পাথরের শৈল্পিক রূপকার ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান : আ বু ল কা লা ম আ জা দ

শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০১৪

বিংশ শতাব্দীতে যারা ভাস্কর্যের আধুনিক ভাষা গড়েছেন, যেমন ব্রাঁকুশি, জিয়াকো মেত্তি, গদিয়ের ব্রেজকা এদের সঙ্গে হেনরি মুরের নামও সমানভাবে উচ্চারিত। চিত্রকর অথচ মূর্তি গড়েছেন, আধুনিক ভাষায় এমন শিল্পীও রয়েছে- যেমন মাতিস এবং পিকাসো। মাতিসের করা অর্ধশায়িত নারী মূর্তির আলোক প্রতিফলনের ক্ষমতা যেমন রয়েছে তিমনি রয়েছে ত্রৈমাত্রিক গুণ। অন্যদিকে ফেলে দেয়া আবর্জনা থেকে সঠিক চিত্রকল্প বার করে পিকাসো ভাস্কর্য গড়েছেন-এ-ও ভাস্কর্যের এক আধুনিক পথ। কিন্তু মাতিস বা পিকাসো কেউই সব সময়ের ভাস্কর নন। এদের ভাস্কর্য তাই নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো। কিন্তু হেনরি মুর পেয়েছিলেন জগৎজোড়া খ্যাতি। কেন তিনি জগৎজোড়া খ্যাতি পেলেন তা অনুমান করলেই শিল্পরসিক মাত্রই বুঝতে পারেন। হেনরি মুরের পথ ধরেই হাঁটছেন ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। হামিদুজ্জামান খান সেই পথ পাড়ি দিয়ে এখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছেন বলে মনে করেন শিল্পবোদ্ধারা।

পঞ্চাশের দশকে আধুনিক ভাস্কর্যের সূচনা করেন নভেরা আহমেদ। পরবর্তীতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভাস্কর্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতাউত্তোর বাংলাদেশে হামিদুজ্জামান খান আধুনিক ভাস্কর্যের প্রসার এবং গ্রহণযোগ্যতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশে এ মাধ্যমটির উন্মেষ সাধনে যাদের নাম আসে তাদের মধ্যে অন্যতম হামিদুজ্জামান খান। তাঁর ভাস্কর্য দেশে-বিদেশে স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত উদ্যানে স্থাপিত হয়। ফলে হামিদুজ্জামান ব্যাপক আলোচিত ও ভাস্কর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পাশাপাশি হামিদুজ্জামান এদেশে জলরঙের জন্যও জনপ্রিয়তা পান। তিনি বহুমাত্রিক ধারায় সিদ্ধহস্ত।

হামিদুজ্জামান খান ধাতব বস্তুতে শৈল্পিক রূপের স্ফুরণ ঘটান। ফুটে তোলেন শিল্পের নানা রূপ। এবার পাথর কেটে-কুটে তিনি শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন। তাই হামিদুজ্জামান পাথরেরও শৈল্পিক রূপকার। বর্তমানে গ্যালারি কায়ায় প্রদর্শিত হচ্ছে স্টোনস শীর্ষক প্রদর্শনী। সমসাময়িক সময় কালের ৪৯টি শিল্পকর্ম এতে স্থান পায়। এই প্রদর্শনীতে পাথর এবং ড্রইং রয়েছে। হামিদুজ্জামান খান একজন নিরলস পরিশ্রমী শিল্পী। সর্বদাই তিনি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর সহজ চলাচল। গ্যালারি কায়ায় তাঁর পাথরের একক প্রদর্শনী হচ্ছে। এটি বর্ণনা করলে তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। এ কাজগুলোর সময়ের সঙ্গে শিল্পগুণ বর্ণনাতীত। তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্ম দেখলেই শিল্পরসিক মাত্রই মন ছুঁয়ে যায়।

পাথর এ দেশের সহজলভ্য উপকরণ নয়। তাই শিল্প চর্চায় তার ব্যবহার নেই বললেই চলে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে পাথর ভাস্কর্যের একটা প্রধান মাধ্যম। তাই তিনি সুদূর কম্বোডিয়ায় গিয়ে পাথরের বিশাল ম্যূরাল দেখে আসেন। সঞ্চিত সব অভিজ্ঞতা এবং বিগত বছরের শ্রম আর চিন্তার প্রকাশ ঘটান এ স্টোনস শিরোনামের প্রদর্শনীতে। আমাদের দেশের শিল্পীরা এখন হরহামেশাই বিদেশে যাচ্ছেন, দেখছেন সমসাময়িক ধারা এবং ফিরে এসে তাঁদের সমাজ বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক পরিধি ইত্যাদি মিলিয়ে অবগাহন করছেন শিল্প রচনায়।

শিল্পী হামিদুজ্জামান খান প্রায়সই বিদেশ ভ্রমণের কারণে সমসাময়িক নন্দন চিন্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছেন যা তাঁর কর্ম ভুবনকে সমৃদ্ধ করছে। হামিদুজ্জামানের গ্যালারি কায়ায় প্রদর্শিত ভাস্কর্যগুলো পাথরের চরিত্রনির্ভর, যার বেশির ভাগই ক্ষুদ্রাকৃতির। এসব কাজে তিনি কোনো না কোনো মোটিফ উপলক্ষ করেছেন। তবে পাথরের চরিত্রের বৈচিত্র্যের প্রতি তাঁর খেয়াল উল্লেখ করার মতো। নানা প্রকৃতির মার্বেল পাথর দিয়ে শিল্পকর্ম গড়েছেন হামিদুজ্জামান। সভ্যতার ইতিহাসে বহুল ব্যবহৃত কারারা থেকে শুরু করে পিঙ্ক, ক্লাক-হোয়াইট-এসব মার্বেলের প্রাকৃতিক চেহারা ব্যবহার করেছেন ভাস্কর্যের সারফেসের বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলতে।

হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্যের গতানুগতিক ধারাকে ভেঙেচুরে এনেছেন আধুনিকতায়। ভাস্কর্য মানে যে শুধু মূর্তি নির্মাণ করা নয়-এটা তিনি বঙ্গভবনের ‘পাখি পরিবার’ থেকে বারিধারার ‘পাখি’ ভাষস্কর্যের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে যে ইলিশ মাছ সবার দৃষ্টি কাড়ছে সেটিও তিনি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে ধাতব নির্মিত ‘শান্তির পাখি’ এটিও তিনি গড়েছেন। আর এগুলো প্রতিটিই তিনি গড়েছেন অত্যন্ত আধুনিক ধারায়।

ভাস্কর্য হামিদুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তাই তাঁর কাজের প্রিয় ক্ষেত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ওপর তিনি অনেক কাজ করেছেন। ১৯৭৬ সালে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত প্রথম জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে তাঁর ভাস্কর্য প্রথম পুরস্কার পায়। ভাস্কর্যটি ছিল ’৭১ স্মরণে ব্রোঞ্জের ‘দরজা’। এরপর তিনি একে একে করেছেন; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’, সিলেট জালালাবাদ সেনানিবাসে ব্রোঞ্জের ‘হামলা’, ময়মনসিংহ সেনানিবাসে ব্রোঞ্জের ‘মুক্তিযোদ্ধা’, টাঙ্গাইল ঘাটাইল সেনানিবাসে ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য’, বাংলা একাডেমিতে ‘মুক্তিযোদ্ধা’, আশুগঞ্জ জিয়া সারকারখানায় ‘জাগ্রত বাংলা’ উল্লেখযোগ্য। সিউল অলিম্পিক কোরিয়ায় হামিদুজ্জামানের ভাস্কর্য স্টেপস (সিঁড়ি) স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়েছে।

হামিদুজ্জামানের কাজের ক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্য রয়েছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ উড়িরচরের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড়-জলোচ্ছ¡াসে মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসলীলা, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টকে তিনি স্থাপনা শিল্পের (ইনস্টলেশন) মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। যে কাজ স্থান পেয়েছে জাতীয় জাদুঘরে। তাঁর কাজের মাধ্যম ভাস্কর্য হলেও তিনি সব সময় জলরঙে ছবি আঁকেন। জলরঙ তাঁর জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

স্টোনস প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য এবং ড্রইংয়ের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমের দুটি বিশাল ক্যানভাস। তারই একটি ‘রানিং ইন সার্কেল’ ২। এ শিল্পকর্মে তিনি জীবনের, সমাজের এবং বাস্তবতার গতি-প্রকৃতি ফুটে তুলেছেন। তিনি ধাতব এবং পাথরের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমের বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাবনাসমূহকে খতিয়ে দেখছেন একাগ্র অনুশীলনে। ধ্যানীর মগ্নতায় তিনি আকৃতি ও পরিসরের আন্তঃসম্পর্ককে অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। তাঁর এ সাধনা যেন ফুরবার নয়। বিমূর্ত চিত্র রচনায় তিনি আরো অর্থময়তার ব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ হবেন এমনটাই প্রত্যাশা।

গ্যালারি কায়া জুড়ে স্থান পাওয়া পাথরের কাজগুলো শিল্পীর অভিনবত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। শিল্পরসিকদের দৃষ্টি কাড়ছে। পিঙ্ক, ক্লাক-হোয়াইট-এসব মার্বেলের কাজগুলোর সঙ্গে আছে গ্রানাইটের কাজ। এসব কাজের বেশির ভাগেই জ্যামিতিক ফর্মের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। আবার তিনি মানুষের মুখ, পাখির মতো প্রিয় অবয়বকেও নির্মাণ করেছেন। এসব অবয়বের নান্দনিক মূল্য অপরিসীম। বিষয়বৈচিত্র্যে, মননশীলতায় এবং অগ্রসর রূচিশীলতার প্রতিফলনে তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্মই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

হামিদুজ্জামান খান আধুনিক শিল্পভাবনায় পথিকৃৎ হয়ে থাকবেন। তিনি যখন যে মোটিভ নিয়ে কাজ করেন তখন সেটিই হয়ে উঠছে আলোর ঝলকানি। তিনি অন্ধকারে আলো ফুটে তোলেন নানা সমিকরণে। এদেশের প্রাকৃত রূপ যা আদি ও অকৃত্রিম সেগুলোও তিনি নিয়ে আসেন তাঁর ভাস্কর্যে। তিনি এ দেশের মানুষের মনোনির্মাণে একটি স্নিগ্ধ রুচিশীলতার বিকাশ ঘটিয়েছেন। হামিদুজ্জামান খান রুমানিয়ার কীর্তিমান ভাস্কর ব্রকুসির ‘স্পেস ও মাস’-এর গণিতটার সঙ্গে সম্পির্কিত। বিশেষ করে ব্রকুসির ‘বার্ড ইন স্পেস’-এর মধ্যে বস্তু যেমন অবয়বগত বৈশিষ্ট্য উত্তীর্ণ হয়ে গতির দ্যোতক হয়ে যায় তেমনি একটা পরিবর্তনের মোহনীয় প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি পাথরের কাছে প্রার্থনা করেছেন। তাঁর এ সাধনা এ দেশের মানুষকে বিশেষ করে শিল্পরসিকদের আন্দোলিত করছে।

এ শিল্পী ১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় ঢাকা থেকে বিএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে এম এস বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত থেকে এম এফ এ ডিগ্রি নেন। এবং ১৯৮২-৮৩ সালে স্কাল্পচার সেন্টার, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ফ্রি-ল্যান্স স্কাল্পচার এবং পেইন্টার হিসেবে কর্মরত। এ পর্যন্ত তিনি ২৩টি একক প্রদর্শনী এবং দেশে বিদেশে বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংগ্রহণ করেছেন। তাঁর রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রকাশনা। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হামিদুজ্জামান খান এ মডার্ন স্কাল্পচার এবং রোজ গার্ডেন হামিদুজ্জামান খান। তিনি পেয়েছেন একুশে পদক, প্রধানমন্ত্রী পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার। গুণী এ শিল্পীর স্টোনস শিরোনামের প্রদর্শনী ৭ নভেম্বর শেষ হচ্ছে। হ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj