কামাল চৌধুরীর কবিতা : শুভবাদী রোদজোছনার মিছিল : আ মি নু ল ই স লা ম

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৫

একজন সংবেদনশীল ও সৃষ্টিশীল মানুষ যে পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যা শোনেন কানে, যা দেখেন চোখে, যা পড়েন বইয়ের পাতায়- সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায়, সে সবই তার চিন্তার ও মননের ওপর গভীর ও নিবিড় ছাপ ফেলে যায়। সে কারণেই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক শোষণ-নিপীড়ন চালানোর ছবি, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় দক্ষিণবঙ্গের নদী-বৃক্ষাদির শোভা ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের চিত্র, শামসুর রাহমানের কবিতায় বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন-স্বাধিকার সংগ্রাম-স্বাধীনতা যুদ্ধের ছবি এবং আল মাহমুদের কবিতায় তিতাসপাড়ের উদার প্রকৃতির সরস প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে বেশি। আবার মাহমুদ দারবিশের কবিতায় তাঁর মাতৃভূমি প্যালেস্টাইন জায়নবাদী ইসরায়েলিদের দ্বারা আগ্রাসিত ও বেদখল হয়ে যাওয়ার চিত্র এবং তা নিয়ে কবির আর্তবেদনা প্রাধান্য লাভ করেছে। আসলে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’- এই তত্ত্বকথার ধোঁয়া যতোই উচ্চারিত হোক, কবি-শিল্পী তার সময়, সমাজ ও যাপিত জীবনকে অস্বীকার বা অতিক্রম করে যেতে পারেন না। হয়তবা সেটা তিনি চানও না। বরং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে সমগ্র বিশ্বের সাথে একাত্ম করে তোলা, নিজ সময়কে মহাকালের সাথে বেঁধে দেয়া এবং ব্যক্তি-অনুভবকে সর্বজনীন অভিজ্ঞানে উন্নীত করাই কবি-শিল্পীর স্থায়ী সাফল্য অর্জনের মূল সূত্র। নজরুল যখন বলেন, ‘আমি সেইদিন হবো শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না।’ তখন তা ব্যক্তি-দেশ-কালসীমার পরিধি ছাড়িয়ে সর্বজনীন, সর্বদেশীয় এবং সর্বকালীন মহিমা লাভ করে। অনুরূপভাবেই মোনালিসার রহস্যমোড়ানো বিষণœ হাসি দেশকালব্যক্তির গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে অন্তরঙ্গ আবেদনের অব্যর্থতায়। কিন্তু এটাও সত্য যে, মানবসৃষ্ট প্রতিটি সৃষ্টি গড়ে ওঠার জন্য একটি নির্দিষ্ট ভূগোল, সময় ও প্রাতিস্বিক অভিজ্ঞানের প্রয়োজন হয়। শূন্যের ওপর কোনো শিল্প রচিত হতে পারে না। বাউল হাছন রাজার ঘরও রচিত হতে পারেনি শূন্যের ওপর।

স্রষ্টার ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা একটি বিরাট ফ্যাক্টর। একজন কবি তার শৈশবে-কৈশোরে-যৌবনে যাদের সাথে মেলামেশা করেন, যে সব ভূগোলে পরিভ্রমণ করেন, যে সব কাজকর্ম করেন এবং যে সব বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করেন, সে সব অভিজ্ঞতা তার মানসগঠনে, তার ভাবনার ডাইমেনশন সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার তার পঠন-পাঠনের অভিজ্ঞতাও তার চিন্তন প্রক্রিয়া নির্ধারণে এবং প্রকাশভঙ্গি নির্মাণে অপরিহার্য প্রভাব ফেলে যায়। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং ইরানি কবিদের মরমী কবিতা ও উপনিষদ পাঠ এবং লালনের গানের প্রভাব স্পষ্ট। আবার তাঁর কথাসাহিত্যে তাঁরই নিজ চোখে দেখা পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির উপস্থিতি প্রবল। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় একদিকে দক্ষিণবাংলার খাল-বিল-নদী-সমুদ্র বৃক্ষ-লতাপাতা-পশুপাখির জীবন্ত উপস্থিতি, অন্যদিকে পঠিত ইংরেজি সাহিত্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবের ছাপ স্পষ্ট। আবার নজরুলের সাহিত্যে সমাজের সর্বশ্রেণীর আপামর মানুষের সাথে তাঁর নিবিড় মেলামেশা এবং সব ধর্মের শাস্ত্রাদি পাঠ ও ইরানি সাহিত্য পঠন-পাঠনের ইতিবাচক প্রভাব পরিষ্কারভাবে লক্ষণীয়।

কামাল চৌধুরীর জন্ম গ্রামে কিন্তু বেড়ে ওঠা শহরে। তিনি সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করেছেন, আবার উচ্চতর গবেষণা করেছেন নৃতত্ত্ব বিষয়ে। তিনি চাকরিসূত্রে প্রশাসনের অন্দরমহল দেখেছেন, দেখেছেন বিস্তারিত গ্রামবাংলা। তিনি রাজনীতিবিদদেরও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি পিতার মৃত্যু দেখেছেন, দেখেছেন পুত্রের জন্ম। তিনি বিস্তারিত বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যেতে দেখেছেন, দেখেছেন সব দুর্যোগ মোকাবেল করে টিকে থাকা নশ্বর মানুষের অবিনশ্বর কীর্তি পিরামিড। তিনি দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য ত্রাণকার্য পরিচালনার পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন; আবার জন্মভূমির সামরিক শাসনে পিষ্ট হওয়া অবলোকন করেছেন বেদনার্ত চোখের অসহায় দৃষ্টি মেলে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং সে সব দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেছেন। বাংলা ভাষার সমসাময়িক প্রধান কবিদের সঙ্গে তাঁর মেলামেশাও ছিল প্রচুর। তিনি নবীন কবিদের লেখা আগ্রহ নিয়ে পাঠ করেন। কামাল চৌধুরীর এই যে বিশাল ও বিস্তারিত অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান, তা তাঁকে প্রবল সহায়তা দিয়েছে কবিতা রচনায় এবং একইসঙ্গে তা তাঁর কবিতাকে প্রভাবিত করেছে নানাবিধ ইতিবাচকতায়।

কবিজীবনের শুরুতে একজন কবির প্রাতিস্বিক স্বপ্ন থাকে নিজ কবিতাকে ঘিরে। তিনি কবিতা দিয়ে কি করতে চান, কবিতা নিয়ে কি কি করতে চান এবং শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে চান কোন লক্ষ্যে- সে সবের একটি মানসিক রূপরেখা এঁকে রাখেন কবি এবং কখনো কখনো সেই রূপরেখাও কবিতায় প্রতিভাসিত হয়ে ওঠে। কামাল চৌধুরীরও তা ছিল যা তাঁর প্রথম বইয়ের দুয়েকটি কবিতায় পরিষ্কারভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। কামাল চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘মিছিলের সমান বয়সী’। ষাটের দশকের শুরু থেকে সত্তর দশকের প্রথমাংশ পর্যন্ত স্বজাতির স্বাধিকার আন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান-স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখতে দেখতে যাঁর বেড়ে ওঠা, তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম ‘মিছিলের সমান বয়সী’ হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত, অথবা বলা যেতে পারে এরচেয়ে উপযুক্ত নাম আর কিছুই হতে পারতো না। প্রতাশিতভাবেই সত্তরের উত্তাল দিনগুলোর ঢেউ ও জোয়ার এবং নিজ যৌবনের উদ্দামতা ধরা পড়েছে তাঁর এই সময়ে রচিত কবিতায়। এই পর্বে রচিত কবিতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষাবলম্বন এবং স্বদেশের মানুষ, প্রকৃতি ও মাতৃভূমির কল্যাণসাধনের ব্রত ঘোষিত হয়েছে দৃঢ় ভাষায়। স্বাধীনতার দশক পেরুনোর আগেই বাংলাদেশ সামরিক শাসনের কবলে পড়ে এবং তা অব্যাহত থাকে নব্বই দশকের আরম্ভ পর্যন্ত। স্বাধীন দেশ আটকা পড়ে থাকে বহুদিন আরেক ধরনের পরাধীনতার শৃঙ্খলে। বলিষ্ঠ নেতৃত্বহীন আবস্থায় জাতিকে জড়িয়ে থাকে এক কালঘুম। কামাল চৌধুরীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘টানাপড়েনের দিন’ রচনার কালপর্ব এটি। স্বভাবতই এই কাব্যগ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর মূল সুরও স্বৈরশাসনে বন্দি মাতৃভূমিকে নিয়ে অসহায় টানাপড়েন এবং মুক্তির জন্য আর্ত-আকাক্সক্ষার প্রকাশ। কিছুু ব্যক্তিগত স্মৃতি, ব্যক্তিগত প্রণয় ও পরিণয় ইত্যাদিও ঠাঁই পেয়েছে এই সময়ে রচিত কবিতায়। দুঃসময়ে কবি হাত পেতেছেন বাঙালির অন্তরশক্তির চির-উৎস রবীন্দ্র-নজরুলের কাছে। পরবর্তী দুটি কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘এই পথ এই কোলাহল’ এবং ‘এসেছি নিজের ভোরে’। এ পর্বেও কামাল চৌধুরীর কাব্যভাবনার কেন্দ্র অপরিবর্তিত রয়ে গেছে যদিও কবিতার বিষয়বস্তুতে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে এবং কবিতার ভাষায় কিছুটা পরিবর্তন দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর পঞ্চম কাব্য ‘এই মেঘ বিদ্যুতে ভরা’। এই কাব্যে এসে কামাল চৌধুরী মাতৃভূমিকে নিয়ে- মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে- তাঁর দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে উঠেছেন। তাঁর কবিতা অন্তরঙ্গ আনন্দের আলোয় ঝলমল করে উঠেছে এবং তিনি সর্বত্র প্রত্যাশিত দিনের প্রত্যাবর্তন দেখে ফিরে পেতে চেয়েছেন বিজয়ের মহৎ আনন্দ-উৎসবে প্রবেশের অধিকার যা এতদিন অন্যদের অন্যায্য অধিকারে ছিল। ২০০০ সালে প্রকাশিত কামাল চৌধুরীর ‘ধূলি ও সাগর দৃশ্য’ কাব্যে মূলত চারকিসূত্রে তাঁর দেশ ও বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কবিতা হয়ে উঠেছে। তিনি তাঁর নৃতত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞানকেও সফলভাবে কাজে লাগিয়েছেন এই পর্বে। এই কাব্যগ্রন্থের দুটি কবিতা অতীব উল্লেখযোগ্য ‘হাড়ের গল্প’ এবং ‘মেঘ ও ধূলি সম্পর্কের কবিতা’। বিদেশ ভ্রমণের ওপর লিখিত কবিতাগুলোও ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে তাঁর সমগ্র কবিতাসম্ভারে। অতঃপর প্রকাশিত ‘রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল’, ‘হে মাটি পৃথিবীপুত্র’ এবং ‘পান্থশালার ঘোড়া’ এই তিনটি কাব্যগ্রন্থে কামাল চৌধুরী বরাবরের মতোই পাঁচমিশালী কবিতার পসরা সাজিয়েছেন। তবে এ পর্বের উল্লেখযোগ্য দিকটি এই যে তিনি কবিতা নিয়ে, মূলত কবিতার আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং তাঁর কবিতার চেহারা পাল্টে যেতে থেকেছে। তাঁর কিছু কিছু কবিতার ভাষায় এক ধরনের রহস্যময়তা দানা বাঁধতে থেকেছে- যদিও যে জোছনা-স্বচ্ছতা তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, তা মূল ধারায় বহাল থেকেছে। অবশ্য ইতোপূর্বে রচিত ‘হাড়ের গল্প’ এবং ‘মেঘ ও ধূলি সম্পর্কের কবিতা’ নামক কবিতা দুটিও এক ধরনের আলো-আঁধারি ধারণ করে আধুনিক কবিতা হিসেবে অনেক বেশি সমৃিদ্ধ অর্জন করেছে। ‘রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল’ কাব্যের ‘অদৃশ্য শহর’ একটি অতীব উৎকৃষ্ট কবিতা। বক্তব্যের রহস্যময়তা, বর্ণনার সৌন্দর্য এবং ইতিহাস ও বর্তমানের সেতুবন্ধন রচনা কবিতাটিকে অনিঃশেষ আনন্দের সৃষ্টিতে উন্নীত করেছে। আলো ও আঁধারি, ইতিহাস ও কল্পনা, চিত্রকল্প ও কল্পচিত্র, রঙ ও রূপ, প্রকাশ ও আড়াল, শব্দ ও ব্যঞ্জনা মিলে একটি কবিতাকে কিভাবে অনিঃশেষ পাঠের ও আনন্দের সৃষ্টি করে তুলতে পারে, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ কামল চৌধুরীর ‘অদৃশ্য শহর’ নামের কবিতাটি।

‘‘পূর্বদিকে তিনদিন হাঁটলে এ শহরে পৌঁছা যায়। চতুর্দিকে অজস্র গম্বুজ,

খিলান, আর তাম্র ভাস্কর্য। একটি স্বর্ণ-মোরগ সুমিষ্ট রহস্য-কণ্ঠে প্রতিভোরে

ডাকে। মার্কোপোলোর বহু শতাব্দী পরে ইটালো ক্যানভিনো যখন কুবলাই

খানের দরবারে বসে রূপকথার মত এ শহরের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, চতুর ও

সংশয়বাদী রাজা সবটুকু বিশ্বাস করেননি। কিন্তু সভাসদগণ এমনকি এককোণে

বসে থাকা রাজকবি- তিনি মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পূর্বদিকে যাত্রার। কোন

কোন সন্ধ্যায় এ শহরের রূপ বদলে যায়, বিশেষত বর্ষকালে। দ্রুত সূর্য ডোবে।

খাবারের দোকানগুলিতে জ্বলে ওঠে লাল নীল হরিৎ বাতি। দৃশ্য ও অদৃশ্যের

মাঝখানে মায়াবী পর্দা সরিয়ে তখন এক নারী-কণ্ঠে করুণ কান্না শোনা যায়।

কান্না এ শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য়।’’

‘রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল’ কাব্যে প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। ‘হে মাটি পৃথিবীপুত্র’ এবং ‘পান্থশালার ঘোড়া’ কাব্য দুটিতে অধিকাংশ কবিতার অবয়ব ছোট হয়ে এসেছে এবং শব্দের ব্যবহারজনিত সংযম ও কৃপণতা এবং স্পেস ও সাংকেতিকতা, পরিহাস ও স্যাটায়ার সহযোগে কবিতার ভাষা উত্তরাধুনিক কবিতার মতো অনেক বেশি তীর্যক হয়ে উঠেছে। এই পর্বের বেশকিছু কবিতায় তিনি সাম্প্রতিক কবিতার বাক-কৃপণ প্রকরণ সম্পর্কিত ফতোয়াকে আক্রমণ করেছেন কিন্তু তাকে অস্বীকার করেননি। এই স্তরে রচিত কবিতাগুলো এ সময়ের নবীনদের হাতে রচিত কবিতার মতো হয়ে উঠেছে, বলা যায় তিনি নবীনদের চেয়েও নবীন হয়ে উঠেছেন। পার্থক্য রয়ে গেছে এই যে প্রকরণগত সাদৃশ্য রচিত হলেও অর্থহীন কবিতা রচনার মোহ তাঁকে কিনে নিতে পারেনি। তাঁর কবিতার ভেতরে নান্দনিক রূপ-রসের খেলা পূর্বের মতোই উপভোগ্যতার মূলশক্তি হয়ে রয়ে গেছে। উল্লেখ্য, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের কাব্যভাবনা এবং কবিতা রচনার আঙ্গিককে নবায়ন করে নেয়ার ক্ষেত্রে কামাল চৌধুরীর ক্ষমতা ঈর্ষণীয়ভাবে বেশি।

কামাল চৌধুরীর কাব্যপ্রকরণের মূল কথাটি এই যে- তিনি পরিমিতিবোধের কবি, স্মিতবাক কবি, ভদ্রগোছের কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগন্থের নাম ‘মিছিলের সমান বয়সী’, অথচ কোনো কবিতাই স্লোগানধর্মী ভাষায় রচিত নয়। তাঁর মুগ্ধতার ভাষা অনুদ্বেলিত, তাঁর ঘৃণার ভাষা সুপরিশীলিত; তাঁর প্রতিবাদের ভাষা বিদ্বেষমুক্ত, তাঁর প্রেমের ভাষা পরিণত। সব ক্ষেত্রেই তিনি আবেগের আতিশয্য এবং উচ্চারণের প্রগলভতাকে পরিহার করেছেন। তিনি কল্পনাকেও কখনো লাগামহীন হতে দেননি। তাঁর কবিতায় ঝড়ের নদীর উথালপাথাল নেই; তাঁর কবিতা আগাগোড়াই প্রভঞ্জনহীন নদীর মতো স্বাভাবিক গতিতে প্রবহমান। এই নদীতে স্রোত আছে, বাঁক আছে, পাল তোলা নৌকা আছে, ছোটখাটো ঢেউও আছে; কিন্তু ঝড়ের উন্মত্ততা নেই; নেই খরায় শুকায়ে যাওয়া প্রাণহীন বালুচর। তিনি বাকসংযমে সযতœপ্রয়াসী এবং সফলও। তবে বাকসংযমের মাঝেও তিনি কখনো কখনো প্রবাদের মতো সুন্দর পঙ্ক্তি রচনা করে পাঠকদের মনে অভূতপূর্ব ভালো লাগার বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারেন।

কামাল চৌধুরী উদার মানবতাবাদে গভীরভাবে বিশ্বাসী কবি। তাঁর কবিতায় মানবতবাদী সুর প্রবল, তবে তা প্রগলভ নয়। আধুনিক কবি হয়েও তিনি শিল্পের বিমানবিকীকরণ তত্ত্বে গা ভাসিয়ে দেননি। নিবিড়ভাবে মানবতাবাদী এই কবি বলেছেন- ‘‘হানাহানি, রক্তপাত- একবিশ্বে বিভক্ত পৃথিবী/কবি তার অংশ নয়- তার নাম চিরমুক্ত পাখি/জন্ম যদি চুরুলিয়া মৃত্যু তবে ঢাকার মাটিতে/কবিকে রুখতে পারে এরকম কাঁটাতার নেই।’’

কামাল চৌধুরীর কাব্যবিষয়ের একটা প্রধান দিক এই যে নিবিড় দেশেপ্রেমে উজ্জীবিত তাঁর কবিতা। এ দেশের মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ দেখে দেখে বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় সেই উত্তাল দিনগুলোর জোয়ার-ভাটা ও ঢেউয়ের দোলাচল ধরা পড়েছে। তিনি মাতৃভূমির এবং স্বদেশবাসীর অধিকার আদায় ও সুরক্ষার সংগ্রামের প্রতি ঐকমত্য ঘোষণা করে এসেছেন। দেশকে স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের কবল থেকে মুক্ত করার শপথ-উচ্চারণে তিনি অবিচলিত-কণ্ঠ। তবে তাঁর স্বদেশপ্রেমের ভেতর একটা অবারিত আকাশ আছে। সে প্রেমের ভেতর কোনো ক‚পমণ্ড‚কতা নেই, কোনো শোভেনিজম নেই; অন্যের বিরুদ্ধে প্রগলভ বিষোদ্গার নেই। তাঁর স্বদেশপ্রেম সব দেশের মানুষের স্বদেশপ্রেমের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। তিনি কোনো ভূগোলকেই অনাত্মীয় জ্ঞান করেননি। তিনি ভাষা আন্দোলনে পথ বেয়ে পাওয়া আমাদের স্বাধীনতার কথা বলেতে গিয়ে উচ্ছ¡সিত হয়ে উঠেছেন দেশপ্রেমে, “আমরা সবাই মিলে ভাগ করে পেয়ে গেছি একটি পতাকা।’’ আবার তিনিই সভ্যতার প্রাচীনভূমি মিসর ভ্রমণে উজ্জীবিত হয়ে লিখেছেন বিশ্বপ্রেমের কবিতা :

“নিজেকে ভাসাতে পারি সভ্যতার দীর্ঘতম নদে।’’

কামাল চৌধুরী একইসাথে নিবিড়ভাবে প্রকৃতিপ্রেমিকও। তিনি প্রত্যক্ষভাবে প্রকৃতির কবিতা তেমন লিখেননি, কিন্তু গাছপালা-বন-বনানী-নদী-সমুদ্র-আকাশ-পাখপাখালি নিয়ে তাঁর মুগ্ধতা এবং এদের সুরক্ষার জন্য দায়বোধ অনেক কবিতাতেই মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিপ্রেমের সূত্র ধরে তাঁর কবিতায় এসেছে নদী-গাছপালা-সমুদ্র সৈকত-কিয়োটো সম্মেলন-পরিবেশবাদী আন্দোলন প্রভৃতি প্রসঙ্গ। তিনি মহামানবী তাপসী রাবেয়ার মতো প্রকৃতির অহিংস উদার অভিজ্ঞান বুকে ধারণ করে প্রবাদবাক্যতুল্য উচ্চারণে বলেছেন, ‘‘বাংলা ভাষা পাখিদের, বাংলা ভাষা বৃক্ষজাতিময়/সবুজ পুস্তিকা ছাড়া মহাকালে কেউ কবি নয়।’’

কামাল চৌধুরী দেশপ্রেমের কবি, প্রেমের কবি, প্রকৃতির কবি, বিপ্লবের কবি কিন্তু বিষয়গতভাবে তিনি মূলত শুভবাদী ভাবনার কবি। তাঁর কবিতায় অসুন্দরের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ এবং সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন ঘটেছে আগাগোড়াই এবং তিনি তাঁর এই শুভবাদী ভাবনা থেকে কখনো একতিল সরে আসেননি। তাঁর কবিতার ভাষা আধুনিক, কখনোবা তা উত্তরাধুনিক। কিন্তু তিনি আধুনিকতাবাদীদের মতো ক্লেদজ কুসুমের নান্দীপাঠ রচনা করেননি। শোষণনির্ভর-পুঁজিবাদী আধুনিকতা-উৎসারিত-প্রশ্রয়িত জীবনের নষ্টামি, নোংরামি, কদর্যতাকে মহিমান্বিত করার পক্ষে উচ্চারিত হয়নি তাঁর একটি শব্দও। তিনি ইউরো-মার্কিন চরম-পুঁজিবাদনির্ভর আধুনিকতার সমর্থক নন- যা সারাবিশ্বে নতুন কৌশলে সাংস্কৃতিক-ভাষিক-অর্থনৈতিক উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় পরিকল্পিত ও প্রকল্পিত। তিনি মনের দিক থেকে মুক্ত মানুষ। কোনো ইজমের দাসত্ব নেই তাঁর কবিতায়। কারো বিরুদ্ধে বিষোদ্গার নেই। বরং যা কিছু পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর, যা সুন্দর জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক, তার পক্ষাবলম্বনে আগাগোড়াই দ্বিধাহীন তাঁর মন ও কলম। এক শুভবাদী রোদ-জোছনার মিছিল কামাল চৌধুরীর কবিতা যা দেখে পিছু হটে জীবনের যাবতীয় অশুভ অন্ধকার। শুভবাদী ঘোষণায় তিনি প্রতিশ্রæতিবদ্ধ জন্মের কাছে, জন্মভূমির কাছে, পৃথিবীর কাছে। “প্রতিটি মুহূর্ত আমি পাখিদের জন্য লিখে দেব/পত্র ও পুষ্পবীথি, অন্ধকার, খোলা বাতায়ন/ডাকো হে আকাশ ডাকো; চিৎকারে, ক্রন্দনে, ঘৃণায়/শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতে- এ শ্রাবণে আমি ঘুমাব না।” কামাল চৌধুরীর এই জোছনার মিছিল চুমু খেতে চায় গাছপালার পাতায়, নদীর স্রোতে, আকাশের নীলে, বলাকার ডানায়, বসতির ঝুপড়িতে, অট্টালিকার ছাদে, পথপাশের ঘাসে, পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণায়, কবিতায় খাতায় এবং আমাদের ভাবনার বাতাবরণে। বিমানবিকীকরণভিত্তিক আধুনিকতা নয়, পৌরুষহীন উত্তরাধুনিকতাও নয়, এক উত্তর-উনিবেশবাদী আলোকের প্রার্থনায় প্রতিটি শব্দকে উদার অলৌকিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে বলে কামাল চৌধুরী কবিতা।

দাও শব্দ দাও- অনন্ত মাধুর্য দাও

উত্তপ্ত লোহাকে আঁকাবাঁকা করি অসময়ে

আলোকের ছিপি খুলে সশব্দে লাফাক কিছু দৃশ্য বুদবুদ

পাপ পুণ্য ভেসে যাক- বসন্ত হাসুক

বনভূমি ডেকে নিক, চাঁদ নদী শস্যক্ষেত

নারী বেশ্যা রঙলীলা প্রতিহিংসা শান্তি কবুতর

বৃষ্টি বজ্র বস্তি খিস্তি ফুটপাত অশ্রাব্য আলাপ

একাকার হয়ে যাক, প্রার্থনায় মিলে মিশে যাক।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj