আমার গল্পকে সবার থেকে আলাদা করতে চেয়েছি : জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

শুক্রবার, ৪ মার্চ ২০১৬

দীনা আফরোজ : দাদা, ‘পরমাত্মীয়’ গল্প দিয়েই শুরু করতে চাই। এটি একটি শক্তিশালী গল্প। গল্পটির বহু তল আছে, ভাষার জাদুময়তা তো রয়েছেই। গল্পটিতে সাইদ এবং শ্রীমন্ত, দুটি ধর্মের অনুসারী দুই বন্ধুর সম্পর্কের আড়ালে দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে হয়। গল্পটির মূল ম্যাসেজ আসলে কী?

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত : পাঠক গল্পটি পড়ে যা মনে করে সেটিই ধ্রæব। বলছেন, গল্পটির বহু তল আছে। পাঠক যদি সবকটি তলের খবর নাও পান এটি তো নিশ্চয় বোঝেন যে জীবন যতো আশার কথা বলুক, যতো স্বপ্ন দেখাক, বঞ্চিতের কাছে কিছুই শেষ পর্যন্ত ধরা দেয় না। যে যতোই ভিন্নপথে চলুক না কেন, এই বঞ্চনাই তাদের পরম আত্মীয়তার সূত্রে বাঁধে। তবে পাঠককে বহু তলের সিঁড়ি দিয়ে বিচরণ করতে দেয়াই ভালো। হ্যাঁ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা তো ‘সাইদ’ আর ‘শ্রীমন্ত’ রূপকে হাজির রয়েছে।

দীনা : লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার বিচিত্র পেশার কোনো প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন?

জ্যোতিপ্রকাশ : প্রভাব তো কোনো না কোনোভাবে থেকেই যায়। আছেও হয়তো। তবে সব গল্পের প্রধান চরিত্রে লেখকই যে জড়িত এমনটি মনে করার সঙ্গত কারণ নেই। কারো ক্ষেত্রেই নয়। কিছু কল্পনা আর বাস্তবতার মিশেলেই তো গল্প। স্কুলে বন্ধুবান্ধবসহ হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ নাকি কলেজ বার্ষিকীর জন্যে গল্প, কবিতা, রম্যরচনা যা-ই লিখেছি, স্বনামে-বেনামে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন বার্ষিকীর ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক। আত্মবিশ্বাস এসেছিল তখন। বেশি প্রভাব সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে সেবাব্রত চৌধুরী, হায়াৎ মামুদ, হুমায়ুন চৌধুরী, শামসুল হকদের সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করা। এনামুল হক সম্পাদিত দ্বিমাসিক ‘উত্তরণ’-এ আমি সহকারী সম্পাদক ছিলাম। প্রভাব বলতে এসবই।

দীনা : আপনার গল্প মানেই কবিতার ছোঁয়া। জাদুময়তা। এরূপ গল্প সৃজনের পূর্বপরিকল্পনা ছিল?

জ্যোতিপ্রকাশ : না না, পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। গল্প লিখতে গিয়েই পরিকল্পনা মাথায় আসে। নিজেকে পৃথক করে উপস্থাপনের চেষ্টা ও চিন্তা থেকে। গতানুগতিক, বর্ণনাধর্মী গল্প তো অনেকেই লিখছেন, লিখে থাকেন। আমি চেয়েছি, আমার গল্পের প্রথম প্যারা বা অনুচ্ছেদেই যেন এমন রসদ থাকে, যা পাঠককে গল্পের গভীরে টেনে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্বসাহিত্যের দিকে দেখো, ম্যাজিক রিয়েলিজমে গল্প সৃজিত হয়েছে। আমি এমনটিই চেয়েছি।

দীনা : গল্প নিয়েই থাকলেন সারাজীবন, এটা দৃষ্টান্ত। আপনার কী মনে হয়?

জ্যোতিপ্রকাশ : আমি তো একটি রহস্য-উপন্যাস দিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত গল্পই লিখছি। এ কথা অনেকেই জানতে চান উপন্যাস লিখছি না কেন। আমি আসলে ঢাউস আকাশের উপন্যাস লিখতে চাইনি। বর্তমান যান্ত্রিক বাস্তবতায় পাঠকের হাতে অত সময়ও নেই। তাছাড়া বড় উপন্যাস বহন করাও কষ্টসাধ্য। মজার ব্যাপার হলো উপন্যাসের পরিকল্পনা করতেই অনেক সময় অতিবাহিত হলো। গত বছর চারটি ছোট উপন্যাস লিখেছি, এ বছর এর মধ্যে তিনটি প্রকাশিত হয়েছে। যাকে আমি ‘ছোট উপন্যাস’ বলছি। কাকতালীয়ভাবে উপন্যাসের প্রত্যেকটিই ৬৪ পৃষ্ঠার। দু’লাইনেও যদি একটি পরিচ্ছদ শেষ হয়েছে, তো ওই পৃষ্ঠায় আর কিছুই নেই। এভাবেই লিখছি। যদিও এই নামে পূর্বে প্রকাশিত গল্প রয়েছে। এটি তারই সম্প্রসারিত রূপ। আরো কিছু গল্প জুড়ে দিয়েই এই ছোট উপন্যাসের জন্ম। এটি পরিকল্পিত বলতে পারেন। এগুলো আকার ছোট কিন্তু উপন্যাসের বিস্তৃত পটভূমি এখানে আছে। ভাষা একদম আলাদ, রচনা ও শিল্পকৌশলের ব্যবহার ভিন্ন। আরো দু-তিনটা লিখব। ‘সময় ভোলে না কিছু’ নামে আমার একটি স্মৃতিকথা আছে। সেখানে অবশ্য বহু কিছু বাদ পড়েছে। ‘বহে নিরন্তর’ নামে অন্যদিনে স্মৃতিকথার একটি অংশ প্রকাশিত হয়েছে। এবার ধারাবাহিকভাবে লিখব।

দীনা : অনেক তরুণ গল্পকারের পূর্বসূরিই আপনি, জানেন?

জ্যোতিপ্রকাশ : ঠিক জানি না, তবে চেয়েছিলাম এমনটিই হোক।

দীনা : অভিযোগ নয়, আপনি সাধারণত প্রমিত ভাষা ব্যবহার করলেও আপনার সৃজিত ভাষার যে অন্তর্গত টান, তা কিন্তু প্রায় সাধুভাষা ছুঁয়ে যায়। কীভাবে দেখেন?

জ্যোতিপ্রকাশ : আসলে আমি এমন একটি গল্পভাষা সৃষ্টি করতে চাইছিলাম তা অন্যদের থেকে পৃথক হবে। আপনার কথা আমার সেই চাওয়াটিকেই সমর্থন করছে। তবে আমার গল্পে তৎসম শব্দের ব্যবহার বেশি থাকে ঠিক কিন্তু সেই সঙ্গে প্রচুর তদ্ভব শব্দের ব্যবহারও আছে; আছে দেশি, বিদেশি শব্দেরও। যখন যেমন প্রয়োজন হয়। এ কারণে প্রমিত ভাষা ব্যবহার করলেও টানটা সাধুভাষার দিকে মনে হতেই পারে। কিন্তু এর বিপরীত দিকটা ভাবুন। প্রমিত ভাষা ব্যবহার করছেন, অথচ তার টানটা বইছে আঞ্চলিক ভাষার দিকে- খুব সুখকর হবে কি? আমার গল্পকে সবার থেকে আলাদা করতে চেয়েছি, এটাই আসল কারণ।

দীনা : আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

জ্যোতিপ্রকাশ : আঞ্চলিক ভাষা অবশ্যই ব্যবহার করা যাবে, তবে তা হওয়া উচিত সৃজিত চরিত্রের বয়ানে। তাহলে আর কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু মিশ্রিতরূপ হলে তা অবশ্যই এক ধরনের দুর্বলতা নির্দেশ করে। আমি প্রায়ই বলে থাকি, এই সেদিন একটি টিভি প্রোগ্রামে বলেছি, আমরা যতই প্রমিত ভাষা ব্যবহারের কথা বলি না কেন, ভাষা বদলানো সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলা ভাষাকে প্রমিত দাবি করেন। আসলে তাদের রাষ্ট্রে বাংলা ভাষা তো একটি আঞ্চলিক, প্রাদেশিক ভাষা বৈ নয়। আমরা বাঙালি-বাংলাদেশিরা দাবি করতে পারি বাংলা আমাদের ভাষা।

দীনা : আপনার প্রথম দিককার গল্পে শিকড়লগ্নতা থাকলেও, দ্বিতীয় পর্যায়ের গল্পে বিদেশি সাহিত্যের ছাপ বেশি। উপমার জায়গায় সাঙ্কেতিকতার ব্যবহার রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা আপনি বরাবরই ইশারায় দিয়ে থাকেন। বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে আনা যেত না?

জ্যোতিপ্রকাশ : ঠিক বুঝি না কীভাবে আসবে। গল্পের প্রয়োজনেই এই সাঙ্কেতিকময়তা। আমার পরের গল্প যেমন, ‘ফিরে যাও জ্যোৎস্নায়’, ‘যে তোমায় ছাড়ে’, ‘নামহীন ফিরিবে সে নীল জ্যোৎস্নায়, ‘জলজকুসুম, ‘হিম চন্দ্রাতপে’ ইত্যাকার গল্পে বাংলাদেশের মানুষের কথাই লেখা, সামাজিক ও রাজনৈতিক পেষণের কথাও বলা হয়েছে। সব গল্পেই শিকড়লগ্নতা রয়েছে। বলতে পারি সময়, অভিজ্ঞতা ও মানসিক পরিণতি পরের গল্পগুলোকে ভিন্ন আবহে স্থাপন করেছে। যাকে বিদেশি সাহিত্যের ছাপ মনে হতেই পারে। দীর্ঘকাল বিদেশে, বিদেশের জীবন ও বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত, তার কিছু ছাপ পড়তেই পারে। যদিও ভাবি কেন এমন মনে হয় না যে আমাদের বাংলা ভাষার কিছু বিশুদ্ধ বাঙালি লেখক মানসিক পরিণতি ও রচনাশৈলীর এমন স্তরে পৌঁছেছেন যে তাঁদের রচনাশ্রিত জীবনচেতনা ও বোধ বিদেশি সাহিত্যের সমান্তরাল বলে ভ্রম হয়! বিদেশি লেখায় সাব অলটার্ন, ম্যাজিক রিয়েলিজম তো আছেই বাংলাদেশের গল্পেও কি আগে থেকেই ছিল না?

দীনা : অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ রচনা করার পরই তো তা বিশ্লেষণে ম্যাজিক রিয়েলিজম, সাব অলটার্ন তত্ত্বের ব্যবহার পাওয়া গেছে। তিনি তো অন্তজ শ্রেণির দুঃখগাথা তুলে ধরেছেন। কিংবা মানিকের কথাও বলা যেতে পারে। আবার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রমুখ লেখকদের গল্পেও এ প্রপঞ্চের উপস্থিতি বিদ্যমান।

জ্যোতিপ্রকাশ : সে কথাই বলছি। প্রকৃত সাহিত্য সৃজন করতে হলে এসব উপাদান এমনিতেই চলে আসবে। আসলে আগে রচনা পরে তার বিশ্লেষণ। বাংলা সাহিত্যও যে আন্তর্জাতিক এটা বুঝতে দেরি করা ঠিক নয় কিন্তু তেমনটিই হয়েছে। আর এসব হয়েছে প্রচারের অভাবে।

দীনা : আপনার গল্প বুঝতে গেলে সিরিয়াস পাঠক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। পাঠকের সঙ্গে হৃদ্যতার বিষয়টা ভাবেন কি?

জ্যোতিপ্রকাশ : খুব-ই ভাবি। ভাবি বলেই চেষ্টা করি, গল্প পাঠের শুরুতেই যেন পাঠক আকর্ষণ বোধ করে। পরে গল্পের গভীরে ঢুকে কিঞ্চিৎ অস্বস্তির মুখোমুখি হলেও সেটি যেন তার ঔৎসুক্য বাড়ায়। সদ্য প্রয়াত কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকেও এমনটি বলেছিলাম।

দীনা : দিদির সঙ্গে প্রণয়ের-প্রেমের কথা বলুন। না-কি দিদি বলবেন?

জ্যোতিপ্রকাশ ন: হাহাহা…। পূরবী বলো।

পূরবী বসু : দিদির আর কী কথা! বলছি তো। বিক্রমপুরের মেয়ে আমি। ভার্সিটিতে পড়ার সময় জ্যোতির সঙ্গে দেখা। তিন দিনের দেখার পরই তো বিয়ে। বিয়ের আগে তো প্রেম-টেম করার সুযোগই পেলাম না। হাহাহা….। বিয়ের পরই করছি। খুব ভালো আছি।

দীনা : আপনাদের বিয়ের গল্পটা শুনতে চাই।

পূরবী : জ্যোতির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেবের বাড়িতে। দেখা হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর ১৯৬৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রোববার আমাদের বিয়ে হয়। উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্য জ্যোতি তখন বিদেশ যাবে। কিন্তু যাওয়ার আগে সে নিশ্চয়তা পেতে চাইছিল, সে ফিরে আসা না পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করব এবং আমার পরিবার অন্যত্র আমার বিয়ের ব্যবস্থা করবে না। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, আমার তিন বছরের বড় বোন ইকনোমিক্সে ফার্স্ট ইয়ার এম এ পড়ে। আমি বিয়ের কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। তখন শিক্ষাবিদ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু হায়াৎ মামুদের উদ্যোগে সব আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের বিয়ে হয় মুন্সীগঞ্জে, আমাদের বাড়িতে। ঢাকা থেকে বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন শিক্ষাবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা, হায়াৎ মামুদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, এখলাসউদ্দিন আহমদ, করুণাময় গোস্বামী প্রমুখ।

দীনা আফরোজ : হায়াৎ সারের কাছে অনেক গল্প শুনেছি আপনাদের। মজার মজার সব ঘটনা। সেরা মজার ঘটনা জানতে চাই।

জ্যোতিপ্রকাশ : মজার ঘটনা তো বটেই। আমরা বন্ধু তো।

পূরবী : নিজের আত্মীয়দের চেয়েও বন্ধুকে অনেক সম্মান ও মর্যাদা দেয় জ্যোতি। আর হায়াৎ আমাদের খুব কাছের মানুষ। বাংলাদেশে এলেই ওর বাসায় আগে ছুটে যাই। ভাবির সঙ্গে আড্ডা দিই। তো আমার বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ছে। আমার দিদিকে দেখিয়ে হায়াৎ জ্যোতিকে বলেছিল, কিরে উনাকে আগে দেখিস নি? হাহাহা…। দিদিকে আগে দেখলে আমার সঙ্গে জ্যোতির বিয়েটা বোধ করি হতো না, কি বলো জ্যোতি? হা..হা..হা…।

দীনা : দাদা, দুই বন্ধু একই সঙ্গে একুশে পদক পেলেন, কেমন বোধ করছেন?

জ্যোতিপ্রকাশ : রাষ্ট্র আমাকে একুশে পদকে সম্মানিত করেছে সার্বিকভাবে সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতির জন্য। আমি গর্বিত এবং আনন্দিত হয়েছি। আর দুই বন্ধু, আমরা একই সঙ্গে সাহিত্য চর্চা করেছি। এখনো বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট, অন্যরকম আনন্দ হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।

দীনা : সমকালীন লেখকদের গল্প পাঠ করেন কি? কীভাবে দেখছেন লেখাগুলো?

জ্যোতিপ্রকাশ : পাঠ তো করতেই হয়। যেগুলো পাই পাঠ করি। অনেকেই ভালো লিখছেন।

দীনা : সময় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আপনাদের।

জ্যোতিপ্রকাশ ও পূরবী : ধন্যবাদ তোমাকেও দীনা, যোগাযোগ রেখো। মাঝেমধ্যেই আমরা আসি, এলে আবারো দেখা হবে। ততদিন ভালো থেকো। বেশি করে পড়বে আর লিখবে। আশীর্বাদ রইল।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj