শাহ সুজা ও পরীবানু : জামাল উদ্দিন

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

চট্টগ্রাম তথা কক্সবাজারের আঞ্চলিক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির সাথে রয়েছে বাংলার নবাব শাহ সুজার আরাকান গমন এবং আরাকান রাজার হাতে সুজা পরিবারের করুণ ঘটনার এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এককালে চট্টগ্রাম ও আরাকানের পল্লীগীতি, বারমাইস্যা, গ্রামীণ হঁলা ইত্যাদিতে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে গাওয়া হতো সুজাতনয়ার বিলাপ, পরীবানুর হঁলা ইত্যাদি।

আরাকান গমন শুধু একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা নয়, আমাদের লুপ্ত ইতিহাসের আলোক মশাল হিসেবেও এ ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও চট্টগ্রাম তথা কক্সবাজার এমনকি আরাকানের বিভিন্ন মুসলিম এলাকায় অনেক পরিবার নিজেদের শাহ সুজার সফরসঙ্গীর বংশধর বলে দাবি করে থাকেন। যে কারণে কক্সবাজার ও আরাকানের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে শাহ সুজার ও তাঁর স্ত্রী পরীবানুর অনেক স্মৃতি।

১৬৬০ সালে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা আপন ভাই আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিশাল সেনাবাহিনীসহ আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী দেশ আরাকানের বন্দর শহর চট্টগ্রামে। শাহ সুজার চট্টগ্রাম গমন ও চট্টগ্রাম থেকে আরাকানের রাজধানী ম্রোহং-এ গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হওয়া, অপরদিকে তাঁর বিশাল মোগলবাহিনীর রামুতে দুর্গ স্থাপন, রামু থেকে আলীকদমে গমন অতঃপর তাদের ভাগ্যের বিপর্যয় এবং বার্মা থেকে বিতাড়িত উপজাতীয় চাকমাদের সাথে সমাজবদ্ধ হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক ইতিহাস। ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম কক্সবাজারের ইতিহাস গ্রন্থে শাহজাদা সুজা প্রসঙ্গে বলেছেন, সুজা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন দেয়াঙে পৌঁছেন। অতঃপর ৩০ রমজান ১০ জুন ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে দেয়াঙে রমজানের ঈদের নামাজ আদায় করেন। কক্সবাজার সীমান্তে থাকতেই কুরবানির ঈদ এসে যায়। ১৬৬০ সালের ১৭ আগস্ট ছিল ১০ জিলহজ (কুরবানির ঈদ)। ২৬ আগস্ট তারিখে আরাকানের রাজধানীতে পৌঁছার পূর্বে ১৭ আগস্ট তারিখে কুরবানির ঈদের নামাজ কক্সবাজারে পড়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এ কারণে চকরিয়ার দুটি স্থানের নামকরণ ঈদগড়, ঈদগাহ হয় বলে মন্তব্য করেন।

এই সময় সুজার সাথে ছিলেন সেনাপতি ফতে খাঁ, শেরমস্ত খাঁ, গোলাম হোসেন খাঁ, শের জব্বার খাঁ, নুরুল্লা খাঁ, শের দৌলত খাঁসহ ১৮ জন সেনাপতি ও সাড়ে চার হাজার মোগলযোদ্ধা এবং তাঁদের ব্যবহৃত কামানসহ বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র, যুদ্ধহস্তি, অশ্বারোহী সৈনিক। এছাড়া সাথে ছিল শাহ সুজার অনুগত বিশাল সৈয়দ দল। তাঁদের মধ্যে সৈয়দ আলম বাদহকাশ, সৈয়দ কুলী উজবেগ, বাড়িহার সৈয়দ দল, ১২টি উট বোঝাই ধনরতœ, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও নিকট আত্মীয়সহ প্রায় অর্ধলক্ষাধিক অনুগত বাহিনী। এই দুঃসময়ে শাহ সুজার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন তাঁরই পীর হাফেজ খান মজলিসসহ ২২ জন উচ্চপদস্থ আলেম। পীর হাফেজ খান ছিলেন শাহ সুজা দরবারের অন্যতম সভাসদ। অধিকন্তু তিনি বিচার বিভাগীয় প্রধান বিচারপতি ‘কাজী-উল-কুযাত’ এর উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকগীতি ‘পরীবানুর হাওলা’য় শাহজাদা সুজা দেয়াঙ থেকে স্থলপথে আরাকান যাওয়ার কথা উচ্চারিত হয়েছে। রেনেল (জবহবষষ) এর মানচিত্রে আরাকান সড়কের এ অংশ থেকে রামু পর্যন্ত একটি সড়কের চিহ্ন দেখানো হয়েছে, যা বর্তমান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক হিসেবে চিহ্নিত। এ সড়কের কিছু অংশ পাহাড়ি অঞ্চলের অভ্যন্তরে ভাগ হয়ে অতিক্রম করেছে। বার্মা ইতিহাসবিদ নামে খ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক ফিয়ারি (চযধুবৎব) এবং স্টুয়ার্ট (ঝঃবধিৎঃ) উভয়ে একমত হন যে, শাহজাদা সুজা, তাঁর পরিবার এবং সহযোদ্ধা মোগলবাহিনী দক্ষিণ চট্টগ্রামে পাহাড়ি দুর্গম পথ অতিক্রম করে নাফ নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেখানে সুজা তিনদিন পর্যন্ত বিশ্রাম নেন।

রামুর ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা গবেষক আবুল কাসেম শাহজাদা সুজার সহযোদ্ধা সেনাপতি গোলাম হোসেন খাঁ’র ডায়েরির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ঐ সময় সুজার সাথে বিশাল মোগল সেনাবাহিনী ছিল। দেয়াঙ থেকে দু’দলে বিভক্ত অগ্রগামী সেনাদলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান সেনাপতি ফতে খাঁ, সেনাপতি শেরমস্ত খাঁ ও ডায়েরির লেখক সেনাপতি গোলাম হোসেন খাঁ। এই অগ্রগামী দল অরণ্যপথে ২২ হাত চওড়া একটি সড়ক নির্মাণ করেন। রামুর ঈদগড়, গর্জনিয়া, বড়বিল, কচ্ছপিয়া হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথে নির্মিত সড়কটির নামই সুজা সড়ক।

সড়কটির অস্তিত্ব এখনো আছে। সড়কটি নির্মাণ শেষে সেনাপতিরা রামুর পুরনো ডাকবাংলো এলাকায় আস্তানা স্থাপন করেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য সেনাপতি ফতে খাঁ, গোলাম হোসেন খাঁ ও শেরমস্ত খাঁ দরবেশের ছদ্মবেশে গোপনে রামকোটে মগরাজার দরবারে হাজির হন। উদ্দেশ্য মগরাজার শক্তি সামর্থ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং পশ্চাৎ অনুগামী আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নাফ নদী পার হওয়ার ব্যবস্থা করা। কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে সেনাপতিরা শিকলঘাটের চেকপোস্ট হয়ে বাঁকখালী নদী পার হয়ে মগদের শক্তি-সামর্থ্য দেখে বুঝলেন এই পথে নাফ নদী পার হয়ে আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গ যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ডুলাহাজরা ফিরে গিয়ে শাহজাদা সুজাকে সড়কপথেই যাত্রা শুরুর ইঙ্গিত প্রদান করলেন। এ প্রসঙ্গে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেন, শাহজাদা সুজা আরাকানের রাজধানীতে পলায়নকালে সকলকে বিদায়পূর্বক কতিপয় ঘনিষ্ঠজনকে সাথে নিয়ে নাফ নদী পার হয়ে আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গ পৌঁছেন ১৬ আগস্ট ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে। তাতে ধারণা করা যায় যে, শাহজাদা সুজার সহযোদ্ধা বিশাল সেনাবাহিনীর আরাকানের রাজধানীতে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সৈয়দ আলী আহসান তাঁর রচিত ‘পদ্মাবতী’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, শাহ সুজা বাংলা ছেড়ে পলায়নকালে তাঁর সঙ্গে ১৫০০ অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। মীর জুমলা যখন অনুসরণ করছিলেন তখন শাহ সুজা ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করে রাঙ্গামাটি পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করেন। দুর্ভেদ্য পার্বত্য অঞ্চল অতিক্রম করে মাত্র ৪০ জন অনুচর ও দু’শজন দেহরক্ষী সাথে নিয়ে শাহ সুজা তাঁর স্ত্রী, তিন কন্যা এবং এক পুত্রকে নিয়ে গর্জনিয়া হয়ে আরাকান সীমান্তের ওপারে টোয়াটঙ (ঞধিঁঃধঁহম) গিয়ে পৌঁছেন এবং সেখান থেকে আরাকানের রাজধানী পৌঁছেন। শাহজাদা সুজা রাজধানীতে পৌঁছলে আরাকানের রাজসৈন্যরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানায় এবং রাজা ‘চন্দ্রসুধর্ম্মা’ যথাসময়ে শাহ সুজার মক্কা গমনের প্রতিশ্রæতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

শাহজাদা সুজা আরাকানের রাজধানীতে পৌঁছলেও সেনাপতি ফতে খাঁ, শেরমস্ত খাঁ ও গোলাম হোসেন খাঁ, শের জব্বার খাঁ, নুরুল্লা খাঁ, শের দৌলত খাঁ, সৈয়দ আলম বাদহকাশ, সৈয়দ কুলী উজবেগ, বাড়িহার সৈয়দ দল, সাড়ে চার হাজার মোগল সৈনিকসহ বিভিন্ন স্তরের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিশ্চয়তার মধ্যেও রামুর রাজারকুল, সিপাহিপাড়া ও ফতে খাঁ’র কুল নামক স্থানে দুর্গ স্থাপন করে অপেক্ষায় থাকেন। আরাকানের রাজধানীতে শাহজাদা সুজা ও তাঁর নিকটজনদের প্রতি রাজা চন্দ্রসুধর্ম্মার মহানুভবতা ও সহৃদয়তার কথা অনেক ঐতিহাসিকের গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে যে, সুজা ও তাঁর নিকটজনদের জন্য মগরাজা একটি সুন্দর দালান বানিয়ে দিয়েছিলেন, সুজা তথায় কিছুকাল শান্তিতে পরিবার পরিজনসহ বসবাস করেন। শাহ সুজা যখন আরাকানে আশ্রয় নিয়েছেন তখন কবি আলাওল ফারসি কবি নিজামীর হপ্তপয়কর কাব্যের অনুবাদ করেন (১৬৬০ খ্রি.)। উক্ত কাব্যে কবি আরাকানরাজ শ্রী চন্দ্রসুধর্ম্মার গুণ বর্ণনা করে বলেছেন-

দিল্লীশ্বর বংশ আসি যাহার শরনে পশি

তার সম কাহার মহিমা।

এতে ধারণা করা হয় যে, শাহ সুজা আরাকানের রাজধানী গমনের প্রথম ভাগেই কবি এ গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী জীবনের ঘটনাবলী অস্পষ্টতার ঘনকুয়াশায় আচ্ছন্ন। বিভিন্ন লেখক শাহজাদা সুজার আরাকান আশ্রয়কাল সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেন। কেউ কেউ বলেন যে, আওরঙ্গজেবের নির্দেশে সেনাপতি মীর জুমলা আরাকানের রাজাকে সুজা এবং তাঁর পরিবারবর্গকে মোগল সম্রাটের হাতে প্রত্যার্পণের প্রতিদানে ১২ হাজার মুদ্রা দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

ঠিক ঐ সময়ই আরাকানরাজের বন্ধুত্বপূর্ণ সহায়তায় সুজার মক্কা গমনের প্রায় সমস্ত ব্যবস্থাই সমাধা করা হলেও সুজার সঙ্গে আনীত ১২টি উট বোঝাই ধনরতœ ও মীর জুমলার প্রতিশ্রæত টাকার লোভে পড়ে আরাকানরাজ তাঁর বন্ধুত্বের কথা ভুলে গিয়ে সুজার শত্রুতে পরিণত হলেন। সুজার এ অসহায়ত্বের সুযোগে আরাকানরাজ সুজার কন্যাকে বিবাহ করারও প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে সুজা ক্রোধে ফেটে পড়েন। বিশ্বাসঘাতককে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার মানসে সুজা মগরাজাকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের জাল ফাঁদেন। আরাকান গমনকালে তাঁর সহচর স্বল্প সংখ্যক মোগল সৈন্য এবং আরাকান সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত কিছুসংখ্যক মুসলিম সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মগরাজাকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখলের কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সে চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ তাঁদের পরিকল্পনা ছিল ত্রুটিবহুল। ষড়যন্ত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়নি, তা দ্রুত রাজার কানে গিয়ে পৌঁছে। আরাকানরাজ নির্মম হস্তে এ বিদ্রোহ দমন করতে অগ্রসর হন। আরাকানি সৈন্যরা রক্তপিপাসু ব্যাঘ্রের ন্যায় বিদ্রোহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এ সময় মুসলিম বিদ্রোহীরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা রাজধানীতে আগুন লাগিয়ে নিকটবর্তী বনে পালিয়ে যায়। পরে অবশ্য রাজার সৈন্যদের হাতে গ্রেপ্তার হয়। অধিকাংশ লোককেই আরাকানি সৈন্যরা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। যারা রক্ষা পায় তারা পরে আরাকান রাজার দেহরক্ষী সৈন্যরূপে নিযুক্ত হয়। ধনুকের ফারসি নাম ‘কামান’। এ নামে ধনুকধারী মোগল দেহরক্ষীদের ‘কামাঞ্চি’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে সুজার ভাগ্যে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল তা কোনো ঐতিহাসিকই সঠিকভাবে বলতে পারেন না। কেউ বলেন, পলায়নকালে সুজা বনেই নিহত হন, কেউ বলেন, জঙ্গল হতে ধরে এনে সুজার শিরñেদ করা হয়। কারো মতে, সুজাকে বস্তাভর্তি করে সাগরে ডুবিয়ে মারা হয়। যা হোক, বিদ্রোহীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর সুজা সম্পর্কে আর কোনো উল্লেখযোগ্য কথা শোনা যায় না। সশস্ত্র বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার পর সুজার পরিজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তাও বিতর্কমুক্ত নয়। গবেষক ও ঐতিহাসিকরা এ সম্পর্কে নানা মত পোষণ করেন। আরাকানে প্রচলিত কাব্য ও প্রবাদ ইত্যাদি পাঠে হার্ভে, মি. যান শোয়েবু এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, হতভাগ্য সুজাকন্যাদের অন্তঃপুরে বন্দি করা হয়। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে সুজার পুত্রগণ ‘কামাঞ্চি’ এবং অন্যান্য মুসলমানদের সাহায্যে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার মনস্থ করেন। কিন্তু এ খবরও অচিরেই রাজার কানে পৌঁছে। ফলে সুজার পুত্র এবং কন্যাগণকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে হয়। নিহত শাহজাদিদের মধ্যে একজন আসন্নপ্রসবা ছিলেন। অপর একদল ঐতিহাসিক এ মত পোষণ করেন যে, সুজার মৃত্যুর পর বড় দু’শাহজাদি ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যা করেন। কনিষ্ঠ শাহজাদিকে বলপূর্বক বিশ্বাসঘাতক রাজা চন্দ্রসুধর্ম্মা অন্দরমহলে নিয়ে যান। কিন্তু সন্তানসম্ভবা শাহজাদিকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এভাবেই তাজমহল নির্মাতা দিল্লির সম্রাট শাহজাহানের পুত্র নবাব সুজার বংশ আরাকানের রাজধানীতে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করে।

শাহজাদা সুজার সাথে যোগাযোগ থাকার সন্দেহে রোসাঙ্গে বসবাসকারী মুসলমানদের ভাগ্যেও নেমে আসে চরম বিপর্যয়। আরাকানে বহু মুসলমান নিহত ও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়। আরাকানের মুসলিমের ওপর চলতে থাকে অত্যাচার ও নিপীড়ন। তেমনি নিপীড়িত হয়েছিল রোসাঙ্গ প্রবাসী বাঙালি মুসলিম কবি আলাওল।

কবি আলাওল তাঁর ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’ কাব্যের শেষার্ধে এবং ‘দারা-সেকান্দর নামা’য় সুজার বিপর্যয়ের কাহিনী উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, মির্জা নামের এক ব্যক্তি, যে সম্ভবত শাহ সুজার সমর্থকদের মধ্যে ছিল, শাহ সুজার হত্যার পর আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আলাওলের ওপর অপবাদ দেয়। এ অপবাদের কারণে বিনা বিচারে কবি আলাওল কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন এবং ৫০ দিন কারাগারে কাটান। অবশেষে তিনি কারামুক্ত হন এবং মির্জা শূলবিদ্ধ হয়। শাহ সুজার মৃত্যুর ৯ বছর পরে ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে কবি তাঁর ‘সয়ফুল মুলুক’ কাব্য রচনা করেন।

আরাকানে আশ্রয়ের ৬ মাসের মধ্যে শাহ সুজার নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবার পর রামুতে অবস্থানরত বিশাল মোগলবাহিনীর ভাগ্যে কী পরিণতি হয়েছিল এ সম্পর্কে ইতিহাস অস্পষ্ট। ধারণা করা যায় যে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রামুতে অবস্থানরত মোগল সৈন্যদের মধ্যে স্বভাবতই উত্তেজনা দেখা দেয় এবং সেখানকার দুর্গের মগ সৈন্যের সাথেও তাদের মরণপণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অবশেষে নিরাপত্তাজনিত কারণে মোগলযোদ্ধারা রামু ত্যাগ করে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পূর্বে তৈনছড়ি নদীর তীরে গভীর অরণ্যে গিয়ে পুনরায় দুর্গ স্থাপন করে এবং সেখানেই বসবাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সময় মোগলযোদ্ধাদের সহযাত্রী হয় আরাকান থেকে বিতাড়িত রামুর চাকমারকুলের উদ্বাস্তু চাকমারাও। গভীর অরণ্যে এই জুমিয়া চাকমাদের সহযোগে মোগলযোদ্ধারা গড়ে তোলে এক ভিন্ন প্রকৃতির সমাজ। এই জনপদেই নারীবিহীন মোগলযোদ্ধাদের অনেকেই চাকমা তথা উপজাতীয় রমণীদের সাথে একে একে প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়ে শুরু করে সংসার জীবন।

দক্ষিণ চট্টগ্রামে জনপ্রিয় গীতিকায়

সুজাতনয়ার বিলাপ ও পরীবানুর হঁলা

সেকালের এক গায়েন অন্তরের দরদ উজাড় করে ব্যক্ত করেছেন সুজা-পরীবানুর ভাগ্য বিড়ম্বনা ও মৃত্যুবরণের কাহিনী এবং হতভাগ্য রাজকুমারী সুজাতনয়ার বিলাপ। মূল ঘটনার সাথে ঐ পল্লীগাথার সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য কতটুকু আছে বা নেই তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বৃথা। কারণ কবি এখানে রচনা করেছেন কাব্য। বলে রাখা দরকার, কাব্য ইতিহাস নয়, কিন্তু কাব্য থেকে খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের অনেক তথ্য-উপাত্ত। সুজা ও পরীবানুর কাহিনী ও সুজাকন্যার বিলাপ পাঠে আমরা জানতে পারি অনেক অজানা তথ্য-উপাত্ত। এখানে পরীবানুর হঁলা ও সুজাতনয়ার বিলাপের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

সাইগরে ডুবালি পরীরে।

হায়! হায় দুখ্খে মরিরে \

বার বাংলার বাদশা সুজা রাজ্যের শেষ নাই

বাপের দিন্যা তক্তের লাগি করিল লড়াই

মার পেডর ভাই রে হৈল কাল পরানের বৈরীরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

ভাইয়ে চাইলো ভাইয়ের লউ (রক্ত) মিছা রাজ্যের লাগি।

গরীবগুইন্যা বেশী বালা যারা খায় মাগি \

কিসের রাজ্য কিসের ধন কিসের টাকা কড়িরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

সুজা বাদশার আওরাত (স্ত্রী) পরীবানু নাম।

চাডিয়াতে (চট্টগ্রামে) আসি তাঁরা বদরের মোকাম \

বহুত খয়রাত সোনা দিলা ভরী ভরীরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

নসিবের লেখা কভু না যায় খণ্ডন

চাডিয়া ছাড়িতে বাদশা করিল মনন \

দক্ষিণ মিক্যা (দক্ষিণ দিকে) আইল তারা হাতির পিঠে চড়িরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

মধ্যে বসে সুজা বাদশা বামে পরীজান

ডানে দুই কন্যা যেন পূর্ণিমারই চান \

ধীরে ধীরে যায় তারা মুড়ার পথ ধরিরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

কোন দিগ্দি কণ্ডে যাইব নাইরে ঠিকানা

কেহ দিল পন্থ দেখাই কেহ করে মানা \

ধীরে ধীরে যায়রে তাঁরা মুড়ার পথ ধরিরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

বড় বড় দইরগ্যা (দরিয়া) পাইবা গেলে তারপর

ডঅর ডঅর (বড়) আছে কুমির ও হাঙ্গর \

কনে (কে) দিব তানরারে দইরগ্যা পার করিরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

ন যাইও ন যাইও পরী মইগ্যা রাজার দেশে

ধন দৌলত হারাইয়া জান দিবা শেষে \

দইন মিক্যা না যাইও পরী পন্থ করিরে –

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

ন যাইও ন যাইও পরী মুরুংগ্যার ঠাই।

মাইনসের গোস্ত খায় তারা হিজাই হিজাই (সিদ্ধ) \

মানা করি যাইতে আমি রে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

পশ্চিম মিক্যা ন যাইও সাগরের পারে

আমার কথা মনে রাইখ্যো কহি বারে বারে \

হার্মাদ্যারা লৈয়া (নিয়া) যাইব গলাৎ বাঁধি দড়িরে-

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

ভোগালুরা (ক্ষুধার্থ) ভাত চায় তিয়াসীরা (তৃষ্ণার্ত) পানি

পানিরে পাইলে নদী বুকে লয় টানি \

মনরে আমি কেমনে বুঝাইরে –

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

বাদশার মুখের পানে রইলো পরী চাহি

মাঝ দরিয়ায় চলে সুজা নৌকা বাহি বাহি \

হাত নাহি চলে, অঙ্গ কাঁপে থর থরিরে

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

আছমানে উডিল সুরুজ (সূর্য) বরণ তার লাল

পরীর মুখ চাহি সুজা সাইগরে দিল ফাল (লাফ)

ওরে দেখা নাই সে গেল আর সেই ছোট তরীরে

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

ডুবিল ডুবিল নৌকা সুজা-পরীজান

দরিয়ার মাঝে হায় দিলরে পরাণ

মরণেও রৈল তারা বুক জড়াজড়ি রে

সাইগরে ডুবালি পরীরে \

দ্বিতীয় পালাগানটিরও প্রচলিত নাম সুজাকন্যার বিলাপ। মগরাজা সুজার সাথে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ তার জ্যেষ্ঠ কন্যাকে রাজবাড়িতে বেড়ানোর (নাইওর) প্রস্তাব দেয়। কন্যা মগরাজার বাড়িতে কিছুতেই যেতে চায়নি। কিন্তু তার কথা পিতা-মাতা কর্ণপাত করেননি। সুজাকন্যা মগরাজার বাড়িতে গেলেই তাকে বন্দি করে রাখে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মগরাজার সাথে শাহ সুজার তীব্র মনোমালিন্যের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনা এমনই দাঁড়ায় যে, মগরাজা শাহ সুজার সমস্ত মণিমুক্তা, ধনরতœ কেড়ে নেয়। শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। অতঃপর সুজা ও পরীবানু সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সুজার অপর কন্যাকেও মগসৈন্যরা হত্যা করে। বন্দিনী সুজাকন্যা পিতামাতা ও বোনের জন্য করেছেন বিলাপ, আর নিয়তির অমোঘ বিধানকে দিচ্ছেন ধিক্কার। অজ্ঞাতনামা কবি এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সঙ্গীতমালার সৃষ্টি করেছেন তা যেমনি করুণ, তেমনি মধুর। এই গীতিকাদ্বয় হৃদয়ঙ্গম করতে গিয়ে আমাদের প্রথমত মনে পড়ে এ বিশ্বসংসারে কোনো কিছুই অবিনশ্বর নয়, টাকা-কড়ি, ধন-দৌলত সব ‘ভোজের বাজিতে’ পরিপূর্ণ। এ সংসারে মিছারাজ্য, মিছাধন, মিছা টাকাকড়ি।

দ্বিতীয়ত আমাদেরকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় সুজাকন্যার বিলাপ – “রাতে দিনে চোখের জলে বালিশ ভিজাই আমি” – এমনই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পাষাণের চোখেও জল এসে যায়।

“নছিবে এ কি ছিল রে\

কি নাইয়র করালি মা-বাপ, ঠেকলাম মগ্যার হাতে।

এত দুক্ষ খোদা মোর লেখিলা বরাতে \

মা-ভৈনেরে হারাইলাম, হারাইলাম বাপ তোরে।

মগ্যা রাজা ছল করিয়া লুইট্যা লইল মোরে \

হায়! লুইট্যা লইল মোরে …

নছিবে একি ছিল রে… \

কু-ছাহাতে আইল রে বাপ মগ্যা রাজার দেশে।

কুলও দিলি, মানও দিলি, জানও দিলি শেষে \

ধন-দৌলত লইয়া রে তুই পলালি কার ডরে।

সোনার জেয়র হীরা মোতি রাখিলি কার ঘরে \

হায় ! রাখিলি কার ঘরে …

নছিবে এ কি ছিল রে … \

দেশে দেশে ঘুরিলাম রে মুল্লুকে মুল্লুক।

কোন্ সতীনের পুতের সঙ্গে করিলি ছুল্লুক \

কি লালছে আইলি শেষে রোসাঙ্গ শহরে।

মা-ভৈনরে ডুপালি রে ডুপিলি সাগরে \

হায় ! ডুপিলি সাগরে …

নছিবে এ কি ছিলরে … \

দুর্গত্যা পরান আমার ন যায় নিকলি।

তুষের আইল্যা হৈয়ে রে বুকে ওঠে জ্বলি জ্বলি \

বারে বারে কইলামরে বাপ নাইয়র ন-দিঅ মোরে।

জীয়তা রাখিয়া কেন মাটি দিলি গোরে \

হায় ! মাটি দিলি গোরে …

নছিবে এ কি ছিলরে … \

ক্ষুধা-তিষ্টা মালুম নাইরে কাঁদি রাত দিন।

মগ্যা রাজার খানা খাইতে মনে আইসে ঘিন \

এক সোনাই রাঁধে রে ভাত, বাড়ী শুদ্ধ খায়।

বাসন ভরা নাপকি পোচা গিলা যে ন যায় \

আমার গিলা যে না যায় রে…

নছিবে একি ছিল রে …।

রাতে দিনে চোখের জলে বালিশ ভিজাই আমি।

পিনবার লাগি মগ্যা রাজা দিছে কালা থামি \

দশমগিনী আইসা আমার বসে গায়ের কাছে।

কানে দিতাম মকহি মোরে সোনার নাধং যাচে \

হায়! সোনার নাধং যাচে রে …

নছিবে এ কি ছিলরে … \

আসমানেরই ফুল রে ছিলাম আসমানেরই ফুল।

মগ্যা রাজার হাতে পড়ি দিলাম জাতি কুল \

সাগরের তলে মা-বাপ করিলি কবর।

হার্মাদ্যার মুলুকে আমার কে লইব খবর \

মা বাপ কে লইব খবর রে…

নছিবে এ কি ছিলরে \

সম্রাট আওরঙ্গজেব ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ : অতঃপর চট্টগ্রাম বিজয়

সম্রাট আওরঙ্গজেব ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ ও বাংলার উপক‚ল মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তকরণের লক্ষ্যে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁরই আপন মামা নবাব শায়েস্তা খাঁ’কে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করে আরাকান অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করার আদেশ দেন।

সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ৮ মে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে রাজমহল এসে পৌঁছেন। তিনি এসেই প্রথমে মাহমুদ বেগ নামক নৌ-বিভাগের দারোয়ানকে ৭৬৮টি রণপোত ও নৌকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। ঢাকার দূরবর্তী খিজিরপুরে নৌ-ঘাঁটি স্থাপিত হলো। নৌ-বিভাগের ব্যয় নির্বাহের জন্য ৮৪৩৪৫২ টাকা ও ৯৩২ জন পর্তুগিজ নাবিকের বেতন বাবদ ৭৭৮৯৫৪ টাকা বরাদ্দ করা হলো। সুবেদারের আদেশে প্রতিটি গ্রাম থেকে সুতার ও কাঠ আমদানি করা হলো। তা ছাড়া যশোর, চিলমারী, কালিবাড়ি, হুগলী ও বালেশ্বরে রণতরী প্রস্তুত হতে থাকে। অল্প দিনের মধ্যে ৩০০ রণতরী ও ১৩০০ জন নৌ-সৈন্য সংগৃহীত হলো।

শায়েস্তা খাঁ আরাকান অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকা ও তমলুকসহ মোগল অধিকৃত বাংলায় অবস্থানরত পর্তুগিজদের লোভ ভয় দেখিয়ে মোগলপক্ষে নিয়ে আসেন। ফিরিঙ্গিরা আরাকানিদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার একাধিক কারণ ছিল। এর মধ্যে আরাকান রাজ পর্তুগিজদের মোগলপক্ষভুক্ত হওয়ার কথা জানতে পেরে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিদের ওপর অত্যাচার শুরু করে দেয়। দেয়াঙ কিল্লার বসতবাড়ি থেকে তাড়িয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়। আরাকানিদের এসব কৃতকর্মের সংবাদ জানতে পেরে পর্তুগিজরা সংঘবদ্ধ হয়ে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর বন্দরে অবস্থিত আরাকানিদের অনেকগুলো জাহাজ জ্বালিয়ে দেয়। তারা ৪২টি জালিয়া নৌকা নিয়ে সদলবলে ভুলুয়ায় গিয়ে সেনাপতি ফরহাদ খাঁ’র মোগল বাহিনীর সাথে যোগ দেয়।

ফরহাদ খাঁ পর্তুগিজ কাপ্তেন মূরকে সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁর কাছে ঢাকা পাঠিয়ে দেন। অন্যান্য পর্তুগিজদের তিনি ভুলুয়ায় রেখে দেন। শায়েস্তা খাঁ কাপ্তেন মূরকে নগদ দু’হাজার মুদ্রা পুরস্কার দেন এবং মাসিক পাঁচশ মুদ্রা বেতন ধার্য করেন। কাপ্তেন মূর তাঁকে পরামর্শ দেন যে, আরাকান থেকে রণতরী ও সৈন্য-সেনা পৌঁছার আগে যেন চট্টগ্রাম আক্রমণ করে দখল করে নেয়া হয়। নবাব শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম অভিযানের আয়োজন শুরু করেন।

সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁকে চট্টগ্রাম অভিযানের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। মোগল পক্ষভুক্ত পর্তুগিজ নাগরিক মি. মূরকে আরাকান অভিযানে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করে তাদেরকে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করে নেন এবং ইবনে হোসাইনকে রাজকীয় নৌ-বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয়। অগ্রবর্তী দল হিসেবে ইবনে হোসেন, মনুয়ার খান, মীর মর্তুজা প্রমুখকে জুগিদিয়া পাঠানো হয়। সেখানে ফরহাদ ও কাপ্তেন মূর পর্তুগিজ সৈন্যসহ অগ্রগামী দলের সাথে যোগ দেন। শায়েস্তা খাঁ পুরো অভিযানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত হন।

সম্রাট শাহজাহানের সময় চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে আসা গভর্নর কামাল সদলবলে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর ৭৫০০ পদাতিক, ২০০ অশ্বারোহী, ৩০০০ নৌ-সেনা এবং ২৮৮ খানা রণতরী নিয়ে আরাকান অভিযানের প্রধান সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান ঢাকা থেকে আরাকানের দিকে দীর্ঘাকাক্সিক্ষত অভিযানে যাত্রা শুরু করেন।

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি জুগিদিয়া ঘাঁটি থেকে যুগপৎ স্থল ও জলপথে আরাকান অভিযান শুরু হয়। স্থলবাহিনী মিরসরাইয়ের পশ্চিম প্রান্তের সমুদ্রতীর ঘেঁষে কুড়াল দিয়ে জঙ্গল কেটে রাস্তা তৈরি করে এবং নৌ-বাহিনী সমুদ্রের তীরঘেঁষে বন্দরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ২১ জানুয়ারি স্থলবাহিনী কুমিরা নালার মোগল নৌ-বাহিনীর সাথে মিলিত হয়। তখনও সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁ মূলবাহিনীসহ তিন ক্রোশ পেছনে ছিলেন।

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ইবনে হোসেনের দূতগণ সংবাদ পান যে, শত্রু সৈন্যরা চাটগাঁ থেকে এসে দু’প্রহরের পথ কাটালিয়া নালায় অবস্থান করছে। ইবনে হোসেন নিজের নৌ-সেনাদিগকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিলেন এবং কয়েকখানি নৌকা রাতারাতি ঐ নালার মুখে পাঠিয়ে দিয়ে তাদেরকে খুব সতর্ক থাকতে হুকুম দিলেন। পরদিন ২৩ জানুয়ারি দ্বিপ্রহরে চৌকিদারগণ খবর দিল যে, মগ নৌ-সেনা কাটালিয়া নালা থেকে বের হয়ে যুদ্ধ করতে আসছে।

তখন সমুদ্রে প্রচণ্ড জোয়ার। জোরালো বাতাস সাগরে প্রকাণ্ড ঢেউ তুলে নৌকাগুলো আগাগোড়া ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তবুও ইবনে হোসেন যুদ্ধের জন্য নৌকা খুলে দিলেন। তখন তীর থেকে একজন তুর্কি সেনা চেঁচিয়ে বলল, তুমি পাগল নাকি, এমন তুফানে এই গভীর সমুদ্রে নৌকা নিয়ে রওনা করছো। তিনি জবাবে বললেন, যদি পাগল না হতাম তবে যুদ্ধের ব্যবসা করতে আসতাম না। শিগগিরই জলযুদ্ধ হবে সংবাদ পেয়ে ফরহাদ খাঁ, মীর মর্তুজা ও হাফাং খাঁ স্থলযুদ্ধে এগিয়ে গেলেন।

মগেরা ১০ খানা ঘরাব ও ৪৫ খানা জলবা নৌকা থেকে তোপ চালাতে লাগল। পর্তুগিজ কাপ্তেন মূর ও অন্যান্য ফিরিঙ্গিদের নৌকা ছিল সর্বাগ্রে। তারা শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইবনে হোসেনও তাদের পশ্চাৎ হয়ে দ্রুত জড়িয়ে পড়লেন জলযুদ্ধে। মগ সৈন্যরা এ আক্রমণ সহ্য করতে পারল না। ঘরাবের মগ সৈন্যরা সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং জলবা নৌকাগুলো দ্রুত বেগে পালিয়ে গেল।

মোগল সৈন্যরা যা কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি মগদের হারাবে। তাতে যথেষ্ট মনে করে আর সামনে আগাতে অস্বীকার করল। ফলে ইবনে হোসেন কুমিরা নালায় সে রাত্রি কাটালেন।

পরদিন মগদের দু’তিনখানা নিশান নৌকা দূরে দেখা যায়। গতকাল মগেরা যুদ্ধে যাওয়ার সময় ১০ খানা ঘরাব ও ৪৫ খানা জলবা বাদশাহি নওয়ার পরাস্ত করার ও কেড়ে নেওয়ার জন্য নিজেদের পোত ও অন্যান্য অনেক নৌকা পথের মধ্যে হর্নাল নালায় রেখে যায়। সেই নৌকাগুলোর ওপর নিশান দেখা গেল।

ইবনে হোসেনের উৎসাহে বঙ্গের নৌ-সেনারা হর্নালের দিকে রওনা হলে মগেরা খবর পেয়ে হর্নাল নালা থেকে বের হয়ে এসে সমুদ্রে নৌ-শ্রেণি রচনা করে দাঁড়াল। প্রথমে ইবনে হোসেন নিজেই ছোট নৌকা নিয়ে দ্রুত তথায় পৌঁছে যান এবং তোপ ছাড়তে থাকেন। ভারী নৌকাগুলোও পেছন পেছন ছুটে আসে। দূর কামানের আওয়াজে রাত কেটে যায়। পরদিন ২৫ জানুয়ারি মোগল নৌবাহিনী মহাউৎসাহে বাজনা বাজিয়ে গোলা ছুড়তে ছুড়তে শত্রুর দিকে অগ্রসর হলো। প্রথমে এগিয়ে গেল সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ। তাতে ছিল ভারী কামান। দ্বিতীয় স্তরে ছিল মাঝারি আকারের ঘরাব জাহাজগুলো। সকলের পেছনে ছুটল দ্রুত জলবা ও কুশা নৌকাগুলো।

চাটিগাঁ দুর্গে মোগলবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণ

আরাকানি সৈন্যের পলায়ন

মগেরা পলায়ন ছাড়া কোনো উপায় দেখল না। দ্রুতগামী জলবা নৌকাগুলো বড় জাহাজগুলোকে কাছি বেঁধে টেনে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পেছনে হটিয়ে দিতে লাগলো। ইবনে হোসেন নিজের শ্রেণি না ভেঙে সাবধানে পেছনে সরে গেলেন।

বিকেল ৩টার সময় মগেরা কর্ণফুলীর মোহনায় গিয়ে দেয়াঙের নিকটবর্তী মাঝের চরে এসে নোঙর করল ঠিক চাটগাঁ দুর্গের সামনে। মোগল নৌ-বাহিনী অমনি এসে কর্ণফুলীর মোহনা অধিকার করে বসল। এটাই মগদের জন্য চরম দুরবস্থা। যেন মোগল নৌ-বাহিনীর খাঁচার মধ্যে বন্দি হলো। তার চেয়ে খোলা সমুদ্রে থাকলে পরাজয় হলেও দ্রুত নৌকাগুলো নিয়ে আরাকানে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারত। দেয়াঙের নিকটস্থ মাঝের চরে এসে নোঙর করায় পলায়নপথও বন্ধ হয়ে যায়। তাতে তাদের বিপদ ঘনিয়ে আসে। কারণ দুর্গ আক্রান্ত হলে নৌ-বল আর তীর থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে না। নৌ-বল পরাস্ত হলে দুর্গে থাকা মগদের বের হয়ে যাওয়া কিংবা আরাকান থেকে সাহায্য পাবার কোনো সুযোগ থাকবে না। বাস্তবে তাই হলো।

কর্ণফুলী মোহনার পূর্বপাড়ে দেয়াঙের ফিরিঙ্গি বন্দর ও ফিরিঙ্গি পল্লীর কাছে মগসৈন্যরা তিনটি বাঁশের ঘর নির্মাণ করে এবং তার মধ্যে অনেক তোপ কামান এবং তেরিঙ্গা সৈন্য ও দুটি হাতি রেখেছিল। সেখান থেকে মোগল নৌ-বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে লাগল। ইবনে হোসেন আর দেরি না করে, বেশ কিছু সৈন্য তীরে নামিয়ে দিয়ে নৌকাগুলোকে উজানে পাঠিয়ে দেন। উভয় দিক থেকে আক্রমণ রচনা করা হলে মগসৈন্যরা কিছুক্ষণ যুদ্ধ করে পালিয়ে যায়। এ সুযোগে মোগলবাহিনী বাঁশের কেল্লাগুলো পুড়িয়ে দিয়ে পুনরায় মোহনায় ফিরে আসে।

বিচক্ষণ ইবনে হোসেন মগসৈন্যদের নানা কৌশলে দুর্বল করে শত্রুর রণপোতে আক্রমণ রচনা করে। ফিরিঙ্গি ও মোগল নৌ-সেনারা এবার দ্রুত শত্রুবাহিনীর চারদিকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। মগসৈন্যরা গত্যন্তর না দেখে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লে চাটিগাঁ দুর্গ থেকে শুরু হয় বৃষ্টি গুলি।

কর্ণফুলীর মোহনা মোগলদের দখলে থাকায় মগদের যুদ্ধজাহাজ পালানোর পথ বন্ধ। প্রাণভয়ে অনেক মগ নৌ-সেনা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অনেক সৈন্য নৌকার ওপর আত্মসমর্পণ করল। মোগলবাহিনীর কামানের গোলায় মগদের বেশ কয়টি যুদ্ধজাহাজ নদীতে ডুবে যায়। এরই মধ্যে প্রধান সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁ জলযুদ্ধের খবর পেয়ে সৈন্যসহ দ্রুতগতিতে চাটিগাঁ দুর্গের কাছে এসে পৌঁছে। দুর্গরক্ষী মগ সৈন্যগণ স্বচক্ষে নৌ-যুদ্ধের পরাজয় দেখে এবং চৌকিদারগণের কাছে বিপুলসংখ্যক মোগল সৈন্য আগমনের খবর পেয়ে প্রাণভয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়।

চাটিগাঁ দুর্গ দখল

সেই রাতেই ইবনে হোসেন বন্দি মগসৈন্যদের থেকে দু’জন সৈন্যকে চাটিগাঁ দুর্গের অধ্যক্ষ ‘ভ্যুলী’র কাছে পাঠিয়ে দেন। তারা ভ্যুলী’কে গিয়ে জানালো বৃথা নিজ পরিজনসহ বিনষ্ট হয়ো না। আগেভাগে দুর্গ সমর্পণ করে প্রাণ বাঁচাও। নচেৎ আমরাই তোমাদের ধরে নিয়ে হত্যা করবো।

দুর্গাধ্যক্ষ সে রাতের জন্য শান্তি ভিক্ষে চেয়ে পরদিন ভোরে মোগল সৈন্যদের জন্য দুর্গদ্বার খুলে দেন। বুজুর্গ উমেদ খাঁ অনায়াসে চাটিগাঁ দুর্গে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। অপরদিকে দেয়াঙ কারাগার ভেঙে মুসলমান বন্দিরা বেরিয়ে আসে এবং তারা পলায়নকারী মগদের পিছু ধাওয়া করে এক মগ সেনাপতিকে হত্যা করে দু’টি হাতি কেড়ে নিয়ে ইবনে হোসেনের হাতে হস্তান্তর করে এবং এভাবে দেয়াঙ দুর্গ ও অস্ত্রভাণ্ডার মোগলবাহিনীর দখলে আসে। আক্রমণে ১৫৫টি আরাকানি রণতরীর মধ্যে ২০টি ডুবে যায়, বাকি ১৩৫টি মোগলবাহিনীর দখলে আসে।

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি মোগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁ দুর্গে প্রবেশ করেন এবং অত্র অঞ্চলের জনগণকে আশ্বস্ত করে নিজ সেনাবাহিনীকে কড়া হুকুম দেন যে, প্রজাদের কারো ওপর লুট বা অত্যাচার যেন না হয়।

ঐতিহাসিক শিহাব উদ্দিন তালিশের বর্ণনায় চাটিগাঁ দুর্গ

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে মোগল অভিযানে অংশগ্রহণকারী ঐতিহাসিক শিহাব উদ্দিন তালিশ বিরচিত ‘ফতিয়া-ই-ইব্রিয়া’ গ্রন্থে, কর্ণফুলীর তীরবর্তী দেয়াঙ পাহাড়ে আরাকানিদের চাটিগাঁ দুর্গ, মগঘাট, মগবাজার, পোতাশ্রয় ও সেনাছাউনির বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে। তিনি আরাকানিদের চাটিগাঁ দুর্গকে আলেকজান্ডারের ফালাক-উল-বারুজ (ঋধষধশ-ঁষ-নধৎঁল) এর মতো দুর্ভেদ্য বলেও মন্তব্য করেছেন।

মোগলরা অনায়াসে কর্ণফুলীর উত্তর তীরাঞ্চল দখল করলেও ২৪ জানুয়ারি থেকে ২৭ জানুয়ারি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিজয়কালে আরাকানিদের দেয়াঙ পাহাড়স্থ চাটিগাঁ দুর্গ দখলে চারদিনব্যাপী ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করে। উক্ত গ্রন্থের আলোকে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার এম এ ইংরেজি অনুবাদে চাটিগাঁ দুর্গের বর্ণনায় বলেছেন –

ঙহ ঃযব নধহশ ড়ভ ঃযব কধৎহধভঁষর জরাবৎ ধৎব ংড়সব যরষষং : যরময ধহফ ষড়,ি ংরঃঁধঃবফ পষড়ংব ঃড় বধপয ড়ঃযবৎ. ঞযব ষড়বিৎ যরষষং যধাব নববহ যবধঢ়বফ ড়াবৎ রিঃয বধৎঃয ধহফ ৎধরংবফ ঃড় ঃযব ষবাবষ ড়ভ ঃযব যরমযবৎ ড়হবং.

অষষ ঃযবংব যরষষং যধাব নববহ ংপৎধঢ়বফ পুষরহফৎরপধষষু ভড়ৎঃরভরবফ ধহফ হধসবফ ঃযব ঢ়ড়ৎঃ (ড়ভ ঈযরঃমধড়হ). ওহ ংঃৎবহমঃয রঃ ৎরাধষং ঃযব ৎধসঢ়ধৎঃ ড়ভ অষবীধহফবৎ ধহফ রং ঃড়বিৎং (নঁৎু) ধৎব ধং যরময ধং ঃযব ভধষধশ-ঁষ-নধৎঁল. ঋধহপু পধহহড়ঃ ংড়ঁহফ ধহফ ফবঢ়ঃয ড়ভ রঃং সড়ধঃ রসধমরহধঃরড়হ পধহহড়ঃ ৎবধপয রঃং হরপযরফ ঢ়ধৎধঢ়বঃ (ঋধঃবধরননৎরধ, ঞৎধহংষধঃবফ নু ঔধফযঁহধঃয ঝড়ৎপধৎ গ,অ )

চাটিগাঁ দুর্গের নিকটেই ছিল দেয়াঙ কারাগার। যুদ্ধ চলাকালে এই কারাগারের দ্বার ভেঙে হাজার হাজার কারামুক্ত বন্দি মোগলসৈন্যদের সাথে একাত্ম হয়ে পুরো দেয়াঙ শহরে আগুন লাগিয়ে ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত করে।

এমনকি হাতিশালার দু’টি হাতিও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় এবং দুর্গ থেকে দুটি হাতি ও ১২২৩টি কামান অধিকার করে নেয়। ধারণা করা যায় যে, এ যুদ্ধে দেয়াঙ শহরের হাজার বছরের স্থাপত্যসহ পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়টিও ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত হয়ে যায়।

রামু দুর্গ দখল

চাটিগাঁ ও দেয়াঙ দুর্গ থেকে পরাজিত আরাকানিরা রামু দুর্গে আশ্রয় নেয়। বুজুর্গ উমেদ খাঁ তাঁর সেনাপতি মীর মর্তুজাকে রামু দুর্গ অধিকারের জন্য প্রেরণ করেন। আলমগীরনামায় বলা হয়েছে রামুর পথ ছিল অত্যন্ত দুর্গম এবং বন্ধুর। এই দুর্গম পার্বত্য এলাকা ১২ দিনে অতিক্রম করে মীর মর্তুজা রামু দুর্গ অবরোধ করেন। আরাকানরাজের ভাই বাউলি- যিনি দুর্গের গভর্নর ছিলেন তিনি যুদ্ধ করে পরাজিত হন। বাউলি তার সৈন্যবাহিনীসহ পার্বত্য এলাকায় আশ্রয় নেন। মীর মর্তুজা আরাকানি সৈন্যদের তাড়া করে হত্যা করেন এবং সেখান থেকেও মুসলিম বন্দিদের উদ্ধার করেন।

আরাকানরাজ রামু দুর্গ পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন সৈন্য প্রেরণ করেন। বুজুর্গ উমেদ খাঁও মীর মর্তুজার সাহায্যের জন্য সিয়ান খান, হুমায়ুন খাঁ ও দিলজা খানের অধীনে নতুন সৈন্য প্রেরণ করেন। এদের সঙ্গে এক বিরাট গোলন্দাজ বাহিনী আসে। আরাকানি বাহিনী হঠাৎ আক্রমণ করে গোলন্দাজ বাহিনীকে হটিয়ে দেয় এবং বিপদগ্রস্ত করে অগ্রসর হয়। এতে ঘোরতর যুদ্ধ বেধে যায়। এই যুদ্ধে আরাকানি বাহিনী পরাজিত হয় এবং রামু দুর্গ মোগলবাহিনী দখল করে নেয়। চট্টগ্রাম থেকে রামুর দূরত্ব ৮০ মাইল। মোগলবাহিনীর খাদ্য কমে যায়।

বর্ষাকাল আগত প্রায়। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মোগলবাহিনীর বিপর্যয় হবার আশঙ্কা করে বুজর্গ উমেদ খাঁ অভিযান বন্ধ করে মীর মর্তুজাকে রামু ছেড়ে চলে আসতে আদেশ দেন।

মোগলবাহিনী রামু ত্যাগ করে শঙ্খ নদীর উত্তর তীরে এসে অবস্থান নেন। শঙ্খ নদী মোগল অধিকৃত চট্টগ্রামের দক্ষিণ সীমানা নির্দিষ্ট হয়। আধু খান ও লছমন সিংহ নামক দু’জন হাজারি সেনাপতিকে সীমান্তরক্ষায় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

চট্টগ্রাম বিজয়ের পুরস্কার

বিজয়ের সংবাদসহ আরাকান রাজার চাচা দুর্গস্বামী ‘ভ্যুলী’কে ঢাকায় নবাব শায়েস্তা খানের কাছে পাঠিয়ে দেন। তিনি ২৯ জানুয়ারি ঢাকায় গিয়ে পৌঁছেন। বিজয়ের সংবাদে চারদিকে প্রজারা আনন্দবাদ্য বাজাতে লাগলো। নবাব খুশি হয়ে ফিরিঙ্গি ও মোগল সৈন্যদের অসংখ্য পুরস্কার দিলেন। নবাবী সৈন্যগণ ও নৌ-বহরের মাল্লাগণ এক মাসের বেতন বকশিশ পেলেন।

দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন চট্টগ্রাম বিজয়ের সংবাদ পেলেন তিনি বাংলার নবাব শায়েস্তা খাঁ’কে এক মণিখচিত তরবারি, দু’টি হাতি, দু’টি ঘোড়া, সোনার সাজযুক্ত একপ্রস্থ খেলৎ পাঠালেন। ইবনে হোসেন, মনসুর খাঁ, মীর মর্তুজা, মুজাহিদ খাঁ পেলেন খেতাব।৪

বুজুর্গ উমেদ খাঁ ও মনোয়ার খাঁ’কে দেড়হাজারী মনসবদার পদে উন্নীত করেন। এবং বুজুর্গ উমেদ খাঁ’কে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত করেন ও চট্টগ্রামকে ইসলামাবাদ নামকরণ করার আদেশ দেন।

‘মজুনা’ নামের এক গীতিকায় যুদ্ধের বর্ণনা

বেলার শেষে কালা মেঘ উড়ে হাইড়া কোণে \

ধীরে ধীরে সেই মেঘ আসমান ছাইল।

ঝাপ্টাইয়া তুফান এক উত্তর থনে আইল \

বেবান সাগরে তখন হৈল বিষম হাল।

চাইর দিকতুন ডাক পৈল ‘সামাল, সামাল \ ’

উপরে উঠিছে ঢেউ আকাশ বরাবর।

নীচের দিকে পড়ে যেন পাতালের ভিতর \

বিজুলী ঠাটার ডাকে আস্মান ভাইঙ্গা পড়ে।

রণবাদ্য থামি গেল শঙ্খমুখের চরে \

পরাণের লালসে মগে ডাকে ‘ফরা, ফরা।’

এইবার নিরঞ্জন সঙ্কটেতে তরা \

নৌকা-নারা তল পৈল কে করে সন্ধান।

শত শত মরি গেল মগ, মুসলমান \

হিন্দু লাঠিয়াল মৈল, ভাসি গেল লাঠি।

মগে ন পাইল আগুন, মুসলমানে মাটি \ ”

আশুতোষ চৌধুরী সংগৃহীত ‘মজুনা’ নামক এই গীতিকায় শায়েস্তা খাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ’র নেতৃত্বে মগদের সঙ্গে কর্ণফুলী ও শঙ্খের মোহনায় মোগল সৈন্যের কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মোহনায় যে ঘোরতর যুদ্ধ হয় তার বর্ণনা আছে। কবির নাম নেই, তবে মুসলিম কবি বলে তিনি মনে করেন। বর্ণনাটি পড়লে মনে হয় যেন এটা কবির স্বচক্ষে দেখা ঘটনা।

প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দরের পতন ও সদরঘাট

থেকে নতুন বন্দরের সূত্রপাত

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হলে আরাকানি মগ ও পর্তুগিজরা হাজার বছরের বন্দর শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। চট্টগ্রাম বিজয়ের প্রধান সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁ কর্ণফুলী নদীর উত্তর তীরে এসে সেনাছাউনি স্থাপন করেন, যুদ্ধ জাহাজগুলোও নোঙর ফেলে কর্ণফুলী নদীর উত্তর তীরে। যুদ্ধ জাহাজের নোঙরকৃত স্থানটির নামকরণ করেন ‘সদরঘাট’ এবং এই সদরঘাট থেকেই পুনরায় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। যে দুর্ভেদ্য পাহাড়ে সেনাছাউনি স্থাপন করেন ঐ স্থানটি ‘আন্দরকিল্লা’ নামকরণ করে সেখানে বিজয়ের স্মারক হিসেবে নির্মাণ করেন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ।

মোগল কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের পর কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী দেয়াঙ পাহাড়স্থ হাজার বছরের প্রাচীন বন্দর শহর সিটি অব বেঙ্গল বা পর্তুগিজদের পোর্টো গ্রান্ডো নামক ঐতিহাসিক বন্দরটি ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রাচীন বন্দর শহর দেয়াঙ-এর কোনো প্রাচীন নিদর্শন আজ আর অবশিষ্ট নেই। তবে সাগর ও কর্ণফুলী মোহনা উপক‚লীয় দেয়াঙ পাহাড় সংলগ্ন প্রাচীন বন্দরের অবস্থানটি-বর্তমান আনোয়ারা উপজেলার এক গণ্ডগ্রাম। প্রাচীন দলিলপত্রে ঐ এলাকাটি বন্দর গ্রাম নামেই পরিচিত। এই গ্রামের মাঝপথে হাজার বছরের বন্দরের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আজও দণ্ডায়মান প্রকৃতির হাতেগড়া তিনশ ফুট সুউচ্চ পাহাড়টি। ইতিহাস যাকে আখ্যায়িত করেছে ‘চাটিগাঁ দুর্গ’ নামে। আনোয়ারা উপজেলার বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মোহনাস্থ এ প্রামে এবং তার রাঙ্গাদিয়া মৌজায় বর্তমানে গড়ে উঠেছে এশিয়াখ্যাত কর্ণফুলী সার কারখানা ও দেশের সর্ববৃহৎ রাঙ্গাদিয়া সার কারখানা এবং নিকটেই বিশাল এলাকাজুড়ে কেইপিজেড। তারই অদূরে মেরিন একাডেমি ও মেরিন ফিশারিজ নামক দু’টি জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের প্রাচীন বন্দর শহর দেয়াঙ সম্পর্কে ইউরোপীয় পর্যটকরা যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন তাতে জানা যায়, সেখানে কাঁচা-পাকা ভবন থাকলেও কালের বিবর্তনে তা ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাচীন বন্দরের স্মৃতি চাটিগাঁ দুর্গের শীর্ষে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একখানা পাকা ভবন আজও হাজার বছরের স্মৃতিকে ধরে রেখেছে। জানা যায় মোগল শাসনামল থেকে বন্দরের কার্যক্রম কর্ণফুলীর উত্তর পাড় থেকে পরিচালিত হলেও বন্দরে জাহাজের আগমন ও নির্গমনে এই ভবনটিই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বন্দরের আওতাধীন এই অফিসের কার্যক্রম ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সচল ছিল এবং এ অফিসে বন্দরের বেশ কয়জন কর্মচারী আজও কর্মরত রয়েছে।

চাটিগাঁ দুর্গ নামক ঐ পাহাড়ের শীর্ষে একটি দ্বিতল গৃহ রয়েছে। গৃহটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। জনশ্রæতিতে জানা যায় আরাকান আমল থেকে একই স্থানে একটি পাকা ভবন ছিল। গৃহটি পর্তুগিজ আমল, মোগল আমল, ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে একাধিকবার সংস্কার হয়েছে।

বর্তমানে দেয়াঙের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাটি খুঁড়তে গেলেই পাকা ভবনের অস্তিত্ব ইট ও ইটের ভগ্নাংশ বেরিয়ে আসে। ইদানীং শিলালিপি ও বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কারে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে গবেষক আবদুল হক চৌধুরী বলেছেন, দেয়াঙ দশম শতক থেকে দেব বংশীয় রাজাদের রাজধানী বা শাসনকেন্দ্র ছিল তাতে সন্দেহ নেই। রাজবংশের পতনের পর ক্রমান্বয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তা ধ্বংস হয়ে যায় এবং সদরঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের গোড়াপত্তন শুরু হয়। তখন থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের ঢাকামুখী কার্যক্রম শুরু হয়।

১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে সদরঘাটস্থ এলাকায় বন্দরের পত্তন হওয়ার পর ২শত ২২ বছরে কর্ণফুলী নদীর নাব্যর কারণে বারবারই বন্দরের অবস্থান সদরঘাট থেকে উজানের দিকে সরিয়ে নেয়া হয়। অবশেষে ২৫ এপ্রিল ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে বন্দর পুনরায় সরে আসে বর্তমান অবস্থানে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় স্থায়ী ভবন। যার নাম আজকের ‘চট্টগ্রাম বন্দর ভবন’। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj