Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং | ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

সংবাদপত্রে সংবাদই হবে মুখ্য, তা হবে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ : ড. অনুপম সেন


প্রকাশঃ ১৮-০২-২০১৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ১৮-০২-২০১৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ণ

1_r2_c1আমরা এমন সংবাদপত্র চাই যেখানে সংবাদ হবে মুখ্য, তবে সে সংবাদকে হতে হবে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ, যা গণতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। অধিকাংশ সময়ে শুধুমাত্র দুঃসংবাদ বা খারাপ সংবাদকেই প্রাধান্য দেয়া হয় সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। এতে করে সমাজ-রাষ্ট্র ও পাঠকদের বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মনে স্বাভাবিক বিকাশকে অনেকটা বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। তার মানে এই নয় যে এ ধরনের সংবাদ একেবারেই দেয়া যাবে না, ঘটনা ঘটলে সে সংবাদ তো দিতেই হবে, তবে সে ক্ষেত্রে যদি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে এসব সংবাদ পরিবেশন করা যায় তাতে অনেক মঙ্গল হবে বলেই মনে করি।

তবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সমাজের শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করে ও মানবিক সমাজ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে সেসব সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা সেলফ্-সেন্সরশিপ করা যেতে পারে। যেমন উত্তর আমেরিকায় সেখানকার সমাজ বাস্তবতায় কিছুটা ন্যুড ছবি ছাপলেও তারা কোনো বীভৎস-বিকৃত ছবি প্রকাশ করে না। জঙ্গি তৎপরতামূলক ছবিও তারা ছাপে না। এতে করে তেমন তো কোনো ক্ষতি হয়নি সেখানকার সমাজে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও বিচার-বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। আমার মতে খারাপ সংবাদই শুধু খবর হবে সে চিন্তাভাবনা পরিহার করার সময় বোধ হয় চলে এসেছে। কারণ এ ছাড়াও তো আমাদের দেশে অনেক সাফল্যের খবর আছে, উন্নতির খবর আছে, কৃষক-শ্রমিক কোন পর্যায়ে আছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাফল্যে তাদের অবদান কতটুকু সে বিষয়গুলোও ভেবে দেখা দরকার। তাদেরকে বাদ দিয়ে কিন্তু আমাদের এ সমাজ টিকে থাকবে না। তাই সংবাদের মধ্যে এসব গণমানুষের খবর থাকাটাও জরুরি।

দেশে অধিকাংশ সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম রাজনৈতিক বিষয়কে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে, কিন্তু এর বাইরেও তো অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বাঙালির আত্মপরিচয়ের ইতিহাসগুলোকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে একটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সে ব্যাপারগুলো বোধ হয় ভেবে দেখা দরকার। কোনো দুর্ঘটনায় যদি অনেক মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটে সেসব সংবাদ তো দিতেই হবে, পাশাপাশি ছবিও ছাপতে হবে সংবাদপত্রে এটাই স্বাভাবিক, কারণ পাঠককে সংবাদ থেকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। তবে সে ক্ষেত্রে সংবাদ পরিবেশনের ধরন এবং এমন কোনো ছবি বোধ হয় ছাপা উচিত হবে না যা শিশু-কিশোরসহ দুর্বল চিত্তের (বিশেষ করে নানা রোগাক্রান্ত নাগরিক) পাঠকদের চিত্ত বৈকল্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের সংবাদপত্রগুলোতে এখন শুধু সংবাদই থাকে না, পাশাপাশি শিল্প, সংস্কৃতি, লেখাপড়া, বিনোদনসহ আরো অনেক কিছুই থাকে। কিন্তু একটু ভেবে দেখতে অনুরোধ জানাই- লেখাপড়ার জন্য যেসব পাতা থাকে তাতে সত্যিকার অর্থে মানবিক বিকাশ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম শেখাবে এমন কিছু বিষয় কি আমরা দিতে পারছি পাঠককে? শুধু নোটবই টাইপের শিক্ষাপাতা ছাপলেই তো হবে না। শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে ছাপলে তা স্বাভাবিকভাবেই পাঠকদেরকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করবে এবং অপরাধ প্রবণতা অনেকটা কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে বলেই মনে হয়। সম্প্রতি দেখলাম এক লোককে মেরে ফেলার পর দশ টুকরা করা হয়েছে এবং সেই খুনের সঙ্গে যেসব কারণ জড়িত রয়েছে সেগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা সত্যিকার অর্থেই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে আমার কাছে। ঘটনাটি ঘটেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, সে সংবাদটি প্রকাশও করতে হবে, কিন্তু অনেক ব্যাপার থাকে যেগুলো অনেক সময় কৌশলে প্রকাশ করলেই ভালো, তা না হলে সমাজে মানুষের মধ্যে অন্যরকম মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে আঘাত করে বা বিরূপ কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এমন কোনো সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আশা করি আমরা সচেতন হবো।

সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ বলা হয়ে থাকে সে বিষয়টি যেমন সত্য, তেমনি আবার এই সংবাদপত্র অনেক ক্ষেত্রে সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখে। অনেকে সংবাদপত্রকে নিরপেক্ষ থাকার কথা বলে থাকেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষতা যে একটি আপেক্ষিক ব্যাপার তা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। কারণ দেশ গঠনে, সমাজ গঠনে গণতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের যে মূল চেতনা রয়েছে তা বাস্তবায়নে সংবাদপত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা তো তেমন সংবাদপত্রই চাই, যা গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে।



পাঠকের মতামত...

Top