শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় নজরুল স্মরণ : পদক পেলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও শবনম মুশতারী

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০১৫

কাগজ প্রতিবেদক : দ্রোহ, প্রেম, সাম্য আর মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় স্মরণ করল দেশবাসী। সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার পালিত হলো বিদ্রোহী কবির ৩৯তম প্রয়াণ দিবস।

ভোর থেকে নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিয়াতে ফজরের নামাজের পর কুরআনখানি অনুষ্ঠিত হয়। ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন কবির সমাধি ও স্মৃতি কমপ্লেক্সে মানুষের ঢল নামে। সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সমিতি ও ছাত্রছাত্রীরা কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও নজরুল মঞ্চে আলোচনা করেন। কবি পরিবারের পক্ষ থেকে কবির নাতনি মিষ্টি কাজীসহ অন্য সদস্যরা পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন।

জাতীয় কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, বিএনপির পক্ষ থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন, দলের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ন্যাপ, সাইফুর রহমান সোহাগের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত সংস্থা, নজরুল ইনস্টিটিউট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, নজরুল একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ভাসানী সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ, আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চা কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, নজরুল গবেষক ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম, ঢাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বেগম আক্তার কামাল, সামাজিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান, কলা অনুষদের ডিন আখতারুজ্জামান, সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. লীনা তাপসী খান। এ পর্বের সঞ্চালনা করেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আমরা নজরুলকে সঙ্গে নিয়েই বেড়ে উঠেছি। তার কবিতা-গান শুনে এবং পড়ে আমাদের চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে তার গান ও কবিতা আমরা কণ্ঠে ধারণ করেছি। তার কালজয়ী সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাস তিনি আমাদের সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন, আছেন আজো। কীর্তিমানের মৃত্যু হয় না, দেহাবসান হয় মাত্র।

বেগম আক্তার কামাল বলেন, জয়বাংলা ও বাঙালির জয় এ চেতনা আমরা নজরুলের কাছেই প্রথম পেয়েছি। তিনি সৃজনশীল সব শাখায় যেমন অবদান রেখেছেন, তেমনি বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে লিখেছেন এবং মাঠে নেমেছেন। কথা বলেছেন নারী অধিকার নিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কবি নজরুলের গান, কবিতা ও বাণী বাঙালি জাতির জন্য উদ্দীপনা ও সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করে। উপাচার্য কবি নজরুলের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জাতিকে নজরুল চর্চা ও অধ্যয়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কবি নজরুলের মানবতাবাদী চেতনা, সাম্য ও মুক্তবুদ্ধির ধারণায় আমাদের আত্ম-জিজ্ঞাসা প্রবণ হতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে এর তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। নজরুল মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ দেখেননি, তার রচনা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতিকে প্রেরণা জুগিয়েছে। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

নজরুল পুরস্কার প্রদান : কাজী নজরুল ইসলামের ৩৯তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আলোচনা, নজরুল পুরস্কার ২০১৪ প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাাদুজ্জামান নূর। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ। মুখ্য আলোচক ছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। এর আগে স্বাগত বক্তব্য দেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ। নজরুল ইনস্টিটিউট প্রবর্তিত নজরুল পুরস্কার ২০১৪ গ্রহণ করেন গবেষণায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও নজরুল সঙ্গীতে শবনম মুশতারী। তাদের হাতে পুরস্কারের সমুদয় অর্থ ৫০ হাজার টাকা ও স্মারক তুলে দেন প্রধান অতিথি আসাদুজ্জামান নূর। পুরস্কার গ্রহণ করে অনুভূতি ব্যক্ত করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যে কোনো পুরস্কার, যে কোনো বয়সে পেলে আনন্দ লাগে, উদ্দীপ্ত হয়। নজরুলের নামাঙ্কিত পুরস্কার পেয়ে আমিও আনন্দিত ও উদ্দীপ্ত। অপর পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী শবনম মুশতারীও উচ্ছ¡াস প্রকাশ করেন তার বক্তব্যে। অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন খালিদ হোসেন, শাহীন সামাদ, ফাতেমা-তুজ- জোহরা, খায়রুল আনাম শাকিল, সালাউদ্দিন আহমেদ, ইয়াসমীন মুশতারী, ইয়াকুব আলী খান, ড. লীনা তাপসী খান, রাহাত আরা গীতি ও ছন্দা চক্রবর্তী। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমির রেপার্টরি সঙ্গীত দল ও নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণার্থী শিল্পীরা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, লায়লা আফরোজ, সীমা ইসলাম প্রমুখ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj