Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং | ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

পরিশীলিত মানষিক বিকাশে সামাজিক দায়িত্ববোধ


প্রকাশঃ ১০-০১-২০১৭, ৩:২০ অপরাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ১০-০১-২০১৭, ৩:২০ অপরাহ্ণ

 

k-sultanaকাজী সুলতানা শিমি, অস্ট্রেলিয়া: মানুষের ভালোথাকা মানে এখন কেবল শাররীকভাবে ভালোথাকা নয়। ভালোথাকার সংজ্ঞা এখন বদলে গেছে। যদিও অভ্যাসবশত মানুষ এখনো ভালোআছি বলতে কেবল শাররীকভাবে ভালোথাকা-কে মনে করে। আসলে তা নয়। শাররীক ও মানসিক ভালোথাকার সম্বনয়েই কেবল সত্যিকারের ভালোথাকা বলা যায়। মন ভালো না থাকলে তা শরীরের উপর প্রভাব ফেলে তেমনি শরীর ভালো না থাকলেতা মনের উপর প্রভাব ফেলেআর সেকারণেই মানসিকভাবে ভালোথাকাটা ও সার্বিকভাবে ভালোথাকার জন্য একটা অত্যাবশ্যকীয় অংশ। তাহলে মানসিকভাবে ভালো থাকা যায় কিকরে তারও একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার।  

আইনস্টাইনের একটি উক্তি ছিল-“আমি ভয় পাই প্রযুক্তি হয়তো একদিন মানুষের ভাব আদান প্রদানকে নষ্ট করে দিবে। যার ফলে পৃথিবীতে নির্বোধ একটি প্রজন্ম জন্মাবে”। আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি” নিয়ে এখনো সবাই যতোটা উদগ্রীব তার মানবতার থিওরি নিয়ে কেউকি ভাবছে! মনে হয় না। কিছুদিন আগে জানা একটা খবরের প্রসঙ্গ দিয়েই বিষয়টা শুরু করা যাক। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ায় ফেসবুক ব্যাবহার করার কারণে ডিপ্রেশনের মাত্রা আগের তুলনায় ৪% ভাগ বেড়ে গেছে। যা মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় একটা অতিরিক্ত সংযোজন। এ বেড়ে যাওয়া যদিও সামান্য কিন্তু এভাবে যদি বাড়তে থাকে তাতে একসময় আসবে তা রোধ করার জন্য বাড়তি বাজেটের প্রয়োজন হবে। ফেসবুকের আত্ম-প্রচারণা মূলক ছবি, স্ট্যাটাস কিংবা শেয়ার দেখে হতাশ ও বিষণ্ণ হওয়ার অভ্যাস থেকে শুর হয় এ মানসিক সমস্যা। এ অভ্যাস বদলানো দরকার, এবং তা হতে হবে উভয়পক্ষ থেকে। আমাদের ভালোথাকা আমাদের হাতে। বিছিন্ন ইন্দ্রিয় বা ভার্চুয়েল রিয়েলিটিই একমাত্র সত্য নয়। আমাদের চিন্তা ও কল্পনা শক্তির বাস্তব প্রয়োগ ঘটানো দরকার। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য অনেকটা নির্ভর ও প্রসারণ হচ্ছে ভার্চুয়েল রিয়েলিটির প্রভাবে।  তাদের চিন্তা ও কল্পনা শক্তির যথাযথ প্রসারণে পারিবারিক সহায়তা সর্বোপরি সামাজিক আশ্বাস প্রয়োজনআর তার প্রয়োজন এখনই      

ইন্দ্রিয় বিছিন্নতা বা ভার্চুয়েল রিয়েলিটির প্রতি আমরা যে হারে ঝুকে পড়ছি তাতে করে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতি হচ্ছে ভীষণ রকম। আমাদের কল্পনা শক্তি ও চিন্তার প্রসারতা হ্রাস পাচ্ছে আশঙ্কা জনক ভাবে। Imagination is more important than knowledge”- আইনস্টাইনের এই উক্তিটি প্রায়গিক সত্যতা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমশ জৈবজগতের মধ্যে মানুষের কল্পনাশক্তি ও প্রশ্ন করার ক্ষমতা অসাধারণ দুটি গুণ। মানুষের এই ইতিবাচক চিন্তা ও কল্পনা শক্তি দিয়ে সে সমাজে বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ইতিবাচক চিন্তা ও বাস্তবিক কল্পনা সমাজ পরিবর্তনের একটি বড় অংশ। চারপাশের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া যেমন মানুষের সহজাত ইচ্ছা, ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে চাওয়া যেমন তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তেমনি এই ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির সম্বনয়েই পরিবর্তন হয় সমাজের। ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির সূচনা হয় চিন্তা ও কল্পনাশক্তি থেকে। চিন্তা ও কল্পনাশক্তি যদি কেবল ভার্চুয়েল জগতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তা সার্বজনীন হয়না।    

শুধু জানতে চাওয়া বা জানার মধ্যেই মানুষের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকেনাযাবতীয় ঘটনার সাম্ভাব্য কারণ বের করার একটা চেষ্টা করা দরকার। আর তা যতোই প্রতিকূল হোক সব সময় চিন্তা ও ইচ্ছা থাকতে হবে ইতিবাচক। হাজারো নিরাশায় আবারো হতাশার কথা বলা মোটেও সমীচীন নয়। এতে সমাজ ও সংসারে ক্ষতি হয় অনেক বেশী। তাই চেষ্টা ও কল্পনাশক্তির মাঝে ইতিবাচক চিন্তা থাকা ভীষণ জরুরি। কেননা এই চিন্তা বা ভাবনা থেকে যে বিষয়টি বেরিয়ে আসে, সেটি দিয়ে আবার সে তার চারপাশের ঘটনাসমূহকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেআবারো তৈরী হয় প্রশ্নের, আবারো ভাবনা এবং কল্পনাশক্তির প্রয়োগএভাবেই চিন্তা ও কল্পনাশক্তি’র প্রয়োগ হতে থাকে সমাজ ও সারাবিশ্বের পরিবর্তনে। নানান যাচাই বাছাই করে তার চিন্তাশক্তিকে বাস্তবতার নিরীখে প্রতিফলিত করে আরো শানিত ও প্রখর করে। এভাবেই এগিয়ে চলা ও সমাজ বিবর্তন। তাই কল্পনাশক্তি, চিন্তাশক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ হওয়া ভীষণ দরকার।

প্রথমেই যে কথা বলেছিলাম ইন্দ্রিয় বিছিন্নতা বা ভার্চুয়েল রিয়েলিটির প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পরা  কমানো দরকার। এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয় যে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ বলতে মূলত বিশেষ করে টেকনোলজি তথা ইন্টারনেটকেই বুঝানো হয়। অন্যান্য বিষয় যতোটা না গুরত্ব পাচ্ছে ইন্টারনেটকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত রকম। একথা সত্যি যে টেকনোলজি, ইন্টারনেট তথা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর আবিষ্কার পুরো মানব সভ্যতার জন্য এক অনন্য অসাধারণ সৃষ্টি। যা না হলে আমরা এখনো অন্ধকার যুগেই রয়ে যেতাম। কিন্তু যে কোন ভালো জিনিষ নেতিবাচক ব্যাবহার করার ফলে তার ক্ষতিকর প্রভাব হয় ভয়াবহ। আর নেতিবাচক ব্যাবহার শুরু হয় নেতিবাচক চিন্তা থেকে। চিন্তাশক্তির তথা কল্পনাশক্তির একটা বড় ক্ষমতা আছেসে শুধু তার একটা সীমার মধ্যে থেকেই কল্পনা বা চিন্তা করেনা। এই সীমা নির্ধারিত হয় তার অভিজ্ঞতা বা তার জ্ঞান দ্বারা। অভিজ্ঞতা বা তার জ্ঞান যদি কেবল বিছিন্ন ইন্দ্রিয় বা ভার্চুয়েল রিয়েলিটিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পরে তাহলে তাতে সৃষ্টিশীল চিন্তা বা কল্পনাশক্তির সুদূর প্রসারণ হয়না। তখন ইচ্ছা বা চিন্তাগুলো একই বৃত্তে লুপ হতে থাকে। যা নতুন সৃষ্টি বা বিবর্তনের অবকাশ রাখেনা।   

একজন জন্মবধির অর্থাৎ যে কোনদিন কোন শব্দ শুনেনি- সে কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক বাকযন্ত্র থাকার পরেও কথা বলতে পারে না, মানে সে জন্ম থেকেই মুককারণ, যেহেতু সে কখনো শব্দ শুনেনি, শব্দ সংক্রান্ত কোন অভিজ্ঞতাও তার নেইএক্ষেত্রে সে তার অভিজ্ঞতার বাইরে ইমাজিনেশন দিয়ে কোন শব্দ বা বাক্য উদ্ভাবন করতে পারে নাএকজন জন্মান্ধ কখনো আলো অন্ধকার কিংবা বিভিন্ন রঙ সম্পর্কে কোনরূপ ইমাজিনেশন তৈরী করতে পারেনাএখানেই  কল্পনাশক্তির সীমারেখা। আমাদের অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় বিচ্ছিন্নতা বা ভার্চুয়েল রিয়েলিটি নির্ভরতা অনেকটা সে পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা অন্ধের মতো অভিজ্ঞতা দিয়ে বা ইন্দ্রিয় প্রত্তক্ষনে যাচাই বাছাই না করে ভার্চুয়াল প্রমাণকে সত্য বলে মেনে নিচ্ছিশুধু ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব থেকে বিশ্বাস করছি অনেক কিছুইযা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতি করছে অনাকাঙ্কখিত ভাবে। চিন্তা ও কল্পনাশক্তি লোপ পাচ্ছে ধীর গতিতে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অতি আবশ্যক আর এ দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের সকলকেই।



পাঠকের মতামত...

Top