গাজীপুর : ইতিহাসের পাতা থেকে

বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

এম নজরুল ইসলাম, গাজীপুর থেকে : গাজীপুর একটি ঐতিহাসিক জনপদ। ইতিহাসখ্যাত ভাওয়াল পরগনাই এখন গাজীপুর জেলা। ৫টি প্রশাসনিক থানা, ৪৪টি ইউনিয়ন, ১১৬২টি মৌজা ও ১১৪৬টি গ্রাম সমন্বয়ে এক হাজার আটশ দশমিক চার সাত বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট নবসৃষ্ট একটি জেলা। জেলা হিসেবে গাজীপুরের আত্মপ্রকাশ এবং নাককরণের কৌলিন্যে অভিষিক্ত হওয়া বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ গাজীপুরের জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু। এর আগে ১৯৭৮ সালে ১৮ ডিসেম্বর গাজীপুর উন্নীত হয় মহকুমায়। কিন্তু জেলা হিসেবে নতুন হলেও এর রয়েছে সমৃদ্ধ ও কালোত্তীর্ণ ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। মহকুমা এবং জেলা হিসেবে উন্নীত হওয়ার আগে এলাকাটির নাম ছিল জয়দেবপুর। তখন তা ছিল থানা সদর। কিন্তু ঐতিহাসিক জনপদ হিসেবে সুদূর অতীত থেকে এলাকাটি পরিচিত ছিল কখনো ‘ভাওয়াল’ কখনো ভাওয়াল বাজুহা অথবা কখনো ভাওয়াল পরগনা হিসেবে। আর ঐতিহাসিক জনপদ হিসেবে ভায়োলের সীমানা কেবল মাত্র বর্তমানের গাজীপুর এ এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নানা সময়ে বিভিন্ন উত্থান পতনকালে এর সীমানা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। আর ভাওয়াল এ নামটি যে পরিচিত ছিল কেবল আজকের গাজীপুরবাসীর কাছে তা নয়, অথবা নয় কেবলমাত্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে। এ উপমহাদেশের বহু স্থানে ভাওয়াল নামটি সুপরিচিত। এমনকি পরিচিত এ উপমহাদেশের বাইরেও বেশ কয়েকটি দেশ বিশেষত সুদূর ব্রিটেন ও গ্রিসে। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও ভাওয়াল তথা গাজীপুরবাসী রেখেছে বীরত্বপূর্ণ অবিস্মরণীয় ভূমিকা। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরেই সংঘটিত হয়েছিল প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। পাকিস্তানি দখলদার বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালির পক্ষ থেকে সেদিনই প্রথম গর্জে উঠেছিল বন্দুক। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তার সুযোগ্য সহযোদ্ধা তাজউদ্দিন আহমেদ এই অঞ্চলের সন্তান।

‘ভাওয়াল’ নামটির উৎস নিয়ে রয়েছে নানাজনের নানান অভিমত। তবে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকেই যে ভাওয়াল নামটির উদ্ভব এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত। ১৬০২ সালে ফজল গাজীর মৃত্যুর পর তার ছেলে বাহাদুর গাজী পরগনার শাসক হন। বাহাদুর গাজী মারা যান ১৬৪৩ সালে। এরপর তার পুত্র কাসেম গাজী শাসন ক্ষমতা লাভ করেন। ১৬৯৩ সালে কাসেম গাজীর মৃত্যুর পর তার ছেলে বরকত গাজী ভাওয়ালের শাসক নিযুক্ত হন। বরকত গাজী মৃত্যুমুখে পতিত হলে তার ছেলে দৌলত গাজী শাসন ক্ষমতায় আসেন। পবিত্র হজ থেকে ফেরার পথে দৌলত গাজী মারা যান এবং তার অনুপস্থিতিতে বলরাম রায় নিলাম ডাকে অংশ নিয়ে গাছার বীরেন্দ্র রায় এবং পলাশুনার নিশিকা ঘোষের সঙ্গে মিলে ১৭৩৮ সালে ভাওয়ালের জমিদারি কিনে নেন। এভাবে ১৭৩৮ সালে গাজীদের ভাওয়াল জমিদারির অবসান ঘটে এবং ভাওয়াল শাসনমঞ্চে আবির্ভাব ঘটে রায় বংশের শাসকদের।

১৭৪৩ সালে বলরাম মৃত্যুর পর তার ছেলে শ্রীকৃষ্ণ রায় জমিদারির কর্তৃত্ব লাভ করেন। তার মৃত্যুর পর জয়দেব নারায়ণ জমিদারির কর্তৃত্ব লাভ করেন। তিনিই পীড়াবাড়ির নাম পরিবর্তন করে নিজের নামানুসারে এলাকার নাম রাখেন ‘জয়দেবপুর’। জয়দেব নারায়ণের মৃত্যুর পর তার পুত্র ইন্দ্রনারায়ণ জমিদারি লাভ করেন। তিনি বিজয় নারায়ণ, চন্দ্র নারায়ণ ও কীর্তি নারায়ণ নামের তিন ছেলে রেখে মারা যান। এদের মধ্যে কীর্তি নারায়ণের ওপর জমিদারির ভার অর্পিত হয়। কীর্তি নারায়ণ মারা যান হরিনারায়ণ, নরনারায়ণ এবং লোক নারায়ণ নামের তিন ছেলে রেখে। এদের মধ্যে কনিষ্ঠ লোকনারায়ণ জমিদারির কর্তৃত্ব লাভ করেন। লোকনারায়ণের মৃত্যুর পর তার একমাত্র ছেলে গোলক নারায়ণ ভাওয়ালের জমিদারি লাভ করেন। তার আমলেই রাজদীঘি, মাধববিগ্রহ মন্দির এবং রাজবাড়ির ইমারত নির্মিত হয়। বাংলা ১২৬৩ সনের ১৩ পৌষ তিনি মারা যান। এরপর ভাওয়ালের শাসক হন কালীনারায়ণ রায় চৌধুরী, যিনি এ বংশের সবচেয়ে খ্যাতিমান শাসক বলে স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনিই প্রথম ‘রাজা’ উপাধিপ্রাপ্ত হন। ১২৮২ বঙ্গাব্দে তিনি মারা গেলে তার একমাত্র পুত্র রাজনারায়ণ জমিদারির দায়িত্বভার নেন। ১৮০১ সালে রাজনারায়ণ ইহলোক ত্যাগ করেন, তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে। বড় ও ছোট রাজকুমার মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে উভয়ে নিঃসন্তান অবস্থায় ২৮ বছর বয়সে মারা যান। এদের মধ্যে মেঝো রাজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ হচ্ছেন ভাওয়ালরাজ সন্ন্যাসীখ্যাত সেই ব্যক্তি যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল রহস্যময় কিংবদন্তি। ১৯০৯ সালে বায়ু পরিবর্তনের জন্য তিনি স্ত্রী বিভাবতীসহ দার্জিলিংয়ে গেলে সেখানেই তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তার শবদেহ শ্মশানে পোড়াতে গেলে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। ফলে শবদেহ শ্মশানে রেখে শবদাহকারীরা আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী ঘরে। বৃষ্টির পর তার মরদেহ পাওয়া যায়নি। এরপর প্রায় ১২ বছর পর এক জটাধারী সন্ন্যাসী এসে জয়দেবপুরে নিজেকে মেঝোকুমার বলে দাবি করেন। শুরু হয় রহস্যের খেলা, সৃষ্টি হয় অপার বিস্ময়ের কাহিনী। মেঝোকুমার শোনান আশ্চর্য এক কাহিনী। শ্মশানে নিয়ে চিতায় তুলে আগুনও দেয়া হয়েছিল কিন্তু সে সময় এল প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শবদাহকারীরা শব ফেলে চলে গেলে বৃষ্টির পানিতে চিতার আগুন নিভে যায়, তিনি তখন জ্ঞান ফিরে পান। তার গোঙানির শব্দ শুনে একদল নাগা সন্ন্যাসী তাকে নিয়ে যায় তাদের সঙ্গে। সন্ন্যাসী বেশে তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ঘুরে বেড়ান কাশী-বৃন্দাবন-বানারসি। তারপর ১২ বছর পর ফিরে আসেন জয়দেবপুরে। কিন্তু বিভাবতী তাকে স্বামী হিসেবে অস্বীকার করেন। পরে মেঝোকুমার বাধ্য হয়ে ঢাকার কোর্টে মামলা করেন। চাঞ্চল্যকর ও কৌতূহলোদ্দীপক এ মামলটি ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা বলে তখন সমগ্র ভারতবর্ষে খ্যাতি লাভ করেছিল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু মামলাটি কলকাতার হাইকোর্ট থেকে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়ায়। দীর্ঘ ১৬ বছর মামলা চলার পর ১৯৪৬ সালে মামলার রায় বের হয় এবং রায়ে মেঝোকুমারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। রায় বের হওয়ার মাত্র তিনদিনের মাথায় মেঝোকুমার মারা যান। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বলা যায় বিলুপ্ত ঘটে ভাওয়াল রাজবংশের।

এ ভাওয়াল রাজবংশের জমিদারির কেন্দ্রস্থল ছিল জয়দেবপুর। জয়দেবপুরেই রয়েছে রাজবাড়ি যা ভাওয়াল রাজবাড়ি নামে পরিচিত। ৩৬৫টি কক্ষবিশিষ্ট এ রাজবাড়িটি দর্শনীয় একটি স্থাপনা। বর্তমানে এ রাজবাড়িতেই রয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ভাওয়াল রাজাদের আমলে জয়দেবপুরকে ঘিরেই চলত তাদের সমুদয় কর্মকাণ্ড। ভাওয়াল রাজবংশের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে জয়দেবপুরের জৌলুশও হ্রাস পেয়ে যায় খানিকটা। ভাওয়াল রাজত্বের অবসান এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর জয়দেবপুর থানাসহ ভাওয়াল পরগনার উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে গঠিত হয় ঢাকা সদর (উত্তর) মহকুমা এ মহকুমার অন্তর্গত হয় উল্লিখিত কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও টঙ্গী থানাসমূহ।

পাকিস্তানি আমলের শেষের দিকে যখন বাঙালিরা তাদের স্বাধিকার, স্বাধীনতার আন্দোলনে দুর্জয় শপথে ছিল সংগ্রাম মুখর, তখন দাবি উঠেছিল এ এলাকাকে জেলায় উন্নীত করার এবং তখন থেকে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এ এলাকার নামকরণ করা হয়েছিল ভাওয়ালগড় জেলা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘গাজীপুর’ এ নামেই এলাকাটির নামকরণ করা হয়।

জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন ২০১৪'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj