সবুজ তাপস : একজন দৃষ্টান্তবাদী কবি : রা জী ব লা ল ন

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৫

এটি একটি কাব্যগ্রন্থ যার ‘কৈফিয়ত’-এ লেখক বলছেন, ‘‘…কয়েকটি কবিতায় ‘সবুজ তাপস’ শব্দযুগলটি থাকায় বইয়ের নাম রেখেছি ‘সবুজ তাপস’।’’ তবে, ‘সবুজ তাপস’কে নিয়ে রচনা করা সহজ নয়। যে সত্তা ২০০১ খ্রি. থেকে শুরু করে এসে প্রকাশিত হয় ২০১৫ খ্রি. এক যুগেরও বেশ কিছুটা পরে আর একাডেমি যখন তাকে ‘দর্শন’ অধ্যয়নের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ‘‘দর্শন-বিষয়ের ছাত্র হওয়ার কারণে তার কবিতা দার্শনিকতাপূর্ণ।…তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত লোকায়ত দর্শন মত ‘দৃষ্টান্তবাদ’র জনক। কবিতায় রয়েছে তার দৃষ্টান্তবাদী মানসের প্রত্যক্ষ প্রভাব (ফ্যাপ-কথন)’’। অধিকন্তু, একক কাব্যগ্রন্থ হিসেবে সবুজ তাপস একটু বেশি ঢাউস- কাব্য সংখ্যা ও মননে।

ফলত, তার সৃষ্টি নিয়ে রচনা করা শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয় দুরূহও বটে। নিজের (পর্যালোচনাকরীর) পঠন সীমাবদ্ধতা ও ‘কুয়োর ব্যাঙ’ জ্ঞান নিয়ে আর অনুজের দায়বদ্ধতা থেকে আজকের এই প্রয়াস।

সমসাময়িক তরুণ কবিদের মধ্যে সবুজ তাপসকে আলাদা না দেখে উপায় নেই, এজন্য যে, লেখালেখির প্রায় ১৫ বছর পর বই করেছেন এই নয়- ভাষার ব্যবহার, শব্দের নবায়নে, ছন্দের উত্তরণে ভাবের এক নতুন জগৎ তিনি নিঃসন্দেহে সৃষ্টি করেছেন যা বিদগ্ধ জনেরও ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। কবি ও তাত্তি¡ক হাফিজ রশিদ খান বলেছেন : “কবিতা নৈরাজ্যের এই সমসাময়িক দোনোমনো বাস্তবতায় সবুজ তাপস একটি ধ্যান উপস্থাপন করেছেন। তার ধ্যানটির অ্যাকাডেমিক শিরোনাম: দৃষ্টান্তবাদী কবিতা। …দৃষ্টান্তবাদিতা সঠিক কাব্য-উপলব্ধি, তার প্রচার-প্রসার ও উন্মোচনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালনে সংশপ্তক। এ লক্ষাভিসারে সবুজ তাপস সংখ্যালঘু হলেও তার আত্মা শুদ্ধ, অনুধাবনা নান্দনিক এবং তা অনুকরণযোগ্য। …সবুজ তাপস নামের এই কাব্যগ্রন্থে কাব্যের বিন্যাসে দৃষ্টান্তবাদিতার প্রতিফলন যথাযোগ্যভাবে সম্পন্ন হতে দেখে আমি বিনোদিত হয়েছি”। আর কবি ও উত্তর আধুনিক তাত্তি¡ক এজাজ ইউসুফী বলেছেন : “…‘জুনিপণ্ডিত’ হয়ে ওঠা সবুজ তাপস অচিরেই আমাদের কাব্যজগতের একজন কবিপণ্ডিত হয়ে উঠবেন এই প্রত্যাশা করি..”। সবুজ তাপস তার সবুজ তাপসের কৈফিয়ত-এ কবি ও উত্তর আধুনিক তাত্তি¡ক এজাজ ইউসুফী এবং কবি ও উত্তর উপনিবেশিক তাত্তি¡ক হাফিজ রশিদ খানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদ বধ’ দ্বারা মিথের উল্টো রূপায়ণে একরূপ বিদ্রোহ ঘোষণা করে নতুন সাহিত্য যুগের ভিত রচনা করেন। আর সবুজ তাপস সেই মিথের অস্বীকারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তবাদ’র দ্বারা কি নতুন আন্দোলনের সূচনা করেন? মিথ সম্পর্কে সবুজ তাপসের অমনোযোগ পরিলক্ষিত। তিনি তার একটি গদ্যে উল্লেখ করেছেন: “যে কল্পনার বাস্তব রূপ দেয়া অসম্ভব, তাকে দৃষ্টান্তবাদীরা সত্য, মিথ্যা- কিছুই বলেন না। অর্থাৎ তারা এ ব্যাপারে নিরুত্তর থাকেন। নিরুত্তর থাকার মধ্য দিয়ে তারা এক- কেউ একে সত্য বলে গ্রহণ করলে অন্য কেউ মিথ্যা হিসেবে গ্রহণ করুক বা এক-কেউ একে মিথ্যা হিসেবে গ্রহণ করলে অন্য কেউ সত্য হিসেবে গ্রহণ করুক- এ জাতীয় কথার ইঙ্গিতও দেয় না। এ মতবাদ এগুলোর পক্ষাবলম্বন তো করে না, এগুলোকে বিরোধিতা করার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মনে করে না।” ঐ গদ্যে কাঠামোবাদী রোলাঁ বার্থের সমালোচনা করার সময় মিথ সম্পর্কে তার ধারণা পরিষ্কার করেন : “মানুষ অতীত-দর্শক- এটা দৃষ্টান্তবাদীরাও স্বীকার করেন; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, একজন কবিকে কবিতার লক্ষ্যে সমাজস্থ ভাষাকাঠামোকে গ্রাহ্য করে যা অষধিুং ধষৎবধফু ৎিরঃঃবহ কেবল তা অথবা তার নবীকৃত রূপ অথবা তার প্যারোডি হাজির করতে হবে এবং একই সাথে অবাস্তব পৌরাণিক বিষয়-আশয়ের সমযদার হতে হবে। কবি অতীত-সন্ধানী হোক, নিজেকে এবং অন্যকে গুহাবন্দি করে ফেলার জন্য নয়, অতীতের বাস্তব এবং দরকারি ঘটনা বা চরিত্র বা অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমানের সংযোগসেতু দাঁড় করে যুক্তিধর্মী ভবিষ্যৎ রচনা করার স্বার্থেই।” তবে তাঁর কাব্যগ্রন্থে যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র, নার্সিসাস, পুলসিরাত, জাহ্নবী, নন্দন-কানন, শ্যাম, কৃষ্ণধর, অগ্নি প্রভৃতি শব্দের অবতারণা করে তিনি কি আবার সেই মিথের আশ্রয়ে স্ববিরোধে নামেন, না কি নতুন কোন চেতনা, যা আমার মতোন সাধারণ পাঠকের জ্ঞাতব্যের বাইরে, তা দিতে দ্যোতনা সৃষ্টি করেন? উল্লেখ্য, ‘ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির’ কেন ‘যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র’ শব্দজোড় হলো তা ভাবনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পোস্টমাস্টার ছোটগল্পে ‘আমাদের পোস্টমাস্টার কলিকাতার ছেলে’ বলে ‘কলিকাতা’কে পোস্টমাস্টার থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়ে অভিনব এন্টি কলোনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করেছিলেন। সবুজ তাপসও কি এ শব্দজোটের বিপ্রতীকতায় মিথ ভাঙার কোন ইঙ্গিত দিলেন- প্রাজ্ঞ পাঠকই তা বলতে পারেন, আর বলতে পারেন কবি নিজে। ইংরেজি সাহিত্যেও সতের শতকের দিকে মেটাফিজিক্যাল অভিধায় জন ডানের প্রাধান্যে একদল কবির খোঁজ পাওয়া যায়, যাঁরা কবিতায় যুক্তি প্রয়োগ ও ‘পড়হপবরঃ’ নামক অদ্ভুত চিত্ররূপের মাধ্যমে পূর্ববর্তী এলিজাবেথীয় রেঁনেসাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। এঁরা পরিচিতি পান ‘দার্শনিক’ কবিগোষ্ঠী হিসেবে। দর্শনের ‘লজিক’ কিংবা ‘সিলোজিজম’ প্রভৃতি সাহিত্যে প্রবেশ করে সেই প্রথম- পরিবাহিত হয় ক্রমে যুগ পরবর্তীতেও। কিন্তু সবুজ তাপস ‘আস্তানা ছেড়ে আস্তানায় থাকি’ বলে, যদিও দর্শনমুখী-নির্দিষ্ট-তথাকথিত কোন ডিসকোর্সের বলয়ে থাকতে অস্বীকার করেন। বেদ-বিহার, ইস্ট-ওয়েস্ট-সোফিস্ট-মিডল ইস্ট ঘুরে ‘লিঙ্গহীন’ (এবহফবৎষবংং) লতিয়ে যান ‘মৃত্যুহীন’। এটাই সবুজ তাপস। পূর্ববর্তী আস্তানা ছেড়ে ছুড়ে দেন নতুন আস্তানা- দৃষ্টান্তবাদ।

সবুজ তাপসও কি সসেমিরার মতো ‘বাহ্যজ্ঞানশূন্য, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব, প্রায় প্রতিকারহীন অবস্থায় আছেন?

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj