শিল্পী আবদুর রাজ্জাক : প্রকৃতির নৈকট্যই তার সৃষ্টিশীলতার বড় প্রেরণা

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০১৫

আব্দুর রাজ্জাক (১৯৩২-২০০৫) ছিলেন এ দেশের প্রথম সারির চিত্রশিল্পী ও অগ্রণী ভাস্কর। চারুকলা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। এখানে তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৬৩ সালে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হয়। এর আগে দীর্ঘ ১৭ বছর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এই অপূর্ণতা নিয়েই পথ চলছিল, কারণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই ভূখণ্ডে ভাস্কর্যকলা চর্চার প্রতিবন্ধকতা রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুভূতিজাত। দেশ বিভাগের অব্যবহিত পর প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পালয় তাৎক্ষণিকভাবে ভাস্কর্য বিভাগ খোলার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে উদ্যোক্তরা সে পথে হাঁটেননি। কিন্তু ১৯৬০’র দশকের প্রেক্ষাপটে এটাও যথেষ্ট সাহসী পদক্ষেপ ছিল। এ প্রসঙ্গে দেশের আরেকজন খ্যাতিমান শিল্পী সফিউদ্দীনের জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলের ভাস্কর্য বিভাগে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন কিন্তু চিত্রকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পরিবারের আপত্তি না থাকলেও ভাস্কর্যকলা শিক্ষা নেয়ার ক্ষেত্রে প্রবল আপত্তি ছিল। অথচ তাঁদের পরিবার প্রচলিত অর্থে রক্ষণশীল ছিল না।

আব্দুর রাজ্জাকের জন্ম ১৯৩২ সালে শরীয়তপুরে। ছবি আঁকার ব্যাপারে তাঁর পরিবার থেকে কোনো বাধা ছিল না, বরং তাঁর পিতা ও এক মামা তাঁকে উৎসাহিত করতেন। তাঁরা উভয়েই সলিমুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে ড্রাফটসম্যান হিসেবে ডিগ্রি নেন। সেখানে ড্রইং শিখতে হতো। পিতার অনুপ্রেরণার কথা তিনি বারবার স্মরণ করেন। তাঁর প্যালেট ও তুলি তিনি আজীবন সযতেœ সংরক্ষণ করেছেন। কার্তিকপুরের একটি স্কুলে তাঁর লেখাপড়া শুরু হলেও পরে ফরিদপুর জেলা স্কুলে এসে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে কোনো ড্রইং টিচার ছিলেন না। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকার কোনো চর্চা শুরুতে হয়নি। শরীয়তপুরে তাঁদের বাড়ির কাছে অবস্থিত কুমোরপাড়ায় তিনি নিয়মিত যেতেন, তাদের কাজ দেখতেন আর ওখান থেকে পুতুল সংগ্রহ করতেন। ফরিদপুরে থাকতে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত জয়নুল আবেদিন, আনোয়ারুল হক, শফিকুল আমিনসহ পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত শিল্পীদের অঙ্কিত ছবি তিনি কেটে সযতেœ রেখে দিতেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি খ্রিস্টান স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে কিছুদিন আঁকা শেখেন। পিগমেন্ট ঘসে ঘসে যে ছবি আঁকা হতো তাকে সফট পেইন্টিং বলা হতো। সেটাই তাঁর ছবি আঁকার হাতেখড়ি। আর আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার পরই তিনি মূলত ছবি আঁকার কৌশলগুলো রপ্ত করেন। তখন স্টিল লাইফ ও ড্রইং বেশি করানো হতো, তাত্তি¡ক বিষয়গুলো সেভাবে পাঠ্যসূচিতে ছিল না। ২০০৪ সালে কালি ও কলম-এর সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই এসব তথ্য জানচ্ছেন।

মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি সকলের নজর কেড়েছিলেন। বরাবরই ভালো ফল করতেন। প্রথম ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা যান। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাপচিত্রের ওপর লেখাপড়া করেন। পিকাসোকে ছাপচিত্রের কৌশল শেখানো মরিসিও লেসানিস্কির কাছে ছাপচিত্রের কাজ শেখেন। দেশে ফিরে চারুকলায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, কিন্তু আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তিনি ছাপচিত্র বিভাগে যোগ দিতে পারেননি পদ না থাকায়। পেইন্টিংসের ক্লাস নিতেন। ১৯৬৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হলো। জয়নুল আবেদিনের বিশেষ আগ্রহ ছিল। তারপরও তাঁরই নির্দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়ে তাদের সম্মতি আদায় করতে হয়েছিল। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন :

আমি গেলাম। আবুল হাশিম সাহেব তখন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান। আমি তাকে বললাম, আমি অনেক মুসলিম সুলতানদের প্রাসাদে দেখেছি বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে, প্রাসাদে ঢুকতেই শ্বেতপাথরের সিংহ চোখে পড়ে, আর ভেতরে ঢোকার পরে অনেক রিলিফ ওয়ার্ক। ইয়োরোপ থেকে শিল্পী এনে মেটালের ভাস্কর্য গড়িয়েছেন। তবে আমাদের দেশে এ ধরনের কাজ হলে অসুবিধা কোথায়? তিনি আমার সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। বললেন, অলরাইট, গো এহেড। তারপর মোটামুটি আমরা শুরু করে দিলাম, তেমন আর কোনো অসুবিধা হলো না। …আমি এ নিয়ে আর্টিকেল লিখেছি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ভাস্কর্য এমন একটি মাধ্যম, এটি আসতেই হবে, যতই ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকুক না কেন, ভাস্কর্যকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। মানুষ যত শিক্ষিত হবে ততই এর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকবে।

চিত্রকলা, ছাপচিত্র ও ভাস্কর্য- এই তিনটি মাধ্যমেই তিনি সাবলীল ছিলেন। তেলরং, জলরং ও অ্যাক্রিলিকে তিনি প্রচুর কাজ করেছন যেগুলো মূলত নিসর্গচিত্র। তাঁকে প্রকৃতি প্রেমিক বলা যায়। প্রকৃতির নৈকট্য তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় এক অনুপ্রেরণা ছিল যা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন :

প্রকৃতির মাধ্যমে প্রকৃতির খুব কাছে থাকার চেষ্টা করেছি। প্রকৃতি সদা পরিবর্তনশীল ও অসীম শক্তিশালী। প্রকৃতির নিয়মকে জানার চেষ্টা করেছি। আমি জীবনকে পরিপূর্ণভাবে জানা ও রূপ দেয়ায় আগ্রহী। অত্যন্ত মন্থর গতিতে আমার কাজ গড়ে ওঠে। রং, রূপ, রেখা, গড়ন ও স্পেসকে কেন্দ্র করে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করি। নানান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কাজ করে করে অগ্রসর হই।

তবে প্রকৃতিকে সাদা চোখে যেভাবে দেখা যায় সেভাবে উপস্থাপন করতে করতে এক সময় তিনি প্রতীক নির্মাণ শুরু করলেন, বিমূর্ত প্রকাশবাদের কাছে গেলেন। পরিণত বয়সের কাজে এই বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। আমেরিকায় কাজ শিখে আসার পরই তাঁর কাজে এই পরিবর্তনগুলো দৃষ্টিগোচর হলো। তেলরঙে বিন্যাস শিরোনামের কাজটি একটি অসাধারণ শৈল্পিক কাজ যেখানে তিনি রংকেই বিষয় করেছেন। রঙের ব্যবহারে রাজ্জাক ভীষণ হিসেবী। তাঁর ছবি দেখলে মনে হয় না যে তিনি অপ্রয়োজনে কোনো রং ব্যবহার করেছেন। একই রঙের অজস্র বৈচিত্র্য অনুসন্ধান তাঁর কাজের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। দৃশ্যগ্রাহ্যরূপ তাঁর লক্ষ্য ছিল না। প্রকৃতি বা বস্তুর অন্তর্নিহিত রূপ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি। ‘প্রকৃতির রূপরঙের নির্যাস প্রকাশই তাঁর উদ্দেশ্য, সাদৃশ্য নির্মাণ নয়।’ কিছু কিছু বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পী বিমূর্ত আদলের প্রতি এক ধরনের শান্ত-সমাহিত-মরমি দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেন। সেখানে বিষয় উপস্থাপনের কোনো প্রচেষ্টাই নেই। সব কাজ যেমন বিমূর্ত নয়, আবার সব কাজ প্রকাশধর্মীও নয়। কিন্তু সাধারণত যা বিশ্বাস করা হয়ে থাকে তা হলো, শিল্পীর যে স্বতঃস্ফূর্ততা তার কাজে লক্ষ্য করা যায় তা তার অবচেতন মন থেকে উৎসারিত। চিত্রের প্রকাশবাদী পদ্ধতি চিত্রটির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্জাকের ছবিতে এই বৈশিষ্ট্যটি ফুটে উঠেছে বলা যায়। বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিত্র স্বভাবগতভাবেই খুব সরল নয়। রাজ্জাকের ছবিকেও আমরা সেই অর্থে সরল বলব না। সবকিছু জ্যামিতিক শৃঙ্খলায় সাজানো নয়। অপ্রতিসম সুমিতি লক্ষণীয়। উজ্জ্বল ও চাপা- দুই ধরনের রঙই তিনি ব্যবহার করেছেন। লাল, কমলা ও হলুদের মতো উষ্ণ রঙ অপেক্ষা নীল, ধূসর ও সবুজের মতো শান্ত রঙ তিনি বেশি ব্যবহার করেছেন। বাগান, রচনা-১০, রচনা-৩২, প্রকৃতি ইত্যাদি ওই ধরনের আরো অনেক কাজে এটা লক্ষ্য করা যায়। একই রঙের ভিন্ন মাত্রা প্রয়োগ করে ছায়াদান করেছেন, আর তাতে মাত্রা ও গভীরতার বিভ্রম সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছেন। হালকা তুলির টানে চমৎকার বুনোট নির্মাণ করেছেন। ছবিগুলোর আলোর উৎস মনে হয় বাইরে। আর আকার ও শূন্যস্থান নিরূপণের সঙ্গে সঙ্গে ছায়াছবির নির্দিষ্ট অংশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং একটি বিশেষ আবহ বা ভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তেলরঙে করা মার্চ ২৬, ১৯৭১ ছবিটি ভয়ার্ত কালরাত্রির স্মৃতি তুলে আনে। খসখসে তুলির মোটা আঁচড়ে সাদা-কালোর অনিয়মিত আকৃতির বুনটে আতঙ্কিত কয়েকটি নারীমূর্তি। দুই রঙেই বৈপরিত্য তৈরির মাধ্যমে পরিপ্রেক্ষিতের বিভ্রম সৃষ্টি করেছেন। সাদা ব্যবহারের মাধ্যমে শূন্যস্থান নির্দেশ করে ফিগারের দূরত্ব বুঝিয়েছেন। ফর্ম নির্মাণে শরীরের দৈর্ঘ্যরে ওপর নির্ভর করেছেন। চোখে খুব আরাম না দিলেও ছবিটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর জলরঙের কাজগুলোর কথাও উল্লেখ করতে হয়। তবে ষাটের দশকে করা জলরঙ আর পরবর্তী সময়ে করা জলরঙের মধ্যে পার্থক্য আছে। ১৯৬৫ সালে করা টেকনাফ শিরোনামের ছবিটির বর্ণপ্রক্ষেপণ খানিকটা ইম্প্রেশনিস্ট ধারার, তবে এমন কাজ খুব বেশি নেই। ১৯৯৭ সালে করা সুন্দরবন-১, ২০০৪ সালে করা রিভার-১ শিরোনামের ছবিগুলোর সঙ্গে ওই সময়ের ছবির পার্থক্য সহজেই নজরে পড়ে।

আমেরিকায় গিয়ে ছাপচিত্রে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই মাধ্যমেও শুরুতে তাঁর কাজ বাস্তবধর্মী। তবে ধীরে ধীরে থিতু হয়েছেন সেই বিমূর্ত প্রকাশবাদে। ‘পঞ্চাশ দশকে মার্কিন ভ্রমণ তাঁকে মুখোমুখি করেছে এক সমস্যার : সাম্প্রতিক উদ্দেশ্যের সমস্যা। তিনি আস্তে আস্তে নির্বস্তুক প্রকাশবাদের কাছে আসেন।’ তাঁর এই উত্তরণ বা বিকাশকে শিল্পী রফিক হোসেন আবার অন্য দৃষ্টিতে দেখেছেন :

মাধ্যম, আঙ্গিক, ধারা ও ধরন ইত্যাদি বিষয়ে তিনি অন্তর্দ্ব›দ্ব ও উভয় সংকটের ভেতরে রয়েছেন। কি করা যায়, কোথা বা কোনদিকে অগ্রসর হওয়া যায় ইত্যাদি বিষয়ে তিনি অন্তর্দ্ব›েদ্বর টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছেন। অর্থাৎ এখনো পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন। অনিশ্চয়তার কারণে কখনো জয়নুল আবেদিনের অনুসরণ প্রবণতা, কখনো স্বতন্ত্র আঙ্গিক উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা, কখনো বাস্তববাদ আবার কখনো বিমূর্ত প্রকাশবাদের মধ্যে দোদুল্যমান হয়ে রয়েছেন। আর দোটানা মনোভাবের জন্যই কখনো জলরং, কখনো তেলরং, কখনো ছাপচিত্র আবার কখনো ভাস্কর্যের মধ্যে টানা-হ্যাঁচড়া চলছে। যে জন্য কোনো কোনো শিল্পসমালোচক তার কাজকে ‘বহুমুখীনতা’ আবার কখনো কখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলে অভিহিত করে থাকেন। বলাবাহুল্য, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখান থেকে এখনো পর্যন্ত বেশিদূর এগোতে পারেননি। তিনি প্রায় ষাট বছরে পৌঁছেছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছেন।

কী অদ্ভুত অবিমৃশ্যকারী মন্তব্য! একজন শিল্পী শুরুতে যে ধরনের কাজ করেন তা কি বিকাশের চূড়ান্তপর্বে একবারেই বিস্মৃত হন! অন্য ধারায় উত্তরণ ঘটলেও প্রাথমিক পর্যায়ে যেভাবে কাজ করতেন তার স্মৃতি কি মাঝে মাঝে তাকে উসকে দেয় না দুয়েকটা কাজ সেভাবে করতে? বাস্তবাবাদী ধারায় কাজ করতেন তিনি, সেখান থেকে বিমূর্ত প্রকাশবাদে তার উত্তরণ ঘটল। তার মানে কি বাস্তববাদী ধারা তাঁর জন্য একেবারে ব্রাত্য হয়ে গেল? এই সমালোচনাকে ঠিক গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হচ্ছে না এর মধ্যে বাস্তবতার নামগন্ধ নেই বলে।

পঞ্চাশের দশকে আঁকা দণ্ডায়মান মূর্তি, অনুশীলন শিরোনামের রেখাচিত্র, এনগ্রেভিং-এ করা আত্মপ্রতিকৃতি, মিশ্র মাধ্যমে নৌকা তৈরি, জলরঙে কক্সবাজার, ড্রাইপয়েন্টে মাথা শীর্ষক ছবিগুলোতে তাঁর মুন্সিয়ানা সকলের নজর কাড়ে। রেখাচিত্র ও প্রান্তরেখাচিত্র উভয়ের ক্ষেত্রেই পরিমিত রেখার টান শারীরস্থানের স্পষ্টতা ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৫১ সালে জলরঙে আঁকা নৌকা নির্মাণ, সদরঘাট ছবিটাতে রং-রেখা-আলোছায়ার সুসামঞ্জস ও পরিমিত ব্যবহার ছবিটাকে একটি বিশেষ দৃষ্টিগ্রাহ্যতা দান করেছে। হলুদ, তামাটে ও কালো রঙের ব্যবহার বাস্তবানুগ তবে ছাউনি চিত্রায়নের ক্ষেত্রে পরিপ্রেক্ষিতের খামতি রয়েছে, যদিও চট করে তা ধরা পড়ে না। অজস্র খুঁটিনাটি তুলে আনার ফলে সামগ্রিকভাবে তা নান্দনিক হয়ে উঠেছে। একটি বৃক্ষকে আলাদা করে দেখা আর অরণ্য দেখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তেমনি ছবিটি সমাগ্রিকভাবে উতরালো কি না সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

শিল্পী আত্মপ্রতিকৃতির ছাপচিত্র করেছেন একাধিক। কিছুটা অলঙ্করণ রয়েছে ছবি দুটোতে এবং মুখবায়বকে লম্বা করা হয়েছে। ড্রাইপয়েন্টে করা মাথা শীর্ষক প্রতিকৃতিটি একটি চমৎকার সৃষ্টি। সীমিত আঁচড় ও পরিমিত আলোছায়ার সমন্বয়ে এটা একটি উৎকৃষ্ট শিল্প নিদর্শন। এ রকম আরো ছবির উদাহরণ টানা যাবে যেখানে রাজ্জাকের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

এ দেশে ভাস্কর্যকলার পথিকৃৎ তিনি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে তাঁর নেতৃত্বে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভাস্কর্য বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর ভাস্কর্যেও সমানভাবে রয়েছে বিমূর্ত ও বাস্তবধর্মিতা। ফর্ম ইন উড, সিমেন্ট উড এন্ড ওয়েল্ডেড মেটাল, চুল আঁচড়ানো, রমণীর মুখ, মুক্তিযোদ্ধা তাঁর বিখ্যাত ভাস্কর্য। ব্রোঞ্জে করা রমণীর মুখ ভাস্কর্যের ভল্যুউম অমসৃণ, হালকা সিল্যুট ও ফর্মে রৈখিক উপাদান রয়েছে, পার্শ্বদৃশ্য, প্রকাশবাদী, কপালের নিচ থেকে মুখের অর্ধেকটায় আলো ফেলা হয়েছে, সজ্জাকরণ ব্যতীত বিশেষ কোনো আবেগ, ধারণা বা মূল্য তুলে ধরে না। ধাতু নির্মিত বিন্যাস ভাস্কর্যটি একটি বিমূর্ত সৃষ্টি। জ্যামিতিকতা রয়েছে, কৌণিক, আঁটসাট সিল্যুট, অলঙ্কারবর্জিত ও প্রকাশবাদী। ১৯৯৮ সালে ধাতু ঢালাইয়ে করা ক্যাকটাস ভাস্কর্যটিতে জ্যামিতি রয়েছে। কৌণিক, অমসৃণ, অলঙ্করণ নেই, সিল্যুট রয়েছে। বিশেষ কোনো আবেগকে ধারণ করে না। দৃষ্টিনন্দন সজ্জাপোকরণ। তবে ফরমায়েশি কাজ হলেও মুক্তিযোদ্ধা একটি উৎকৃষ্টমানের ভাস্কর্য। কংক্রিট ও হোয়াইট সিমেন্টে করা ৪২ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্যটি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি স্মারক। একহাতে রাইফেল ও আরেকহাতে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণের প্রতীক্ষায় নির্ভিক যোদ্ধা একাকী দাঁড়িয়ে। পায়ের নিচের দিকে সামান্য শারীরস্থানিক ত্রুটি গ্রাহ্য না করাই শ্রেয়। তল মসৃণ, প্রধান রৈখিক উপাদানগুলো ফর্মে পরিদৃষ্ট এবং প্রয়োজনমতো সিল্যুট রয়েছে। কিছু বাঁক মডলিং-এর মাঝেই অন্তঃস্থায়ী বৈশিষ্ট্যরূপে বিদ্যমান। এই ভাস্কর্যের মধ্যে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে রাঙালির আবেগ ও প্রেরণা। শুধু প্রকাশবাদিতা এর উদ্দেশ্য নয়।

পঞ্চাশ বছরের শিল্পীজীবনে তিনি ৮টি একক ও ৭৫টির মতো সম্মিলিত প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন যার মধ্যে আমেরিকা, ইরান ও তুরস্কে আয়োজিত একক প্রদর্শনীগুলো রয়েছে। আর দেশে আয়োজিত প্রদর্শনী ছাড়াও আমেরিকা, কানাডা, পাকিস্তান, ইরান, জাপান, হংকং, ভারত, মালয়েশিয়া, চিন, জিম্বাবে, বেলজিয়াম, জার্মানি ইত্যাদি দেশে তাঁর যৌথ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৬০ সালে তিনি সর্ব পাকিস্তান জাতীয় প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স মাধ্যমে কৃত শিল্পকর্মের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে ভাস্কর্যকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ সম্মাননা, ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা একুশে পদক এবং একই বছর জয়নুল আবেদিনের ৭৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর যশোরে একটি শিল্পকর্মশালা পরিচালনার সময় অকস্মাৎই এই কর্মীপুরুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শারীরিক মৃত্যু তাঁর জীবনের যতি টেনে দিলেও রেখে যাওয়া সৃষ্টিসম্ভারের মাঝে উত্তর প্রজন্মের জন্য রয়েছে অনিঃশেষ অনুপ্রেরণার উপাদান।

:: শরীফ আতিক-উজ-জামান

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj