খাপড়া ওয়ার্ড শহীদ দিবসের রাজনৈতিক গুরুত্ব

রবিবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৬

১৯৪৮-৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে কৃষক, বর্গাচাষি, ক্ষেতমজুররা অধিকার আদায়ের লক্ষে নানা কর্মসূচি নিয়েছিল। এই কর্মসূচিগুলো জাতীয় বা কেন্দ্রের নির্দেশনায় হয়নি। আন্দোলন কর্মসূচিগুলো সংঘটিত হয়েছিল অঞ্চলভিত্তিক চাহিদানুসারে। তাই টংক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলনসহ এলাকাভিত্তিক এই আন্দোলনগুলো নানা নামে পরিচিত। এ ধরনের আন্দোলনের সূত্র ধরে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠন যে প্রকৃত স্বাধীনতা নয় তার প্রমাণ মেলে অঞ্চলভিত্তিক তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক, ছাত্র, শ্রমিকদের কর্তৃক সংঘটিত হওয়া বিদ্রোহের মাধ্যমে। সারা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা পেশার মানুষ অধিকার আদায়ের জন্য নিজেদের সংগঠিত করে। পূর্ব বাংলা ছিল একটি কৃষি প্রধান অঞ্চল। শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই ছিল কৃষি নির্ভরশীল। আর তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক ও বর্গাচাষি। তৎকালীন সময়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু হয়, যা পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলে পাকিস্তান সরকারও শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমির অধিকার, ভূমি স্বত্ব, কৃষকের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষে কমিউনিস্ট পার্টিও আদর্শের পতাকাতলে কৃষকরা সংগঠিত হয়।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়। সেই সময় বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগে কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রের নেতৃত্বে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তেভাগা সংঘটিত হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে এবং খুলনা অঞ্চলে কমরেড আব্দুল হকের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়। কৃষক বিদ্রোহের আগুন সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের এভাবে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির ভিত কেঁপে ওঠে। ফলে দেখা যায় পাকিস্তানি শাসক শ্রেণি এ দেশের কৃষক আন্দালন দমন করতে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া শুরু করে। সারা দেশে প্রায় এক হাজার কৃষক আন্দোলনের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করা কৃষক নেতাদের দেশের বিভিন্ন কারাগারে রাখা হয়। আর কারাগারগুলোতে কৃষক নেতাদের ওপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। আর ওই সময় গ্রেপ্তারে কারণে দেশের জেলখানাগুলো কমিউনিস্ট বন্দিদের দ্বারা ভরে যায়।। ১৯৪৮ সালের পর থেকে সারাদেশে কৃষক নেতাদের ওপর চলতে থাকে পুলিশি নির্যাতন। এই সময়ে পাকিস্তানে জেলখানায় কারা বিধির নিয়মনীতি মানা হতো না। পাক শাসক শ্রেণি বুঝতে পারে এই আন্দোলন বাংলার স্বাধীনতার আন্দোলনের তাই কঠোরহস্তে তারা আন্দোলন দমন করতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে রাজবন্দিদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে বিল পাস করা হয়। আর এই বিল পাসের মধ্য দিয়ে রাজবন্দিরে স্ট্যাটাস বাতিল হয়ে যায়। তারাও সাধারণ বন্দিতে পরিণত হন। কিন্তু এখানেই শেষ নয় বন্দি নির্যাতন, স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের সাধারণ বন্দি বানানোর পরও চলে তাদের ওপর নানা ধরনের শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার। বিশেষ করে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী এই আইন করেছিল কমিউনিস্টদের জব্দ করার জন্য। এই আইন পাস হওয়ার পর সারা দেশের জেলখানায় সাধারণ বন্দি এবং রাজবন্দিরা আন্দোলন শুরু করে।

রংপুর, ঢাকা, রাজশাহী জেলে কমিউনিস্ট বন্দিদের নেতৃত্বে সব বন্দিরা অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ওই সময় ঢাকা জেলে অনশন আন্দোনরত কমিউনিস্ট নেতা শিবেন রায়কে জেল কর্তৃপক্ষ জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করলে তিনি মারা যান। শিবেন রায় মারা যাওয়ায় বন্দি বিদ্রোহ চরমে পৌঁছে। ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে রাজশাহী জেলের রাজবন্দি এবং সাধারণ কয়েদিরা এক আলোচনায় বসে। সেই আলোচনায় সব বন্দিরা সর্বসম্মতভাবে একটি যুক্ত দাবিনামা সরকারের কাছে পাঠায়। রাজশাহী জেলের ওই সময়কার ৫৫০ জন বন্দি যুক্ত দাবিনামায় স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু সরকারি কর্তৃপক্ষ দাবিনামার বিষয়ে কোনো আলোচনায় বসেনি কারাবন্দিদের সঙ্গে। উপরন্তু জেল কর্তৃপক্ষ বন্দি নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। জেলের বন্দিদের আন্দোলন থামাতে রাজশাহী জেল কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত কমিউনিস্ট নেতা বিজন সেন (২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ডে কারারক্ষীদের গুলিতে শহীদ হন) এবং আবদুল হককে ডেকে নিয়ে ধমক দেন এবং আন্দোলন থামাতে বলেন। রাজশাহী জেলের জেলার তাদের এই বলে শাসিয়ে দিয়েছিলেন যে, আন্দোলন না থামালে তাদের কনডেম সেলে ঢুকানো হবে। রাজশাহী জেলে কমিউনিস্ট বন্দিরা ছিলেন খাপড়া ওয়ার্ডে। জেলের অন্য বন্দিদের দৃষ্টি ছিল খাপড়া ওয়ার্ডের দিকে। আর জেল কর্তৃপক্ষ নানা কৌশলে খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিদের নিপীড়ন করতে থাকেন। যাতে করে আন্দোলন থেমে যায়। কনডেম সেলে ঢুকানোর হুঁশিয়ারির কথা বিজন সেন এবং আব্দুল হক এসে সহবন্দিদের জানায়, খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, এখান থেকে একজন বন্দিকেও কনডেম সেলে ঢুকাতে দেয়া হবে না। তাদের এই সিদ্ধান্ত জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। জেল কর্তৃপক্ষ খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিদের ওপর আরো ক্ষুব্ধ হয়। জেল কর্তৃপক্ষের এই ক্ষুব্ধতায় খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা বুঝতে পারে যে, যেকোনো সময় পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে দেয়া হতে পারে আর তারা ধারণা করতে থাকেন তাদের ওপর চলতে পারে অকথ্য নির্যাতন, বন্দিদের ধারণা ছিল না যে তাদের গুলি করা হতে পারে। কিন্তু সব ধারণা কল্পনার অবসান ঘটে ২৪ এপ্রিল। ওইদিন জেল সুপার মি. বিল খুব ভোরবেলায় খাপড়া ওয়ার্ডে ঢুকেন। জেল সুপারের জেল পরিদর্শনের দিন ছিল বুধবার কিন্তু যে দিন মি. বিল খাপড়া ওয়ার্ডে আসেন সেদিন বুধবার ছিল না, তার এই অতর্কিত পরিদর্শনের কারণ বন্দিরা বুঝে উঠতে পারেনি। বিলের এই অতর্কিত পরিদর্শনের সময় খাপড়া ওয়ার্ডে ৩৭ জন বন্দি ভিতরে অবস্থান করছিল কিছু বন্দি ওয়ার্ডের বাইরে ছিলেন। বিল পরিদর্শনে এসে খাপড়া ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে দেন এবং অতর্কিতভাবে কারারক্ষীদের বন্দিদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। তখন বন্দিরা থালা বাসন বিছানাপত্র দিয়ে বিলের কাপুরোষিত বর্বর আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করে, বাইরে অবস্থানরত বন্দিরা দৌড়ে খাপড়া ওয়ার্ডের দিকে আসতে শুরু করলে তাদেরও গুলি করা হয়। বিলের এই কাপুরুষোচিত আক্রমণে সাতজন কমিউনিস্ট নেতা নিহত এবং প্রায় ৩৩ জন আহত হন। সাতজন নিহতরা হলেন খুলনার দেলোয়ার হোসেন, কুষ্টিয়ার হানিফ শেখ, ঢাকার সুধীন ধর, ময়মনসিংহের সুখেন ভট্টাচার্য, দিনাজপুরের কৃষক নেতা কম্পারাম সিং, রাজশাহীর কমিউনিস্ট নেতা বিজন সেন, খুলনার আনোয়ার হোসেন। খাপড়া ওয়ার্ডে নির্মমভাবে কমিউনিস্ট বন্দিদের হত্যা করার পরও পাক শাসক শ্রেণি থেমে যায়নি। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এ দেশের স্বাধীনতার আন্দোলন স্তব্ধ করতে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বহু কমিউনিস্ট নেতা আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। অজ্ঞাত স্থানে কমিউনিস্ট নেতারা অবস্থান করার পরও কমিউনিস্টরা পাক শাসক হঠানোর আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় পকিস্তানের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিল কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব, যার জন্য দেখা যায় প্রায় পুরো পাকিস্তানের শাসন আমলে কমিউনিস্ট রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। সেই সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব বিভিন্ন গণসংগঠনের মাধ্যমে (যেমন কৃষক, ক্ষেতমজুর, বর্গাচাষি, ভূমিহীন কৃষক) বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ গড়ে তোলে। অগ্নির ধাবানল আগুনকে যেমন ছাই দিয়ে চেপে রাখা যায় না, ঠিক তেমনি কমিউনিস্টদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ থেমে থাকেনি। তখন কমিউনিস্ট নেতারা আত্মগোপন করে বিভিন্ন গণসংগঠনে যোগ দিয়ে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ২৪ এপ্রিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। তাই ২৪ এপ্রিল পালিত হয় শহীদ খাপড়া ওয়ার্ড দিবস হিসেবে। দিবসটি রাজশাহীসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বাম সংগঠন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আসছে। সেদিনের আত্মদানকারী সাত বীর শহীদের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে তাদের বীরত্বগাথা কাহিনী তুলে ধরেছে নতুন প্রজন্মের কাছে। কিন্তু এটা যে মুক্তি সংগ্রামের প্রথম শহীদ এ কথাটি অনেকেই উল্লেখ করেন না। খাপড়া ওয়ার্ড দিবসটি কি কারাগারে কয়েদিদের অধিকার আদায়ের দাবিতে শহীদ হওয়ার দিবস, নাকি পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম জাতীয় অধিকার আদায়ের দাবিতে আত্মোৎসর্গ দিবস। আনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরা খাপড়া ওয়ার্ড দিবসটি কারাগারে কারাবন্দির অধিকার দিবস হিসেবে আখ্যা দেন। আসলে যারা খাপড়া ওয়ার্ডে শহীদ হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারান্তরীণ হন। আর এই বিপ্লবী নেতাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানিরা তাদের শাসনের পথ সুগম করতে চেয়েছিল। তাই পাকিস্তানি শাসকরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটিকে কারাবন্দিদের বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যা দেন। প্রকৃতার্থে খাপড়া ওয়ার্ড দিবস আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম মাইলফলক। আবার অনেকেই বলে থাকেন, খাপড়া ওয়ার্ডের আন্দোলনে পদ্ধতিগত ভুল ছিল কিন্তু কি ভুল ছিল তার যথার্থ ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেননি। তবে এটা প্রমাণিত হয় যে, খাপড়া ওয়ার্ডের বিদ্রোহের মাধ্যমে প্রথম পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়। যে আন্দালনের পথ বেয়ে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : লেখক, কলামিস্ট।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj