Bhorer Kagoj logo
ঢাকা, সোমবার, ১৭ই জুন, ২০১৯ ইং | ৩রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৩ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

রঙিন ঘুড়ির দিন


প্রকাশঃ ১৬-০১-২০১৭, ৩:৪২ অপরাহ্ণ | সম্পাদনাঃ ১৬-০১-২০১৭, ৩:৪২ অপরাহ্ণ

1460546229963নায়না শাহরীন চৌধুরী: (১) দুপুরের দিকে ভাল একটা সিনেমা দেখাচ্ছিল এইচ,বি,ও তে। নাম দেখা হয় নি। ডেমি মুর ছিল মুখ্য চরিত্রে। গল্পটা যখন ক্লাইমেক্সের দিকে যাচ্ছিল, ডিশের লাইন চলে গেল। ঝিম ধরানো না-বিকেলটা নিঃসঙ্গতার পাল্লাটা ভারী করে দিল আবার। জানালার পাশ ঘেষা ডিভানে পেপার নিয়ে বসতেই ইলেক্ট্রিসিটিও চলে গেল। যাহ্‌! মাঝে মাঝে এমন হয়…সব কিছু বিপরীত। ভাবলাম, সুপ্তিকে ফোন করি, ফোন ধরল না। সুপ্তি আমার ছোটবেলার বন্ধু। অসহ্য একটা গাধা। কিন্তু, ওর কাছে আমার জন্য একটু সময় থাকে। আজ, তাও পেলাম  না। ডিপ্রেশন গলা চেপে ধরছে। ফেসবুকে ঢুকে গেলাম। অদ্ভুত অদ্ভুত খবরে ঠাসা থাকে। তবু ভাল লাগে না আমার। মানুষজনের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গির ছবি দেখতে ভীষণ বিরক্ত লাগে। তবু যখন উপায় নেই, কি করব! আজ জায়েদ ফোন করতে মানা করেছে। ডে লং ট্রেনিং। এসএমএস করে কি বলব? মন খারাপ, জলদি আসো? কিভাবে আসবে ও?  

চুলায় চা চড়িয়ে বারান্দায় যাই। কি মিষ্টি বাতাস! কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যায় না। গলির মোড়ে দাঁড়ানো গ্যারাজের মেকানিকগুলো তাকিয়ে থাকে আর থুতু ফেলতে থাকে। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাই।

চায়ে চুমুক দিয়ে চানাচুরের টিন নিয়ে আবার জানালার পাশে বসি। একা একা বাদাম খুটে খেতে খেতে মনে হয়, আমার বেঁচে থাকার অর্থ কি?  এভাবে একা একা বসে থাকার জন্য? একা থাকলে জীবনের সব কটা দুঃখ গলা চেপে ধরতে আসে। তাই কি? যখন অনেক লোকের ভীড়ে থাকি তখন কি দুঃখ গুলো ঘাপটি মেরে বুকে চেপে থাকে না?

কোন দুঃখটা টা সবচে’ গভীর তা হয়তো সময় নির্ধারণ করে। সবগুলো দুঃখের আলাদা রং। পাঁচ বছর বয়সে মেজো মামার নিয়মিত আমাকে ব্যাবহার করা, প্রথম প্রেমের ছকবাঁধা ব্যার্থতা, জায়েদকে বিয়ের সিদ্ধান্তে মা বাবার বৈরিতা অথবা  সন্তানহীনতায় সামাজিক কটাক্ষ। আর চরম একাকীত্ব, একেই বা অবমূল্যায়ন করি কি করে। দীর্ঘশ্বাস গুলো গভীর থেকে গভীরতর হয়। তারপর ক্লান্ত লাগে। বিষণ্ণতার ঘুণ পোকা তিলতিল করে নিঃশেষ করে, জায়েদ সেটা ঠিক বিশ্বাস করে না। আমার মানসিক বিপর্যয় আমি একা একা দেখি। আজকাল ভুলে যাই অনেক কিছু। দোকানে গেলে টাকা ফেরত দিলে গুনতে গেলে মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। বাসার কাজে অনেক ভুল হয়। আমি অবাক হয়ে নিজের অবনতি দেখি।

আজকাল, জায়েদও খুব একটা সময় দিতে চায় না। প্রথম দিকে অভিমান হত, অভিযোগ অনুযোগ করতাম। কিন্তু, যখন দেখলাম, এটুকু দেখার বা শোনার সময়ও তার নেই, তখন  নিজেকে আরও গুটিয়ে নিলাম। একটা চাকরি পেয়েছিলাম, ইন্টারন্যাশনাল একটা এন জি ও তে। ঢাকার বাইরে পোস্টিং। আমি বেশ সিরিয়াস হয়ে জায়েদ কে বললাম, ও পুরোটা না শুনে “ধুর” বলে হেসে উড়িয়ে দিল। আমি যে ঢাকার বাইরে চাকরি করতে পারি বা ভাবতে পারি এটা হয়তো তার ভাবনার অতীত। প্রেমের বিয়েতে কষ্ট পেলে স্বামী যদি মান না ভাঙ্গায় তাতে কষ্ট আরও বাড়ে। জায়েদ এখন হয়ত এটা ভাবনাতেও আনে না। তবে, আমার সন্তানহীনতার জন্য সে যে আমাকে কোন রকম অশান্তিতে রাখে নি এজন্য আমি জায়েদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

মাঝে মাঝে মায়ের মত একটা বুকের জন্য ভেতরটা আকুলি বিকুলি করে। বাবা-মা’র কাছে যাওয়া হয় না। মা-মেয়ের প্রাকৃতিক ও সহজাত ভালবাসায় যখন শর্ত প্রযোজ্য-এর অদৃশ্য সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন আর যাই হোক, ঐ শান্তিটা আর মেলে না। আমি একা একাই নিজেকে জড়িয়ে ধরি। আমার শুধুই আমি।

সেলফোনের বিপ বিপ আওয়াজে নিজের ভেতর থেকে ফিরে আসি। টেক্সট এসেছে সুপ্তির কাছ থেকে। পাশেই একটা কফিশপ আছে। ওখানে যেতে বলছে। আমি অনেকটা হাঁফ ছাড়লাম। সুপ্তি কম্প্যানিয়ন হিসেবে বোরিং, তবে একা এভাবে থাকার চেয়ে ওর  স্টুপিড বকবক শোনা অন্তত কিছুটা হলেও স্বস্তির।

Kites_Web(২) আজ চারদিকে চকচকে সবুজ। আমি কফিশপের বাইরে ভেজা সবুজ গাছপালা দেখছি। সুপ্তি আমার হাতে চড় মারল, “ শোন না!”

আমি আবার সুপ্তির দিকে তাকালাম। সুপ্তি অনেকক্ষণ থেকে বকবক করছে। বিষয়বস্তু একটাই। ওর ধারনা “ রিশাদ ওকে এখনও চায়। রিশাদ ওর এক্স বয়ফ্রেন্ড। ঠিক বয় ফ্রেন্ড বলা যাবে না হয়ত। ওর সাথে দু’তিন বার শরীরী মজা নিয়েছে। তারপর, কেটে পড়েছে। কার দায় পড়েছে এই স্টুপিডের বকবক সারাজনম হজম করবে। তা ছাড়া ওকে বোকা বানিয়ে নিজের ইচ্ছে আদায় করা সহজ মনে হয়েছে তাই করেছে। আমার মাঝে মাঝে খুব রাগ লাগে। আবার হঠাৎ ভীষণ মায়া হয় পাগলীটার জন্য।

“কাল রাতে যে নম্বর থেকে টেক্সট এসেছে, দেখ,” আমাকে দেখায় ভুন্দিটা। “ব্ল্যাংক মাসেজ, বুঝতে পারছিস?”নিজে আবার দেখে, “এখন বুঝতেসে কি হারাইসে।”

আমি তাকিয়ে থাকি। এস্প্রেসো আসে, চুপচাপ চুমুক দিচ্ছি। হঠাৎ বেশ দূরের একটা টেবিলে এক ভদ্রলোককে দেখলাম বিশাল এক ক্যামেরা নিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে আমার দিকে এমন ভাবে ক্যামেরা ধরতে চাইছে যাতে আমি না দেখি। মেজাজ হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। ভদ্রলোক মনে হচ্ছে, অথচ, চুরি করে ছবি তুলতে চায়। ফট করে দাঁড়িয়ে গেলাম। গটগট করে এগিয়ে গিয়ে ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি যে বারবার ক্যামেরা আমার দিকে তাক করছেন, সেটা যে একধরনের অসভ্যতা এটা তো জানার কথা, তাই না?”  ভদ্রলোক, কিছুটা নিচু গলায় বললেন, “ সরি! আসলে আয়োজন করে পারমিশন নিতে গেলে যে ছবিটা চাচ্ছি সেটা আসত না।“ আমি হতভম্ব গলায় বললাম, “মানে? আপনি কি অলরেডি ছবি তুলেছেন?” ভদ্রলোক কোনও কথা না বলে একটা হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।“ আমি পেছন থেকে, “এই যে! এই! শুনে যান…” করতে করতে বুঝলাম, এনাকে ফেরানো যাবে না। মেজাজ খারাপের মাঝেও, কেন যেন ভাললাগার একটা চোরা বাতাস বুকে বইতে শুরু করেছে। সুপ্তি অবিরত জানতে চাইছে, কি হ’ল। ওর বকবক আমার কানে ঢুকছে না।

(৩) ব্যাপারটা প্রথমে জানালো সাইমুম। ফেসবুকে নক করে হেব্বি হাউকাউ- “মডেলিং শুরু করছিস, আর জানাস না, তোদের দাম বেড়ে গেছে খুব।” আমি তো কিছুই বুঝছি না। পরে অনেক তেনা প্যাঁচানো কথার পর জানা গেল, ‘ডেইলি স্টারের’ উইকলী ম্যাগাজিনে আমার ছবি ছাপা হয়েছে। কিভাবে ওখানে আমার ছবি ছাপা হতে পারে? সাইমুম লিঙ্ক পাঠিয়ে দিল ইনবক্সে। দেখে আমি থ। কফি সামনে নিয়ে আমি বসে আছি, জানলা দিয়ে দৃষ্টি গাছের ফাঁকে নরম বিকেলের রোদে। কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সেই ফটোগ্রাফার ভদ্রলোক এই কাণ্ড করল! তাও আবার কাভার পেজে! ক্যাপশন- “লেইজার” অবসর। নিচে ফটোগ্রাফারের নাম খুঁজে বের করলাম। সায়াদ মুস্তাফিজ। কি অবিশ্বাস্য দ্রুতটায় ফেসবুকে খুঁজে বের করে ফেললাম প্রোফাইলটা। আর ফট করে অ্যাড ফ্রেন্ড বাটনে ক্লিক করে মনে হ’ল , -“কি করলাম?”

জায়েদ কে নিয়ে যে চাপা টেনশনটা ভর করেছিল, ও কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, সেটা দু’দিনে চলে গেল। ও জানতেই পারেনি আমার ছবি ছাপার ব্যাপারটা। আমার ও আর বলতে ইচ্ছে হ’ল না।

এক দুপুরে সায়াদ ম্যাসেঞ্জারে নক করল নিজেই, “হেই, কফি শপ লেডি!”

আমি বিস্ময় আর অজানা কারনে লাল হয়ে জবাব দিলাম বেশ রাগ দেখিয়ে, “আপনার সাহস হল কিভাবে আমার ছবি তুলে পত্রিকায় দেওয়ার?”

-“ওপস! সেজন্য তো ঐদিন ই সরি বললাম।”

– “সরি বললেই মিটে গেল। প্রফেশনালিজম বলে একটা ব্যাপার আছে, নয় কি?”

-“হ্যাঁ, তা আছে, তবে তার আগে শিল্পের প্রাধান্য আমার কাছে বেশী।”

আমি চুপ করে গেলাম। ঝগড়া করতে মন চাইছে না।

উনি দু’তিন বার ডেকে চলে গেলেন অফলাইনে।

আর আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কেন আমি এই ভদ্রলোকের সাথে কথা বাড়াচ্ছি। যা হয়েছে, হয়ে গেছে।  আর না। কিন্তু আমার একলা দুপুর গুলো, দীর্ঘশ্বাসে ঘেরা বিকেলটা, আর অপেক্ষার সন্ধ্যা আমাকে ভারচুয়াল জগতে টেনে আনে। আমার মন বোঝায়, কথা বললে কি হবে? আমি সায়াদের সাথে কথা বলি। আমি যত তাকে জানি, তত যেন আমি একটা চোরাবালিতে আটকে পরি। সেই চোরাবালিতে দম বন্ধ হয় না, বরং এক চিলতে আকাশে, সাদা সাদা মেঘে বাতাস যেভাবে চক্কর দেয় তেমন অনুভুতি হয়। হয়ত আমি একটা রঙিন ঘড়ি হয়ে উড়ি, লাটাই থাকে ছবি শিকারির হাতে। আমি হাসি, কপট অভিমান করি, আমি নিজেকে নিয়ে ভাবি, নিজেকে আবার আবিষ্কার করতে চেষ্টা করি। এটা কি প্রেম?আমি জানিনা।

আমরা কফিশপে এক বিকেলে দেখা করি। ততদিনে মনের অনেক কাছাকাছি আমরা দু’জন। যেন প্রতিদিন দেখা হয় আমাদের। তবু কি এক বিচ্ছিন্ন লজ্জা আমাকে ঘিরে রাখে। সায়াদ আমার হাতে আঙ্গুল ছোঁয়ায়। আমি হাত টেনে নেই। ওর একাকীত্ব আমার একাকীত্ব এক বিন্দুতে জমা হয়। আমরা খোলা বইএর মত আমাদের সব কিছু জেনে গেছি। তবু কোন অদৃশ্য দ্বিধায় আমি উঠে দাঁড়াই।

বাসায় ফিরে  অসহায় একটা অস্থিরতা, একটা অযৌক্তিক অপরাধবোধ কুরে কুরে ভেতরটা খেতে লাগল। আমি জায়েদ কে ফোন করলাম। জায়েদ দু’ তিন বার ফোন করার পর ব্যাক করল। আমি আকুল হয়ে বললাম, এখন আসতে পারবে, প্লিজ!” জায়েদ কিছুটা অবাক হয়ে বলে, “কি হয়েছে? “ আমি বললাম, “ কিছু না, এমনি।“

জায়েদ একটু চুপ থেকে বলল, “কাল কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাব। আজ রাত হবে।”

(৪) আমি আজ অনেক সেজেছি। আজ জায়েদ আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে। কোথায় নিয়ে যাবে জানিনা। আমি অপেক্ষা করছি। সাড়ে আটটা বাজে। ও কি ভুলে গেছে? কেউ ফোন করল। কণ্ঠটা জায়েদের নয়। তবু সে আমায় ডাকছে। এক টুকরো খোলা আকাশের মত, অথবা সাদা সাদা মেঘের মত।

আমি ঘরের চৌকাঠ পেরোচ্ছি। আমি আজ আমার মত হব। আজ রঙিন ঘুড়ির দিন।



পাঠকের মতামত...

Top