বাবার মেয়ে লায়লা আলী

মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০১৪

লায়লার বয়স যখন ৮ বছর তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর মায়ের কাছে বড় হয়েছেন লায়লা আলী। অথচ ক্রীড়া বিশ্বে তিনি পরিচিত বাবা মোহাম্মদ আলীর নামে। ১৯৯৯ সালের ৮ অক্টোবর রিঙে প্রবেশ করেন লায়লা আলী। আজ তাকে নিয়ে লিখেছেন শামসুজ্জামান শামস।

দুর্দান্ত ডিফেন্স চকিত পদচারণা, অসাধারণ অনুমান ক্ষমতা নিখুঁত সময় জ্ঞান, রিঙের প্রতিটি ইঞ্চি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করার অত্যাশ্চর্য কুশলতা মোহাম্মদ আলীকে বিশ্বের সর্বোত্তম বক্সার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি এতোটাই ফিট ছিলেন যে, তার সম্পর্কে বলা হতো রিঙে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বেড়াতেন কিন্তু ফুল ফোটাতেন মৌমাছির মতো। ১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল লুইজিয়ানার ফোর্টপকে ২৬ জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর একজন লোক লেফটেন্যান্টের সামনে একটি করে নাম ডাকছেন, অফিসার আর তাদের এগিয়ে যেতে বলছেন সামনে। মানুষগুলোকে এখানে আনা হয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাওয়ার জন্য, যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য। ক্যাসিয়াস ক্লে! আর্মি ডাকলেন। কোনো জবাব নেই। মোহাম্মদ আলী! আর্মি! ডাকলেন অফিসার আবার। কিন্তু দল ছেড়ে একধাপও এগোলেন না মোহাম্মদ আলী। এবার তাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে বোঝানো হলো। সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানালে জরিমানা এমনকি পাঁচ বছরের জেলও হয়ে যেতে পারে। আলী বললেন, তিনি তার কথা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছেন। যুদ্ধে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আলী জানালেন, ‘সেখানে লুইভিলেন নিগ্রোদের সঙ্গে কথা হচ্ছে কুকুরের মতো ব্যবহার। সেখানে কেন আমাকে বোমা ফেলতে কিংবা বুলেট চালাতে বলছ নিরীহ ভিয়েতনামিদের ওপর? আলীর প্রত্যেকটি কথা বিস্ফোরিত হলো বোমার মতো। আমি যা বিশ্বাস করি, তাতে অবিচল থাকি। আমার হারাবার কিছু নেই। আমরা কালো মানুষরা গত চারশত বছর ধরেই জেল খাটছি। নিউইয়র্ক বক্সিং কমিশন এবং ডব্লুবিএ ফেডারেল কোর্টের রায়ের জন্য অপেক্ষার প্রয়োজনও তারা বোধ করল না। কেড়ে নেয়া হলো আলীর বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপা। ক‚লে নেয়া হলো চ্যাম্পিয়নশিপ বেল্ট।

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর জায়ারের কিনসাসায় মোহাম্মদ আলী আর জর্জ ফোরম্যানের শিরোপা রক্ষার লড়াই হয়েছিল। সেটি শতাব্দীর সেরা লড়াই হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতির কারণে কেড়ে নেয়া হয়েছিল আলীর শিরোপা। ১৯৬৮ সালে ফোরম্যান পেয়েছেন অলিম্পিক স্বর্ণপদক। আলীর বয়স তখন ৩২ বছর। ২৪ বছরের ফোরম্যান তখন অপরাজিত বুনো ষাঁড়ের মতো ভয়ঙ্কর এক মুষ্টিযোদ্ধা, যার পাঞ্চে বোমার বিধ্বংসী ক্ষমতা। শেষ আটটি লড়াইয়ে ফোরম্যান প্রতিদ্ব›দ্বীকে ধরাশায়ী করেছিলেন মাত্র দুই রাউন্ডে। সেই দুই রাউন্ডে পরাজিত দলে জো ফ্রেজিয়ারও আছেন। ৩২ বছরের আলীর গত ৭টি বছর কেটেছে ঘটনা প্রবাহের মাঝ দিয়ে। জীবনের সেরা সময় ২৫-২৮ বছর পর্যন্ত তিনি নিষিদ্ধ থেকেছেন বক্সিং থেকে। আর্চি মুর আলীকে পরামর্শ দিলেন লড়াইয়ের আগের রাতে সবার অগোচরে বনে পালিয়ে যেতে। কারণ তাতে করে রিঙে তার যে শোচনীয় অবস্থা হবে সেটি অন্তত তিনি এড়িয়ে যেতে পারবেন। সবার হাসির খোরাক হওয়ার চেয়ে বনে পালিয়ে গেলেও কিছুটা সম্মান রক্ষা হবে। ফোরম্যানের সঙ্গে লড়াইয়ে আলী ‘দ্য রোপ এ ডোপ’ কৌশলের আশ্রয় নিলেন। এ কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রথমে প্রতিপক্ষের আঘাত সহ্য করে পরে পাল্টা আঘাত হানা। প্রথম পাঁচ রাউন্ডে ফোরম্যানের আক্রমণগুলো প্রতিহত করে ৬ষ্ঠ রাউন্ড থেকে ঝলসে ওঠেন আলী। হিংস্র ফোরম্যান পঞ্চম রাউন্ড থেকে দুর্বল হতে থাকেন। আলী আক্রমণ প্রতিহত করে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন। অষ্টম রাউন্ড শেষ হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে চূড়ান্ত আঘাত হানেন আলী। রেফারি ১০ গোনার আগে পুরোপুরি উঠে দাঁড়াতে পারেনি ফোরম্যান। এক দশক আগে জয় করা বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপাটি এভাবেই পুনরুদ্ধার করেন আলী।

মোহাম্মদ আলী মোট ৪টি বিয়ে করেছেন। বক্সার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন তৃতীয় ঘরের সন্তান। লায়লা আলী। অন্য ছেলে বা মেয়েরা কেউ বাবার লাইনে আসেননি। লায়লা যে বক্সার হবেন তা কেউ কল্পনাও করেনি। ১৮ বছর বয়সে মেয়েটি সেলুন ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তখন সবাই বলাবলি করছিল মেয়েটি এতোদিনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যবসায়িক লাইনে পড়া মেয়েটিকে দিয়েই ব্যবসা হবে। এক রাতে টেলিভিশনে প্রমীলা বক্সারদের ফাইট দেখে লায়লা আলী সিদ্ধান্ত নিলেন বক্সার হবেন। বাবা মোহাম্মদ আলী এবং মা ভেরোনিকা মেয়েকে বাধা দিলেন না। তারা জানেন, মেয়েকে বারণ করে লাভ হবে না। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-পড়শীরা মেয়েটিকে উৎসাহ না দিয়ে বরং বলতে শুরু করলো বাপের নাম ডুবাবে মেয়েটি। লায়লা আলী নামে মোহাম্মদ আলীর যে একটি মেয়ে আছে তখনো জানে না বহির্বিশ্ব। জানলো আরও ৩ বছর পর, যখন লায়লা আলী প্রফেশনাল বক্সিংয়ে পা রাখার ঘোষণা দিলেন। পিতা কিংবদন্তি বক্সার এ সূত্রে মিডিয়ার শিরোনামে লায়লা চলে এলেন পেশাদার বক্সিংয়ে পা রাখার ঘোষণা দিয়ে। লায়লার বয়স যখন ৮ বছর তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর মায়ের কাছে বড় হয়েছেন লায়লা আলী। ১৯৯৯ সালের ৮ অক্টোবর রিঙে প্রবেশ করেন লায়লা আলী। প্রতিপক্ষ ছিল এপ্রিল ফ্লাওয়ার। ৪ রাউন্ডের লড়াই দেখতে গাঁটের টাকা খরচ করে গ্যালারিতে উপস্থিত হয়েছে মুষ্টিযুদ্ধ অনুরাগীরা। লায়লার ক্রমাগত পাঞ্চের আঘাতে প্রথম রাউন্ডে নকআউট হন এপ্রিল ফ্লাওয়ার। দ্বিতীয় লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন স্যাডিনা পেনিক্সোরের সঙ্গে অনায়াসে জিতলেন লায়লা। এরপর একে একে হারালেন নিকলিন, আমটিং। ক্রিস্টাল আকের্ড, মাজোয়া দোল, কেন্দ্রা বেলহাট এবং ক্রিস্টিল রবিনসনকে। জ্যাকি ফ্রেজারের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যাবেন লায়লা এমন ধারণা ছিল অনুরাগীদের। মোহাম্মদ আলী হাতেগোনা যে ক’জন বক্সারের কাছে হেরেছিলেন জ্যাকির পিতা জো ফ্রেজার ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। জ্যাকি ফ্রেজারের সঙ্গে ৮ রাউন্ডের লড়াইয়ে জিতেছে লায়লা আলী। তৃতীয় স্ত্রী ভেরোনিকার মেয়ে লায়লার লড়াই দেখতে প্রায়ই গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতেন মোহাম্মদ আলী। আলী লড়াইয়ে হেরেছিলেন। লায়লা আলী ২৫ লড়াইয়ে এখনো অপরাজিত। দ্বিতীয় বিয়ে করার পর বক্সিং থেকে দূরে রয়েছেন লায়লা আলী।

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj