Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, বুধবার, ১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১০ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

পৃথিবীর যে স্থানগুলোতে রয়েছে নরকের দরজা!


প্রকাশঃ ২৮-১১-২০১৫, ৭:৩৮ অপরাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ২৮-১১-২০১৫, ৭:৩৮ অপরাহ্ণ

norakকাগজ অনলাইন ডেস্ক: বছরের পর বছর ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছে এই পৃথিবীতে এমন কিছু স্থান রয়েছে যা স্বর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে স্বর্গের। এর বিপরীত ধারণায়ও বিশ্বাস করেন কেউ কেউ। যুগ যুগ ধরে তাদের বিশ্বাস, পৃথিবীর বেশ কিছু স্থানের ধার কাছ দিয়ে শুরু হয়েছে নরকে যাওয়ার রাস্তা। এ সব বিশ্বাস বা ধারণার কোনো ভিত্তি বা যুক্তি না থাকলেও তা মানুষ মেনে আসছে অন্ধভাবে; বৈজ্ঞানিকভাবে যার কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন কয়েকটি স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে এই প্রতিবেদনে। আসুন জেনে নেওয়া যাক ইতিহাসে রূপ নেওয়া এমন কিছু স্থানের কথা যা নরকের দরজা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

হিয়েরাপোলিসের প্লাউটোলিয়ন
১৯৬৫ সালে বর্তমান তুরস্কের পামুক্কালের কাছে এমন একটি স্থানের খোঁজ পান অনুসন্ধানকারীরা যার সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয়ের যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় কিছু প্রমাণ ও গবেষণা। বিশেষ করে সেখান থেকে পাওয়া প্রচীন জিনিসপত্র ও বলি দেওয়ার নিদর্শন সবাইকে মনে করিয়ে দেয় পূর্বের কোন এক জাতির কথা যারা কিনা এখানে নিজেদর দেবতাকে তুষ্ট করার জন্যে প্রাণি হত্যা করতেন। কিন্তু কারা তারা? আর কি-বা এই দেবতার নাম? অনেক অনুসন্ধানের পর অবাক করা এক বিষয় বেড়িয়ে আসে এ স্থানটি সম্পর্কে। আর সেটি হচ্ছে এটি ছিল অনেক আগের হিয়েরাপোলিস নামক এক প্রাচীন শহরের ভেতরকার একটি স্থান, প্লাউটোলিয়ন।

যার বাসিন্দারা নিজেদের প্লুটো বা মৃত্যুর দেবতার খুব কাছের কেউ মনে করত। শুধু তাই নয়, তারা নির্দিষ্ট একটি স্থানকে প্লুটো বা মৃত্যুর দেবতার স্থান, অর্থ্যাৎ নরক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার কাছেই সবসময় বিভিন্ন প্রাণি বলি দিতেন তারা। তবে বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষের মাধ্যমে জানা যায়, আসলে তা নরক নয়। বরং মাটির গভীরে প্লুটোনিয়নের নীচের এক গুহা থেকে বের হওয়া প্রচন্ড তাপ আর বিষাক্ত গ্যাস এই স্থানটিকে নরকের দরজা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে বিজ্ঞানের এমন কথা মানে না এই অঞ্চলের মানুষ। তারা আজও বিশ্বাস করে এটাই নরকে যাওয়ার রাস্তা। কে জানে হয়তো তাদের বিশ্বাসও সত্যি হতে পারে!

চীনের ফেঙ্গডু
গল্পটা অনেককাল আগের। হান রাজত্বের সময় রাজকীয় সভায় কাজ করতেন ওয়াঙ্গ ফাঙ্গপিং আর ইন চাঙ্গশেঙ্গ নামের দুই কর্মচারী। হঠাৎ করে তাদের কি মনে হল, কাজ কর্ম বাদ দিয়ে তাওয়িজমে সাধনা শুরু করতে বসে গেলেন এই দুই মানুষ। ধীরে ধীরে একটা সময় হয়ে উঠলেন অমর। তাদের এই প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয়েছিল ফেঙ্গডুতে। ফলে তাদের নামের ভয়ংকর প্রভাবের সঙ্গে মানুষের মনে ভয় জন্মাতে থাকে ফেঙ্গডু পাহাড়কে নিয়েও।

প্রায় ২,০০০ বছর ধরে ভূতুড়ে এলাকা নামে পরিচিত হয়ে আসছে এ অঞ্চল। শুধু তাই-ই নয়, ফেঙ্গডুর পাহাড় মিঙ শানকে একটা সময় নরকের রাজা টিয়ানজির আবাসস্থল হিসেবেও চিহ্নিত করা হত। চীনের এই শহরটিকে বর্তমানে আত্মা আর মন্দিরের শহর বলে মনে করা হয়। যেখানে প্রবেশ করতে হলে মৃত হতে হবে মানুষকে। পার হতে হবে অসহায়ত্বের সেতু। দিতে হবে পরীক্ষা। করতে হবে নানা সমস্যার সমাধান। অবশ্য দরকার পড়লে জীবিত ব্যক্তিরাও প্রবেশ করতে পারবেন এখানে। সেক্ষেত্রে সেতু পার হওয়ার পর শয়তানের মুখোমুখি হতে হবে তাদের।

মাসায়ার আগ্নেয়গিরি
১৬ শতকের আগের কথা। সে সময় নিকারাগুয়ার মাসায়ায় অবস্থিত মাসায়া আগ্নেয়গিরির পরিচিতি সবার কাছে ছিল নরকের দরজা হিসেবে। সে সময় এবং তার খানিক পরেও যে রোমান ক্যাথলিকের সভ্যরা ওখানে গিয়েছেন তাদের লেখা আর প্রমাণাদিতে পাওয়া যায়, তারা শক্তভাবে বিশ্বাস করতেন, এমন প্রচণ্ড তাপ এমনি এমনি হতে পারে না। এটা শয়তানেরই ছেড়ে দেওয়া আগুন। যেটা কিনা নরকের দরজাতেই একমাত্র সম্ভব। মাঝখানে সত্যিই এটি নরকের দরজা কিনা সেটা নিয়ে মানুষ কম অনুসন্ধান করেনি। ১৫২৯ সালে ফ্রে ফ্রান্সিসকো ডি বোবাডিলা ভ্রমণ করেন আগ্নেয়গিরির মুখের কাছে আর নিশ্চিত হন যে এটি আসলেই নরকের মুখ।

এর পরেই বেশকিছু মানুষ আসেন পৃথিবীর এই স্থানে, যারা জানতেন আগ্নেয়গিরি কি? ধীরে ধীরে সবাইকে নরকের দরজা সম্পর্কে তাদের যে ভুল ধারণা রয়েছে তা অবহিত করতে থাকেন তারা। রোমান ক্যাথলিক জুয়ান ডি টরকুইমেন্ডা ঠাট্টা করে বলেই ফেলেন, ‘আত্মারা যে কোন স্থানের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে। আর তাই তাদের জন্যে নরকের আলাদা কোনো দরজার দরকার পড়ে না।’ তবুও, দিনের পর দিন নানা ধর্মিয় গ্রন্থে ও বিশিষ্টজন স্থানটিকে নরকের মুখ বলে অভিহিত করায় এখনও অনেকেই মাসায়া আগ্নেয়গিরিকে নরকের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করে থাকেন।

নরকের সাত দরজা
শুনতে অদ্ভূত লাগলেও অনেকে মনে করেন পেনসিলভানিয়ার হেল্লাম টাউনশিপের ট্রাউট রান রোডের কাছেই রয়েছে নরকের সাত দরজা। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে এই সাতটি দরজা যদি অতিক্রম করে ফেলে কোন মানুষ তাহলে সঙ্গে সঙ্গে নরকের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করবে সে। তবে এখনও কেউ পাঁচটি দরজার বেশি পার হয়নি। কিংবা বলা ভালো যে সাহস পায়নি। তবে এই দরজা খুঁজে বের করা বা এর বর্তমান সত্যতা নিয়ে বেশ দ্বিধা-দ্বন্ধ রয়েছে সবার ভেতরে। হেল্লাম টাউনশিপের ভেতরে এখনও এ রকম কোনো স্থান পাওয়া যায়নি। অন্তত সেখানকার মানচিত্রে তো নয়ই। চিহ্নিত স্থানটিতে রয়েছে কেবল একটি মাত্র দরজা। আর সেটাও জনৈক চিকিৎসক তার সম্পত্তি থেকে মানুষের অবাধ বিচরণ রোধ করতেই তৈরি করেছিলেন।

অনেকে অবশ্য এই দরজাগুলোকেও অদৃশ্য বলে মনে করেন। শুধু আমেরিকার জনগণই নয়, ভূতে বিশ্বাসী ও ভূত সাধনাকারীদের মতে পৃথিবীর ভেতরে নরকে প্রবেশের অন্যতম উত্তম কোন স্থান যদি থেকে থাকে সেটি হচ্ছে এই নরকের সাত দরজা বা সেভেন গেইট অব হেল। আর সত্যি বলতে কি আমেরিকার ভেতরে বাস্তবিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নরকের দরজা রয়েছে এই একটিই স্থানে। তাই দৃশ্যমান হোক কিংবা অদৃশ্য, সবসময়ই অনুসন্ধানকারীদের ভীড় থাকে স্থানটিতে।

লাকাস কার্শিয়াস
পুরো ঘটনাটা জানা যায় রোমান ঐতিহাসিক লিভির জবানিতে। সে সময় এক বিশাল গহ্বর বা গর্ত ছিল রোমে। যার ভেতর যত মাটিই ফেলা হোক, যতকিছুই করা হোক, সেটাকে ভরাট করা যেত না। কোনভাবেই গর্তটিকে ভরাট করতে না পেরে চিন্তায় পড়ে যান তৎকালীন রোমান শাসক মার্কাস কার্শিয়াস। এরই মধ্যে তিনি এক দৈববানী শুনতে পান। তাকে বলা হয়, এই গর্ত যেনো ভরাট না করা হয়। আর সে চেষ্টা করা হলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে রোম। এরপরই মার্কাস স্থানটিকে নরকের দরজা বলে চিহ্নিত করেন।

আর বিশাল গহ্বরটি ভরতে নানা উপায় খুঁজতে থাকেন তিনি। অবশেষে একটা উপায় পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে বলিদান! না, কোনো মানুষের নয় বরং রোমের শক্তির বলিদান। কি কারণে রোম এত শক্তিশালী? ভেবে উত্তর বের করেন মার্কাস। আর কিছু নয়, রোমের অস্ত্র আর শৌর্য-বীর্যই ছিল এ প্রচণ্ড শক্তির মূল। তাই নরকের দরজাকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে নিজেদের সব হাতিয়ার ফেলে দেন মার্কাস এই গর্তে। তিনি নিজেও হাতিয়ার নিয়ে পুরোপুরি সাজ্জিত হয়ে একটি ঘোড়ার ওপর চড়ে বসেন আর সোজা নেমে পড়েন গর্তে। একেবারে নরকের ভেতরে গিয়ে থামেন তিনি। নিজেকে বলি দিয়ে রোমকে বাঁচান মার্কাস। বন্ধ হয়ে যায় বিশাল গহ্বরটি। মৃত্যুর দেবতাকে খুশি করতে বা নরকের সন্ধানে এখনো মানুষ চলে আসে এই লাকাস কার্শিয়াসে।

নরক দ্বীপ
গল্পটা সেইন্ট প্যাট্রিককে নিয়ে। তখন ধর্মকে প্রচারের কাজে ব্যস্ত ছিলেন মানুষটি। তবে মানুষের অবিশ্বাস আর ঠাট্টাকে কোনভাবেই দূর করতে পারছিলেন না তিনি। এক সময় অবিশ্বাস আর সন্দেহের তীরে বিদ্ধ হয়ে হতাশ হয়ে পড়েন প্যাট্রিক। পূরাণ মতে, তখন খ্রীষ্ট এসে তাকে স্টেশন দ্বীপের দিকে চালিত করেন। সেখানে একটি গুহার ভেতরে থাকা গর্তের মধ্যে প্যাট্রিক যান আর দেখেন সেই মানুষগুলোকে যারা নরকের আগুনে জ্বলছে।

১২ শতাব্দী পর্যন্ত খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে আদর্শ স্থান হিসেবে থেকে যায় এই দ্বীপটি। এরপর আয়ারল্যান্ড সরকার বন্ধ করে দেন এই নরকের দরজাটিকে। তবে দরজাটি বন্ধ হলেও এখনও এটি পরিচিত বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান হিসেবে। পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ এই স্থানটির প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন।



পাঠকের মতামত...

Top