নারী সাংবাদিকতার কিংবদন্তি নূরজাহান বেগম

বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০১৬

নূরজাহান বেগম। উপমহাদেশের নারী সাংবাদিকতায় পথিকৃৎ এবং প্রথম নারী সাপ্তাহিক ঐতিহাসিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক। শুধু তাই নয়, আমাদের সাহিত্য, সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম পুরোধা, প্রগতিশীল নারী আন্দোলনের অগ্রসেনানী, লেখালেখির জগতে নারীদের অংশগ্রহণের অগ্রদূত ছিলেন তিনি। তার আরেকটি বড় পরিচয় আজো আমাদের অজানা। একজন শিশু সংগঠক ও সমাজকর্মী হিসেবে তার অবদান অনবদ্য। শিশু কিশোরদের অতি আপনজন ও শিশু কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ, শিশুবন্ধু নূরজাহান বেগম তেমন আলোচিত ছিলেন না। অথচ তার জীবনের একটি অন্যতম ব্রত ছিল শিশুদের জন্য বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলা। বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদের দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। আমিও এই প্রতিষ্ঠানের কাউন্সিলর হওয়ার সুবাদে তাকে কাছে থেকে দেখেছি। অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত শিশুদের উন্নয়নে তার আকুলতা, মতামত ও কার্যক্রমে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। নারী আন্দোলনের দীর্ঘ যাত্রাপথের অন্যতম দিশারি, মানবতাবাদী, মমতাময়ী এই মহীয়সী নারী গত ২৩ মে আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন পরপারে।

১৯৯২ সালে তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ও পরিচয় পাটুয়াটুলীর ‘বেগম’ কার্যালয়ে। সাক্ষাতের একটি উদ্দেশ্য ছিল, সেটি হলো ১৯৪৭ সালের ২৩ আগস্ট ‘বেগম’ পত্রিকার সংখ্যাটি সংগ্রহ করা। ওই সংখ্যায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে ‘পাকিস্তানের রাষ্টভাষা’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের তথ্যাবলী ও দলিলপত্র সংগ্রহ করা ছিল আমার নেশা। আমি তখন জগন্নাথ কলেজের অনার্সের ছাত্র। আমার কলেজের অতি নিকটেই ছিল ‘বেগম’ কার্যালয়। ফলে অবাধ যাতায়াত ছিল সেখানে। প্রথম সাক্ষাতের দিন আমার ইচ্ছার কথা জানতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত হন এবং আমাকে আদর করে কাছে বসিয়ে চা-সিঙ্গারা খেতে দেন। স্বল্প সময়ের আলাপচারিতা শেষে আমাকে অন্যদিন আসতে বলেন। আমি বিদায় নিয়ে চলে আসি। কয়েকদিন পর আবারো উপস্থিত হই বেগম কার্যালয়ে। প্রথম দিনের পরিচয়েই আমি অভিভূত হয়ে যাই মাতৃসমা এই মমতাময়ী নারীর ¯েœহাশীষ ও একান্ত সান্নিধ্য পেয়ে। তিনি সে দিন ১৯৪৭ সালের ২৩ আগস্টের ‘বেগম’ সংখ্যাটি আমার হাতে তুলে দিয়ে যা যা প্রয়োজন লিখে নিতে বলেন। আমি আমার প্রয়োজনীয় অংশটুকু লিখে নিয়ে আসি।

বেগম পত্রিকা আর নূরজাহান বেগম ছিলেন অভিন্ন সত্ত্বা। পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই। সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম’ এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। সে সময় নূরজাহান বেগম ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৫০ সালে তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। ‘বেগম’ শুধু একটি পত্রিকা নয়, এটি সমকালীন নারীদের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এই পত্রিকার মধ্য দিয়ে বাঙালি নারীদের সৃজনশীলতা, নারীশিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা এবং লেখালেখির সূচনা হয়েছিল বলা চলে। নূরজাহান বেগম পত্রিকার সৃষ্টিলগ্ন থেকে জীবনের শেষ সময় অবধি কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করে গেছেন। ১৯৪৭ সালের ২৩ আগস্ট বেগম পত্রিকার সম্পাদকীয়টি ভাষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই পাঠকদের উদ্দেশে সম্পাদকীয়টি তুলে ধরছি।

“পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে আজ বিভিন্ন পত্রিকায় যে সব আলোচনা হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সর্বসম্মতভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের দাবি এই যে, সমগ্র পাকিস্তান না হোক অন্তত পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হবে। তার অর্থ এই যে, পাকিস্তানে দুটি ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে। … সমগ্র পাকিস্তানে বাংলা বা উর্দু কোনো ভাষাকেই এককভাবে রাষ্ট্রভাষা করা সমর্থন করা যায় না। … কিছুদিন আগে ড. জিয়াউদ্দিনের মতো একজন মনীষী বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু এবং শিক্ষার মাধ্যমও হবে উর্দু। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষীরা এই মতের বিরোধিতা করেছেন। এ বিষয়ে আমাদের নারী সমাজও যে অচেতন নন তার প্রমাণ ‘বেগম’ এর গত সংখ্যা এবং বর্তমান সংখ্যায় প্রকাশিত এই বিষয় নিয়ে লেখা দুটি প্রবন্ধ। আশা করি যে, আমাদের নারী সমাজ সমগ্রভাবে বাংলা ভাষাকে সমর্থন করবেন।”

নূরজাহান বেগমের সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয় বছর খানেক আগে তার শরৎগুপ্ত রোডের বাসায় এবং সর্বশেষ ফোনে কথা হয় মাস খানেক আগে। আমার সম্পাদিত ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের নারী সমাজ’ শীর্ষক গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি এবং এর ভূমিকা লিখে দেয়ার বিষয়ে কথা হয়। ওই বইয়ের পাণ্ডুলিপিটি আমি আজো শেষ করতে পারিনি আর কোনো দিন তাকে দিয়ে ভূমিকা লেখাও সম্ভব হবে না। আমার সেই ইচ্ছা আর কোনো দিন পূর্ণও হবে না। শেষ সাক্ষাতে বেগম, নারীসমাজ ও ব্যক্তিগত নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয় তার সঙ্গে। তিনি অকপটে উত্তর দিয়ে যান আমার প্রাসঙ্গিক অপ্রাসিঙ্গক নানা প্রশ্নের। আসলে এটা কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার ছিল না। তার বাসায় বারান্দায় মোড়ায় বসে মুড়ি-চানাচুর খেতে খেতে চলছিল আমাদের কথকতা। তিনি জানান, কলকাতার জীবনে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার সান্নিধ্যের কথা, তার বাবা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের কথা, শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের কথা এবং বেগম পত্রিকার কথা। শিশু অধিকার এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা আজ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে এখনো শিশুরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পদে পদে। শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে নিমর্মভাবে। এসব শুনে মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। গ্রামে এবং শহরের শিশুদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। গ্রামের শিশুরা নানা অসুবিধার কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার এখনো শহরে পথশিশুদের কথা শুনতে হচ্ছে। শিশুর বিকাশ ও উন্নয়নে আমাদের আরো কাজ করতে হবে। তিনি আমার কাছে বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদ সম্পর্কে জানতে চান। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের শিশুবিকাশে নানা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির কথা শুনে আনন্দিত হন। বিশেষ করে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে মাসিক সাহিত্য আসর-এর আয়োজনের কথা জানতে পেরে উল্লসিত হয়ে ওঠেন। আমি তাকে সাহিত্য আসরে আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি সানন্দে রাজী হন। তবে শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে হয়তো সাহিত্য আসরে আসা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমাদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ হৃদ্যতাপূর্ণ এ সাক্ষাৎকার পর্বটি আজ শুধুই স্মৃতি।

নূরজাহান বেগম জন্মেছিলেন চাঁদপুরের চালিতাতলি গ্রামে ১৯২৫ সালের ৪ জুন। সাড়ে তিন বছর বয়সে চলে আসেন কলকাতায়, শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গালর্স হাই স্কুলে। ১৯৪২ সালে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৬ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। কিশোর বয়স থেকেই বাবা নাসির উদ্দিনের সঙ্গে ‘সওগাত’- এ কাজ করতেন। কলেজে পড়ার সময় সহপাঠীদের নিয়ে গড়ে তুলেন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। সেখানে নাচ, গান, আবৃত্তি এবং নাটক করতেন। বাবার হাত ধরে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই ‘বেগম’ এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। তখন তিনি ছিলেন এই পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৫০ সালের দিকে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম ক্লাব’-এর তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। বেগম পত্রিকার মাধ্যমে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে তৈরি করেছেন অসংখ্য সাংবাদিক এবং লেখক। যাদের লেখা তখন ‘বেগম’-এ প্রকাশিত হয়েছিল তারা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক। তিনি শুধু সাংবাদিকতাই নয় সমাজকর্মেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত, ছিলেন দক্ষ সংগঠকও। বিভিন্ন সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। নারী প্রগতি ও নারী জাগরণ ছিল তার একমাত্র ধ্যান ধারণা। আজীবন তিনি এ মহান আদর্শকে লালন করেছেন। ১৯৫২ সালে বিয়ে করেন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইকে। সুখময় দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন দুসন্তানের জননী। নূরজাহান বেগম পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘রোকেয়া পদক’ এবং ‘একুশে পদক’সহ বহু সম্মাননা ও স্বর্ণপদক। তার জীবন ও কর্ম দেশ-জাতির অমূল্য সম্পদ। তিনি অবিনশ^র, তার স্মৃতি অ¤øান হোক। নারী সাংবাদিকতার কিংবদন্তি মহীয়সী এই নারীকে জানাই বিদায়ী শ্রদ্ধা।

এম আর মাহবুব : গবেষক, লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj