বহুদিন লন্ডন থাকলেন, তখন কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এবারে দায়িত্ব দেয়া হলো হাওয়া ভবনখ্যাত তারেক রহমানকে। প্রবীণরা দেশে সক্রিয় থাকতে কোনো বৈঠক ছাড়া দ্বিতীয় পর্যায়ের নেতা রিজভীর ঘোষণায় শূন্য পদে তারেককে বসিয়ে দেয়া প্রবীণ নেতাদের অপমান করার সমতুল্য। আর কেবল পারিবারিক বিবেচনায় ওপর থেকে বসিয়ে দেয়া এই নেতা যে বিতর্কিত তা কারো অজানা নয়। মানুষের মধ্যে, কূটনৈতিক মহলে তারেক জিয়ার ইমেজ খুবই খারাপ। খালেদা জিয়া গ্রেপ্তারের পর বৈঠক ছাড়া এক ঘোষণায় এই নিয়োগ  দেয়ায় ঘটনায় বিএনপি নেতৃত্বই বুঝিয়ে দিল,  নেতাদের মধ্যে নানামুখী দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। ইতোমধ্যে দ্বন্দ্ব -সংঘাতের নানামুখি খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। লন্ডনের পানি ঢাকায় কোথায় কীভাবে গড়াবে কে জানে!

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বিএনপি এখন আরো বিপাকে পড়েছে এক নম্বর পার্টনার জামায়াতকে নিয়ে। ২০১৪ সালে যখন যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের মামলায় শাস্তি হচ্ছিল, তখন জামায়াতের বিপদে বিএনপি দাঁড়িয়েছিল পাশে। জামায়াতের জন্য কি না করেছে বিএনপি! ক্ষমতায় গিয়ে জাতীয় পতাকা উড়াতে দিয়েছিল। আর বিরোধী দলে থাকতে জামায়াতের সাক্ষাৎ মুরব্বি পাকিস্তানের কথা শুনে যুদ্ধংদেহী আগুন-সন্ত্রাস পর্যন্ত চালিয়েছিল। কিন্তু এখন বিএনপির বিপদের দিনে জামায়াত কি নামবে রাস্তায়? এখনো তেমন আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। যদি না নামে তবে কী হবে জোটের অবস্থা! এটা কার না জানা যে, সংকট তীব্র হলে দল ও জোটে ভাঙন হয়। সংকটে তো পড়ছে বিএনপি। কে জানে কী কপালে আছে বিএনপির!

বিএনপির জন্য আরো দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক মহল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার শাস্তি ও গ্রেপ্তারে নীরব। কোনো দেশই খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ কিংবা মুক্তি দাবি করেনি। জামায়াত নেতাদের বিচারে শাস্তি হলে পাকিস্তান পার্লামেন্টে বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু খালেদা ও তারেক প্রশ্নে পাকিস্তানও নীরব।  বলাই বাহুল্য, তারেক জিয়া কার্যকরী চেয়ারপারসন হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো সাপোর্ট পাওয়া এখন দিল্লি দুরস্তর মতো ব্যাপার-স্যাপার হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির বিচ্ছিন্নতা চরমে উঠবে। সব মিলিয়ে বিএনপি এখন দাঁড়িয়ে আছে ক্রস রোডে। বিএনপি আন্দোলনের দল নয়- এই পরীক্ষিত কথাটাকে যদি মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারে বিএনপি, তবে দলটির ভবিষ্যৎ আছে। আর যদি না পারে তবে দুর্ভোগ দুর্দশা ভাঙন বিচ্ছিন্নতা যে ভাগ্যে রয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ ঠিকই লিখেছে যে, খালেদার সাজায় খোঁড়া হয়ে গেল বিএনপি। ওই পত্রিকাটি আরো লিখেছে যে, ‘জেল থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ থাকলেও খালেদার ভাগ্য প্রায় নির্ধারিতই হয়ে গেছে বলা যায়। এই রায়ের ফলে জিয়া বংশের পতনের পথ প্রশস্ত হলো।’

কলামটা যখন শেষ করছি তখন উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মোবাইল কল পেলাম তৃণমূলের এক রাজনৈতিক বন্ধুর কাছ থেকে। তিনি বললেন, মানুষ নাকি বলছে খালেদা জিয়ার আমলে শেখ হাসিনাকে তো গ্রেনেড আর বোমা দিয়ে মেরে ফেলতে চাওয়া হয়েছিল। গোপন নাশকতামূলক কাজ দিয়ে তা করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল। প্রচেষ্টা সফল হয়নি তাই শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন। আর হাসিনা খালেদাকে জেলে নিয়েছেন প্রকাশ্য আদালতের বিচারের রায় দিয়ে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা পরিকল্পনাকারীদের কোনো প্রকাশ্য অভিযোগ ছিল না। কিন্তু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। এই বিবেচনায় বিএনপির প্রতিহিংসাপরায়ণ কর্মকাণ্ডের ধারে কাছেও যেতে পারবে না আওয়ামী লীগ। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, নির্বাচন সামনে নিয়ে গ্রামের মানুষ গণতন্ত্র নিয়ে ভাবছে না, ভাবছে কোন দল ক্ষমতায় থাকবে তা নিয়ে। বিএনপির যা লেজেগোরবে অবস্থা তাতে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবে বলে মানুষ মনে করছে। বলাই বাহুল্য, উল্লিখিত ধরনের প্রচার যদি দানা বেঁধে ওঠে গ্রামগঞ্জে, তবে ছত্রখান হয়ে যাওয়ার বিপদ আছে বিএনপির।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক, কলাম লেখক।