বিশ্ব বেতার দিবসে ভাবনা

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

রেডিও সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও জনপ্রিয় গণমাধ্যম। জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, তা হোক সংকটে বা দুর্যোগে, বিশেষত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রেডিওর প্রেরণাদায়ক ভূমিকার কথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন। একাত্তরে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ ও বিবিসির সংবাদ রণাঙ্গনে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ধমনীতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল, তেমনি অবরুদ্ধ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রাণে জাগিয়ে রেখেছিল স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। সেদিন গণমাধ্যম হিসেবে রেডিওর শক্তি ও সম্ভাবনার দিকটি সবার কাছে উন্মোচিত হয়েছিল।

রেডিওর সুবিধা হলো এই মাধ্যম সহজে এবং দ্রুত ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ও দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের জন্য দৈনিক সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশনের পরিবর্তে প্রত্যন্ত এলাকার ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে এখনো রেডিওর ওপর নির্ভর করতে হয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুবাদে অন্যান্য খাতের মতো রেডিওর ক্ষেত্রেও এসেছে নজরকাড়া পরিবর্তনের ছোঁয়া। অনুষ্ঠানের মান, বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা, উপস্থাপনার ঢং ও প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারের ফলে রেডিও গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতায় নিজেকে নতুন করে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। মোবাইলের ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে মানুষকে এখন আর নতুন করে রেডিও সেট কিনতে হচ্ছে না, সব মোবাইল ফোনেই এফএম রেডিও শোনার সুবিধা থাকায় মানুষ মোবাইল ফোনেই রেডিও শুনতে পারছে। আবার চাইলেই যখন খুশি তখন কল করে কিংবা এসএমএএস-এর মাধ্যমে প্রশ্ন ও অভিমত জানাতে পারছে। শুধু প্রান্তিক এলাকায়ই নয়, ব্যস্ত নাগরিক জীবনেও রেডিও হয়ে উঠেছে তথ্যপ্রাপ্তি ও বিনোদনের নির্ভরযোগ্য উৎস। একজন ব্যস্ত নাগরিক পথে বসেই জানতে পারছেন দেশের সবশেষ হালচাল, যানজট পরিস্থিতি, আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা এমন কি বাজার দরও। সুতরাং, যারা ভাবছেন স্যাটেলাইটের দাপটে রেডিও পিছু হটছে, তাদের ধারণা যে নিতান্ত অমূলক তা উল্লেখ না করলেও চলে।

‘আগামীর বাংলাদেশ হবে রেডিওর বাংলাদেশ’- এই স্লোগানের সত্যতা মেনে নিয়ে ও উন্নয়নে রেডিওর অপরিসীম সম্ভাবনার দিকটি যথার্থভাবে বিবেচনা করে সরকার ইতোমধ্যে ২৮টি প্রাইভেট এফএম এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে। এ ছাড়া সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায বাংলাদেশ বেতার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১২টি আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্র ও ৩৫টি এফএম পরিচালনা করছে। ২০০৮ সালে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত ‘কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা’ ও ২০১০ সালে কমিউনিটি রেডিওর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে বস্তুতপক্ষে বেতার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটেছে। ঘোষিত নীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণমাধ্যমের এই মৌলিক ধারার অফুরন্ত সম্ভাবনা উন্মোচন করার জন্য রেডিওতে কমিউনিটির বহু বিচিত্র কণ্ঠস্বর সম্প্রচারের পথ খুলে দেয়া। সমাজের পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, বিশেষ করে উপক‚লীয় এলাকায় মানুষের দুর্যোগের সঙ্গে টিকে থাকা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উন্নয়নে সহায়ক শক্তি হিসেবে রেডিও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে- এ রকম ধারণা থেকে ২০০৯ সালে সরকার প্রাথমিকভাবে ১৪টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের অনুমতি দেয়। পরবর্তীতে আরো ২টি রেডিও স্টেশন যুক্ত হয়ে বর্তমানে দেশের ১৫টি জেলায় ১৬টি কমিউনিটি রেডিও নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। দেশের কমিউনিটি রেডিওগুলোর সহায়তাকারী সংস্থা বিএনএনআরসির (বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কম্যুনিকেশনের) সাম্প্রতিক এক জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, ১৬টি রেডিও স্টেশন বর্তমানে প্রতিদিন সর্বমোট ১২৫ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। এই স্টেশনগুলোতে বর্তমানে আট শতাধিক যুবা ও যুবনারী কর্মরত। এদের শতভাগ স্থানীয় পর্যায়ের, যাদের আবার অর্ধেকেরও বেশি যুবা নারী। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এভাবে একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় খাত সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা বিশ্লেষণে দেখা যায, দেশের প্রান্তসীমার যে মানুষগুলোর কথা একদিন গণমাধ্যমে বিশেষ করে রেডিওতে শোনার বিষয়টি ছিল নিছক সোনার পাথর বাটি তা এখন বাস্তব রূপ লাভ করেছে। কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখন নিজেদের সমস্যা-সম্ভাবনার কথা নিজেরাই নিজেদেও ভাষায় বলতে পারছে। স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্যবিমোচন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, মানবাধিকার ও নারী ক্ষমতায়ন, যৌতুক ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ অর্থাৎ স্থানীয় উন্নয়ন সম্পর্কিত সব ইস্যু এখন উঠে আসছে গণমাধ্যমে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়ও প্রান্তিক মানুষের একটি বড় ভরসাস্থল এখন কমিউনিটি রেডিও। নিকট অতীতে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ আঘাত হানার সময় যখন উপক‚লের অনেক এলাকা ছিল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, তখন উপক‚লবর্তী কমিউনিটি রেডিও স্টেশনগুলো ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচার চালু রেখে মানুষকে ঝড়ের সর্বশেষ সংবাদ জানিয়েছে। কমিউনিটি রেডিওতে আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা জানতে পেরে বহু জেলে সমুদ্র থেকে ফিরে এসে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছে এ রকম দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক।

দুই. ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘ ঘোষিত ৫ম বিশ্ব বেতার দিবস। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব বেতার দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। দিবসটি উদযাপনে নানান অনুষ্ঠানমালায বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিও স্টেশনগুলো সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। ৫ম বিশ্ব বেতার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : ‘দুর্যোগ ও জরুরি আপদকালীন সময়ে রেডিও’। দুর্যোগকালীন যে কোনো জরুরি পরিস্থিতির আগে বা পরে ও দুর্যোগকালীন সময়ে রেডিও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসাবে ভূমিকা রাখে। এই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের যে উপ-ধারণাগুলোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে, সেগুলো হলো- ১. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দুর্যোগ-সহনীয় হওয়া বাঞ্ছনীয় ২. রেডিও দুর্যোগে বেঁচে-যাওয়া ও বিপদাপন্নদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে তাদের মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখা ও নেতিবাচক সংবাদ ও গুজব পরিহার করে নতুন করে বাঁচার আশাবাদ সৃষ্টি করা ৩. রেডিও সর্বস্তরের জনগণের তথ্যে প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত করে সামাজিক প্রভাব সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা, ৪. রেডিও জীবন বাঁচায়-রেডিও পূর্বাভাস সম্প্রচার, দুর্যোগ কবলিত জনগোষ্ঠীকে তাৎক্ষণিক বার্তা ও তথ্য প্রদান এবং মানবিক সাহায্যদানকারী সংস্থাগুলোকে সাহায্য দানে এগিয়ে আসতে ভূমিকা রাখে, ৫. দুর্যোগকালীন জরুরি অবস্থায় রেডিও সম্প্রচার তরঙ্গও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে এ ক্ষেত্রে রেডিও সম্প্রচার তরঙ্গ নিরাপদ রাখার জন্য পরিকল্পনা হাতে নেয়া।

বিশ্ব বেতার দিবসের প্রাক্কালে উপরোক্ত প্রতিপাদ্য বিষয় ও ধারণাগুলো বিবেচনায় নিয়ে আসুন আমরা সবাই মিলে রেডিও উৎসব উদযাপন করি। এ বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ যে, এখনো গণমাধ্যম হিসেবে কেবল রেডিও তথ্য পরিবেশন, সংবাদ প্রদান এবং বিনোদনের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।

সৈয়দ কামরুল হাসান : লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj