শেষ হলো তিন দিনের ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’

রবিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৫

কাগজ প্রতিবেদক : অগ্রহায়ণের মিষ্টি সকাল। শীতের আমেজ নেই। তবু একধরনের মিষ্টি, হালকা হিমেল বাতাস বইছিল চারপাশজুড়ে। গতকাল শনিবার সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই দেখা গেল বর্ধমান হাউসের পাশের একটি মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল। নাটকের কাহিনী হচ্ছে- একজন পাঠকের অচেনা এক শহর থেকে সাইকেলে চেপে ‘ঢাকা লিট ফেস্টে’ আসার। এই আসার পথে সে নানা রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। শেষটা হয় এক আনন্দ অনুভূতি দিয়ে। লিট ফেস্টের শেষ দিনের অনুভূতিও ছিল তেমনি এক আনন্দের, নতুন প্রত্যয়ের। উৎসবটি সাহিত্য অঙ্গনে আশার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশের সাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজি ভাষার পাঠক-লেখকদের মেলবন্ধনের এক অনন্য আয়োজন ছিল ঢাকা লিট ফেস্ট। গত তিন দিনে বিভিন্ন সেশনে দেশি-বিদেশি লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সমালোচকদের আলোচনায়, আড্ডায় মুখর হয়ে উঠেছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। আগামী বছর আরো বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রত্যাশা জানিয়ে শেষ হয়েছে এবারের লিট ফেস্ট।

গতকাল উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধিবেশন ছিল নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হেরল্ড ভারমাস ‘অ্যা লাইফ ইন আর্টস এন্ড সায়েন্স’। হ্যারল্ড ভারমাস বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই বিজ্ঞানীদের ভিন গ্রহের প্রাণীর মতো মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- বিজ্ঞানীরাও অন্য সব মানুষের মতো সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, খেলাধুলাসহ নানা বিষয়ে আগ্রহী হয়ে থাকেন। বিজ্ঞানের একটি অসম্ভব শক্তি হচ্ছে এটি চাইলেই বিশ্বের সব দেশকে নিয়ে আসতে পারে এক ছাতার নিচে। বিশ্ব দিনে দিনে সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে।

বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের অবদান সম্পর্কে তিনি বললেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে সরকার নতুন করে চিন্তা করতে পারে। গবেষণার জন্য পৃথক তহবিল করতে হবে। বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক টেনে এই বিজ্ঞানী বলেন, বিজ্ঞানকেও সাহিত্যের মাধ্যমে প্রকাশ যায়। বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যকর্মগুলোর একটি পৃথক ভাষা আছে। এ বিষয়ে প্রচুর মানসম্মত বই প্রকাশিত হয়েছে। আমার মনে হয় পাঠকরা সেই বইগুলোও পাঠ করতে পারেন।

তৃতীয় বিশে^র দেশগুলো নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একসঙ্গে কাজ করে তবে রাষ্ট্রের উন্নয়নে সময় লাগে না। সে জন্য উন্নয়নশীল দেশে নেতৃত্বের স্বচ্ছতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দিনের মতোই শেষ দিনে আপন ভাবনার কথা বলেছেন ভারতের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক নয়নতারা সায়গল। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর আত্মীয়া এদিন রাজনীতির সঙ্গে নিজস্ব লেখালেখির সম্পর্ক এবং ভারতের উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ চলমান নানা বিষয়ে আলোকপাত করেন। তার আত্মজীবনীর লেখিকা ঋতু মেননও অংশ নেন এ অধিবেশনে। জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরে বলেন, বাবা-মার পরে তিনি

ছিলেন আমার তৃতীয় অভিভাবক। আমার বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, সাহিত্যচর্চা- সবকিছুতেই তিনি আমাকে প্রভাবিত করেছেন। নিজের লেখালেখি সম্পর্কে বলেন, প্রকৃত অর্থে লেখক তার লেখার বিষয়কে বেছে নেন না বরং বিষয়ই লেখককে তাড়িত করে। এ কারণেই আমার সাহিত্যকর্মে রাজনীতির সঙ্গে ইতিহাসের সমন্বয় ঘটেছে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির সমন্বিত এই দেশটিকে এখন হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর পাঁয়তারা চলছে। হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যবহার করা হচ্ছে এই অপতৎপরতায়। তবে আমরাও বসে নেই। চালিয়ে যাচ্ছি আমাদের প্রতিবাদ।

একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে দুপুরে বসে সাহিত্য নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা। তাতে ‘সবার জন্য সাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, ভারতের কবি ও সাংবাদিক পৌলমী সেনগুপ্ত, কবি আতা সরকার, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক ও আন্দালীব রাশদী। ঘরোয়া আড্ডার ভঙ্গিমায় তারা তুলে ধরেন সাহিত্যের নানা দিক। ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় এ সময় বক্তারা বলেন, জীবনধারণের জন্য খাদ্য যেমন অপরিহার্য, সাহিত্য তেমন নয়। কিন্তু জীবনের সঙ্গে যখন আত্মা জড়িত, তখন ওই আত্মার অন্যতম খাদ্য হচ্ছে সাহিত্য। সাহিত্য আত্মাকে কোমল করে, ভালোবাসতে শেখায়।

স্বনামধন্য কবিদের অংশগ্রহণে দুপুরে একাডেমির বর্ধমান হাউসে বসে কবিতা পাঠের আসর। শামীম রেজার সঞ্চালনায় এই অধিবেশনের বিভিন্ন কবিতা পাঠ করেন মুহম্মদ নুরুল হুদা, নির্মলেন্দু গুণ, কামাল চৌধুরী, সাজ্জাদ শরিফ ও ভারতের কবি চিন্ময় গুহ। নিজের কবিতা ছাড়াও বিদেশি কবিদের কবিতা পাঠ করেন তারা।

গতকাল শেষ দিনে উৎসব শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। সকাল ৯টায় মূল মঞ্চে দেখানো হয় ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘ইন্ডিয়াস ডটার’। তারপর শুরু হয় নির্ধারিত সেশন।

‘অনুবাদের অধিকার’ সেশন ছিল একাডেমির আমতলায় অবস্থিত কসমিক টেন্টে। বিশেষ করে কবিতা যখন অনূদিত হয় এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় তখনই তার সূক্ষ¥ অনুভূতি হারিয়ে যায়। কেন হারিয়ে যায় কিংবা আসল কবিতা কোনটি সে বিষয়ে আলোচনা করেন আলোচকরা। অরুণাভ সিনহার সঞ্চালনায় এই পর্বে আলোচক হিসেবে অংশ নেন ফরিদা হোসেন, মাসুদ আহমেদ, সায়েদা আরিয়ান জামান।

‘নগর আমার হৃদয়ে’ বিষয়ে ভিন্নধর্মী এক সেশন বসেছিল বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান স্মৃতি মিলনায়তনে। উৎসব উপলক্ষে এই মঞ্চটির নাম দেয়া হয় কেকে টি মঞ্চ। নগরসভ্যতার বিকাশ সেই সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে। নগরকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা-সংস্কৃতি ও সাহিত্য কী শুধুই নাগরিক সাহিত্য নাকি জনমানুষের হৃদয়ের সাহিত্য হয়ে উঠেছে প্রায়শ। এই বিষয়ে আলোচনা করেন সলিমুল্লাহ খান, তিলোত্তমা মজুমদার, ইমতিয়ার শামীম ও শিমুল সালাহউদ্দিন। সঞ্চালনা করেন হামীম কামরুল হক।

‘ফেমিনিজম : দ্য নেক্সট এফ ওয়ার্ড’ বিষয়ক অধিবেশন ছিল একাডেমি বর্ধমান হাউসের সামনের লনে। এই অধিবেশনের নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন ভারতীয় সাংবাদিক শোভা দে, ভারতের নারীবাদী প্রকাশনা সংস্থা কালী ফর উইমেন এবং জুবানের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক উর্বশী বাটালিয়া ও প্যারিসে রয়েল শেক্সপিয়ার কোম্পানি হয়ে ১০০টি নাটকের নির্দেশক জুথ কেলি এবং তাসাফি হোসেন। পৌনে এক ঘণ্টার এই অধিবেশনে তর্ক-বির্তকের মধ্য দিয়ে তারা নারীবাদের নবজাগরণের নানা দিক তুলে ধরেন।

আদিবাসী নিয়ে একটি সেশন ছিল কেকে টি মঞ্চে। সাহিত্যে আদিবাসী বা নৃ-গোষ্ঠীর ভূমিকা কী রকম আছে এবং ভবিষ্যতে কী রূপ এই বিষয়ে আলোকপাত করেন প্রখ্যাত লোক-ইতিহাস বিদ ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, আনিসুল হক, কুমার চক্রবর্তী, সঞ্জীব দ্রং। সঞ্চালনা করেন জফির সেতু।

বর্ধমান হাউসের পূর্বপার্শ্বের লনে মঞ্চস্থ হয় আদি লোকগাথা ‘মনসা’ অবলম্বনে লোকনৃত্যনাট্য ‘বেহুলা লাচারি’। এটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশের লুবনা মরিয়াম।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj