মজিদ মাহমুদের কবিতা : নান্দনিকতার ধারাভাষ্য : ম তি ন বৈ রা গী

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল ২০১৬

‘প্রতিভাসিক কবিতাজগতের একাগ্রতা ভেঙে তাকে নাট্যপ্রাণ বিশুদ্ধতা দেয় কবি। কিন্তু তবুও তিন জগতেই বিচরণ করে সেই- মানবসমাজকেই চিনে নেবার ও চিনিয়ে দেবার মুখ্যতম প্রয়োজনে আন্তরিক হয়ে ওঠে। লিরিক কবিও ত্রিভুবনচারী, কিন্তু তার বেলায় প্রকৃতি, সমাজ ও সময় অনুধ্যানকেই কেউ কাউকে প্রায় নির্বিশেষে ছাড়িয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে না; অন্তত মানবসমাজের ঘনঘটায় প্রকৃতি ও সময়ভাবনা দূর-দুর্নিরীক্ষ হয়ে মিলিয়ে যাবার মতো নয়। কাজেই উপন্যাস ও নাটকের মতো মানুষমনকে সমূলে আক্রান্ত না করেও, কবিতা মানসের আমূল বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে; তাকে নির্মলতর করে তুলবার জন্য কথা ও ইঙ্গিতের দুর্লভ স্বল্পতার ভিতর দিয়ে’ [জীবনানন্দ দাশ, প্রবন্ধ কবিতা প্রসঙ্গে’।] কবিতা প্রসঙ্গে, কবিতার রূপ প্রসঙ্গে, নির্মাণ প্রসঙ্গে, নান্দনিক বিষয় প্রসঙ্গে, আবেগ ও কল্পনার সমন্বয় প্রসঙ্গে, হ্রস্বতা বা দীর্ঘ অবয়ব প্রসঙ্গে, নানা তত্ত্ব কখনও কবিরা কখনও বুদ্ধিবৃত্তিক লোকেরা, কখনও মনীষীরা দিয়েছেন তবুও এর বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্টতর দিশা তেমন লাগসই হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য প্রসঙ্গে তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছেন- ‘যেমন একটা সূতাকে মাঝখানে লইয়া মিছরির কণাগুলা দানা বাঁধিয়া উঠে তেমনি আমাদের মনের মধ্যেও কোনো একটা সূত্র অবলম্বন করিতে পারিলেই অনেকগুলা বিচ্ছিন্ন ভাব তাহার চারিদিকে দানা বাঁধিয়া একটা আকৃতিলাভ করিতে চেষ্টা করে। অস্পষ্টতা হইতে পরিস্ফুটতা, বিচ্ছিন্নতা হইতে সংশ্লিষ্টতার জন্য আমাদের মনের ভিতরে একটা চেষ্টা যেন লাগিয়া আছে।’ [ ‘সাহিত্যসৃষ্টি’ প্রবন্ধ।]

একদিকে রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্যসৃষ্টি‘ সংজ্ঞাকরণ অন্যদিকে জীবনানন্দের ‘কাব্যসংজ্ঞায়ন’ চূড়ান্ত বিচার বিশ্লেষণে এমন দাঁড়াবে না যে একটা আরেকটার বিপরীত এবং বৈরিতায় অবস্থান নিয়েছে। বরং বলাচলে সময়ের ধারাবাহিক ক্রমে নানা বাঁধনে নানারূপ কৃতকৌশল যেমন পাল্টায় সমূলে নয়; পুরনোর মধ্য থেকে নতুনে যার সঙ্গে সুদীর্ঘ সময়ের সামাজিক বোধ লেপ্টে থাকে এবং যার মধ্যে একজন সৃজনশীল মানুষ তার ইতিহাসের অংশ হয়ে ঐতিহ্যকে মনে প্রাণে গ্রহণ ও বর্জনের ক্রিয়ায় নিয়ত রত, যা উল্লম্ফন নয়, বিশ^জ্ঞানের বিবর্তিনের সূত্রে সূত্রায়িত। যদিও দর্শনে এসব তর্কের কখনও মীমাংসা করা গেছে বলে দাবি উঠলেও অন্য কেউ আবার সেই মীমাংসায় দাঁড়িয়ে নতুন যে তথ্য ও তত্ত্ব সন্নিবেশ করেছেন তা সভ্যতারই ক্রম; একেবারেই নতুন বা একেবারেই পুরনো নয় বরং বলা চলে অভিজ্ঞতা ঝেড়ে মুছে নতুন বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদির সন্নিবেশে আবার তার সংযোজন এমনি ক্রিয়া লাগাতার চলছে। কবিতায় ভাবনা বিবর্তন নির্মাণের উৎকর্ষতা শুদ্ধিকরণের চেষ্টিত ফলাফল সবই মানব চিন্তার ধারাবাহিক রূপ ও রূপান্তর যাকে আমরা শনাক্ত করতে গিয়ে বলে ফেলি, এ আধুনিক না হয়ে যায় না- একেবারে নতুন এবং নতুনের গন্ধ গায়ে মাখা। বাস্তবে এখনও নতুন আসেনি, তার জন্য দরকার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন যার দিশা নির্মিত হলেও নির্মাণদিশা পরিপূর্ণভাবে উত্তোরিত গণিতে মিলিয়ে যায় না। ফলে কবিতার শরীরে যেটুকু পরিবর্তন কখনও কখনও দেখা যায় সেটা সামাজিক চাহিদার প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে। বলা চলে, সমাজে কবির অবস্থানের তৃপ্তি-অতৃপ্তিরই প্রকাশ। যখন সামাজিক ব্যবস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণশক্তি একটি কল্যাণকামী বিশ^-শরীর নিয়ে কবির কাছে হাজির হবে, তখন ভাবনাগুলো কেমন হবে তার রূপরেখা এখন নির্ণয় কঠিন, আপতত মানুষ যে কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে মানুষের রূপ বদলে দিতে পারে এমন প্রতীতী ‘কবিতা প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে রয়েছে; রয়েছে টুকরো ভাবগুলোর একই সূতায় সূত্রবদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে নানা ভাবের সন্নিবেশ এবং কবির বৃহৎ চাহিদায় উত্তোরণের একটা মীমাংসা। এসব নিয়েই আজকের কবিতার নানা শরীর প্রত্যক্ষ পরোক্ষ বাগ-বিস্তার, ভাববিস্তার; অনু-ভাবের সংযোজনায় নতুন ভাবনার যুক্তিকরণ। কিন্তু সকলকেই যেতে হবে সুন্দরের মধ্য দিয়ে কাব্যিক হয়ে কবিতার নন্দনে। আমাদের আলোচ্য কবি মজিদ মাহমুদও সেই ধারাবাহিকতার কবি, নতুন তবে নতুন নয়; পুরনোও নয়।

‘বাগানের ভেতর শোভা পাচ্ছিল বসন্তের ফুল

গন্ধ ও রঙে আকৃষ্ট হয়ে উড়ে আসছিল মৌমাছি

আমারও ইচ্ছে খুব সে ফুলের সান্নিধ্যে যাবার

কিন্তু চারিদিকে শক্ত দেয়াল, ভেতরে নির্দয় মালী’

‘ভেতরে নির্দয় মালী’ এই মালী সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বৈরিতা- যা সুন্দরকে, জীবন প্রবাহকে আনন্দ উৎসকে দখল করে আছে। সকলের ভোগের উপভোগের সুযোগ কুক্ষিগত করে একচেটিয়া করে নিয়েছে। অথচ প্রত্যক্ষতায় ‘বসন্তের ফুল’ ‘গন্ধ ও রঙে আকৃষ্ট করে’ মৌমাছির মতো অন্য আরও অনেকের মতো কবিকেও সেই সুন্দরে সামিল হবার আকাক্সক্ষায় হাতছানি দিলেও তার প্রবেশ অনুমতি বা সুযোগ নেই। অর্থাৎ একই মানুষের সামাজিক বিভাজন, ভোগশক্তির সীমিতকরণ বা দূর-আয়ত্তকরণে নিষিদ্ধ অথচ তার বিপুল উপস্থিতি। আর তারা সমাজ ও রাষ্ট্রশক্তিরই অচ্ছেদ্য, কিন্তু যুক্ততার ক্ষেত্র রয়েছে রক্তচক্ষুর পাহারায়। পতিত শক্তির চারদিকে যে শক্ত দেয়াল যাকে ডিঙিয়ে সান্নিধ্য লাভ শক্ত কঠিন অসম প্রতিযোগিতা, এমনি চেতনাগত অধিকার প্রাপ্তি বা অর্জন-এর ক্ষেত্রে যা জীবন বদলানোর জন্য জরুরি তাও বদ্ধ আবদ্ধ এবং সহজ গতিময়তার মধ্যে প্রাপ্তিকরণ অসম্ভব। এমনি নানা ভাবনার দোলায় ওই যে নানা ভাষ্য এক সূতায় গেঁথে দিয়ে প্রত্যাশিত নানা মাত্রার দৃশ্যকল্পকে নির্মাণ, যার গতিমুখ প্রত্যাশার দিকে প্রচ্ছন্ন হয়ে ফিরে আসে। এইখানে এই লিরিক ভাবনার ছোট বিন্দুর স্ফূর্ততা নিয়ে একটা এককের দিকে যাত্রা করে। আমরা নাটকেও দেখি নানা প্রসংগ টুকরো টুকরো দৃশ্যের মধ্য দিয়ে একটি একক ছেদকে ভেদ করে। মজিদ মাহমুদ মাত্র চার পঙ্ক্তিতে যে ভাবনা টুকরো আকারে ছেড়ে দিলেন সে ভাবনা এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে অর্থাৎ ভাঙনের মধ্য দিয়ে গড়ে নিল আরেক শরীর যা মনুষ্য মানসের প্রত্যায়িত নতুন।

[ ব্যর্থতা] কবিতামালা গ্রন্থ।

কিম্বা

‘আমার কবিতা শেষ না হতেই পাঠক বই ছুঁড়ে মারেন ডাস্টবিনে

আমি স্বস্তি পাই তাহলে ঠিকমতো এগুচ্ছে সব

আসলে কবিতার বই র‌্যাকে থাকতে চায় না

কবিতা এমন একটা জ্ঞান যা ফুটপাত থেকে কুড়িয়ে নিতে হয়

কাগজ কুড়ানো শিশুদের পলিথিনের ব্যাগর ভেতর ঘুরে ঘুরে

কবিতাগুলো আবার আমার হাতেই ফিরে আসে’

অর্থাৎ কবিতা কোনো আকাশ বাণী নয়, মেঘের বর্ষণও না বরং আকাশ মেঘ বরিষণ সবই কবিতায় ঠিক-ঠাক বসে কবিতা হয়ে যায় তাদের রূপ সৌন্দর্য আনন্দ কবির মনে বিরহ, বেদনা থেকে হর্ষ হুল্লোড়ে আমোদিত বা বিষাদিত করে এক শরীর পেয়ে যায় ভাষ্য ধারা, নানা উপমায় হয়ে ওঠে কল্পনার রাণী, প্রেমিকার মুখ সে কবিরই অবলোকন যার অস্তিত্ব শরীর ও তার মনোগঠন সম্পূর্ণই সামাজিক সত্তা। ‘আমার কবিতা শেষ না হতেই পাঠক বই ছুঁড়ে মারেন’ এই ছুঁড়ে মারাটা গ্রহণেরই এক নামান্তর এ কারণে যে কবিতা একটি মতও বটে একটি মতবাদের অংশও যার পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে, যা কাউকে না কাউকে আঘাত করে কাউকে তৃপ্তি দেয়। কেউ একজন বিভাজিত সমাজে নিয়ন্ত্রণকারী শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে, মনমানসিকতায় তা লালন করতেও পারে, যদিও সে অবস্থানগত দিক থেকে প্রান্তিক; কিন্তু কবিতার সারসত্তায় সে তার উচ্চারিত বিষয়াবলীর সাথে একাত্ম না হয়ে বিচ্ছিন্ন বোধ দ্বারা চালিত হতে পারেন, সে ক্ষেত্রে যখন কবিতা পরিত্যক্ত হয় অর্থাৎ সে প্রান্তিক হয়ে পড়ে তখন কবির এই উপলব্ধি হওয়া পজিটিভ যে, তার কবিতা ঠিকমতো ঠিক জায়গাটিকে পিনবিদ্ধ করতে পেরেছে ও যথার্থ হয়ে উঠছে। বাস্তব যে কবিতা জনগণ এর মধ্য থেকে, জন-জীবনের ধারাবাহিকতা থেকে তাদের আচার-রীতি থেকে; গড়ে তোলা দীর্ঘ অভ্যাসরুচি থেকে সংগ্রহ করতে হয়, আসমানের কোনো সম্পর্ক নেই এর সাথে; আছে বস্তুজগত মনজগত যা ভাবজগতের উদ্দীপনগুলো প্রজ্ঞায় জারিত করে নতুন রূপে নতুনের কণ্ঠ হয়ে ওঠার একটা সুর। তাই ক্ষুদ্র ক্ষদ্র অবলোকনগুলো নানা ইমেজের মধ্য দিয়ে একটা সংহত শরীর গড়ে নেয়, যা দৃষ্ট বিষয় থেকে ভিন্ন ভাষ্যে নবায়নের রীতিতে। এ ভাবে কবিতাগুলো আবার কবির মানস কবির নিকটে ফেরে, তাঁর বিশ^াসের সন্ধিতে। মজিদ মাহমুদ বড় কথাকে অল্পতে গম্যতার ভাষণে বিবৃত করেছেন এবং করতে পেরেছেন তার অধিকাংশ কবিতায়। যেমন-

‘কবিতা তোমাকে লিখছি- রাত্রি জেগে

রক্তধারা প্রবল বেগে- নদী পর্বত দিগি¦দিক

কার সন্ধান বুঝি না ঠিক

কোথায় যেন একটি কথা রয়েছে গোপন

কোথায় যেন হয়নি ধরা একটি ক্ষণ

সেই অধরা হয়তো আমার কবিতা ঠিক’

[কবিতা]

‘জন্মে স্বাধীন মানুষ- সর্বত্র পরাধীন

এ কথা বলেছেন ফরাসি মহামতি রুশো’

[রুশো]

‘নন্দনতাত্তি¡ক সংবেদন সর্বস্বতা [এ্যসথেটিক সেন্সেশনালিজম] এবং মনস্তাত্তি¡কতার ধারণা ঘিরেই যে সব জার্মান দার্শনিক আপন আপন মতবাদ প্রচার করেছিলেন, তাদের মধ্যে ক্রিকম্যান অন্যতম; তিনি হলেন বাস্তববাদের প্রণেতা। তাঁর মতে, শিল্পগত সত্য হলো বাস্তবের প্রতিরূপ [ইমেজ] মাত্র; এই প্রতিরূপটি হল শুদ্ধ প্রাণবন্ত আদর্শায়িত রূপ…’ [নন্দনতত্ত্ব : ক্রোচে] মজিদ মাহমুদ-এর কবিতায় আমরা সেই সুন্দরকেই প্রত্যক্ষ করতে পারি তার কাব্যভ্রমণের মধ্য দিয়ে। যেমন তিনি [কবিতা নামক ছোট্ট কবিতাটিতে] ‘কবিতা তোমাকে লিখছি- রাত্রি জেগে/রক্তধারা প্রবল বেগে- নদীপর্বত দিগি¦দিক’ একটি কবিতা যখন লেখা শুরু হয় তখন যে প্রকাশ অস্থিরতা টেক্সট থেকে টেক্সট-এ যেতে শরীরে মনে দ্রুত সঞ্চারণশীল, প্রকাশ উপকরণ তা প্রকাশ করতে থমকে থাকে ভাষার সরবহাক্ষীণতার কারণে ফলে নির্মাণ বিপর্যয় রোধক অন্য উপভাষ্যগুলো একটা আপতকালীন স্তম্ভের জোগান দিলেও কাব্যিক গমনরেখায় গতিপরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট হয় চলে আসে আরেক ভাষ্য। ফলে যে পরিকল্পিত বিষয়ের একটা বিপরীত আরেকটি বিপরীতকে প্রান্তগামী করে মূলত শুরুর টেক্সটটিতে ছিল, পথ হারিয়েছে। এ জন্য কবিতা অধরা থেকে যায় অনেক সময়। আবার নির্মাণ লক্ষ স্থির হলে উদ্দেশ্য মুখের ভাষা নানাভাবে দিক পরিবর্তন ঘটায় নতুন ভাষ্য নির্মাণকালে সেখানেও কবিতার নানা কিছু হারায়। সঙ্গত কবিতার শরীর, নান্দনিক দিকগুলো ছন্দ নির্মাণ একটা বিষয় হয়ে গোলকধাঁধার সৃষ্টি করে আর ‘কোথায় যেন একটি কথা রয়েছে গোপন/ কোথায় যেন হয়নি ধরা একটি ক্ষণ’ যা কবিতাটিকে কেবল সুন্দর নয় সাবলাইমে তৃপ্ত করতে পারত। সে সব কারণেই অধিকাংশ সৃষ্টি স্রষ্টার স্বপ্নকে তার তৃপ্তিকে ছুঁতে পারে না; আর তখন সেই অতৃপ্তির প্রকাশগুলো ‘সেই অধরা হয়তো আমার কবিতা ঠিক’ এই সিদ্ধান্ত অনুসিদ্ধান্তে রূপলাভ করে। কিন্তু কবি তারপরও তা ধারণ করেন- তৃপ্তি অতৃপ্তির আলোছায়ায়। পাঠকও অনেক সময় এই পরিপূর্ণতার অপূর্ণতাকে স্পর্শ করতে পারেন আবার নাও করতে পারেন।

মানুষ যে জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং তার স্বাধীনতা যে জন্মের পরে তার অভিভাবক দ্বারা চলমান সমাজক্রিয়া দ্বারা রুদ্ধ হয় এবং তার ওপর নানা আচার-রীতি মূল্যবোধ চাপিয়ে দিয়ে তাকে খাপবদ্ধ করে তার একটা বিবৃতি আমরা পাই মজিদ মাহমুদের রুশো কবিতায়। ‘জন্মে স্বাধীন মানুষ- সর্বত্র পরাধীন’ এই টেক্সট থেকে। কবিতাটির শেষ পঙ্ক্তিটি থেকে উত্তরটা নিয়ে নেয়া যায় যে দাসদের ঘরে যার জন্ম সে কি স্বাধীনভাবে জন্মায়। এখানে ভাবনার পরিসর ক্ষীণতা আছে ঠিক কিন্তু প্রশ্নটি অবান্তর নয়। পরিসর ক্ষীণতা বলছি এ কারণে যে, দাসদের ঘরে জন্মই কেবল পরাধীনতা নয় সে হলো বাহ্যিক অধীনতার দ্বারা সীমাবদ্ধ। প্রকৃত পরাধীনতায় সে আবদ্ধ হয় সমাজ সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দ্বারা, চলমান বিশ^াস দ্বারা যা তার ওপর চাপে তার অজান্তে যা এক মৌলবাদ এক ‘আয়রনি’ যাকে ধারণ করায় আরেক দল মানুষ এবং সে সারাজীবন বয়ে চলে দাসের ঘরে জন্ম নিলেও আবার এই তথাকথিত মুক্ত সমাজেও।

মজিদ মাহমুদের কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের চলমান বাংলাকাব্যের ধারাবাহিকতা লগ্ন হলেও বৈচিত্র্যপূর্ণ। কত কিছু রয়েছে তার কবিতায়, রয়েছে নানারকম মনস্তাত্তি¡ক বিষয়-আশয়। তার কবিতা কোনো জটিল বাক্যবন্ধে বা অসম্ভব কল্পিত কল্পে প্রতিভাষ নয় বরং ভাষ্যগুলোর একটা সরল ভঙ্গি নিয়ে নাচতে নাচতে উঠানে নামে- গড়ে কাব্য-শরীর। আপাতত সামান্য বিষয় কখনও কখনও চলমান জীবনে তুচ্ছ বিষয়ও বড় অর্থ নিয়ে তৈরি করেন কাব্য যা দক্ষ হাতেরই রূপান্তর। আর তাই তার ভূমিকা কাব্যে ঠিক ঠিক বলে দিতে পারেন ‘যে কবিতা তিনি লিখতে চান তা লেখা হয়নি’ আর তাই তিনি এও বলেন যে ‘এই কবিতাগুলো কোনো মরণশীল পড়তে পাবে না; এই কবিতাগুলো চিতায় দাহ করার আগে, সমুদ্রে বিমানধসের আগে, মৃতদের আত্মা মহাকাশে উত্থিত হওয়ার আগে, গ্যংরেপে হারিয়ে যাওয়ার আগে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আগে. সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগে, প্রেম-বঞ্চনার আগে- স্বয়ং ধ্বনিত হয়ে উঠবে’ এই তার বিশ^াস এই তার প্রথিত প্রজ্ঞায় সংশ্লেষিত মনন আর সে কারণে কবি মজিদ মাহমুদ চলমান সময়ে একটু অন্যরকম এবং তার কবিতার ধারাভাষ্য গঠনশৈলী ভিন্ন মাত্রা পায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj