জন্মবার্ষিকী : স্বাধীনতা সংগ্রামী শিক্ষাব্রতী শেখ আবু হামেদ

বুধবার, ১৮ মে ২০১৬

অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ একজন ভাষা সংগ্রামী ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। সরাইল থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সরাইল ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং শাহবাজপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি সবচেয়ে বেশি। তাঁর জন্ম ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের ৪ জ্যৈষ্ঠ। (১৯২৮ সালের ১৮ মে)। অধ্যক্ষ আবু হামেদ লোকান্তরিত হয়েছেন ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন ভক্ত ছিলেন তিনি। ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এ অধ্যয়নকালে এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. ডি. ডি মরিশন তাঁকে আমেরিকায় পিএইচডি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি জীবন-স্মৃতিতে লিখেছেন : ‘আমার মনে ছিল শিক্ষার জন্য সরাইলে গিয়ে কাজ করব। আমাকে বিদেশে গেলে চলবে না।’ আবু হামেদ তাঁর কথা রেখেছিলেন। কিন্তু এর জন্য তাঁকে জীবনে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাঁর আত্মজৈবনিক ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তিতাস পাড়ের স্মৃতি’ এবং কবিতাগ্রন্থ ‘অঙ্গে আমার বঙ্গ রক্ত বহে’- গ্রন্থগুলো বাঙালির ইতিহাস, বাঙালি জাত্যাভিমান ও সুগভীর দেশপ্রেমের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

তাঁর পিতা শেখ মাসিহুজ্জামান, পিতামহ পীর শেখ গোলাম মোহাম্মদের স্বাধীনচেতনা, সহজ-সরলতা, ধার্মিকতা ও সাহস ছোটবেলা থেকেই তাঁকে করেছিল উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত। ১৯৫১ সালে সরাইল অন্নদা উচ্চবিদ্যালয় থেকে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ডে ১৭তম স্থান অধিকার করে মেট্রিক, ১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ১ম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে সরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহচর মুন্সী আব্দুল গণির উপস্থিতিতে সরাইল থানা ছাত্রলীগের কমিটি হয়। তিনি হন এর প্রথম সভাপতি।

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেট দিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস খেয়ে আহত হয়েছিলেন আব্দুল হামেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বরকত শহীদ হওয়ার সময় তাঁর পাশেই ছিলেন তিনি। বরকতের রক্তে নিজের হাত ও রুমাল রঞ্জিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে দীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি।

ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ১৯৫৩ সালে সরাইল কালচারাল এসোসিয়েশন গঠন করেন। সরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষক বাবু হেমেন্দ্র চন্দ্র রায় ছিলেন এর সভাপতি। এই এসোসিয়েশনের উদ্যোগে সরাইলে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৫৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি প্রথম সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে সরাইলে আওয়ামী লীগ সংগঠিত করেন এবং সরাইল থানা আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি হন। ১৯৬২ সালে কিশোরগঞ্জ শহরে অধ্যাপক নরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষকে নিয়ে কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংসদ গঠন করেন। ১৯৬৪ সালে কিশোরগঞ্জে কিশোরগঞ্জ সদর ও পাকুন্দিয়ার বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে শাহবাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে সরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিদ্যোৎসাহী সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন। ওই নির্র্বাচনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা আ. মন্নাফ ঠাকুর পরাজয়বরণের মধ্য দিয়ে তাঁর অঞ্চলে মুসলিম লীগের রাজনীতির অবসান ঘটে। ১৯৭০-এর ২৪ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন এসডিও কাজী রকিবুদ্দীন আহমদ সাহেবকে (বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার) দিয়ে সরাইল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করান ও অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

সত্যব্রতী এই মানুষটি মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সব কর্মসূচি পালনে তিনি তাঁর এলাকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২৩ মার্চ কালীকচ্ছ কমিউনিটি হল প্রাঙ্গণে সরাইলের জনসভায় সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ পাকিস্তানকে তালাক দিলাম।’ ১৮ এপ্রিল তিনি ভারতের আগরতলায় শহরে পৌঁছেন। মুজিবনগর সরকারের অধীনে নরসিংহগড় যুব শিবিরে পলিটিক্যাল মটিভেটর হিসেবে যোগ দেন। ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত কলেজ শিক্ষকদের কল্যাণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের স্বনামধন্য অধ্যাপক বাবু হরলাল রায়কে সভাপতি করে পূর্বাঞ্চলীয় কলেজ শিক্ষক সমিতি গঠন করেন। তিনি ছিলেন এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

১৯৭১-এর ৩০ ডিসেম্বর তিনি কলকাতা থেকে আগরতলা হয়ে দেশে ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে ভেবে পূর্বাঞ্চলীয় কলেজ শিক্ষক সমিতির জন্য তিনি ভারত সরকারের শিক্ষক-সহায়তা কমিটির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অনুদানের চেক গ্রহণ করেছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় স্টেট অব ইন্ডিয়ার আগরতলা শাখায় সেই চেক জমা দিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরেছিলেন। তাঁর সেই সততা ও সাহসের কথা তাঁর সতীর্থদের মুখে এখনো শোনা যায়।

ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী আবু হামেদ সারাটি জীবন সরাইলকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, পথে-প্রান্তরে এর ঐতিহ্য খুঁজে বেড়িয়েছেন, সরাইলের ইতিহাস লিখেছেন। মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার, তাদের কাছে টেনে নেয়ার এক সম্মোহনী শক্তি তাঁর মধ্যে ছিল। কারণ তাঁর জীবনে যতটুকু সফলতা তার মূলে কিন্তু ছিল এলাকার ছাত্র-যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষের শক্তি। বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪২)-এর সময় মেঘনা নদীর পূর্বপাড়ের সরাইল একবার বাংলার রাজধানী হয়েছিল- গবেষণালব্ধ এ তথ্য তিনিই উদঘাটন ও প্রচার করেন। স্বাধীন বার ভুঁইয়াদের প্রধান মোগল-ত্রাস ঈসা খাঁর জন্মস্থান সরাইল নিয়ে তাঁর গর্বের অন্ত ছিল না। সরাইলের ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য তিনি গঠন করেছিলেন সরাইল ইতিহাস পরিষদ।

নিভৃতচারী আবু হামেদের জীবনী সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক (বর্তমানে মাননীয় উপাচার্য) ২০০০ সালে তাঁকে ‘সরাইলের সঞ্জীবনী ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু কথায় বলে, ‘প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার’। ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে আবু হামেদ যে অঞ্চলে দেশপ্রেমের রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, সমাজের কল্যাণধর্মী কাজ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলতেন, সেখানে তাঁর স্মৃতিবাহী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহের কোনোটিরই অবস্থা আজ ভালো নয়। এলাকায় নেতৃত্বের শূন্যতা প্রকট। অকৃতজ্ঞতার বেড়াজাল আর সংকীর্ণ স্বার্থের নিগড়ে যেন বন্দি হয়ে পড়ছে অনেকেই। এতে করে কারো কারো আর্থিক অবস্থার অনেক উন্নতি হলেও সময়ের তুলনায় এলাকাটি গেছে পিছিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা বেশি শোচনীয়। এ বেড়াজাল ভাঙাই এখন সময়ের দাবি। তিনি বেঁচে থাকলে এ অবস্থার বিরুদ্ধে অবশ্যই জনমত সংগঠিত করতেন। ৮৮তম জন্মদিনে এই গুণী ও সত্যনিষ্ঠ মানুষটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমরা যেন অকৃতজ্ঞ ও বিস্মৃত না হই।

শাহ শেখ মজলিশ ফুয়াদ : লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj