বাংলাদেশের কবিতা : এক পলকে

শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৬

** মা হ বু বু ল হ ক **

বাংলাদেশের সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা যে কবিতা তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। বিগত কয়েকটি দশকে আমাদের দেশে প্রকাশিত হয়েছে অগণিত কবির কয়েকশ কাব্যগ্রন্থ ও অজস্র কবিতা। আর এভাবেই এ দেশে গড়ে উঠেছে বাংলা কবিতার এক সমৃদ্ধ ধারা।

দেশবিভাগ পরবর্তী অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তথা অবাঙালি উর্দুভাষী মুসলমানরা হয়ে বসে পূর্ববাংলার জনগণের ভাগ্যবিধাতা। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার চক্রান্তে মাতে তারা। ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয় বাঙালি জনগণ। এই অবস্থায় একদিকে ছিল পাকিস্তানের প্রতি অন্ধ মোহ, অন্যদিকে ছিল আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের প্রতি গভীর মমতা। ফলে বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার নবীন-প্রবীণ কবিকুলের সামনে প্রশ্ন জাগে, বাংলা কবিতা কোন ধারায় এগুবে? তা কি বাংলা কবিতাধারার মূল ঐতিহ্যের অনুসারী হবে নাকি পাকিস্তানি তমুদ্দুনের প্রেরণা-পথে চলবে? সে সময় কবিদের মধ্যে এ পশ্নে সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ করা গেলেও আবহমান বাংলা কবিতার যে ধারাটি তিরিশের দশকের কবিদের হাতে পরিপুষ্ট হয়েছিল সেই ধারাটিই ধীরে ধীরে সমৃদ্ধতর হয়েছে। বাংলা কবিতার এ পালাবদল সচেতন পাঠকমাত্রই লক্ষ করে থাকবেন।

চল্লিশের দশকে পাকিস্তানি তমুদ্দুনের প্রভাব পড়েছিল গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখের কবিতায়। গোলাম মোস্তফা ধর্মাশ্রিত ইসলামি আদর্শের সঙ্গে পাকিস্তানি ভাবধারাপুষ্ট কবিতার চর্চা করেছেন পূর্ণোদ্যমে। পাকিস্তানি আদর্শ ও মুসলিম নবজাগরণের ভাবধারা প্রধান হয়ে ওঠে কবি ফররুখ আহমদের কবিতায়ও। পাকিস্তানবাদ ও আরব-ইরানের ঐতিহ্যে সে কবিতা আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারে ও প্রকরণ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। কবি তালিম হোসেন ছিলেন ইসলামের সাম্য ন্যায় ও পাকিস্তানি আদর্শে উজ্জীবিত কবি। সৈয়দ আলী আহসানের মানস গঠনে এসবের প্রভাব পড়লেও তিরিশি আধুনিকতা দ্বারাও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে চল্লিশের দশকে আবহমান বাংলা কবিতার উত্তরসাধক ছিলেন কবি আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, সিকানদার আবু জাফর, সানাউল হক, আবদুল গণি হাজারী প্রমুখ। মধ্যবিত্ত জীবনের সামাজিক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টিপাত, লোকায়ত ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ ও নাগরিক মানসিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে আহসান হাবীবের কবিতায়। আবুল হোসেনের কবিতাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে আধুনিক কাব্য প্রকরণ। বাস্তবতা, রোমান্টিকতা ও ব্যঙ্গ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নতুন সৃষ্টির স্বাক্ষর রেখেছেন।

তৎকালীন পাকিস্তানে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নানা ঘটনা বিশেষ করে বায়ন্নোর ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রত্যাশা যখন বাধাগ্রস্ত হতে থাকে তখন আশাভঙ্গের বেদনার পাশপাশি সৃষ্টি হতে থাকে অসন্তোষ, হতাশা ও বিক্ষোভ। স্বাভাবিকভাবে ও সঙ্গত কারণে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিতায় সে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ সাধারণ লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। তার প্রকাশ-রূপ বিচিত্র হলেও সামগ্রিকভাবে কবিতা হয়ে ওঠে সমাজমনস্ক।

পঞ্চাশের দশকে যেসব কবি কবিতাঙ্গনে দেখা দেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ে রোমান্টিকতা যেমন আছে তেমনি আছে নস্টালজিক স্মৃতিময়তা ও মানবমুযক্তির আকক্সক্ষা। সৃষ্টিশীল কবি শামসুর রাহমান বিভাগোত্তর তথা স্বাধীনতা-পূর্বকালে নারী ও নিসর্গ নিয়ে প্রথম দিকে রোমান্টিক কবিতা লিখলেও পরে দেশ-কাল-সমাজভাবনার পথ ধরে এ দেশের মানুষের সংগ্রাম ও জীবনের কথা কবিতায় বাণীরূপ দিয়েছেন। এ কারণে তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে জননন্দিত কবি। হাসান হাফিজুর রহমান লিখেছেন আলোকিত বিশ্বাস ও অঙ্গীকারের কবিতা। আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতায় প্রতিফলন ঘটেছে বৈপ্লবিক সামাজিক চেতনা, রোমান্টিক শরীরী প্রেম ও জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের। পরবর্তীকালে পঞ্চাশের কবিদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ। আল মাহমুদের গভীর ভাব-চেতনা-সমৃদ্ধ সুরেলা স্নিগ্ধ কবিতায় প্রথমাবধি লক্ষ করা গেছে লোকজীবনের অনুষঙ্গ। তবে তাতে সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক শিল্পবোধ। শহীদ কাদরীর কবিতায় আধুনিক নাগরিকবোধ বাণীরূপ পেয়েছে সমস্ত দ্ব›দ্ব-বিক্ষোভ, যন্ত্রণা ও উল্লাস সমেত। সৈয়দ শামসুল হক সবচেয়ে নিরীক্ষাধর্মী- বিষয় ও প্রকরণ দুক্ষেত্রেই। তাঁর ক্রমাগত সৃষ্টিশীল কবিতা প্রথম দিকে গহন মনোমুখী এবং তির্যক ও ঝংকৃত হলেও উনসত্তরের বিদ্রোহ ও একাত্তরেরর রক্ত আগুনমাখা সংগ্রামী পদক্ষেপের ধ্বনিতে মুখর। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় চলমান জীবনের চালচিত্রের পাশাপাশি মূর্ত হয়ে ওঠে চারপাশের অপূর্ণতাজনিত আক্ষেপ, বিপন্ন মানবতাকে উদ্ধারের আকুলতা। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিবোধ-প্রধান কবিতায় শোনা যায় সমকাল ও পরিপার্শ্বের ছন্দোময় কল্লোল ধ্বনি। তীক্ষè সমাজ সচেতনতা ও সংগ্রামী আশাবাদ তাঁর পরবর্তীকালের কবিতাগ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্ট।

পঞ্চাশের দশকের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কবির মধ্যে রয়েছেন : হাবিবুর রহমান, আবদুল গনি হাজারী, মযহারুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার, আশরাফ সিদ্দিকী, আতাউর রহমান, আবদুর রশীদ খান, আহমদ রফিক, আজিজুল হক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, জাহানারা আরজু, কায়সুল হক, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, আবু বকর সিদ্দিক, আবুল খায়ের মোসলেহ উদ্দীন, ফজল শাহাবুদ্দীন, মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, বেলাল মোহাম্মদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, জিয়া হায়দার, ইমরান নূর, ওমর আলী, বেলাল চৌধুরী, লতিফা হিলালী প্রমুখ।

২.

ষাটের দশকে বাংলাদেশের কবিতার ধারায় রয়েছে কিছু উজ্জ্বল নাম। এঁদের মধ্যে রয়েছেন : আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রমুখ।

আবদুল মান্নান সৈয়দের পরাবাস্তবতার লক্ষণ আক্রান্ত কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকরণ নিষ্ঠা। তবে যৌনতার বিস্তারে কখনো কখনো তাঁর কবিতা অস্বস্তিকর। দিলওয়ারের কবিতায় প্রোজ্জ্বল রূপ পেয়েছে সমাজ-সচেতনতা। প্রথম দিকে ঐতিহ্যমনস্কতা প্রধান হলেও পরবর্তীকালে রফিক আজাদ শ্লেষ-বিদ্রƒপ-ঘৃণায় মধ্যবিত্তের মূল্যবোধকে নির্মমভাবে আঘাত করেছেন কবিতায়। আবদুল্লাহ আবু সাঈদ লিখেছেন কম, তবে তাঁর কবিতায় অন্তরঙ্গ রূপ নিয়েছে দেশপ্রেম। নির্মলেন্দু গুণ সত্তরের দশকে প্রেমের কবিতায় তারুণ্যকে যেমন উন্মাতাল করে তুলেছিলেন তেমনি তাঁর রাজনীতি প্রধান কবিতা মুখর হয়েছে বিপ্লব বন্দনায়, হয়েছে যুদ্ধের হাতিয়ার। পরে তাতে ছোঁয়া লেগেছে গীতল মাধুর্যের। মহাদেব সাহার পরিশীলিত অন্তর্মুখী কবিতায় মানুষ ও স্বদেশের জন্য ভালোবাসা চিত্রল গীতিময়তায় উদ্ভাসিত। আবুল হাসানের কবিতার শাশ্বত গীতিময়তার সঙ্গে দৈনন্দিন সমাজ বাস্তবতা শিল্পময় গভীরতা পেয়েছে। মোহাম্মদ রফিকের কবিতায় গীতিকবির নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি রয়েছে কথকতার ভাষা। কখনো শাণিত ব্যঙ্গ কখনো বা উচ্চকণ্ঠ ঘোষণায় তাঁর কবিতা জীবন ও সংগ্রামের কথা বলে। আসাদ চৌধুরীর কবিতায় দেশজ রীতিতে ছড়া ও গজলের আদলে যেমন অবচেতনা রূপ পেয়েছে তেমনি তাতে একস্র্রোতে মিশে গেছে তীব্র রাজনৈতিক সচেতনতা ও জীবনের আনন্দ ঘন উচ্ছলতা। অন্যদিকে কবিতায় ব্যক্তিগত বৃত্ত নির্মাণ করেছেন সাইয়িদ আতিকুল্লাহ আর গদ্যাত্মক কবিতায় ব্যক্তিবোধের স্ফুরণ ঘটেছে বেলাল চৌধুরীর কবিতায়। হেলাল হাফিজের কবিতায় লিরিক বৈশিষ্ট্যে মূর্ত হয়েছে বিষণœতার বেদনা। মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা জীবন ও পরিবেশ সচেতনতাকে মূর্ত করে তোলে মিথের ব্যবহারে ও অনুপ্রাসের প্রকরণে।

বাংলাদেশে বায়ান্নোর মহান ভাষা আন্দোলন হয়েছে অনেক কবির প্রেরণার উৎস। এই প্রেরণায় লেখা হয়েছে অনেক ভালো কবিতা। শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার’, হাসান হাফিজুর রাহমানের ‘অমর একুশে’, আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র মতো ক্লাসিক কবিতা আমরা এভাবেই পেয়েছি।

ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের কবিতায় পেয়েছে রক্ত মাতাল করা সংগ্রামী অনুভূতি। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’, সিকানদার আবু জাফরের ‘সংগ্রাম চলবেই’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘শহীদ স্মরণে’, নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’ ইত্যাদি কবিতা এ ধরনের অনেক চমৎকার কবিতার মধ্যে কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।

ষাটের দশকের অন্যান্য কবির মধ্যে রয়েছেন : হায়াৎ মামুদ, মাহবুব তালুকদার, মোফাজ্জল করিম, সিকদার আমিনুল হক, হায়াৎ সাইফ, রবিউল হুসাইন, মুশাররফ করিম, সমুদ্র গুপ্ত, জুলফিকার মতিন, সুব্রত বড়–য়া, রুবী রহমান, ওবায়দুল ইসলাম, ফরহাদ মজহার, মাকিদ হায়দার, মাহবুব সাদিক, সানাউল হক খান, হুমায়ুন আজাদ, অসীম সাহা, জাহিদুল হক, আবু কায়সার, জিনাত আরা রফিক, মাশুক চৌধুরী, শাহনূর খান, হুমায়ুন কবির, হেলাল হাফিজ, মাহমুদ আল জামান প্রমুখ।

৩.

১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো কবিতার পরিমণ্ডলেও অনন্যসাধারণ মাইলফলক হয়ে আছে। সেই দিনগুলোর বিচিত্র অনুভূতি, রক্তমাতাল উত্তেজনা, বাংলাদেশের হৃদয়ের আর্তনাদ, তার অগ্নিময় অঙ্গীকারের প্রতিধ্বনি- সবই বাক্সময় হয়ে আছে আমাদের কবিতায়।

একাত্তরের বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্ছ¡সিত ফোয়ারার আবেগে উৎসারিত হয়েছে কবিদের আবেগ ও অনুভূতি, স্বপ্ন ও অঙ্গীকার। বিভাগোত্তর কালে যাঁরা আবহমান বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করায় সচেষ্ট, তাঁরা যেমন, তেমনি অনেক নতুন কবি সক্রিয় হয়ে ওঠেন কবিতার সৃজনশীল অঙ্গনে। তাঁদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে আমাদের পরিচয়ের অভিজ্ঞান, চলার পথের ধ্রæব নক্ষত্র, জীবন ও মরণে সঞ্জীবনী অনির্বাণ শিখা। কখনো কবির কবিতায় মূর্ত হয়েছে বাঙালির দুর্বার অপরাজেয় অন্তর শক্তি, কখনো কবিতা হয়ে উঠেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, স্বপ্ন ও সংগ্রামের পতাকা। কখনো কবিতায় মূর্ত হয়েছে একাত্তরের কালো রাত্রির দুঃস্বপ্ন কখনো তা হয়ে উঠেছে সাহস ও বিক্রমের বীরত্বগাথা।

তবে সবচেয়ে বড় কথা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কবিতায় এনেছে নতুন সম্ভার, নতুন চিত্রকল্প। তা বদলে দিয়েছে কবির অনুভবকে, কবিতার ভাষাকে। ক্রোধ, ভালোবাসা, ঘৃণা, অঙ্গীকার, রক্তার্ত আর্তনাদ কিংবা মুক্তিসেনান দৃপ্ত পদধ্বনি এমনভাবে আগে কখনো আমাদের কবিতায় ফুটে ওঠেনি। ফুলের গন্ধ ছাপিয়ে কবিতায় এসেছে বারুদের গন্ধ।

আরও একটি দিক থেকে আমাদের কবিতা বৈশিষ্ট্যময় হয়ে ওঠে। একাত্তরের আগে কবি ছিলেন প্রধানত আত্মমগ্ন কিন্তু একাত্তর কবির আসনকে সরিয়ে এনেছে জনতার কাতারে। ব্যক্তির বোধ পরিণত হয়েছে সবার বোধে। এভাবেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এক বিরাট প্রভাবের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর কবিতার যাত্রা শুরু হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের ভেতর দিয়ে বিশ্বসভায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের ভেতর দিয়ে সৃষ্ট হয় নতুন আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। জাতীয়তাবাদী দেশচেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সাম্যভাবনার ভেতর দিয়ে নতুন উদ্দীপনা পেয়েছে দায়বদ্ধ কবিতা রচনার ধারা। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পরাজিত শত্রুদের চক্রান্ত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশে জাতীয় জীবনে নতুন সংকট দেখা দেয়। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আচ্ছন্ন করে অনেক কবিকে। এই পটভূমিতে ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অগ্রযাত্রাকে করা হয় পেছনমুখী। এর প্রভাব লক্ষ করা যায় সত্তরের দশকের ও পরবর্তীকালের কবিতায়।

সত্তরের দশকের সূচনা থেকেই কবিতার রচনার জোয়ার শুরু হয়। অনেক নতুন কবি উঠে আসেন বাংলাদেশের কবিতার অঙ্গনে।

সত্তরের দশকের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে রয়েছেন : অরুণাভ সরকার, সমুদ্র গুপ্ত, মাহবুব সাদিক, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, আবুল মোমেন, আবিদ আনোয়ার, ময়ূখ চৌধুরী, সৈয়দ হায়দার, রবীন্দ্র গোপ, দাউদ হায়দার, ত্রিদিব দস্তিদার, আবিদ আজাদ, শিহাব সরকার, নাসির আহমেদ, আবু করিম, সৈকত আসগর, ইকবাল আজিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহন রায়হান, কামাল চৌধুরী প্রমুখ।

অরুণাভ সরকার বাসনাকাতর প্রেমের কবিতায় সৃষ্টি করেছেন রোমান্টিক মাধুর্যময় জগৎ। সমুদ্র গুপ্তের কবিতায় আশাভঙ্গের বেদনাকে ছাপিয়ে উঠেছে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনা। মাহবুব সাদিক পাশ্চাত্য কাব্যকলা প্রভাবিত কবিতায় তীক্ষè ইঙ্গিতময় করে তুলেছেন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে। হাবিবুল্লাহ সিরাজী বাকপ্রতিমার মোহন কারুকাজে স্বপ্নময় ব্যঞ্জনা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। আবুল মোমেন ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে সৃষ্টি করেছেন কবিতার ভুবন। আবিদ আনোয়ার প্রকরণ-সচেতন কবিতায় পরাবাস্তবতার আবহ সৃষ্টি করেছেন চিত্রকল্পে ও প্রতীকে। ময়ূখ চৌধুরীর উপমাঋদ্ধ ও চিত্রকল্পশোভিত কবিতায় প্রকৃতি ও জীবন রূপায়িত হয়েছে রোমান্টিক উজ্জ্বলতায়। সৈয়দ হায়দারের প্রেম ও প্রকৃতি আশ্রয়ী কবিতায় মিশে গেছে বিশ্বাস ও সংস্কার। রবীন্দ্র গোপের কবিতায় প্রধান হয়ে উঠেছে স্বদেশপ্রীতি ও মানবমুক্তির চেতনা। যুদ্ধোত্তর মুক্ত স্বদেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তির উত্থানে স্বপ্নভঙ্গের বেদনাময় আর্তি প্রকাশিত হয়েছে দাউদ হায়দারের কবিতায়। ছিন্নমূল মানুষ ও শোষিত সমাজ উঠে এসেছে ত্রিদিব দস্তিদারের কবিতায়। সকল অনাসৃষ্টির বিরুদ্ধে মানবমুক্তির পক্ষে তাঁর কবিতা। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের স্বপ্নবিভোর স্মৃতিকাতরতা ও অনুভূতিময়তা রূপায়িত হয়েছে আবিদ আজাদের কবিতায়। স্বদেশকে নিয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও স্বৈরশাসনের যন্ত্রণা ধরা পড়েছে শিহাব সরকারের অনুভবে। নাসির আহমেদের হৃদয় সংবেদী কবিতায় অবক্ষয় ও হতাশাময় বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গেছে প্রকৃতি ও নারী। আবু করিম সমাজ ও রাজনীতির পাশপাশি প্রেমের বেদনাকে মূর্ত করে তুলেছেন। পুরাণ ঐতিহ্য নিসর্গশোভা ও নারী প্রতিমার আশ্রয়ে রোমান্টিক বিষাদের জগৎ তৈরি করেছেন সৈকত আসগর। ইকবাল আজিজের প্রকৃতিকেন্দ্রিক রোমান্টিক কবিতার সঙ্গে মিশেছে বিজ্ঞানচেতনা। ইতিহাস ও ঐতিহ্য-সচেতন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায় ফুটে উঠেছে বাস্তবতার বেদনা ও ক্ষোভ : ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পরোনো শকুন।’ অবক্ষয় ও নেতি, স্বৈরাচার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া প্রতিবাদী-প্রতিরোধী রাজনৈতিক চেতনা জ্বলে উঠেছে মোহন রায়হানের কবিতায়। কামাল চৌধুরী রাজনীতি সচেতন ও সমকাল মনস্ক কবিতায় সৃষ্টি করেছেন নানামাত্রিক ব্যঞ্জনা।

এই দশকে স্বাধীনতা অর্জনের ভেতর দিয়ে মুক্তির যে হাওয়া বয়ে গিয়েছিল তার প্রভাবে বাংলা দেশের কবিতায় আবির্ভাব ঘটেছিল বিপুল সংখ্যক কবির। তাই দেখা যায় যাঁদের কথা এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে তার বাইরেও রয়ে গেছেন অনেক কবি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন : আলতাফ হোসেন, শহীদুজ্জামান ফিরোজ, শেখ তোফাজ্জল হোসেন, স্বপ্না রায়, দিলারা মেজবাহ, আতাহার খান, শান্তনু কায়সার, জরিনা আখতার, দীপংকর চক্রবর্তী, সৈয়দ মাহবুব, শিহাব সরকার, সুজাউদ্দিন কায়সার, মুজিবুল হক কবীর, নাসরীন নঈম, মাসুদুজ্জামান, ফারুক মাহমুদ, খান মোহাম্মদ ফারাবী, কাজী ফয়সল আহমদ, বিমল গুহ, মাহবুব বারী, শামীম আজাদ, ইকবাল হাসান, ত্রিদিব দস্তিদার, আওলাদ হোসেন, জাহাঙ্গীরুল ইসলাম, আবুল আহসান চৌধুরী, শামসুল ফয়েজ, এ কে শেরাম, শফিক আলম মেহেদী, মোরশেদ শফিউল হাসান, ফজলুল কাশেম, দুলাল সরকার, শাহানা মাহবুব, হাফিজুর রহমান, কাজলেন্দু দে, দিলারা হাফিজ, শুভেন্দু ইমাম, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, আশরাফ মীর, মাহবুব হাসান, মোস্তফা মীর, মাহমুদ শফিক, হারুন রশীদ, বাবু ফরিদী, সৈকত রহমান, ইকবাল আজিজ, তৌহিদ আহমেদ, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, মুস্তাফা মজিদ, ব্রজগোপাল রায়, শিশির দত্ত, আবসার হাবীব, তপংকর চক্রবর্তী, সোহরাব হাসান, হালিম আজাদ, আশরাফ আহমদ, শাহাবুদ্দীন নাগরী, হাসান হাফিজ, নুরুনন্নাহার শিরীন, জাহিদ হায়দার, ফরিদ আহমদ দুলাল, সোহরাব পাশা, মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, দীপঙ্কর মাহমুদ, ফজল মাহমুদ, রফিক জাহাঙ্গীর, নাসিমা সুলতানা, সাব্বির রেজা, জাফর ওয়াজেদ, দুখু বাঙাল, মাহমুদ কামাল, ওয়াহিদ রেজা, আসাদ মান্নান, খালিদ আহসান, মুহাম্মদ সামাদ, আসলাম সানী, সলিমুল্লাহ খান, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, হোসেন সোহরাব, এম এ বাশার, গোলাম ফারুক খান, অনীক মাহমুদ, শামসুল ইসলাম তালুকদার, রেজা সেলিম, সৈয়দ আল ফারুক, আহমদ আজিজ, মুজাহিদ শরীফ, সিলভী মমতাজ, মনজুরুর রহমান, মিনার মনসুর, রামু সাহা, আশুতোষ ভৌমিক প্রমুখ।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj