রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি রাজশাহীতে নির্মিত দেশের প্রথম শহীদ মিনারের

রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে ভাষার দাবিতে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। একুশ কিন্তু শুধুমাত্র স্বজন হারানোর বেদনায় সিক্ত একটি দিন নয়। তা আমাদের স্বতন্ত্র জাতি গঠনের অনুপ্রেরণায় বিপ্লবী চেতনার বহ্নিশিখাও। অন্যায় ও অপশক্তির কাছে বাঙালি জাতি কখনো মাথানত করেনি। বাহান্ন ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তাই প্রমাণ করে। বাঙালি জাতির রক্তে রয়েছে প্রতিরোধের আগুন। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে বুকের রক্ত ঢেলে দিতেও এই জাতি কখনো দ্বিধাবোধ করে না। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারাদেশ ছিল উত্তাল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এই ঘোষণার পরপরই ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহীতেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা এর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। ঢাকার কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে রাজশাহীতেও দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন কর্মসূচী। রাজশাহী কলেজ ছিল এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর রাজশাহীতে সে সময় ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজ উদ্দিন আহমদ, যুদ্ধপরাধ ট্রাইব্রুনালের চিফ প্রসিকিউটার গোলাম আরিফ টিপু, মোহাসিন প্রমাণিক, ডাক্তার এস এম গাফ্ফার, সাঈদ উদ্দিন আহমদ প্রমুখ।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। রাজশাহীতেও আন্দোলন চলছে। ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজশাহীতে খবর পৌঁছে যে ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। অনেক ছাত্র আহত ও নিহত হয়েছেন। এই খবর আসার পরপরই কয়েকশ ছাত্র-জনতা রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে জমায়েত হন। তারা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। এ সময় রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের একটি কক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে শহীদদের স্মরণে হোস্টেল প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুসারে উপস্থিত ছাত্ররা এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন। রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলের এফ ব্লুকের সামনে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়। ছাত্ররা আশপাশ থেকে ইট-বালু সংগ্রহ করে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করেন। স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ শেষে একটি কাগজে লেখা হয় ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সময় চারদিক থেকে পুলিশ ঘিরে রেখেছিল। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ এই স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলেন। এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণের সময় সে সময় নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন, মোহাসিন প্রমাণিক, এস এম গাফফার, গোলাম আরিফ টিপু, ড. আব্দুল লতিফ, সাঈদ উদ্দিন আহমদ, হাবিবুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক খান চৌধুরী, এড. আব্দুর রাজ্জাক (স্কুল ছাত্র), মোশারফ হোসেন আখুঞ্জি (স্কুল ছাত্র)সহ অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এই সব ভাষা সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভটি দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কারণ ঢাকার কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারটি নির্মাণ হয় ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে নির্মিত হয় দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কিন্তু আজো এই শহীদ মিনারটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।

২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম এই শহীদ মিনারটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানায় ‘চেতনায় একুশ’ নামের সংগঠনটি। তারা ভাষা সৈনিকদের নিয়ে সে সময় রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই জায়গাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান। সে বছরই প্রথম ২১ ফেব্রুয়ারিতে এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ‘চেতনায় একুশ’সহ রাজশাহীর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। পরবর্তীতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও রাজশাহী কলেজ প্রশাসন যৌথভাবে এখানে একটি স্মৃৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দেন। রাজশাহীর ভাষা সৈনিকসহ রাজশাহীবাসীর দাবি অবিলম্বে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান।

পারভেজ আহমেদ পাপেল : ভাষাসৈনিক এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাকেরর পুত্র।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj