Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং | ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বাবার জন্য অশ্রুবিন্দু…


প্রকাশঃ ১৫-১২-২০১৬, ৪:০৩ অপরাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ১৫-১২-২০১৬, ৪:০৩ অপরাহ্ণ

unnamed-1কাজী সুলতানা শিমি, অস্ট্রেলিয়া: মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পরলে কি এমন অনুভুতি হয়! নাকি বুকের পাঁজর ভেঙ্গে গেলে! রোববার। ২০শে নভেম্বর। জানলাম বাবা নেই। অবিশ্বাস্য বিষয় কেমন করে সহ্য করতে হয়; সেদিন বুঝলাম। আমি দাঁড়ানো থেকে মাটিতে পরে গেলাম। কি ভয়ঙ্কর। এমন একটা সময়ের জন্য আমি এখনো প্রস্তুত নই। তিনি অসুস্থ ছিলেন না। কোন রকম শাররিক জটিলতাও ছিলোনা। হটাত করে ঘুমের মধ্যে গভীর ঘুমে চলে যাওয়া। একেবারে না ফেরার দেশে।

আমি ভাবতেই পারছিনা তিনি আর নেই। তার অস্তিত্বটা এখনো আমার কাছে জীবন্ত। তার প্রতিটি স্মৃতি ক্ষনে ক্ষনে ভেসে উঠছে মনের ভিতর। বেজে উঠে বুকের ভিতর। কাজেকর্মে, সভা সেমিনারে, গান-গল্পে হটাত বুকের ভিতর দুমরে উঠে হাহাকার। মুহূর্তে আনমনা হয়ে যাই। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখি তার অবয়ব। বাবাকে ঘেরা দৃশ্যগুলো, কথাগুলো, আনন্দ-বেদনার স্মৃতিগুলো নিমেষে কেড়ে নেয় আমার তাৎক্ষণিক মুহূর্ত। আমি অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। ফিরে যাই অধরা সময়ে।
চোখবন্ধ করে প্রতিদিন দৃশ্যটা ভাবতে থাকি। কেমন পরিবর্তন হয়েছে আজ তার। অন্ধকার মাটির ঘরে। চুল, দাড়ি, ভ্রু আর চোখের পাপড়িগুলো কি ঝরে গেছে এরমাঝে! হয়তবা। এরপর মাংসপিণ্ড গলে গলে মিশে যাবে মাটির সাথে। হাড়গুলো পরে থাকবে নির্বিকার হয়ে। ধীরে ধীরে উঁচু মাটির স্তপটা সমান্তরাল হয়ে যাবে। আমার বাবা শুয়ে আছেন নিকষ অন্ধকার মাটির ঘরে। নিয়ম মাফিক জীবন, প্রত্যাহিক ছুটে চলা, সংসার ও সামাজিক দায়িত্ব সবকিছুই আছে আগেরই মতো। কিন্তু তারপর ও কোথাও যেন এক গভীর শূন্যতা। কাজের মাঝে, মনের মাঝে, চিন্তা ও চেতনায় এই শূন্যতা নীরব দংশনে চুর্ন করে দিচ্ছে আমার বুকের পাঁজর। আমি পরিষ্কার টের পাচ্ছি প্রতিবার দীর্ঘশ্বাসের সাথে বুকের মাঝে একটু চিনচিনে ব্যথা, ভারী কোন পাটাতন যেন বুকে চেপে আছে।

একটি মানুষের শিশু থেকে বড়ো হয়ে উঠার পেছেনে বাবার অবদান তুলনাহীন। তাদের আবেগ প্রকাশের ব্যাপারটা ভিন্ন বলে তারা তো অনুভূতিহীন নয়। আজ আমার, বাবাকে নিয়ে অল্প কিছু স্মৃতি লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার বাবা ছিলেন বিচিত্র চরিত্রের একজন মানুষ। খানিকটা হুমায়ুন আহমেদের কল্পিত চরিত্রের মতো। তার রাগ ও আনন্দ কিছুই বুঝা যেতনা। এনিয়ে সবসময় আমরা ভাইবোনরা তাকে খুব খেপানোর চেষ্টা করতাম। এইতো কিছুদিন আগেও বেড়াতে গিয়েছিলেন কানাডার অটোয়া। আমার মা’র ফেসবুকে দেখলাম বাবা শাদা-লাল ট্রাক-স্যুট পরে সাইকেল চালাচ্ছেন। সবুজ বনবীথিকায় মাথার সিঁথির মতো সরু ফুটপাত। চারপাশে সিগ্ধ ছায়া। বাবা তার সাইকেলে। সাথে আমার ভাইয়ের বাচ্চারা। ছবিটা দেখে আমরা সবাই নানারকম মন্তব্য করলাম। আরেকটা ছবিতে তিনি লেকের পাড়ে মাছ ধরছেন। তার বরশীর হুকে মাছ আঁটকে আছে। এ নিয়ে তিনি মহা খুশী। সত্যি বলতে কি তাকে এরকম প্রনবন্ত খুশী হতে কখনো দেখিনি। সারাজীবন দেখে এসেছি ৯টা-৫টা অফিস শেষ করে বাসার ফেরেন। বিকেলের চা শেষে খবরের কাগজ নিয়ে বসা। তারপর আমাদের পড়াতে বসতেন। তিনি ছিলেন একজন সরকারী ব্যাংক অফিসার। বদলীর চাকরী হওয়ায় আমাদের সারা জীবন কেটেছে এ জেলা থেকে সে জেলায়। খুবই সহজ সরল ও সাদাসিধে মানুষ ছিলেন বলে তার বদলী ও হতো খুব ঘন ঘন। কোন ধরণের তদ্বির করা তার স্বভাবে ছিলোনা। সেকারণে তল্পী-তল্পা নিয়ে আমাদের ছোটবেলা কেটেছে সিলেট, চিটাগাং, কুমিল্লা সহ নানা জায়গায়। এ নিয়ে আমাদের সবার মধ্যে ছিল অসীম বিরক্তি। নতুন স্কুলে বন্ধুত্ব হতে না হতেই আবার অন্য স্কুলে যেতে হতো। এজন্য আমাদের কারোই কোন বন্ধু ছিলোনা স্কুল-জীবনে। তার নিজের জীবনেও একই দশা। বিভোর আড্ডার মানুষ নন তিনি।

আসলে বাবাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেক কথাই এসে যায়। যে কথা লিখতে বসেছিলাম। আমাদের পড়াশোনা ও ভাল মানুষ হয়ে গড়ে তোলার ইচ্ছেই ছিল তার মুল লক্ষ্য। এজন্য নিজের কোন চাওয়া-পাওয়া ছিলোনা। সারাদিন পড়ার কথা বলাই ছিল তার একমাত্র কাজ। ছোটবেলায় আমার খুব গান শেখার ইচ্ছে ছিল। ইচ্ছেটা জানার পর কিনা জানিনা তিনি সবুজ রঙের একটা রেডিও কিনে এনেছিলেন। বললেন শুনে শুনে গান শিখতে হবে। কারো কাছে শিখতে গেলে সময় নষ্ট তাতে পড়াশুনার ক্ষতি হবে। সত্যি বলতে কি রেডিওতে শুনে শুনেই আমি অনেক গান মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। সিলেটের আম্বরখানায় থাকি। আমার বাবা হটাত একদিন বিকেলে আমাকে ডাকলেন। পাশে বসালেন। তারপর বললেন, একটা গান কর। তোকে আমি গুন-গুনিয়ে গান গাইতে শুনেছি। ভালো করে কর দেখি আমি শুনি। আমি হতভম্ব। তারপরও ভয়ে ভয়ে, ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়”-এই রবীন্দ্র সঙ্গীতটা গেয়ে শুনিয়েছিলাম। ক্লাস ফোরে পড়া মেয়ে মুখস্থ রবীন্দ্র সঙ্গিত গাইতে পারে শুনে সে রীতিমতো অবাক।

অনেক কথা লিখার আছে তাকে নিয়ে। লিখবো হয়তো কোন একসময়। তবে যে বিষয়টা আমি খুব বেশী মিস করি সেটা হল আমার স্বাধীনতা বোধে কখনো বাধা দেয়নি আমার বাবা। আমার মনে আছে ঢাকা বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট যখন বের হয় একই সাথে চট্টগ্রাম বিশ্ব-বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট ও বের হয়েছিলো। তখন সবাই আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হবার জন্য জোরাজোরি করেছিলেন। বিশেষ করে আমার মা ও চাচা। তাদের মতে ঢাকায় থাকলে মেয়ে অনিরাপত্তা ও নানা ঝামেলায় পরতে পারে ভেবে ঢাকায় পড়ার ব্যাপারে আপত্তি। কিন্তু আমার বাবা দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন মেয়ে যেখানে পড়তে চায় যা কিছুই পড়তে চায় সেটা সম্পুর্ন তার ব্যাপার। বলতে গেলে তার অকুণ্ঠ সমর্থনে আমার ঢাকা বিশ্ব-বিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ে পড়া। যদিও দর্শন বিষয়ে পড়া নিয়ে অন্য সবার ঘোর আপত্তি ছিল। আমার ইচ্ছাই সব এ বিষয়ে বাবার সমর্থনের উপর কারো কোন কথাই আর টিকলোনা। যখন যা কিছু করতে চেয়েছি সব সময়ই করতে পেয়েছি।

আমরা যারা প্রবাসে থাকি তারা জানি মধ্যরাতের কোন টেলিফোন বেশীর ভাগ সময়ই বাংলাদেশের। কেননা সময়গত পার্থক্যর কথা তাদের প্রায়ই মনে থাকেনা। আমার বাসায় যখন এই মধ্যরাতে টেলিফোন বেজে উঠে আমি গভীর ঘুমেও তাড়াতাড়ি রিসিভারটা তুলে বলি কিছু বলবেন বাবা? আমি ধরেই নিই সেটা আমার বাবার ফোন। এখন থেকে সেই ফোন আর বাজবেনা। হুট করে রেগে যাওয়া কিংবা রাশভারী গলায় কেউ আর বলবে না, তুই কেমন আছিস।
খবরটা পেয়ে তারপর দিন বাংলাদেশে রওনা হলাম।কি তীব্র বেদনার দিন। শূন্য বিছানা, শূন্য রুমে তার জায়নামাজ, টুপি, তজবি, ঘড়ি, আগের মতোই আছে। শুধু মানুষটি নেই। তার কবরে গেলাম। একমুঠো মাটিহাতে স্তব্দ হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। একবিন্দু নয়, অঝর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কবরের উপর। কি দুর্বিষহ শূন্যতা। কবর খুলে একবার দেখতে ইচ্ছে হলো। ভীষণ রকম। আমি মাটিতে গড়িয়ে পরলাম। কি অসহ্য বেদনা। আর দেখা হবেনা কোনদিন। তবুও চিন্তা, চেতনা, ভাবনা ও কল্পনায় আছেন প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। প্রতিভোরে একবুক দীর্ঘশ্বাস আর অবারিত অশ্রুবিন্দু নিয়ে প্রার্থনায় বলি, শান্তিতে ঘুমাও বাবা, অপার শান্তিতে…।



পাঠকের মতামত...

Top