চরমপত্র একাত্তরের অস্ত্রহীন যুদ্ধ

শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০১৪

ঝর্ণা মনি : ‘কি পোলারে বাঘে খাইলো? শ্যাষ। আইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ। ঠাস্ কইয়্যা একটা আওয়াজ হইলো। কি হইলো? কি হইলো? ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পিঁয়াজী সাবে চেয়ার থনে চিত্তর হইয়া পইড়া গেছিলো। আট হাজার আষ্টশ চুরাশি দিন আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট তারিখে মুছলমান-মুছলমান ভাই-ভাই কইয়া, করাচী-লাহুর-পিন্ডির মছুয়া মহারাজরা বঙ্গাল মুলুকে যে রাজত্ব কায়েম করছিল, আইজ তার খতম্ তারাবি হইয়া গেল। আত্কা আমাগো চক বাজারের ছক্কু মিয়া ফাল্ পাইড়্যা উডলো, এলায় কেমন বুঝতাছেন? বিচ্চুগো বাড়ির চোটে হেই পাকিস্তান কেমতে কইর্যা ফাঁকিস্তান হইয়া গেল? আইজ ১৬ই ডিসেম্বর। চরমপত্রের শ্যাষের দিন আপনাগো বান্দার নামটা কইয়া যাই। বান্দার নাম এম আর আখতার মুকুল।’

দেশের কিছু কুলাঙ্গার রাজাকার ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে সকল সত্যিকার বাঙালিই যুদ্ধ করেছেন। একেকজন একেকভাবে। কেউ অস্ত্র দিয়ে কেউ অশ্রæ দিয়ে। কেউ স্টেনগান নিয়ে, কেউ মাইক্রোফোন নিয়ে আবার কেউ শব্দসৈনিক হয়ে। সকলেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। সবার লক্ষ্য ছিল একটি পতাকা ও একটি দেশ, বাংলাদেশ। ব্যঙ্গাত্মক শব্দ, আঞ্চলিক ভাষা আর ক্ষুরধার বাচনভঙ্গিতে যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস নেপথ্যে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপনা জুগিয়েছিলেন এম আর আখতার মুকুল (১৯২৯-২০০৪) এবং তার অস্ত্র ছিল স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠান। একাত্তরের ২৫ মে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র চালু হওয়ার দিন থেকে কথিকা পাঠ শুরু হয় এবং তা শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বর। একটি হালকা ভাঙা কণ্ঠ, অসাধারণ শব্দচয়ন ও অনন্য বাচনভঙ্গিতে এই কথিকা মুক্তিকামী বাঙালিকে রোমাঞ্চিত করত। অন্যদিকে রাজাকার-আলবদর ও পাকিস্তানপন্থীদের কাছে চরমপত্র ছিল দগদগে ঘায়ে নুনের ছিটার মতো।

চরমপত্রে তিনি কখনোই তার নিজের নাম ব্যবহার করতেন না, ছক্কু মিয়া নামেই প্রচার করতেন। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা ব্যবহার করেছেন, তেমনি সুদূর উত্তরবঙ্গের ভাষাও ব্যবহার করেছিলেন। এসব ভাষার মাধ্যমে গল্প ও হাসি-ঠাট্টার ছলে দুরূহ রাজনীতি ও রণনীতির ব্যখ্যা এবং রণাঙ্গনের সর্বশেষ খবরাখবর উপস্থাপন করতেন। ফলে অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই বৈচিত্র্যময় এবং সব শ্রেণি ও বয়সের মানুষের কাছে সমাদরে গৃহীত হয়েছিল। পশ্চিম বাংলাতেও এটি সমান জনপ্রিয় ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা সেই দুর্দিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতেন শুধু ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠান শোনার জন্য।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক অধ্যাপক মঈন আহমেদ বলেন, চরমপত্র স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের যেমনি শক্তি, সাহস, মনোবল বাড়াতে সহায়ক ছিল, তেমনি বিপক্ষ শক্তিকে নিরুৎসাহ ও দুর্বল করে রাখত। চরমপত্র তরুণদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছে। অনেকে রাজাকারের দলে নাম লিখাতে বিরত থেকেছে।

একাত্তরের অস্ত্রহীন যুদ্ধ : চরমপত্র অনুষ্ঠানের নামকরণ করেছিলেন স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের একনিষ্ঠ কর্মী আশফাকুর রহমান খান। এম আর আখতার মুকুলের নিজের ভাষায়, এই অনুষ্ঠান ছিল সাংবাদিক হিসেবে কাছ থেকে দেখা সংঘাতবহুল রাজনৈতিক ঘটনাবলি আর আমার ৪২ বছর জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ফসল। আমার জীবনের সার্থকতা এই যে, যুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতেও ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠান রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে জুগিয়েছিল অদম্য সাহস, লাখো শরণার্থীর হৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল অপরিসীম মনোবল আর দখলিকৃত এলাকার কোটি কোটি মানবসন্তানের জন্য এ অনুষ্ঠান ছিল আলোকবর্তিকা।

সাধারণ মানুষের কাছে এ কথিকাটি বোধগম্য করার লক্ষ্যে মুকুল অত্যন্ত সহজ ও সরল ভাষায় এর কথামালা রচনা করতেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও মুন্সিয়ানার সঙ্গে উপস্থাপিত ‘চরমপত্র’ ছিল একেবারে ব্যঙ্গাত্মক ও শ্লেষাত্মক মন্তব্যে ভরপুর একটি অনুষ্ঠান। এম আর আখতার মুকুলের মতে, কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের আরেকটি কারণ ছিল ভাষ্যকারের গোপনীয়তা রক্ষা। অধিকাংশ শ্রোতা বুঝতে পারেননি, এই মজার লোকটি আসলে কে? অবশ্য শেষ পর্বে, ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের আনন্দে, চরমপত্রের লেখক ও পাঠক নিজেই তার পরিচয় প্রকাশ করেন। তিনি যখন দেখতে পেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের ৯৫ জনই হচ্ছেন গ্রামের সন্তান, তখন তিনি ‘চরমপত্র’ পঠনে চমক সৃষ্টি করলেন। দ্রুত শহুরে ভাষা পরিত্যাগ করে মোটামুটি ঢাকাইয়া ভাষা ব্যবহার করা শুরু করলেন। একই সঙ্গে সব মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে একটি সুদৃঢ় একতা তৈরির জন্য যথেচ্ছভাবে বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিক ভাষাও ব্যবহার করেন। মাঝে-মধ্যে কবি নজরুলের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উর্দু ও ফার্সি শব্দও ব্যবহার করেছেন। এমনকি এও দেখা গেছে, তিনি বাংলা ভাষায় এমন কিছু নতুন শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা ছিল তার নিজস্ব সৃষ্টি। ২৯ মে ১৯৭১ এ প্রচারিত চরমপত্রের পঞ্চম পর্বের অংশবিশেষ ছিল এরকম, ‘জেনারেল ইয়াহিয়া খান এখন ঝিম ধরেছেন।… এদিকে আগায় খান পাছায় খান, খান আব্দুল কাইউম খান আবার খুলেছেন, মাফ করবেন ‘মুখ’ খুলেছেন।… আয় মেরে জান, পেয়ারে দামান, খান কাইউম খান তোমার ক্যারদানী আর কত দেখাবে?… জেনারেল ইয়াহিয়া, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। হা-ডু-ডু খেলা দেখেছো কখনো? সেই হা-ডু-ডু খেলায় কেচকি বলে একটা প্যাঁচ আছে… আর তুমি বুঝি হেই কেচকির খবর পাইয়া আউ কাউ কইরা বেড়াই আছ।’

স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতে স্বাভাবিক কারণেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময়ের দরকার হয়। গোটা দেশে মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্ব তখন স্তিমিত। পাকিস্তানিরা সেই সময়টা স্বাভাবিক অবস্থা দাবি করে। ট্রাকে পাক সেনারা ঘুরে বেড়ায়। স্থানে স্থানে চেকপোস্ট। এরকম হতাশাব্যঞ্জক সময়ে চরমপত্রই দেশবাসীকে চাঙ্গা করে রেখেছিল। বর্ষা আগত। সারা দেশ জলমগ্ন হবে। পাকিরা সাঁতার জানে না। বিচ্ছুরা শুধু ওদের স্পিডবোট ফুটো করে দেবে। তারপরই কেল্লা ফতে। শত শত পাকসেনা ডুবে মারা পড়বে। চরমপত্রের এরকম কল্পকাহিনী হতাশার মাঝে নিয়ে আসত সাহস আর আশার আলো। স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালিদের মনে হতো যুদ্ধ জয়ের বুঝি আর দেরি নেই। পাকসেনা আর রাজাকারদের দিকে একরাশ ঘৃণা ছড়ানো বিকৃত কণ্ঠে তিনি পড়তেন, ‘আইজ ভেড়ামারার কাছে আমাগো বিচ্চু পোলাপাইনরা এমুন মাইর দিচে, কমসে কম তেরজন পাকি সৈন্য প্যাকের মধ্যে পইড়্যা কাঁতরাইতাছে।’ মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি বিচ্ছু বলতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতে চরমপত্রে মুকুলের দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘ঘেটাঘ্যাট, ঘেটাঘ্যাট। কি হইলো? কি হইলো? অংপুরের ভুরুঙ্গামারীতে ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়ারা হালাক হইলো। কেইসটা কি? কই না তো, আমাগো মানিকগঞ্জ মুন্সীগঞ্জে কোনো টাইমেই মছুয়া আছিলো না তো? মেরহামত মিয়া অক্করে চিক্কুর পাইড়া উঠলো, বুঝছি, বুঝছি, পুরা মছুয়া রেজিমেন্টরে আলাদা না পাইয়া প্যাক আর দরিয়ার মাইদ্দে গায়েব কইরা, কী সোন্দর দুই হাত ঝাইড়া বিচ্চুরা কইতাছে, কই না তো? এইদিকে কোনোদিন মছুয়ারা আহে নাই তো? ব্যাস, মেসিন গানের লগে মেসিন গান; মর্টারের লগে মর্টারের বাইড়া-বাইড়ি শুরু হইয়া গেল। গাবুর বাড়ির চোটে জেনারেল টিক্কা খান খাকিস্তানে ভাগোয়াট্ হইলেন।’ বিজয়ের দিনে উল্লাসিত বাঙালিকে আরো উল্লাসিত করতে মুকুল বলেন, ‘২৫ শা মার্চ তারিখে সেনাপতি ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালিগো বেশুমার মার্ডার করনের আর্ডার দিয়া কি চোটপাট। জেনারেল টিক্কা খান হেই আর্ডার পাইয়া ৩০ লাখ বাঙ্গালির খুন দিয়া গোসল করলো। তারপর, বঙ্গাল মুলুকের খাল-খন্দক, দরিয়া-পাহাড়, গেরাম-বন্দরের মাইদ্দে তৈরি হইলো বিচ্চু। যেই রকম বুনোওল, সেইরকম বাঘা তেঁতুল। গেরামের পোলাপান যেমতে কইর্যা বদমাইশ লোকের গতরের মাইদ্দে চোত্রা পাতা ঘইস্যা দেয়, বিচ্চুগো হেই রকম কাম শুরু হইয়া গেল। হেই কাম ইবমরহ. ঢাঁই-ই-ই-ই। কি হইলো কি হইলো? বিচ্চুগো জয় হইলো।’

আজো সরকারি স্বীকৃতি পায়নি চরমপত্র : চরমপত্র এতটাই প্রভাব সৃষ্টি করে যে পরবর্তীতে চরমপত্র আর মুকুলের নাম একাকার হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গোপন স্থান থেকে প্রকাশিত ১১৭ পর্বের (২৫ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর) প্রতিটি চরমপত্র লেখা ও ব্রডকাস্ট করার জন্য এম আর আখতার মুকুল (১৯২৯-২০০৪) পেতেন সোয়া সাত টাকা সম্মানী। স্বাধীনতার পর তিনি রেডিও বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে ক‚টনৈতিক দায়িত্ব¡ও পালন করেন তিনি। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর সরকার চরমপত্রের সব রেকর্ড পুড়িয়ে দেয়। এম আর আখতার মুকুল লন্ডনে তার হাইকমিশনার কাজ হারিয়ে চরম দুর্যোগে পড়েন। পূর্ব-লন্ডনে একটি পোশাক তৈরি কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিয়ে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। পরে দেশে ফেরেন এবং সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। উদ্ধার করেন চরমপত্রের পুরাতন পাণ্ডুলিপি এবং ২০০০ সালে বই আকারে বের হয় চরমপত্র।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, আপামর জনসাধারণের ভালোবাসা পেলেও সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি ‘চরমপত্র’-এর। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মুক্তিযুদ্ধের একট রাজনৈতিক দলিল হতে পারত, আমাদের বিগত সরকাগুলোর অদূরদর্শিতার জন্য এর কথিকাগুলো মুছে গেছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj