অতিদীর্ঘ এক কবিতার কথা: জ্যো তি প্র কা শ দ ত্ত

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল ২০১৬

‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’ একটি দীর্ঘ কবিতা। বরং বলা যাক, একটি অতিদীর্ঘ কবিতা।

পাঁচটি ‘সর্গ’ আছে কবিতাটিতে। প্রতিটি সর্গ একান্নটি স্তবকের সমাহার। প্রতিটি স্তবকের দুটি অংশ। ‘ক’ ও ‘খ’। প্রতিটি স্তবকে চরণ সংখ্যা পনেরো, দুই একটিতে কম-বেশিও আছে। অন্যূন সাত হাজার ছয়শ’ পঞ্চাশটি চরণ বা পঙ্ক্তি আছে এই কবিতাটিতে। অতিদীর্ঘ নিঃসন্দেহে। নিঃসন্দেহে বিস্ময়ের।

তাহলে কি কবিতাটিকে অন্য কোনো অভিধায় চিহ্নিত করা প্রয়োজন? ‘সর্গ’ ভাগ ও অতি সুশৃঙ্খল স্তবক-অনুস্তবকের গঠন ও পঙ্ক্তিসজ্জার পরিকাঠামো (১/২/৩-২/১/৩/১/২ অথবা ২/১/৩/১/২-১/২/৩ অথবা ১/২/৩-১/২/৩/১/২/৩) পাঠককে আরো উচ্চতর কোনো কাব্যরীতির কথা মনে করাবে-‘মহাকাব্য’। খুব বেশি আলোচনায় না গিয়ে বা ‘মহাকাব্য’-এর সংজ্ঞা ইত্যাদির যথাযথ চিহ্ন আবিষ্কারের চেষ্টা না করেও বলা যায় ‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’ মহাকাব্য সদৃশই। সোজা কথায় জগৎ, জীবন, মৃত্যু-সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় এবং এইসব ধারণার সীমায় যা বিন্যস্ত করা যায় সবই মহাকাব্যে ধরা থাকে! আছে আরো কিছু ল²ণও মহাকাব্যের।

‘আরেকটু ভেতরে গিয়ে সৌরবিশ্ব ছেড়ে মহাবিশ্বের কথা তুললে বলা যায় যে, এই অনাবিল শূন্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নক্ষত্রগুলোই আলোর উৎস, শক্তির আধার। ছায়াপথে বিভিন্ন বিন্যাসে অবস্থান করে ছায়াপথেরই পেটের ওপর দিয়ে নিরন্তর ঘুরছে এরা। তার মানে সূর্য শুধু নয়, শক্তির উৎস এইসব নক্ষত্রও। আমাদের জালে তাদের অস্তিত্ব ধরা পড়ে যেহেতু আমরা আছি। সেই অর্থে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রধান তিনটি চরিত্র- নক্ষত্র, নারী ও পুরুষ। এই গ্রন্থের উপযোগী করে তুলতে এরা যথাক্রমে নক্ষত্র, পাথর ও আমি রূপে উঠে এসেছে (ভূমিকা : নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ)।’ জগৎ কি জীবনের কোনো কথা তাহলে আর বাকি থাকে? ভাবলে বিস্ময় লাগে বৈকি, কি অনায়াসে এই কবিতায় হাসানআল আব্দুল্লাহ মানবজাতিসহ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং এ জন্য এই কবিতাটিকে মহাকাব্য বলাই সমীচীন।

তবুও কথা থাকে। অতিদীর্ঘ কবিতা, বর্ণাঢ্য বর্ণনা, ধীরোদাত্ত চরিত্রের অধিকারী নায়কতর কীর্তি কি শৌর্যবীর্য বর্ণিত হয় যে কবিতায়, বিস্তৃত জগৎ ও জীবন তার পটভূমি; জাতি, দেশ, বিশ্ব, মহাজগৎ সবই তারও অবয়বেও স্থান পায়। কেবল নায়কটিকে (আমি) সর্বদা অনুধাবন করা যায় না কি ধীরোদাত্ত চরিত্রটিও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়! সবচেয়ে বড় কথা, মহাকাব্যের নায়কের চরিত্রের একটি পরম দুর্বলতা থাকে, যা অবশেষে তার পতনের কারণ হয়। ‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’-এ তেমন দেখা যায় না। তবুও কিছু কিছু বিষয়ের বিবেচনায় হাসানআল আব্দুল্লাহ যে মহাকাব্যের ভূমিতে বিচরণাকাক্সক্ষী সেটি স্পষ্ট বোঝা যায়। সময়, দেশ, জাতি, বিশ্ব এবং পঞ্চভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) বিবেচনায় সেটি নিতান্ত অযথার্থও মনে হয় না।

দুই.

বাঙালি কাব্যামোদী দীর্ঘ কবিতাপাঠে কখনোই মনোযোগী নয়, সম্ভবত অভ্যস্তও নয়। মহাকব্যের প্রাচুর্য তাই বাংলার কাব্যাকাশে দেখা যায় না। প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন কি মধ্যযুগের পরে আধুনিক কালে মহাকাব্য চর্চাও তেমন পরিলক্ষিত হয় না। বাংলায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা বলি আমরা এই প্রসঙ্গে, দীর্ঘ কবিতা প্রসঙ্গে নবীনচন্দ্র সেন কি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়-এর কথাও মনে পড়বে অনেকেরই; যদিও আদি মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ কি ‘মহাভারত’-এর কথা বলবেন সকলেই। বস্তুত ‘রামায়ণ’-এর নায়ক রাম তাঁর ধীরোদাত্ত চরিত্র কি শৌর্যবীর্যের পাশাপাশি একরকম চারিত্রিক দৌর্বল্যের অধিকারী ছিলেন এই কারণে ‘রামায়ণ’ খুব সহজেই মহাকাব্যের মর্যাদা পায়। ‘মহাভারত’ও অমনি। বাংলা সাহিত্যে মধুসূদন ব্যতীত ‘মহাকাব্য’ রচনায় নিবেদিত কবি কায়কোবাদ, যদিও ‘মহাশ্মশান’-এর পাঠক আপামর জনসাধারণে পরিব্যাপ্ত নয়।

তবুও দীর্ঘ কবিতা রচনার ব্যাপারটি আলোচনায় থাকে। পৃথিবীর নানা সাহিত্য এমনকি বাংলা সাহিত্যেও দীর্ঘ কবিতা রচনার উদাহরণ, এই সাম্প্রতিককালেও, বিরল নয়। ‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’ এই ক্ষেত্রেও কাব্যামোদীকুলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।

আগের কথাতেই আবার ফেরা যাক। অতিদীর্ঘ কবিতা পাঠে অভ্যস্ত নই আমরা সকলে যারা কবিতা পাঠে কিছু পরিমাণ সময়ও ব্যয় করে থাকি। তাই সাত হাজার পঙ্ক্তির একটি কবিতা পাঠ একাসনে তো নয়ই দশাসনেও সম্ভবত সাধারণ বাঙালি কাব্যপাঠকের সাধ্যে কুলোয় না। ‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’ এ-কারণে হয়তো পাঠকের পাঠ্যতালিকায় না-ও থাকতে পারে, যদিও হাসানআল আব্দুল্লাহ মোটেই সেটি চাইবেন না। তাঁর কবিতার গঠনরীতি, সুসংহত শব্দের ব্যবহার, শব্দের লালিত্য, ব্যঞ্জনা পাঠককে আকর্ষণ করবেই, এই তাঁর বিশ্বাস। তাঁর কবিতার সম্পদ অজস্র চিত্রকল্পের সম্ভার, বর্ণিল ভাষারীতি, সমকালীন জীবনের সবকথা- দুঃখ, বেদনা, হতাশা, ক্রোধ সহজেই পাঠকের মনোলোক জারিত করে দেয়।

‘মহাসঙ্কোচনের কথায় আমাদের হৃদয় বিকল হয়ে যেতে চায়…বিজ্ঞানীরা

আশ্বস্ত করেন…আমার পাশেই সময়ের পাতা উল্টান বিশুদ্ধ কবিতার খাতা…

আমার পাশেই শতাব্দী হাত-পা তুলে দৌড়াতে থাকেন…মহাবিশ্বগুলো

নিয়মিত স্ফীত হতে হতে ক্রান্তিমান ঘনত্বের দিকে অগ্রসর হয়…শত

কোটি বছর দূরত্বে সেইসব অজানা সময় দিয়ে স্টিফেন হকিং আমাদের

তেমন উৎসাহিত করে তুলতে চান না…সেইসব দূরাবহ সময়ে হয়তো

মানুষের অস্তিত্বের, পাথর ও আমার সঞ্চারমান অবস্থানের গুরুত্ব শূন্য;

একথা জেনেই…জীবন ও যন্ত্রণার মাঝে বিন্দু বিন্দু সম্ভাবনা দোলা দিলেও

বিপর্যস্ত মহাবিশ্বগুলো নক্ষত্রমণ্ডল, গ্যালাক্সি বলয় নিয়ে টিকে থাকে…

খ)

পাথরের দেহ চুষতে চুষতে আমি, আর আমার শরীর মেখে নিতে নিতে

পাথর এসব বিচ্ছুরিত প্রাপ্তিতে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে…জটিল চিন্তার জট খুলে

আমরা তখন একে অন্যের তুমুল আলিঙ্গনে নত হয়ে যাই…আমাদের

মহাবিশ্ব তার তাবত সম্পদ নিয়ে অন্যান্য মহাবিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে

তখনও সাবলীল, ভোঁ কাট্টা ঘুড়ির মতো, শূন্যতায় ভাসে…সাথে নিয়ে

আলোর কণিকা…সাথে নিয়ে নক্ষত্র, উল্কাপিণ্ড, গ্যালাক্সি ও ব্লু্যাক হোল…’

(স্তবক : ৫০, সর্গ : ৫)

তিন.

‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। সাময়িকীতে প্রথম সর্গের প্রকাশ ঘটে ১৯৯৪-৯৫ সালে। কবির নিজ বয়ানে ‘অর্ধকুড়ি’ বছর ধরে তিনি এটি রচনা করেছেন। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে এর কিছু অংশ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। হাসানআল সেইকালে পরিপূর্ণ যুবকই বলা যায়। সময়ের মধ্য দিয়ে পার হওয়া অভিজ্ঞ কবি তিনি নন- তবুও ওই কালেই মহাকাব্য রচনায় প্রবিষ্ট হওয়ার কি দুঃসাহস তাঁর ভাবলে অবাক হতে হয়।

আরো অবাক হতে হয় তাঁর বিষয়বস্তুর কথা শুনলে-তাঁরই বয়ানে : ‘মানুষ ও নক্ষত্রগুলোর অবস্থান ও ক্রিয়া-কলাপ সর্বত্র সমান্তরাল। ঘূর্ণন, আলো তৈরি, বিস্ফোরণ এবং নতুন করে জন্ম নেয়া ও দেয়ার প্রক্রিয়া প্রায় অভিন্ন। কোনো কোনো বিজ্ঞানী তো মনেই করেন যে নিয়মতান্ত্রিক নাক্ষত্রিক চলাচলেরই ধারাবাহিকতা জীবনের উৎপত্তির চালিকাশক্তি। অতএব চরিত্রগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় পৃথিবী থেকে আস্তে আস্তে মহাপৃথিবীর দিকে। অসংখ্য সভ্যতার চিন্তা, ছায়াপথে, যদিও আমাদের নাগালের বাইরে, এইসব নাক্ষত্রিক বাস্তবতাও ঘুরে ফিরে আসে। আসে বিগব্যাঙ, স্ট্রিং থিয়রি, এম ও এফ থিয়রি, ব্লুাকহোল, হোয়াইট হোল, কোয়েশার, পাঁচ পর্যায়ের মহাবিশ্ব-জীবন, সমান্তরাল মহাবিশ্বসহ তাবত প্রয়োজনীয় বিষয়। আসে পুড়ে যাওয়া পৃথিবীতে লেগে থাকা রক্তের দাগ। কিন্তু কিছুই কবিতা বহির্ভূত নয়; কাহিনীর বিন্যাসে বিষয়ের সাথে একাত্ম হয়ে যায়।’ প্রকৃত আধুনিক কবিতা।

চার.

রবীন্দ্রনাথ মহাকাব্য রচনা করেননি। তাঁর রচিত অতি দীর্ঘ কি দীর্ঘ কবিতার সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। কবি বিহারীলালের কাব্যজগতেই তাঁর বসবাস না হলেও মহাকাব্য রচনার সময় তিনি পার করে এসেছিলেন।

আমি নাববো মহাকাব্য/ সংরচণে ছিলো মনে/ হঠাৎ কখন ঠেকলো/ কাঁকন কিঙ্কিনীতে/ কল্পনাটি গেলো ফাটি/ হাজার গীতে।

তাঁরই কথা। হাসানআল আব্দুল্লাহ সেই বিবেচনায় অতি ব্যতিক্রমী এক কবি, সন্দেহ কি।

(নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ, হাসানআল আব্দুল্লাহ, অনন্যা, ঢাকা ২০০৭ পৃষ্ঠা : ৩০৪ মূল্য : ৩০০ টাকা)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj