সহযাত্রী : ফরিদা হোসেন

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

একটা প্রথম শ্রেণির কামরায় উঠে বসলো সবাই। সবাই বলতে ওরা পাঁচজন। ঢাকা-চট্টগ্রামের দুস্তর রেল ভ্রমণ। চমৎকার কাটবে।

হেনার ভাষায়।

: রিজার্ভেশন ছাড়া এনজয় করা যায় না।

বাই রোডেও যাওয়া যেত, গত বছরের মতো। সবার মতে অনেক দিন ট্রেনে চড়া হয়নি।

আর তাছাড়া দলেবলে ট্রেন জার্নির মজাই আলাদা। এর নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। গতি আছে। অন্তত টেনশনমুক্ত হয়ে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।

এসব সাত পাঁচ ভেবে পরিবারের সদস্যদের কথায় ট্রেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গৃহকর্তা হাসিব। বাইরের লোক থাকলে অস্বস্তি লাগবে। শুধু নিজেরা থাকলে শুয়ে বসে যুৎসইভাবে পারিবারিক আড্ডা দিয়ে যাওয়া যাবে।

একটু জোরে কথা বলার অভ্যেস ওদের প্রায় সবার। সবাই মানে হাসিবের স্ত্রী হেনা, হাসিব ও ছোট ভাই রাজিবের।

হেনা উচ্ছ¡সিত হয়ে বলল-

: বাহ! চমৎকার একটা পরিচ্ছন্ন আর নিরিবিলি কম্পার্টমেন্ট পাওয়া গেছে।

: রিয়েলি ভাবি সবই তোমার জন্য। ইউ আর গ্রেট ভাবি।

বাইরের দিকে দেখতে দেখতে বলল, ভার্সিটিতে পড়া হাসিবের তুখোড় ভাই রাজিব।

সবাই সব কিছু দেখেশুনে গুছিয়ে বসল। রুমটা বেশ বড়। রেল কর্তৃপক্ষের ভাষায় এটাকে কনফারেন্স রুম বলা হয়। দশ জনের সিট, এসি আছে। মেরুন ভেলভেট দিয়ে সিটগুলো মোড়ানো। দুটো আপার বার্থ, নিচে দুটো আট জনের টানা সিট। দুটো সিঙ্গল চেয়ার আর আছে একটি টেবিল। চমৎকার একটা ফ্যামিলি রুম।

গুলশানে থাকে বলে এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকেই উঠেছে ওরা। ট্রেনটা এখনই ছাড়বে।

এমনি সময় ডানদিকের আপার বার্থের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো দলের সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য মিঠু।

সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সেদিকে। দেখল আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে একেবারে দেয়ালের সাথে লেগে শুয়ে আছে কে একজন।

হেনা বলল-

: কি ব্যাপার রিজার্ভেশনে তো আর কেউ থাকার কথা নয়।

: তাই তো।

চিন্তিত হয়ে সাথে সাথে একজন টিটিকে ডেকে পাঠালো হাসিব।

একটু পরেই টিটি সাহেব এলেন হন্তদন্ত হয়ে।

সব শুনে অমায়িক হাসলেন তিনি। বললেন-

: এই রুমটায় স্যার দশজনের সিট। আপনাদের পাঁচ জনের জন্য দিয়েছি। আপনারা এর জন্য পেমেন্টও করেছেন স্যার।

: তাহলে।

আপার বার্থে শুয়ে থাকা মানুষটির দিকে দেখিয়ে টিটি বললেন-

: স্যার উনিও ফার্স্ট ক্লাসের সিটের প্যাসেঞ্জার। আর কোথাও একোমোডেট করতে না পেরে… আর তাছাড়া রাতে হলে আমরা হয়তো এলাও করতাম না। দিনে বলেই।

:স্যার প্লিজ। কোনোরকম অসুবিধে হলে আমরা তো আছি।

চলে গেলেন টিটি সাহেব।

এতক্ষণ জানালার ধারে চুপ করে বসে ছিল হেনার বোন মিলা। উষ্মা প্রকাশ করে বলল-

: হলো তো ! মন খুলে একটু কথাও বলতে পারবো না।

সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। কেউ কোনো উত্তর দিল না।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে।

সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ। মুড অফ হয়ে গেছে সবার।

এক সময় হাসিব বলল হেনাকে-

: কি হলো? আমার ওপর রাগ করে আছো কেন? আমি কি করলাম?

হেনা কোনো উত্তর দিল না।

হাসিব বলল-

: খাওয়া-দাওয়া কি এনেছো দাও। এগুলো কি দোষ করলো?

রাজিব তাকালো হেনার দিকে। তারপর মিলাকে বলল-

: কি হলো মিলা? বোনকে কষ্ট না দিয়ে নিজে একটু হাত লাগাও। নাও আমি তোমাকে হেলপ করছি।

কিছুক্ষণের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে গেল পরিস্থিতি।

বাড়ি থেকে কেউ নাস্তা খেয়ে আসেনি সকালে স্টেশনে আসার জন্য। টিফিন ক্যারিয়ার থেকে লুচি ভাজি, হালুয়া বের করল মিলা।

রাজিব চট করে একটা ডিসপোসিবল প্লেটে একটু খাবার নিয়ে বলল-

: ওয়াও ! কি ফ্লেবার…।

মিঠু আরেকটা প্লেট হাতে নিয়ে বলল-

: রাইট চাচ্চু। তুমি তো খাবার আগে ফ্লেবারেই সব বুঝতে পারো।

: ইয়েস।

বলে খেতে লাগল রাজিব।

হেনা এক সময় হাসিবকে বলল-

: ওপরের মানুষটিকে একটু ডাকো। আমরা সবাই খাচ্ছি।

হাসিব তাকালো আপার বার্থের দিকে।

রাজিব বলল-

: ওনার এতো আরামের ঘুম ভাঙানো কি ঠিক হবে?

হেনা বলল-

: আহা ডেকেই দেখ না।

রাজিব হাতের প্লেটটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ডাকল-

: এই যে ব্রাদার শুনছেন? ব্রেকফাস্টের টাইম ওভার হয়ে যাচ্ছে। ব্রাদার…

এবার নড়ে চড়ে উঠল ওপরের মানুষটি। বলল-

: আমাকে বলছেন ! কে আপনি?

রাজিব রাগে দাঁত মুখ খিচালো। তারপর কণ্ঠ মোলায়েম করে বলল-

: জি, আপনার সহযাত্রী স্যার।

: সহযাত্রী!

উঠে বসল লোকটি একটু কাত হয়ে। তারপর স্যরি বলে এক পাশের শিকল ধরে নেমে পড়লো।

মানুষটির দিকে তাকালো সবাই। শার্ট প্যান্ট পরা, একরাশ এলোমেলো চুল, উজ্জ্বল শ্যামলা রং, চমৎকার ব্যক্তিত্ব ভরা চেহারা।

হাসিব বলল-

: হ্যালো-

লোকটি হাসলো একটু। বলল-

: হ্যালো-

হেনা বলল-

: আসুন আমাদের সাথে একটু নাস্তা করুন।

লোকটি বলল-

: থ্যাঙ্কস, আমার শুধু একটু চা হলেই চলবে।

বিস্মিত সবাই।

তারপর ‘এক্সকিউজ মি’ বলে দরজাটা খুলে বাঁয়ে করিডোরে চলে গেল।

মিলা একটা সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল-

: ওম শান্তি।

রাজিব বলল-

: ওম শান্তি-এ্যা? কতোক্ষণ? তবে এতে আমার কোনো প্রবলেম নেই। মিঠু তোর আছে?

: মোটেই না। বরং নতুন নতুন মানুষদের সাথে গল্প করতে আমার খুব ভালো লাগে।

মিঠুর পিঠে চাপড় মেরে হাসল রাজিব। বলল-

: গুড।

লাইক চাচা লাইক ভাতিজা। কি বলিস?

: রাইট।

বলে আবার খেতে লাগল মিঠু।

একটু পরেই পরিপাটি হয়ে ফিরে এলো লোকটি। ঢুকেই বলল-

: আপনাদের অসুবিধে হলে আমি অন্য কোথাও বসে যেতে পারি।

আবার সবাই চাওয়া চাওয়ি করলো।

হেনা বলল-

: আসুন তো আগে একটু নাস্তা করে নিন।

একটা সিঙ্গেল চেয়ারে বসলো লোকটি।

হাসিব বলল-

: আমাদের পরিচয় পর্বটা আগে সেরে নেয়া উচিত।

কি বলেন-

: ও শিওর।

বলে হাসিবের দিকে হাত বাড়ালো লোকটি। তারপর বলল-

: আমি জাভেদ। জাভেদ চৌধুরী। ঢাকায় একটি কোম্পানির সাথে জড়িত।

: হাসিব। আমি হাসিব রায়হান, আমার স্ত্রী, শ্যালিকা, ছোট ভাই ও ছেলে। এ প্রথম চিটাগাং যাচ্ছি সপরিবারে।

হেনা বলল-

: প্লিজ একটু নিন।

: নো থ্যাংকস। শুধু একটু চা।

রাজিব এবার সোজা হয়ে বসল।

: শুনুন সাহেব শুধু এক কাপ চায়ের জন্যই কি আপনাকে এমন সুখ নিদ্রা হতে তুললাম? আমার ভাবির হাতের নাস্তা খেলে অনেক দিন মনে থাকবে।

: রাজিব, আমার ছোট ভাই, একেবারেই ক্ষ্যাপা।

বলল হাসিব।

জানালার ধারে বাইরে মুখ করে বসে ছিল মিলা। হেনার ডাকে মুখ ঘুরাতেই জাভেদের সাথে চোখাচোখি হলো। কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করল মিলা।

হাসিব খেয়াল করল ব্যাপারটা। পরিস্থিতি হালকা করার জন্য একটু হাসলো হাসিব।

: আমার ছোট গিন্নি মিলা। সাহিত্যের ছাত্রী।

রাজিব বলল-

: আমার ব্যাচ মেট।

জাভেদ হেসে বলল-

: সত্যি, আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম। আই থিঙ্ক ইউ আর এ রিয়েলি হ্যাপি ফ্যামিলি।

হাসলো হাসিব।

বলল-

: আলহামদুলিল্লাহ।

একটা ব্যাগ থেকে বই বের করল রাজিব। বলল-

: এক্সকিউজ মি। আমি একটু ওপর তলায় যাচ্ছি। এই বইটা শেষ না করলেই নয়।

আপার বার্থে উঠে গেল রাজিব, ঝুলতে ঝুলতে।

মিঠু আর বাকি থাকে কেন?

তারপর সে একটু ইতস্তত করে জাভেদকে বলল-

: আঙ্কেল আপনি কি আবার ওপরে শোবেন?

হাসলো জাভেদ। বলল-

: না না। আর দরকার হবে না। তখন তো ভোরে কমলাপুর স্টেশনে উঠতে হয়েছে। তাই-

: ওকে বাই।

বলে বাবার সহায়তায় ওপরে উঠে গেল মিঠু।

মিলা টিফিন ক্যারিয়ারগুলো গুছিয়ে ফেলল।

ট্রেন চলছে দ্রুত গতিতে।

মিলা পা গুটিয়ে বসেছে বাইরের দিকে মুখ করে।

উল, কাটা বের করেছে হেনা। কথার ফাঁকে ফাঁকে হাত চলছে।

দূরের মাঠ, ঘাট আর প্রান্তর ছাড়িয়ে ছন্দায়িত গতিতে ছুটে চলছে ট্রেনটা।

হাঁটুতে চিবুক রেখে বসে আছে মিলা। গুনগুন করে একটা গান ওর ভীষণ গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু…।

ওপর থেকে রাজিব বলল-

: পরিবেশটা কেমন গম্ভীর মনে হচ্ছে নাকি?

একটু চুপ করে থেকে আবার বলল-

: ট্রেন জার্নিতে মিলার গান কিন্তু দারুণ হয়। মনে নেই গতবার এসকারশনে…

মিলা অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করল রাজিবের দিকে।

একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল রাজিব। ‘স্যরি’ বলে আবার বইয়ে মন দিল রাজিব।

জাভেদ মিলার চরম ঔদাসীন্য লক্ষ করে বলল-

: সত্যি তাহলে কিন্তু সময়টা বেশ কাটতো।

লোকটার স্পর্ধা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল মিলা।

ওর বিস্মিত এবং বিরক্তিময় চোখ বারবার করে দেখলো জাভেদকে।

আশ্চর্য! লোকটির দৃষ্টি একেবারেই স্বাভাবিক।

কেমন যেন অপ্রস্তুত মনে করল মিলা নিজেকে।

তা দেখে ওপর থেকে মিটিমিটি হাসছিল রাজিব।

একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ দেখে জাভেদ একসময় বলল-

: এক্সকিউজ মি, মনে হচ্ছে আমার উপস্থিতি আপনাদের একটু বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। আমি বরং অন্য কোথাও গিয়ে বসি।

হাসিব বলল-

: না, না সে কি। অর্ধেক সময় তো পেরিয়ে গেছে। গল্প করতে করতে এ সময়টা পেরিয়ে যাবে। বসুন প্লিজ।

জাভেদ বুঝলো অত্যন্ত খানদানি লোক এরা।

প্রয়োজনে ভদ্রতার চরমে উঠতে পারে। গল্পের এক ফাঁকে হাসিব বলল-

: কি হলো ছোট গিন্নি এতো চুপচাপ থাকলে কি চলে। একটু কফিটফি হোক। খালিমুখে কি গল্প জমে। জাভেদ সাহেবের সাথে কথা বলতে কিন্তু আমার বেশ লাগছে।

মিলা কফি বানাতে বসলো। ওপর থেকে কৃত্রিম গলা খাকারি দিল রাজিব। মিলা তীর্যক দৃষ্টি হানলো ওর দিকে। অপ্রস্তুত হলো রাজিব। তাড়াতাড়ি বলল-

: বলছিলাম কি এক কাপ কফি কি এদিকে পাওয়া যাবে?

মিলা কোনো জবাব দিল না।

কফি বানিয়ে কাপটা ধরলো জাভেদের সামনে। জাভেদের মুগ্ধ দৃষ্টি স্থির হলো মিলার চোখের ওপর। হাতে ধরা কফির পেয়ালা।

হাসিবের চোখ ম্যাগাজিনের পাতায়।

ওপর থেকে আবার গলা খাকারি দিল রাজিব। তারপর বলল-

: কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

ঢোক গিলল মিলা।

জাভেদ কফির কাপটা হাতে নিয়ে বলল-

: থ্যাঙ্কস।

মিলা আরো কফি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

এক সময় ট্রেন ইন করল একটা স্টেশনে। ফেরিওয়ালা আর লোকজনের হাঁকডাকে সরগরম চারদিক।

: কোন স্টেশন এটা…?

হেনা বাদাম আর কচি পেয়ারা কিনলো ফেরিওয়ালার কাছ থেকে।

জাভেদ দরজা খুলে নেমে পড়ল হঠাৎ।

দেখলো মিলা।

: কি আশ্চর্য, নামছে কেন মানুষটা।

: একটু পরেই তো গাড়ি ছেড়ে দেবে। পাগল নাকি।

চারদিক তাকালো মিলার চোখ দুটো অস্থির হয়ে উঠল । একটু পরেই সিটি দিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করল। হেনা বলল-

: জাবেদ সাহেব তো এলো না।

: তাই তো, ট্রেন ছেড়ে দিল।

কেমন এক অস্থিরতায় ছটফট করতে লাগল সবার মধ্যে।

মিলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিতে লাগল অপরিচিত মানুষটির জন্য।

হেনা বলল-

: উঠতে পারলো তো লোকটা?

হাসিব বলল-

: উঠেছে নিশ্চয় কোথাও। ছেলে মানুষ তো আর নয়। অত ভাবনার কি আছে? এসে যাবে।

তবুও ধুকধুক করতে লাগল মিলার বুকের ভেতরটা। যে মানুষটির উপস্থিতিতে সবাই কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত বিব্রত ও অস্বস্তি বোধ করছিল এখন সে মানুষটির অনুপস্থিতি আবার সবাইকে আচানক দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল।

জানালার দিকে মুখ করে বসল মিলা। বার কয়েক তাকাল আপার বার্থে শোয়া রাজিবের দিকে।

আশ্চর্য!

কেমন ছেলে রাজিব? একটুও চিন্তা নেই। সাথের একটা মানুষ সময়মতো রুমে এলো না। একটু খোঁজ নিলেও তো পারে।

কিন্তু অপরিচিত মানুষটার জন্য মিলারইবা এরকম লাগবে কেন…?

কয়েক ঘণ্টারই তো পরিচয়। জাভেদের কিছুই তো জানে না সে। চেনে না।

কিন্তু মিলার হাত থেকে কফির কাপ নিতে গিয়ে কি রকম মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল জাভেদ ওর দিকে।

ভাবতেই বুকের ভেতরটায় কেমন যেন শিহরণ লাগে।

পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে উঠে দাঁড়ালো মিলা।

হেনা জিজ্ঞেস করল-

: কোথায় যাচ্ছিস?

: আসছি।

হেনা বলল-

: বেরিয়ে বাঁয়ে টয়লেট। সাবধানে যাস।

কোনো জবাব দিল না মিলা।

বেরিয়ে চিপা করিডোরের একটা জানলার ধারে এসে দাঁড়ালো। কেমন যেন অস্থির লাগছে ওর কাছে। আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল ট্রেনের গতি। দেখল লেখা আছে-

স্টেশনের নাম-‘বৈকল্যধাম’।

খুব বেশি লোকজনের সমাগম নেই। মনে হলো ছোট্ট স্টেশন। পুরোপুরি থামলো না ট্রেনটা, গতি কমতে কমতে আবার বেড়ে গেল।

মিলা তখনও দাঁড়িয়ে থাকলো। আশ্চর্য কোথায় গেল লোকটা। ওর ব্যাগটাও তো রুমে…

এমনি সময় পাশ থেকে কারো কণ্ঠ শুনে রীতিমতো চমকে উঠল মিলা। জাভেদ বলল-

: একা একা এখানে কি করছেন?

মিলা অস্থির কণ্ঠে হঠাৎ বলে ফেললো-

: কোথায় চলে গিয়েছিয়েন না বলে?

: জি …!

বিস্মিত জাভেদ।

অপ্রস্তুত মিলার মরে যাওয়ার অবস্থা হলো।

নিজের ওই ধরনের কথার জন্য।

বাঁ হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল অজান্তে।

জাভেদের বিস্মিত মুগ্ধ দৃষ্টি মিলার মুখের দিকে স্থির হয়ে গেল।

নিজেকে সামলে নিয়ে ভেতরে চলে এলো মিলা। এসে বসলো জানালার ধারে আগের নির্দিষ্ট জায়গায়।

রাজিব ততক্ষণে নেমে এসেছে নিচে। এসে বসল মিলার পাশে, একটা চুইংগাম দিল মিলার হাতে। বলল-

: খাও। মন ভালো থাকবে।

হেনা বলল-

: ওর আবার মনের কি হয়েছে। বরং আমাকে একটা দে বসে থাকতে থাকতে মেজাজটা আমার খারাপ হতে যাচ্ছে।

তাই দিল রাজিব। তারপর মিলাকে বলল-

: আর একটু নাস্তা হবে কি?

বার্গার, স্যান্ডউইচ অথবা আর কিছু? দেখ না মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড।

হঠাৎ রেগে গেল মিলা, বলল-

: আমি কখনও তোমার ফ্রেন্ড ছিলাম না।

আর তুমি কি আমার গুরুজন যে অর্ডার করবে?

অপ্রস্তুত হয়ে দু’কান ধরল রাজিব। বলল-

: স্যরি স্যরি আমি কেন তোমার গুরুজন হয়ে অর্ডার করতে যাব? তোমায় রিকোয়েস্ট করছি মাই ডিয়ার…।

মিলার অগ্নিদৃষ্টির সামনে থেমে গেল রাজিব।

টেনে টেনে বলল-

: মিলা।

দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে শুনছিল জাভেদ। হাসিমুখে ভেতরে এলো।

ওকে দেখেই হাসিব বলল-

: আরে সাহেব কোথায় চলে গিয়েছিলেন আপনি? খুব চিন্তা হচ্ছিল আপনার জন্য।

জাভেদ আড়চোখে তাকালো মিলার দিকে। তারপর হেসে বলল-

: কোথাও যাইনি তো এখানেই ছিলাম। এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল তাই…

হাসিব বলল-

: বসুন বসুন আরেক রাউন্ড কিছু খাওয়া যাক।

এবার রাজিব সবাইকে নাস্তা দিল।

হেনা বলল-

: খাওয়া সেরে সব কিছু গোছগাছ করে নাও। আর বেশিক্ষণ কিন্তু নেই। মিঠু আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো-

: সত্যিই মা?

হ্যাঁ বাবা, এখন একটু লক্ষী হয়ে বসো তো।

মিঠু বলল-

: ফুপ্পির মতো?

হাসির রোল পড়ে গেল সবার মধ্যে।

মিঠু অবাক হয়ে বলল-

: এতে হাসির কি হলো? সবাই তো ফুপ্পিকে লক্ষী মেয়ে বলে। বলে না কাক্কু? রাজিব বলল-

: বলে বাপ বলে। এখন থামতো।

থামলো মিঠু।

মিলা শেষবারে মতো কফি বানাতে বসলো।

কিছুক্ষণ আগে আরো দুই ফ্লাক্স গরম পানি দিয়ে গেছে বেয়ারা।

সবাই এক পাশে রাখা টেবিল থেকে কফির কাপ তুলে নিচ্ছে। জাভেদ একটু দূরে ছিল। হাত বাড়াতেই ওর দিকে এক কাপ এগিয়ে দিল মিলা। হাতে হাত লেগে গেল, দৃষ্টি অবনত।

: থ্যাঙ্কস-

বলে কাপটা নিলো জাভেদ।

এরপর সময় সংক্ষিপ্ত।

চট্টগ্রাম স্টেশন ছুঁই ছুঁই করছে ট্রেন। সবাই উঠে তৈরি হলো নামবার জন্য।

হাসিব এবং জাবেদ ভিজিটিং কার্ড বিনিময় করল।

জাভেদ বলল-

: থ্যাঙ্কস আতিথেয়তার জন্য। আবার কখনও দেখা হবে, চলি।

কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে নেমে পড়লো জাভেদ।

তারপর মিলে গেল স্টেশনের অসংখ্য মানুষের ভিড়ে।

হাসিবের পরিবার নামল ধীরেসুস্থে। এগিয়ে গেল সবাই।

স্টেশনে চাচাতো ভাই রিয়াদের গাড়ি ছিল এবং সেই গাড়িতে হাসিবের পরিবার যখন রিয়াদদের বাসায় পৌঁছলো তখন বিকেল প্রায় চারটা।

মিলা গাড়িতে ওঠার আগে চারদিকে একবার তাকালো আনমনেই। কাকে খুঁজলো? কেন খুঁজলো?

এটা কারো জানবার কথা নয়। ক্ষণিক পরিচয়ের, কয়েকটি মুহ‚র্ত, মৃগ্ধ দৃষ্টি বিনিময়ের ঘটনার কোনো অর্থই হয় না।

একেবারেই অযৌক্তিক।

মিলার অনাঘ্রাতা কুমারী হৃদয় আজ কেন বারবার উদাস হয়ে যাচ্ছে।

ওই মানুষটির অভিন্যস্ত চুলের ভাষা, ভাবময় দুটি চোখের মুগ্ধ দৃষ্টি, আর সেই কণ্ঠের সেই কথা ‘এখানে একা একা কি করছেন?’ যেন কাঁপন লাগিয়ে দিয়েছে মিলার বুকের ভেতরটায়।

কিন্তু কি করবে মিলা?

এই যুক্তিহীন ছেলেমানুষী ভাবনার মধ্যে অযথা আকণ্ঠ ডুবে থাকার তো কোনো মানে নেই।

খাবার জন্য ডাক পড়লো। সবাই বসলো। আরো অনেকেই ছিল টেবিলে। রিয়াদের অন্যান্য আত্মীয়স্বজন সবাই।

অনেকের সাথে পরিচয় হলো।

হাসিব আর হেনা বিশ্রামে গেল কিছুক্ষণের জন্য। হেনা তো বলেই ফেলল-

: চাচি পিঠটা একটু সোজা না করলে চলছে না।

চাচি : নিশ্চয় বৌমা। এতো লম্বা জার্নি করে এসেছো। সে কি আমি বুঝি না?

হেনাদের বিশ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে চাচি চলে গেলেন নিজের কাজে।

চট্টগ্রামের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাগুলো বেশ রাত করেই হয়। কখনও কখনও শেষ রাত পর্যন্ত চলে। রাতভর আনন্দে মেতে থাকে ছেলে বুড়ো সবাই। বনেদি পরিবারে চলে যেন মহাউৎসবের খেলা।

কাল বিয়ে রিয়াদের সবার ছোট বোন রুবার। পাহাড়ের ওপর এতো বড় বাড়িটা যেন মেতে উঠেছে জৌলুসে।

অনেক বড় ব্যবসা রিয়াদের বাবা জাফর সাহেবের। প্রচুর বিষয় সম্পত্তি। এতো বড় ব্যবসা সৌভাগ্যের বদৌলতে ফুলে-ফেঁপে বিশাল বিস্তৃতি লাভ করেছে দেশের চারদিকে।

জাফর সাহেব প্রচুর আত্মীয় সমাগমের ব্যবস্থা করেছেন।

রুবা এ বাড়ির সবার ছোট। এবং শেষ বিয়ে এ বাড়ির। জাফর সাহেবের পাঁচটা গেস্ট হাউস একটি হোটেল সব কটিই বরাদ্দ করা হয়েছে বাইরে থেকে আগত মেহমানদের জন্য।

কিন্তু হাসিবরা রয়েছে বাড়িতে। জাফর সাহেবের আপন ভাইয়ের ছেলে বলে কথা।

চট্টগ্রামের এ ধরনের বিয়ের পরিবেশের সাথে পরিচয় মিলা রাজিব দুজনের জন্যই প্রথম।

বিয়ের দিন

চিটাগাং ক্লাবে বিশাল আয়োজন হয়েছে অনুষ্ঠানের। প্রচুর অতিথির সমাগমে ঝলমল করছে চারদিক।

রঙিন আলোয় আর বাহারি পোশাকে অন্যরকম মনে হচ্ছে সবাইকে।

কনে রুবার পাশেই ছিল মিলা।

বেগুনি জারদোসি ও চুমকির কাজ করা শাড়ি, কপালে কাচপোকার টিপ আর বাহারি খোঁপায় এক থোকা বেলকুড়ির মালা।

গায়ের গোলাপি রং ওর, যেন গলে গলে পড়তে লাগল।

মিলার দিকে তাকিয়ে যেন চোখ ফেরানো যায় না।

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ।

বাকি আছে শুধু রসুমাত।

শুভ দৃষ্টি আর সঁপে দেয়ার পালা।

অনেক ভিড় ঠেলে অন্দর মহলে বর এলো এক সময়। ডায়াসে তখন কনে রুবার পাশে মিলা। এবং আরো কয়েকটি পরিবারের বাচ্চা।

অনেকের সাথে এগিয়ে এলো বর।

উঠে বসল ডায়াসে। বরের সাথে লোকটাকে দেখে বিস্মিত হোল মিলা। এতো ট্রেনের সেই লোকটাই, জাভেদ যার নাম।

দৃষ্টি সরিয়ে নিলো মিলা।

এক ফাঁকে জাভেদ সুযোগ বুঝে এলো মিলার কাছে। বলল-

: বরের ভাই আমি। অবহেলা করা চলবে না।

চোখ তুলল মিলা, চমৎকার মুখভঙ্গি করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল জাভেদের দিকে।

: আচ্ছা…।

এবার একটু হাসলো জাভেদ।

মুগ্ধ দৃষ্টিতে চমৎকার ভ্রæভঙ্গি করে বলল-

: দারুণ লাগছে কিন্তু। রিয়েলি, চোখ ফেরাতে পারছি না।

মরাল গ্রীবা ভঙ্গি করল মিলা। তারপর-

আড়াল হয়ে গেল অনেকের মধ্যে।

যাবার আগে দুটো মুগ্ধ চোখ দিয়ে অনেক খুঁজেছে জাবেদ মিলাকে। কিন্তু দেখা আর হয়নি।

ঢাকায় ফিরে আবার সেই একঘেয়ে রুটিন জীবন সবার।

হাসিবের অফিস, হেনার সংসার আর সোশ্যাল ওয়ার্ক, মিলা-রাজিবের ভার্সিটি এবং মিঠুর স্কুল।

এই হলো সবার রোজকার জীবন।

রোজই সকাল, দুপুর, সন্ধ্যে এবং রাত।

একদিন রাজিব বলল-

: আমি এ জীবন হতে বেরুতে চাই।

মিলা টিভি দেখছিল। একটা মজার সিরিয়াল। না শোনার ভান করল-

রাজিব আবার বলল-

: মিলা আমি সিরিয়াসলি বলছি।

এবার মিলা জবাব দিল-

: কি?

: আমি কিন্তু এখানে থাকবো না। বিদেশে চলে যাবো।

মিলা তেমনি অন্যমনস্কভাবে বলল-

: কবে যাচ্ছ। একটা গ্র্যান্ড ফেয়ার ওয়েল পার্টি দিতে হবে না?

রেগে গেল রাজিব।

: এ মুহূর্তে আমি কিন্তু ইয়ার্কির মুডে নেই মিলা। সিরিয়াসলি বলছি-

: পরীক্ষাটা দিয়েই বেরিয়ে পড়ব নিজের ভাগ্যান্বেষণে।

মিলা হেসে বলল-

: রিয়েলি?

উঠে দরজার সামনে গেল রাজিব। বলল-

: দেখে নিও।

নিজের ঘরে চলে গেল রাজিব।

এর কিছু দিন পর-

পরীক্ষা দিয়ে কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠলো রাজিব চাকরির সন্ধানে। হয়রান হয়ে গেল পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে।

এমনি একদিন-

অনেকগুলো পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখায় ব্যস্ত রাজিব। চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকলো মিলা।

এদিক সেদিক তাকালো তীক্ষè দৃষ্টি ফেলে।

তারপর বলল-

: খুব কি ব্যস্ত?

রাজিব চোখ না তুলেই জবাব দিল-

: দেখতেই তো পারছো।

মিলা বলল-

: চা এনেছিলাম তোমার জন্য।

: চা।

রাজিব সোজা হয়ে বসলো। বিস্মিত চোখে তাকালো মিলার দিকে।

বলল-

: চা ! তুমি এনেছো আমার জন্য?

এবার একটু হাসিমুখ করল মিলা। বসলো পাশের চেয়ারে। তারপর চায়ের কাপটা রাখলো রাজিবের সামনে।

জানালা দিয়ে তাকালো বাইরের দিকে। বলল-

: কেন? চা আনতে পারি না আমি তোমার জন্য। আফটার অল তুমি আমার…

: ব্যাচমেট।

বন্ধু নই। বল বল ঠিক কিনা।

মিলার মুখের কথা টেনে নিয়ে শেষ করল রাজিব।

: অকৃতজ্ঞ। না চাইতে চা এনে দিলাম, কোথায় থ্যাঙ্কস জানাবে তা না…

রাজিব এবার উঠে দাঁড়ালো। বলল-

: স্যরি স্যরি, রিয়েলি আই এ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি। কিন্তু ব্যাপারটা কি বলতো?

: কোন ব্যাপারটা?

: কোনো কারণ ছাড়া তো তুমি আমার ঘরে আসার মানুষ নও।

আবার বসলো মিলা।

বলল-

: তুমি দেশের বাইরে চলে গেলে আমার কি হবে বলতো-

: মানে…

: কার সাথে ঝগড়া করবো।

কপট রাগে বলল মিলা।

এবার হাসলো রাজিব। বলল-

: কেন তোমার বরের সাথে।

: বরের সাথে? বর পেলে কোথায় তুমি?

বিস্মিত হলো মিলা।

রাজিব বলল-

: হবে না? হবে তো।

ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ। কিছু দিনের মধ্যে হয়তো তোমার বিয়ে হয়ে যাবে।

তা কোথাও কিছু আছে টাছে নাকি?

: থাকলে তুমি জানতে না?

: তা বটে।

মাথা নেড়ে বলল রাজিব।

এবার একটু অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসলো রাজিব। বলল-

: আমার কিন্তু একজনের কথা খুব মনে হয়। আই মিন তোমার জন্যে একেবারে পারফেক্ট।

মিলা ভ্রæ কুঁচকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি দিয়ে তাকালো রাজিবের দিকে।

বিশেষ একটা মুখভঙ্গি করল রাজিব। তারপর বলল-

: বুঝতে পারছো না।

: না।

মাথা নেড়ে বলল মিলা।

এমনি সময় কলিং বেল বেজে উঠলো।

রাজিব উঠে দেখতে গেল, আসছি বলে।

দরজা খুলে দিয়ে আগন্তুককে দেখে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল।

: আপনি …?

তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ হবার চেষ্টা করে বলল-

: আপনি ! আমি ভাবতেই পারছি না।

: একটু হাসলো জাভেদ। বলল-

: ভাবতে পারেননি বলে ভেতরে আসতে বলবেন না?

নিজের মাথায় নিজে চাটি মারলো রাজিব।

: স্যরি। আসলে আমি একটা উজবুক। আসুন আসুন ভেতরে আসুন।

: প্লিজ বসুন।

ঘরের চারদিক দেখতে দেখতে ভেতরে এলো। এবং বসতে বসতে জাভেদ বলল-

: বাড়িতে আর কেউ নেই? একটা দাওয়াত দিতে ভাইয়া আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি নিজে আসতে পারেননি বলে ক্ষমা চেয়েছেন।

রাজিব উচ্ছ¡সিত হয়ে বলল-

: প্লিজ একটু ধীরে। আপনার সব কথা আমাকে একটু বুঝে উঠতে দিন।

এবার সোজা হয়ে বসলো। বলল-

: আমি কি আবার রিপিট করবো।

এর মধ্যে রাজিবের খোঁজে দরজায় এসে দাঁড়ালো মিলা।

কথার মধ্যে ওদিকে চোখ পড়তেই নিজের অজান্তেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওকে দেখলো রাজিবও।

অপলক বিস্ময়ে স্থবির হয়ে গেল যেন মিলা। ও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

এক সময় ধীর পায়ে এগিয়ে এলো মিলা।

হেসে সহজ হবার চেষ্টা করে জাভেদ বলল-

: আজকে এখানে আপনার দেখা পাব ভাবিনি।

মিলা কোনো জবাব না দিয়ে দৃষ্টি সরালো।

জাভেদ আবার বলল-

: যাই হোক, এসব কথার কোনো মানে হয় না। আসলে যে জন্য এসেছিলাম অর্থাৎ নতুন আত্মীয়তার সূত্র ধরে আগামী শুক্রবার আপনাদের সবাইকে ডিনারে ডেকেছেন ভাইয়া, ভাবি। হাসিব ভাই, ভাবি, সবাইকে।

: আর আমি।

কথার মাঝখানে বলে উঠলো রাজিব।

হেসে উঠলো জাভেদ ও মিলা।

একফাঁকে মিলা বলল-

: আমি আপনার জন্য চা নিয়ে আসি।

জাভেদ বাধা দিলো। বলল-

: নো থ্যাঙ্কস। আরেক দিন। অন্তত চায়ের বাহানায় আরেক দিন তো আসা যাবে।

রাজিব কেমন একটা ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো মিলার দিকে। তারপর বলল-

: তা বটে, তা বটে।

জাভেদ একটা কার্ড রাজিবের হাতে দিয়ে বলল-

: এ ঠিকানায় শুক্রবার সন্ধ্যে সাতটায়।

তারপর মিলার দিকে চেয়ে গভীর কণ্ঠে বলল-

: আসলে খুশি হব।

চলে গেল জাভেদ।

মিলা তেমনি দাঁড়িয়ে রইলো দরজার দিকে তাকিয়ে।

রাজিব বিশেষভাবে তাকালো মিলার দিকে তারপর বলল-

: কি হলো? কিছু বুঝলে?

: মানে?

তীর্যক দৃষ্টি হাঁকলো মিলা।

রাজিব দরজা বন্ধ করতে করতে বলল-

: এই যে, দাওয়াতের বিশেষ ধরন।

: যেমন?

: নরম গলায়… আসলে খুশি হবো। সুরে কেমন দখিনা বাতাস দোলা দেয় না কি মনে।

এবার রেগে উঠে দাঁড়ালো মিলা। বলল-

: তুমি না একটা অসহ্য। দেশ থেকে বিদেয় হলে আমি একটু শান্তিতে থাকতে পারবো।

: ওকে, ওকে।

বলে পাশের ঘরে চলে গেল রাজিব।

শুক্রবারের দাওয়াতে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো সবাই। হাসিব, রাজিব, মিঠু, সবাই একেবারে সপরিবারে।

হাসিবের চাচাতো বোন রুবা।

সদ্যবিবাহিত রুবার শ্বশুরবাড়ির দাওয়াত। একেবারে বেছে বেছে আত্মীয়-স্বজন দাওয়াত দিয়েছে ওরা।

বিশেষভাবে সাজলো হেনা। যতটুকুন আকর্ষণীয় করা যায় নিজেকে।

স্ত্রীর ওপর থেকে হাসিবের চোখ যেন আর সরে না।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো স্ত্রীর পেছন দিয়ে।

একটু রোমান্টিক মুখ ভঙ্গি করে বলল-

: আজ তোমাকে এই অপরূপা সাজে দেখে নতুন করে প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে আবার।

হেনা হেসে হাসিবের চোখে চোখ রাখলে। এবং বলল-

: বয়সের সাথে সাথে তোমার রোমান্টিকতাও যেন বেড়ে যাচ্ছে।

কি একটা বলতে যাচ্ছিল হাসিব।

এমন সময় দরজায় টোকা দিয়ে রাজিব এসে দাঁড়ালো দরজায়।

হাসিব ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল-

: কিরে তৈরি?

: জি ভাইয়া।

হাসিব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল-

: তাহলে আর দেরি কিসের।

তারপর একটু থেমে বলল-

: মিলা কোথায়?

রাজিব মাথা নিচু করে একটু ইতস্তত স্বরে বলল-

: ও যাবে না।

: হোয়াট! যাবে না মানে।

হেনা দু’পা এগিয়ে গেল দরজার দিকে-

: পাগল নাকি? যাবে না কেন?

রাজিব বলল-

: তোমার আহ্লদি বোনকেই জিজ্ঞেস করো।

হাসিব একটু উদ্বিগ্ন হয়ে স্ত্রীকে বলল-

: গিয়ে একটু দেখতো মিলার কি হলো?

এমনি সময় দরজার আড়াল থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এলো মিলা। চমৎকার পরিপাটি করে সাজগোজ করা।

ওকে দেখে সবাই অবাক।

হাসিব শ্যালিকার কাছে এসে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলে উঠলো-

: ওয়াও …!

এদিকে হেনা বিস্ময়ে বলল-

: তবে রাজিব যে বলল-

বিস্ময়ে হতবাক রাজিবও।

বলল-

: বিশ্বাস করো ভাবি আমাকে একটু আগেই বলল যে…

শেষ করার আগেই হাসিব ওকে থামিয়ে দিলো। কাছে গিয়ে ওর একটা কান মলে বলল-

: এতো বড় হয়েছিল বাদরামো একটুও কমেনি, না।

রাজিব কসরত করে নিজের কানটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-

: বিলিভ মি ভাইয়া, মিলাকে তো তুমি চেনো না।

হাসিব বলল-

: আমার ছোট গিন্নিকে আমি চিনি না।

: ভাইয়া-

: আর কোনো কথা নয়, চল সবাই।

মিলার চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ। রাজিবকে বকুনি খাওয়ানোটাই ছিল ওর প্রধান উদ্দেশ্য। দাওয়াতের বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা হয়ে গেল সবাই।

খাওয়া দাওয়ার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপা দুলাভাইয়ের জন্যে অপেক্ষায় রইলো মিলা। বাইরে চাঁদের আলোর প্লাবন। বাগানে বাতাসের চঞ্চল স্পর্শ।

এই একা দাঁড়িয়ে থাকায় যে ভালো লাগা, তার অনুভূতি অন্যরকম।

প্রশস্ত হলরুমের অনেক মানুষের উচ্ছ¡সিত হাসি আর কথা। হাই ভোল্টেজের ঝাড়বাতির মতোই ঝলমলে।

কিন্তু বাইরের বারান্দার পরিবেশটাই অন্যরকম।

কেমন জোছনা ভেজা হিম হিম আলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু যেন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল মিলা।

এক সময় কারো উপস্থিতি যেন সম্বিৎ ফিরে পেল।

পাশে দাঁড়িয়ে জাভেদ। বলল-

: এত আত্মস্থ হয়ে রয়েছিলেন যে, খুব ভালো লাগছিল দেখতে। ইচ্ছে করেই ডাকিনি। এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?

অপ্রস্তুত হলো মিলা। বলল-

: ও কিছু না। এমনি। ভেতরে বড্ড হৈচৈ তো তাই।

এমনি সময় মিলার খোঁজে বারান্দায় এলো রাজিব। এবং দুজনকে একত্রে দেখে বলল-

: স্যরি, আই এ্যাম রিয়েলি স্যরি। ডিসটার্ব করার জন্য।

জাভেদ বলল-

: মোটেই না। চলুন ভেতরে যাওয়া যাক।

ওরা তিনজন হলরুমে এলো। সেখানে অনেকেই তখন যাই যাই করছে।

এক সময় হাসিবের পরিবারও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো।

এর দিন কয়েক পর জাভেদের অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলো হাসিব ও হেনার কাছে।

শুনে মিলা মোটেই বিস্মিত হলো না। কারণ দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সূত্র ধরে এটা হওয়াই স্বাভাবিক।

মিলা কোনো মতামত দেবার আগেই একদিন রাতে ফোন করল জাভেদ।

মনে মনে জাভেদের উপস্থিতি ভালো লাগলেও এতোটা ভাবেনি মিলা।

জাভেদ বলল-

: অবাক হলেও আমি আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।

মিলা বিস্মিত হয়ে বলল-

: আমার সাথে আপনার কিসের কথা মিলা অস্থির কণ্ঠে বলল-

: কথা আছে মিলা, কথা আছে। দুই পরিবারে মধ্যে একটা সম্পর্ক হতে যাচ্ছে। আমি চাই আপনার সাথে বিশেষ কিছু জরুরি কথা বলতে।

মিলা প্রশ্ন করল-

: খুবই জরুরি?

: খুবই জরুরি। আজ বিকেলে আসুন না পাবলিক লাইব্রেরিতে। প্লিজ।

রাজি হলো মিলা।

পাবলিক লাইব্রেরির এক প্রান্তে দেখা হলো মিলা ও জাভেদের।

তখন বিকেল।

গোধূলির পড়ন্ত রোদের ঝিলিমিলি চারদিকে।

মিলা কোনো রকম ভণিতা না করেই সরাসরি প্রশ্ন করল জাভেদকে-

: কেন ডেকেছেন বলুন।

জাভেদ মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো মিলার মুখের দিকে।

বলল-

: আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে, আই মিন আমাদের বিয়ের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতে যাচ্ছে। ফাইনাল কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমি চাই আপনাকে কিছু জানাতে।

মিলা সরাসরি তাকালো জাভেদের দিকে। কিন্তু কোনো কথা বলল না।

জাভেদ একটা দীর্ঘশ্বাস চাপতে চাপতে বলল-

: আমি যখন আমেরিকায় এমবিএ শেষ করি তখন ওখানকার একটা বাঙালি মেয়ের সাথে আমার বন্ধুত্ব এবং পরে বিয়ে হয়।

: বিয়ে!

বিস্মিত মিলা।

: হ্যাঁ মিলা। রিয়া, অর্থাৎ সেই মেয়েটি, একজনের সাথে চ্যালেঞ্জ করে আমাকে বিয়ে করে।

: কি বলছেন আপনি?

: এবং বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবার আমাকে ছেড়ে চলে যায় তার আরেক বন্ধুর সাথে।

এটা ছিল রিয়ার এক ধরনের খেলা। বিদেশ অধ্যয়নরত বাঙালি ছেলেদের নষ্ট করবার একটা নেশা।

মিলা বিস্ময়ে হতবাক।

একসময় জাভেদের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন করল-

: আপনি কি নষ্ট হয়েছিলেন?

জাভেদ কেমন করে যেন তাকালো মিলার দিকে। তারপর অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল-

: নষ্ট হইনি বলেই কথাগুলো অকপটে আপনার কাছে বলতে পারলাম।

: আপনার পরিবার ঘটনাটা জানে?

: না।

: না!

আপনার জীবনের এতোবড় একটা ঘটনা আর বাড়ির কেউ জানে না? এটা আপনি আমায় বিশ্বাস করতে বলেন?

: বলিনি তো।

এখন জানানোটা জরুরি মনে করছি বলে প্রথমে আপনাকে জানালাম। পরিবার সময় মতো জানবে।

মিলা বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেল না।

জাভেদ এক সময় বলল-

: আমি মনে করি দুটি মানুষের বিবাহিত জীবন সততা এবং শুদ্ধতা দিয়ে শুরু হওয়া উচিত।

অনেক মানুষের জীবনেই বেদনাময় একটা অতীত থাকে। ইচ্ছে করলেই তাকে সহজভাবে নিয়ে সুন্দরতর করে তোলা যায়। সবই যার যার বৈচিত্র্যময় মানসিকতার ব্যাপার।

অন্তত আমি তাই মনে করি।

মিলার চোখে মুখে বিস্ময় না মুগ্ধতা কোনোটাই বোঝবার উপায় নেই।

জাভেদ ফেরার জন্য তৈরি হলো। গাড়ির চাবিটা বের করল পকেট থেকে।

গভীরভাবে তাকালো মিলার মুখের দিকে।

একটু হাসবার মতো মুখ করে বলল-

: একটা সত্যি কথা বলব? কিছু মনে করবেন না তো?

মিলা নীরবে মাথা নাড়লো।

জাভেদ তাকালো চারদিকে।

অস্থির আঙুল চালালো মাথার চুলো।

তারপর বলল-

: আপনাকে ভালো লেগেছে বলেই অকপটে এতোগুলো কথা বললাম। বলে, বুকের ভেতরে কুরে কুরে খাওয়া কষ্টটা লাঘব করার চেষ্টা করেছি শুধু।

কেমন যেন অশ্রæসিক্ত হয়ে উঠলো জাভেদের চোখ দুটো।

নিজেকে সামলে নিয়ে এবার বলল-

: অপ্রিয় কিছু বলে থাকলে ক্ষমা করে দিয়েন, প্লিজ।

আচ্ছা চলি।

রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল জাভেদ, একবারও পেছন ফিরে তাকালো না।

এক সময় ডাক দিল ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মিলা-

: জাভেদ।

চলতে চলতে থেমে গেল জাভেদ।

আবার ডাক।

: জাভেদ।

নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না জাভেদ। ঘুরে দাঁড়ালো এবার।

দেখলো কয়েক পা এগিয়ে এসেছে মিলা।

হাসিতে উজ্জ্বল ওর মুখমণ্ডল।

এগিয়ে এলো জাভেদের কাছে। মিলা নিজের একটা হাত এগিয়ে দিলো জাভেদের দিকে।

গম্ভীর কণ্ঠে বলল-

: আমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছেন?

আরো এগিয়ে এলো জাভেদ।

ও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

মিলা আবার বলল-

: কি হলো?

: মিলা…!

জাভেদ মিলার হাতটা ধরলো আবেগে। বলল-

: আমি বিশ্বাস করতে পারছি না মিলা।

আমি কিছুতেই …

মিলা অন্য হাতে জাভেদের হাতটা চেপে ধরলো।

বলল।-

: চলুন। বাড়ি যেতে হবে না।

ওরা দুজন এগিয়ে গেল। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj