মারাত্মক লোকবল সংকট : সারা দেশে ১৬৪টি রেলস্টেশন বন্ধ : চালু করার উদ্যোগ নেই

মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৪

এন রায় রাজা : প্রায় এক দশক ধরে দেশের মোট ৪৫৩টি রেলস্টেশনের মধ্যে ১৬৪টি বন্ধ হয়ে আছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিলেও দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ থাকা এসব স্টেশন চালুর কোনো উদ্যোগই নেই। আবার লোকবল সংকটে প্রায়ই অনেক স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৩০০-৪০০ কিলোমিটার রেলপথ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এক দশক আগে যারা রেলের সুবিধা পেতেন তাদের অনেকেই এখন সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আবার স্টেশন সুপার ও মাস্টারের সংকটের কারণে আংশিক বন্ধ আছে প্রায় অর্ধশত রেলস্টেশন। প্রতি মাসেই লোক সংকটের কারণে এক-দুটি স্টেশন বন্ধ করে দিতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। আর স্টেশন বন্ধের কারণে স্টেশনের সামগ্রীসহ রেলের বিভিন্ন মূল্যবান সম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে দীর্ঘ ১০ বছর থেকে এ স্টেশনগুলো বন্ধ থাকলেও চালুর কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। এতে একদিকে যাত্রীরা যেমন চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) শাহ জহিরুল ইসলাম বলেন, আইনি জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে রেলের বিভিন্ন পদে কোনো লোক নিয়োগ করা যাচ্ছে না। অথচ দিনে দিনে কর্মীরা অবসরে যাচ্ছেন। সে কারণে লোকবলের অভাবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে কম গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বন্ধ রেখে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন চালু রাখতে হচ্ছে। এ নিয়ে প্রতি মাসেই আমরা উচ্চ পর্যায়ে চিঠি দিচ্ছি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। লোকবল-স্বল্পতার কারণে গত ২০০৮ সালে ১৬টি, ২০০৯ সালে ২৬টি এবং ২০১০ সালে ৩৪টি

১স্টেশন বন্ধ করা হয়। গত ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৬০টি স্টেশন বন্ধ ছিল, বর্তমানে আরো ৩-৪টি স্টেশনের মাস্টার অবসরে গেলে বন্ধ স্টেশনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪টিতে। এছাড়া লোকবল না থাকায় চালু থাকা স্টেশনগুলোতেও সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে দীর্ঘদিন স্টেশনগুলোয় কর্মী না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে বলে এ কর্মকর্তা জানান।

রেলসূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে মোট ৪৫৩টি রেলস্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে ১৬০ স্টেশন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ দীর্ঘদিন থেকে। বর্তমানে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরো ৪টি। বন্ধ স্টেশনের মধ্যে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। রেলওয়ের লালমনিরহাট ও পাকশী বিভাগে প্রায় শতাধিক স্টেশন দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৬০টি স্টেশন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে দীর্ঘ ৫-৭ বছর ধরে। এছাড়া আংশিক ও এক বা দুই শিফট করে বন্ধ রয়েছে ১০-২০টি স্টেশন। এসব স্টেশনের অধিকাংশই মাস্টার সংকটের কারণে চালু করা যাচ্ছে না বলে জানা যায়।

এ ব্যাপারে রেলওয়ের মহাপরিচালক তাফাজ্জল হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, লোকবল সংকটের কারণে সারা দেশে প্রায় ১৬৪টি স্টেশন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি। তিনি জানান, একটি স্টেশন পরিচালনার জন্য সুপার, মাস্টার ও পয়েন্টম্যানের দরকার হয়। কিন্তু রেলওয়ের লোক সংকটের কারণে এসব লোক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ বছরের মধ্যে রেলওয়ের লোক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হলে কিছু স্টেশন চালু করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রেলওয়ের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ১০৩টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। এছাড়া লালমনিরহাট ডিভিশনে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টেশনগুলো হচ্ছে- কাঞ্চিপাড়া, আনন্দবাজার, ভরতখালী, নশরতপুর, অন্নদানগর, মন্মথপুর, চৌধুরানী, কিসমত, রুহিয়া, নয়নীগুরুজ, পাঁচপীর মাজার, বালাবাড়ি, টগরাইহাট, সিঙ্গার ডাউরিহাট, শহীদ বোরহাননগর, সুলতানপুর স্কুল, বাজনাহার, রমনাবাজার ও রাজারহাট। এছাড়া লালমনিরহাট বিভাগে প্রায় ২০টি স্টেশন আংশিক বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে- বুড়িমারী, পাটগ্রাম, আদিত্যমারী, সেতাবগঞ্জ, পীরগঞ্জ, ভোমরাদহ, শীবগঞ্জ, রুহিয়া, পঞ্চগড়, বাদিয়াখালি রোড, মঙ্গলপুর ও বালাসীঘাটসহ একাধিক রেলস্টশন মাস্টারের অভাবে অপারেটিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

অপরদিকে, পাকশী ডিভিশনের ফুলতলা, চেংগুটিয়া, রূপদিয়া, যশোর ক্যান্টনমেন্ট, মেহেরুন্নেসানগর, জয়রামপুর, মোমিনপুর, মুন্সীগঞ্জ, ইয়াসিনপুর, শাহাগোলা, তিলকপুর, বেলাইচড়ি, দারোয়ানি, মির্জাগঞ্জ, ঝিকরগাছা, নাভারন, নন্দনগাছি, নাচোল, জগতি, চড়াইকোল, মাছপাড়া, বেলগাছি ও পাঁচুরিয়া বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। এছাড়া পাকশী ডিভিশনে আংশিক বন্ধ রয়েছে- মালঞ্চি, জামালগঞ্জ, হিলি, মিরপুর, সবলনগর, সিতলাই, কাঁকনহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রহনপুর, গোয়ালন্দঘাট, দর্শনা ও গোয়ালন্দবাজার এবং লালমনিরহাট ডিভিশনে কাঞ্চন-পঞ্চগড় সেকশনের মাঝের ও লালমনিরহাট-বুড়িমারী সেকশনের মধ্যবর্র্তী স্টেশনগুলো আংশিক বন্ধ রয়েছে।

অপদিকে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৬১টি স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৭টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬টি ও সিলেট সেকশনে ২৮টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। ঢাকা বিভাগে বন্ধ স্টেশনের মধ্যে লস্করপুর স্টেশনটি বন্ধ রয়েছে ২০০৩ সাল থেকে। এছাড়া ঢিলাগাঁও এবং খাজাঞ্চিগাঁও স্টেশন দুটি ২০০৯ সাল থেকে, ইটাখোলা, ভাটেরাবাজার, আফজালাবাদ, বাইগনবাড়ী স্টেশনগুলো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে ২০১০ সাল থেকে, কালিকাপ্রসাদ, মোশারফগঞ্জ, সুতিয়াখালী স্টেশনগুলো ২০১১ সাল থেকে এবং বাউসি, ইজ্জতপুর, ঠাকুরাকোনা, বিষকা ও নীলগঞ্জ স্টেশন ২০১৩ সাল থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ছাতকবাজার স্টেশনটি এক শিফট, জামালপুর কোর্ট স্টেশনটি ২ শিফট, কেন্দুয়াবাজার স্টেশনটি ২ শিফট, শহীদনগর বারৈ পটল স্টেশনটি ২ শিফট, মানিকখালী স্টেশনটি ১ শিফট ও হরষপুর স্টেশনটি ২ শিফট করে আংশিক বন্ধ রয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়।

সূত্র জানায়, স্টেশন মাস্টার ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। এগুলো হলো- ভাটেরা, টিলাগাঁও, লস্করপুর ও ইটাখোলা রেলস্টেশন।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, লোকবলের অভাবে চুয়াডাঙ্গা জেলার ৫টি স্টেশন আনসারবাড়িয়া, জয়রামপুর, গাইদঘাট, মোমিনপুর ও মুন্সীগঞ্জ স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা-বাগেরহাট রেললাইন তুলে ফেলা হয়েছে, বন্ধ রয়েছে শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে চুনারুঘাটের বল্লা সীমান্ত পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার আগের যেসব লাইনে ট্রেন চলতো, এমন অনেক লাইন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। পড়ে রয়েছে রেলকঙ্কাল।

এ ব্যাপারে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, এসব স্টেশনের বেশির ভাগই বিএনপি সরকারের আমলে বন্ধ হয়েছে। আর যে সব রুট বন্ধে আছে তাও বিএনপি সরকারের আমলে বন্ধ করা হয়। বর্তমান সরকার রেলওয়ের বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। জনবল সংকটের কারণে স্টেশনগুলো চালু করা যাচ্ছে না। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এ বছরের মধ্যে স্টেশন মাস্টার নিয়োগ দেয়া হলে কিছু স্টেশন চালু করা যাবে। তা ছাড়া বন্ধ থাকা রেললাইনের উন্নয়ন ঘটিয়ে আবারো রেল সংযোগ দেয়া হবে। দেশের প্রতিটি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কেও আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj