‘বাসি’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং তারপর…

শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

সাধারণত সরকারি গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকা। এবার সরকারিভাবে ঘোষণার প্রায় এক সপ্তাহ আগেই তালিকা ফাঁস হয়ে যায়। এরপর থেকেই ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৪’র মনোনীতদের তালিকা দেখে শুরু হয় বিতর্কের। বিতর্ক আরো জোরালো হতে থাকে গত বৃহস্পতিবার সরকারি গেজেটের মাধ্যমে পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকা প্রকাশিত হবার পর। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে লক্ষ্য করা যায় জোর সমালোচনা। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা/ অভিনেত্রী/ শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার/ শ্রেষ্ঠ সুরকার-এই বিষয়গুলোকে ঘিরেই বেশি সমালোচনামুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের পোস্ট ও মন্তব্য। চিত্রনায়িকা আরিফা জামান মৌসুমী আবারো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়ালেন। বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এ পুরস্কার তিনি দ্বিতীয়বার পেয়েছিলেন ‘দেবদাস’ ছবিতে পার্বতী চরিত্রের জন্য, আর তাতেই গত বছর দেখা দিয়েছিল বিতর্ক। সিনেমাটির অন্য অভিনেত্রী অপু বিশ্বাস সে সময় দাবি করেছিলেন, ছবিটির মূল অভিনেত্রী ছিলেন না মৌসুমী। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৪’র ক্ষেত্রেও। তবে তালিকা ফাঁস হবার পর থেকেই অনেকে মৌসুমীর পুরস্কার পাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে সমালোচনা করেন। তালিকায় দেখা যায়, মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘তারকাঁটা’ সিনেমার জন্য মৌসুমী সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাচ্ছেন। তার সঙ্গে যৌথভাবে একই বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন বিদ্যা সিনহা মিম। তিনি অভিনয় করেছেন খালিদ মাহমুদ মিঠু পরিচালিত ‘জোনাকির আলো’ চলচ্চিত্রে। কথা উঠেছে ‘তারকাঁটা’য় মৌসুমী অভিনীত চরিত্র নিয়ে। কারণ ওই সিনেমায় তাকে দেখা যায় আরিফিন শুভর বড় বোনের চরিত্রে। শুভর বিপরীতে ছিলেন মিম। অনেক দর্শকের মন্তব্য, মৌসুমীর চরিত্রটি এ পুরস্কার পাওয়ার মতো গভীর নয়। একই বছর মুক্তি পাওয়া উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো- সিমলা অভিনীত ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’, সোহানা সাবা অভিনীত ‘বৃহন্নলা’ ও অপর্ণা ঘোষ অভিনীত ‘মেঘমল্লার’। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৩’তে ‘দেবদাস’ সিনেমার জন্য মৌসুমী যৌথভাবে ‘মৃত্তিকা মায়া’ অভিনেত্রী শর্মিমালার সঙ্গে পুরস্কার পান। ওই সময় ‘দেবদাস’ সিনেমায় পার্বতী চরিত্রে অভিনয়কারী অপু বিশ্বাস অভিযোগ করেন, ওই সিনেমার প্রধান চরিত্র পার্বতী, কোনোভাবে দ্বিতীয় চরিত্র চন্দ্রমুখী অভিনেত্রী সেরার পুরস্কার পেতে পারেন না। বেশ জল ঘোলা এ বিষয়টি নিয়ে। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৪’ ঘোষণা হবার পর শুধু অভিনেত্রীর ক্ষেত্রেই নয়, শ্রেষ্ট চলচ্চিত্র, সেরা অভিনেতা এ সমস্ত ব্যাপারেও ফেসবুকে নানা সমালোচনামূলক মন্তব্য প্রকাশ করেছেন অনেকেই। বিশেষ করে ‘এক কাপ চা’ সিনেমার জন্য ফেরদৌস পাচ্ছেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার। অনেকেই মন্তব্য করেছেন- এই ছবিতে ফেরদৌসের অভিনীত চরিত্র আহামরি কোনো চরিত্র ছিলো না যা তাকে জাতীয় পুরস্কার এনে দিতে পারবে! সবচেয়ে বেশি সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে কবি নির্মলেন্দু গুণ অভিনীত এবং মাসুদ পথিক পরিচালিত ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ চলচ্চিত্রটি এবার সর্বোচ্চ পাঁচটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পাবার পরও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার না পাবার জন্য। এই চলচ্চিত্রটির জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক ড. সাইম রানা, শ্রেষ্ঠ গায়িকা মমতাজ, শ্রেষ্ঠ গীতিকার- মাসুদ পথিক, শ্রেষ্ঠ সুরকার- বেলাল খান, শ্রেষ্ঠ মেকআপম্যান হিসেবে আবদুর রহমান জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। অথচ এতোদিন মুরাদ পারভেজ তার পরিচালিত চলচ্চিত্র‘বৃহন্নলা’-কে নিজের কাহিনী হিসেবে দাবী করলেও এটি নাকি সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘গাছটা বলেছিল’ ছোটগল্প থেকে নেওয়া! আর এই বৃহন্নলা চলচ্চিত্রটি একাধারে সংলাপ, কাহিনি এবং শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র – তিনটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন এবং গান লিখেছিলেন কবি অসীম সাহা । তার ফেসবুকে বেশ কয়েকটি পোস্টে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’র সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন-‘বাহ! বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারদাতাগণ! লজ্জা! লজ্জা!!’ (কাহিনি-চোর পুরস্কৃত)। এছাড়াও তিনি আরো লেখেন,‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’-র সত্যি মহাপ্রয়াণ ঘটেছে। কবি নির্মলেন্দু গুণকে কলা দেখিয়ে, মাসুদ পথিককে মুলো দেখিয়ে এবং আমাকে ক্ষুর দেখিয়ে পুরস্কারের ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে গেছে। সাব্বাশ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-বিচারকগণ!! শুধু অসীম সাহাই নন, ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৪’-র মনোনয়ন তালিকা প্রকাশ হবার পর নানানভাবে সমালোচনা করেছেন সাধারণ শ্রেণীর দর্শকরাও। একজন দর্শক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন- ‘ভবিষ্যতে যারা সিনেমায় নামবে, তাদেরকে এখনই একটা করে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দিয়ে রাখা উচিত। কী দরকার শুধু শুধু অনর্থক বিলম্বে!’ অনেকে সমালোচনা করলেও কিছু দর্শক আবার পুরস্কার নিয়ে এতো সমালোচনা তৈরি হওয়ায় বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে একজন ফেসবুকে লিখেছেন-যারা পুরস্কার পাচ্ছেন তাদের জন্য এতো প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকাআঁকি কেন? পুরস্কার কে পাবে, কার কাজ মানুষ গ্রহণ করবে, সেটা সৌভাগ্য। সেই সৌভাগ্য উপর থেকে নির্ধারণ হয়।’ উল্লেখ্য, আগামী ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৪’ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

:: শ্রাবণী হালদার

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj