Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, সোমবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং | ১লা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৬ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

ওই অহংকারের অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম আমি : চেমন আরা


প্রকাশঃ ০৪-০২-২০১৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ০৪-০২-২০১৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

vasa-soinik-cemon-araশরীফা বুলবুল: ‘বাঙালি জাতির সবচাইতে গর্বের, সবচাইতে অহংকারের অধ্যায়টির নাম হচ্ছে আমাদের ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ বা কোনো আটপৌরে আন্দোলন ছিল না। একটা ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার অসাধারণ এক উত্থান ছিল এই ভাষা আন্দোলন। তাই ভাষা আন্দোলন অনেক বেশি গর্বের, অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ পৃথিবীর প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষীর কাছে। ওই অহংকারের অধ্যায়টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম আমি।

গতকাল ভোরের কাগজের কাছে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন ভাষা সংগ্রামী অধ্যাপক চেমন আরা।

এই ভাষাসৈনিক আরো বলেন, এখানে যে যার মতো ভাষা উচ্চারণ করছে। এটা আমাকে বেশ কষ্ট দেয়। আমাদের এত ত্যাগ আর কষ্টে অর্জিত বাংলা ভাষাটাকে এভাবে নষ্ট করতে দেয়া ঠিক হবে না। একে রক্ষা করা উচিত। কেবল মুখে নয়, কাজে। দেশের সর্ব ক্ষেত্রে শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রচলন আরো ব্যাপকভাবে হওয়া উচিত। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম ছাড়া এর উন্নতি সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের মেয়ে চেমন আরা। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে চেমন আরা একটি অনন্য নাম, একটু আগুনের স্ফুলিঙ্গ। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় ইডেন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সাল থেকেই তিনি ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেন।

অধ্যাপক চেমন আরার জন্ম চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও থানার ঐতিহ্যবাহী মৌলভি বাড়িতে ১৯৩৫ সালের ১ জুলাই। তার বাবা এ এস এম মোফাখ্খর ছিলেন বিভাগ পূর্বকালে কলকাতা হাইকোর্টের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। মা দুরদানা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী।

১৯৫১ সালে ঢাকার সরকারি কামরুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৩ সালে ইডেন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় ১৯৫৬ সালে বিএ অনার্স ও ১৯৫৭ সালে এমএ পাস করেন। চেমন আরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও অবদান রাখেন। তিনি নারী অধিকার আন্দোলনেরও একজন একনিষ্ঠ কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৫৪-৫৫ সালে এসএম ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও প্রতিদন্ধীতা করেন এবং ১৯৫৬-৫৭ সালে ডাকসুর ম্যাগাজিন কমিটির মনোনীত সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে শত ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করতেন। তার স্বামী বিশিষ্ট কথাশিল্পী শাহেদ আলী এবং বাবার কাছ থেকে এ বিষয়ে অনুপ্রেরণা লাভ করেন।

১৯৪৮ সালে সাপ্তাহিক সৈনিকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্প। অধ্যাপক চেমন আরার গল্প, স্মৃতিকথা, জীবনীগ্রন্থ ও ৫টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং ৫টি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।

এ ছাড়া নরওয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা ভ্রমণ নিয়ে অভিযাত্রী নামে চমৎকার একটা ভ্রমণ কাহিনীর গ্রন্থ রয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার প্রচুর গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আজো লিখে যাচ্ছেন নিরন্তর গতিতে।

নারায়ণগঞ্জের নবীগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এই ভাষা সংগ্রামী। ঢাকা কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বদরুন্নেছা কলেজ ও ইডেন কলেজে বাংলা বিভাগে প্রায় ৩৬ বছর অধ্যাপনা করেন।

চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৩ সালে তিতুমীর কলেজ থেকে অবসর নেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কিছুদিন কিশোরগঞ্জ জেলার কাটিয়াদীতে অবস্থিত ডা. আব্দুল মান্নান মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালে গঠিত হয় ‘তমদ্দুন মজলিস’। এ সময় অধ্যাপক কাসেম প্রায়ই চেমন আরার বাবা এ এস এম মোফাখ্খরের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। সে সময় থেকেই কিশোরী চেমন আরার বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়।

বাবার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে পারিবারিক পরিমণ্ডলটা অনেক উদারপন্থী ছিল। অধ্যাপক চেমন আরা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন সপ্তম শ্রেণি থেকে। তবে ১৯৪৮ সালে চেমন আরা তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তমদ্দুন মসলিস কর্তৃক আহ‚ত সভা, সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে ভাষা-আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার প্রচার ও প্রসারে এবং বাংলা ভাষার দাবিতে পোস্টার লেখার কাজে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫০ সালে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বিশিষ্ট সাহিত্যিক শাহেদ আলীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং এ আন্দোলনের একজন সার্বক্ষণিক কর্মীরূপে আবির্ভূত হন। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ১৯নং আজিমপুরের তিনি ছিলেন অন্যতম কর্মী।

১৯৪৯ সালে বাংলা ভাষাকে আরবি হরফে লেখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত সভা-সমাবেশও তিনি যোগ দেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের সংগঠিত করে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে চেমন আরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপারে যে সমাবেশ হয়, চেমন আরা সে সমাবেশে উপস্থিত থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের সংগঠিত করেন। সভা শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঐতিহাসিক ছাত্রী মিছিলেও তিনি অংশ নেন। ভাষা শহীদ বরকতের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি যে মিছিল বের হয় সে মিছিলে চেমন আরা অংশ নেন।

পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনের চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ও লেখালেখির মাধ্যমে অবদান রাখেন। বর্তমানে তিনি লেখালেখির মধ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন।



পাঠকের মতামত...

Top