Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং | ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

ওয়ার্ডবয়, আয়া ও নার্সের দৌরাত্ম্যে অসহায় চমেক প্রশাসন


প্রকাশঃ ২৩-১২-২০১৬, ৪:২০ অপরাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ২৩-১২-২০১৬, ৪:২০ অপরাহ্ণ

ctg-medical20161223111116চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, সর্দার, আয়া, নার্সদের দৌরাত্ম্যে প্রশাসনও অসহায়। ফলে অভিযোগের শেষ নেই রোগীদের। অভিযোগের সঙ্গে ছড়াচ্ছে অসন্তোষ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দেও সেবার মানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং বরবাদ হচ্ছে নিবেদিতপ্রাণ কিছু চিকিৎসকের শ্রম ও প্রচেষ্টা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এতো বরাদ্দেও চমেক হাসপাতালে সেবার মান বাড়েনি। ওষুধ ও খাবার বাইরে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও বর্তমানে রোগীদের হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ তীব্র হয়ে উঠেছে। রোগিদের নামে বরাদ্দ ১২৫ টাকার খাবারও রোগিদের কপালে জুটছে না বলে অভিযোগ।

হাসপাতালের আয়া-বুয়ারাই করেন নার্সের কাজ। একজনের ওষুধ দিয়ে অপারেশন করা হয় অন্য রোগীকে। রোগীদের দিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ কিনে তা আবার কৌশলে চুরি করা হয়। পরীক্ষা না করে রোগির জন্য নেয়া রক্ত রোগির রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মিল না হওয়ায় ফেলে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে অতি সম্প্রতি।

হাসপাতালে প্রথম হয়রানি শুরু হয় জরুরি বিভাগে রোগি ভর্তির সময়। সৈয়দ নামের এক রোগির অভিভাবক জানান, টিকিট নিয়ে গুরুতর বা কম গুরুতর রোগি ভর্তির পর শুরু হয় আয়া-বুয়াদের দৌরাত্ম্য। রোগিদের নির্ধারিত ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রলি চাইলে দিতে হয় অর্থ। লিফটে রোগিকে উপর তলায় তুলতে হলে লিফটম্যানকে দিতে হয় অর্থ। এছাড়া ওয়ার্ডগুলোর দারোয়ানদের অর্থ না দিলে ভিতরে ঢুকতে দেয় না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ওষুধ বরাদ্দের চিঠি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে চলতি বছরের ২ আগস্ট। বরাদ্দকৃত ওষুধের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ ইডিসিএল (এসেনসিয়াল ড্রাগস লিমিটেড) থেকে ক্রয় করা হয়েছে, যাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা।বাকি ৩০ ভাগ ওষুধ কেনা হয়েছে প্রাইভেট ওষুধ কোম্পানি থেকে। আর এ ৩০ ভাগ ক্রয়কৃত ওষুধের দাম দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকা।

যন্ত্রপাতি বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। লিলেন ৮৪ লাখ টাকা, গজ, ব্যান্ডেজ, কটন ৮৪ লাখ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ ব্যয় ১ লাখ ২৬ হাজার, অক্সিজেন ২৮ লাখ, আসবাবপত্র বাবদ ১৪ লাখ, সংগ্রহ, সরবরাহ ১৪ লাখ টাকাসহ মোট বরাদ্দ ১৪ কোটি টাকা।

অপরদিকে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গত ১ জুলাই থেকে কার্যকরী দৈনিক খাদ্য তালিকায় উল্লেখ আছে, খাদ্য নং ১ কলামে পাউরুটি ১০০ গ্রামের দাম রাখা হয়েছে ১০ টাকা ২৫ পয়সা, ডিম ১টি ৯ টাকা ৭০ পযসা, সাগরকলা ১টি ৬ টাকাসহ রোগিপ্রতি বরাদ্দ ২৫ টাকা ৯৫ পয়সা।

এ ছাড়া দুপুরের খাবারে চাল (পাইজাম), ডাল মশুর, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, মটর ডাল, সবজি, মুরগি ও মসলাসহ বরাদ্দ ৫১ টাকা। রাতের খাবারে চাল, ডাল মশুর, তেল, পেঁয়াজ, মটর ডাল, সবজি, মসলা, মুরগি, (সপ্তাহে দুদিন), মৃগেল সপ্তাহে একদিন, রুই মাছ সপ্তাহে দুদিন, নাইলোনটিকা সপ্তাহে দুদিনসহ বরাদ্দ ৪৮ টাকা ৫ পয়সা ধরা আছে খাদ্য তালিকায়।

চিকিৎসকদের পরামর্শে রোগিদের জন্য পাউরুটি, ডিম, সাগরকলার জন্য বরাদ্দ ২৫ টাকা ৯৫ পয়সা। বিকেলের খাবারে দুধ, পাউরুটিসহ বরাদ্দ ৫৬ টাকা ৪৫ পয়সা। শিশুদের খাবারের তালিকায় তরল দুধ, চিনি, ডিমসহ খাবার ধরা আছে ১২৪ টাকা ৯৮ পয়সা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে, রোগি ও তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোগীদের জন্য ওয়ার্ডে কলা, ডিম নিয়ে আসলেও ঝুড়িতে করে সেগুলো আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রোগিদের দেয়া হয় শুধু পাউরুটি। আর ডিম সকালের পর দুপুরের আগে বাইরের দোকানে বিক্রি করেন খাদ্য বিভাগের কর্মচারীরা।

জানা যায়, আগের স্টুয়ার্ড এমরান যখন দায়িত্বে ছিলেন খাবার নিয়ে দুর্নীতি তখনও চরম আকার ধারণ করেছিল। কিন্তু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদুল গণি শক্তহাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি বলেন, যে বরাদ্দকৃত খাবার থাকে, তা রোগিদের সরবরাহ করতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর স্টুয়ার্ড এমরান এলপিআরে যাওয়ার পর আব্দুস সাত্তার খাদ্য বিভাগের স্টুয়ার্ডের দায়িত্ব পান। সাবেক এ পরিচালক বদলির পরপরই দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

১৩ নং মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগির সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

সফুরা নামে এক রোগি জানান, তিনি এখানে তিনদিন হলো ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু তিনদিনে সকালের নাস্তায় তিনি কখনো ডিম, কলা পাননি। সফুরার পাশের বেডে থাকা নাছিমা জানান, ডিম ঝুড়িতে আনতে দেখি। কিন্তু সেগুলো আমাদের না দিয়েই নিয়ে যায়। নিতে হলে প্রতি জোড়া সিদ্ধ ডিম ৩০ টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়।

অভিযোগের তীর সকালের নাস্তার দিকে হলেও দুপুরে হাসপাতালের রোগির জন্য খাবারের চিত্র একটু আলাদা।

রোগিদের জন্য বরাদ্দের ভাত, মাছ, ডাল, মাংস পেলেও তা রোগির স্বজনদের কাছে বিক্রি করেন খাদ্য বিভাগের কর্মচারীরা। প্রতি প্লেট ভাত ও তরকারি ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি করেন তারা।

জানা গেছে, রোগি ভর্তির তালিকা প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে আগের দিন রাতে খাদ্য বিভাগে খাবারের চাহিদা পাঠানো হয়। কিন্তু সে চাহিদাপত্রে রোগির চেয়ে খাবারের চাহিদার পরিমাণ বেশি থাকে। সকালে যেসব রোগিকে ছাড়পত্র দেয়া হয়, তাদের তালিকাও অন্তর্ভুক্ত থাকে চাহিদাপত্রে। আর এসব বাড়তি খাবার পরবর্তীতে বাইরে বিক্রি করে দেয়া হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতালের খাদ্য বিভাগের বর্তমান স্টুয়ার্ড আবদুস সাত্তার।

তিনি জানান, ওয়ার্ড থেকে চাহিদার ভিত্তিতে খাবার রান্না করা হয় এবং সে। খাবার রোগিদের সরবরাহ করা হয়। এখানে অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, বরাদ্দের ১৪ কোটি টাকার মধ্যে ৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয় হলেও রোগিদের কপালে জোটে না কোনো ওষুধ। ১২ নং হৃদরোগ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিসিইউ ও পোস্ট সিসিইউ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগিদের প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়।

রাশেদা নামে এক রোগি জানান, তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন চারদিন। চারদিনে তার সব মিলে ১৭ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। প্রতিবার অক্সিজেন নেয়ার জন্য ওয়ার্ডবয়কে তার ১০০ টাকা গুণতে হয়। একইসঙ্গে মেডিসিন, গাইনি, হুদরোগ, সার্জারি ওয়ার্ডে রোগিরা তাদের সঙ্গে ডাক্তারদের খারাপ আচরণের অভিযোগও করেন।

এ বিষয়ে ১২ নং সিসিইউ বা হৃদরোগ ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার রাজু দে জানান, রোগির প্রচণ্ড চাপ সামাল দিতে চিকিৎসকদেরদের হিমসিম খেতে হয়। তবে রোগিদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করতে চিকিৎসকদেরদ ওপর কড়া নির্দেশ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে শয্যার চেয়ে রোগি ভর্তি প্রায় তিনগুণের কাছাকাছি থাকে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি হাসপাতালের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। তবে রোগিদের জন্য যা বরাদ্দ আছে, তা না পেলে অবশ্যই তিনি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।



পাঠকের মতামত...

Top