দেশে ১৫ লাখ ৩১ হাজার মানুষ আধুনিক দাসত্বের শিকার!

সোমবার, ১৩ জুন ২০১৬

অদ্ভুতভাবে দেশের উন্নতি গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী! এই যে প্রায় ‘নিয়ম করে’ প্রায় প্রতিদিনই টার্গেট কিলিং হচ্ছে দেশে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান পাহাড়ি সমতলী ছাত্র-শিক্ষক পুরোহিত-পাদ্রি বৌদ্ধভিক্ষু-ব্লুগার লেখক-প্রকাশক থেকে চাকরিজীবী। কোনো পেশার লোকজন আর বাদ নেই। নির্বিচারে মানুষ খুন হচ্ছে। সেসব খুনের পর সগৌরবে দায় স্বীকার হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা গলদঘর্ম হচ্ছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও কোনো ক‚ল-কিনারা পাচ্ছেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্ররাও নিয়ম করে সরকারকে ‘ব্যবস্থা’ নিতে চাপ দিচ্ছে। ঘটনাগুলো ঘটার হার এবং ঘটার পরের ঘটনাবলি এতটাই নিয়মিত এবং নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, এসবে এখন আর কেউ বিস্মিত হচ্ছেন না। যেন বাজার করতে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক ঘটনা! এবং আরো বিস্ময়কর হচ্ছে এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন শাখায় উন্নতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী! এই জায়গাটিতেই বিশেষজ্ঞ আর আম পাবলিকের তফাৎ। আম পাবলিকরা যেটি ভেবে ভেবে গলদঘর্ম হবেন, বিশেষজ্ঞরা সেখানেই চটজলদি সমাধান দিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই বিশেষজ্ঞরাও এখন আর সমাধান দিতে পারছেন না। বিশেষ করে অর্থনীতিতে বাংলাদেশের উত্থান নাকি সমসাময়িক আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় ঈর্ষণীয়! আগেই বলেছি; আমরা সাধারণ নাগরিকরা কোনোভাবেও ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের ‘মারপ্যাঁচ’ বুঝব না। এখন না পারি, এক সময় বুঝতাম। এরশাদ আমলে জোর করে বাংলাদেশ ব্যাংককে টাকার ডি-ভ্যালুয়েশন ঠেকিয়ে রাখতে বলা হতো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যখন টাকা ডি-ভ্যালু করত বাংলাদেশ তখন দিব্যি না করেও চলতে পারত। সে সময় যে ‘কৌশলে’ এটি করা হতো এখনো তেমনি করা হয় কিনা তা আমরা জানি না, তবে দেশ এগোচ্ছে এটা কেউ অস্বীকার করবে না।

তাই যদি হবে তাহলে বাংলাদেশে ১৫ লাখ ৩১ হাজার মানুষ আধুনিক দাসত্বের নিগড়ে বসবাস করবে কেন? কেনই বা দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিক্ষিত-আধা শিক্ষিত বেকার উদ্দেশ্যহীন জীবন কাটাবে? এই চমকে যাওয়া খবরটি ছাপা হয়েছে ‘প্রথম আলো’তে গত ১ জুন ২০১৬ তারিখে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত বৈশ্বিক দাসত্ব সূচক ২০১৬ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে এ দেশে দাসত্বের শিকার মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯০০ মানুষ। অর্থাৎ মাত্র এক বছর পরই দাসত্বের শিকার মানুষের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। আর এই সময়টিতেই সরকারের বিভিন্ন মুখপাত্ররা ঢাকঢোল পিটিয়ে চাউর করছেন- দেশ শনৈঃ শনৈঃ এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়েই দেশের অর্থমন্ত্রী গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮শ কোটি টাকা কিংবা সোনালী ব্যাংকের আড়াই হাজার কোটি টাকা চুরির পর বলতে পারেন- চার হাজার কোটি টাকা তেমন কোনো টাকা নয়! কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮শ কোটি টাকা খোয়া যাওয়ার পর বলতেন না ‘এতে অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না’!

এই রিপোর্টটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই বিপুল পরিমাণ দাসত্বের শিকার মানুষের সংখ্যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ভয়াবহ রকম বেশি! যে সময়টিতে ৬ লাখ ৮০ হাজার মানুষ থেকে মাত্র এক বছরে বেড়ে ১৫ লাখ ৩১ হাজারে পৌঁছেছে, সেই সময়কেই বাংলাদেশের ‘স্বর্ণসময়’ বলা হচ্ছে। তার মানে এই সময়কালেই দেশ অনেকগুলো ক্ষেত্রে উন্নতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী করতে পেরেছে। এখন খুব সহজেই প্রশ্ন উঠবে- উন্নতি যদি হলো তাহলে এত বিপুল পরিমাণ মানুষ কেন আধুনিক দাসত্বের শিকার হলো? এর উত্তর কর্তাব্যক্তিরা দেবেন না। আমরা অনুমান করতে পারি। কোনোই কষ্ট হবে না অনুমান করতে। এর কারণ নিপীড়ন। এর কারণ ব্যাপক বৈষম্য। এর কারণ শ্রেণিগত বৈষম্যকে আরো প্রবল করে নিপীড়িত শ্রেণিকে সর্বস্বান্ত করার পুঁজিবাদী আগ্রাসন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সারা বিশ্বে দাসত্বের শিকার মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৮ লাখ। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশই ভারত, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তানের। দাসত্বের দুর্দশায় পড়া মানুষের সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। তবে মোট জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের যে ২১টি দেশের অবস্থান আধুনিক দাসের সূচকে সবচেয়ে ওপরে, এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম। এতে প্রথমে আছে উত্তর কোরিয়া। এ জরিপটি করতে ৫৩টি ভিন্ন ভাষায় ১৬৭টি দেশের ৪২ হাজার মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে।

ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে ‘আধুনিক দাসত্বের’ সংজ্ঞায় বলা হয়, দেশভেদে এর সংজ্ঞার ভিন্নতা আছে। মানব পাচার, বলপূর্বক শ্রম, ঋণগ্রস্ততা, জোরপূর্বক বিয়ে, শিশু নিগ্রহ এসবই আধুনিক দাসত্বের নমুনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে সস্তা শ্রমে তৈরি পণ্য পাঠানো হয় আধুনিক দাসত্ব বেশি আছে এমন ১০টি দেশ থেকে। এ তালিকায় দশম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। তালিকায় একেবারে প্রথমে আছে উত্তর কোরিয়া। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে উজবেকিস্তান ও কম্বোডিয়া।’

রিপোর্টে মানব পাচার, বলপূর্বক শ্রম, ঋণগ্রস্ততা, জোরপূর্বক বিয়ে, শিশু নিগ্রহকে আধুনিক দাসত্বের নমুনা বলা হয়েছে। এবার এই নমুনাগুলো একটি একটি করে আলোচনা করলে দেখা যাবে এর প্রত্যেকটিতেই বাংলাদেশের অবস্থার শীর্ষে থাকা উচিত! মানব পাচার নিয়ে গত বছর যে সিরিজ রিপোর্ট হয়েছিল তাতে করে সেই পুরনো দিনের অপবাদ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে নতুন অপবাদ হয়ে যেতে পারত- ‘মানব প্রাচারের স্বর্গভূমি’! থাইল্যান্ডে, মালয়েশিয়ায়, ভিয়েতনামে, ইন্দোনেশিয়ায় হাজার হাজার বাঙালির মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে। ক্ষুধার্থ নৌকাবোঝাই বাঙালি খাবারের জন্য চিৎকার করে কাঁদছে সেই দৃশ্য সারা পৃথিবীর মানুষ দেখেছে। বিষয়টি এত বেশি বার ঘটেছে যে, এটাকেই অনেকে ভুল করে বাংলাদেশের অন্যতম আয়ের উৎস ভেবে বসতে পারে! এর পর আসে বলপূর্বক শ্রম। এটাও বাংলাদেশে প্রায় মহামারী। ওই রিপোর্টে আসলে পুরোটা উল্লেখ হয়নি। অথবা তারা ক্ষেত্রগুলো দেখতে পাননি। তা না হলে কেবলমাত্র এই রাজধানীতেই প্রায় ৪ লাখ শিশু শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এদের সিংহভাগই আয় করে তাদের বাবা-মায়ের সংসার চালায়! শিশু নিগ্রহে বাংলাদেশ পনের-কুড়ি নয়, রীতিমতো এক নম্বরে থাকবে। সংবাদপত্র এবং ওয়েবপোর্টালে প্রতিদিনই এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হয়, হয়েছে। যা ঘটে তার অল্পই খবরে আসে। তাতেও এই হার ভয়াবহ রকম বিপজ্জনক। আর ঋণগ্রস্ততা? সে তো বাংলাদেশের গ্রামে বসবাসকারী মানুষের ‘ভূষণ’! প্রায় বারো কোটি কৃষিজীবী মানুষের সিংহভাগই কোনো না কোনো সময়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পড়তে বাধ্য হন। দাদন ব্যবসা এ দেশের সামন্ত শ্রেণির ইতর টাইপ প্রভুদের অতি প্রিয় একটি ব্যবসা! ফসল লাগানোর সময় টাকা ধার দিয়ে ফসল ঘরে উঠলে সুদে-আসলে টাকা তুলে নেয়াকে দাদন বলে। একেবারে সিম্পল নিষ্কলুষ একটি বাণিজ্য মনে হলেও এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে চুরি-চামারি, নিপীড়ন-নির্যাতন, শোষণ-পীড়ন আর সুদ তস্য সুদের কারবার এবং আদায় করার সময় নৃশংস কায়দায় আদায়। জোরপূর্বক বিয়ে খাতেও আমাদের অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার ওপরে। গ্রামে এমন কোনো পরিবার নেই যাদের কোনো না কোনো মেয়েকে তারা জোর করে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের বাধ্য করা হয়েছে।

এই বাস্তবতায় ওই রিপোর্টটি নিয়ে সরকারের কোনো মহলে মাথাব্যথা হওয়ার কথা নয়। মাথাব্যথা হয়ওনি। এরই মধ্যে বাজেট অধিবেশনে সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী তার ভাষণে যে ‘সত্য’ বলেছেন তাও এই জাতির জন্য অশনি সংকেত! ‘জাতীয় সংসদে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের মঞ্জুরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে লুটপাট হয়েছে, সেটা শুধু পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি।’ – প্রথম আলো ৮ জুন, ২০১৬। যে প্রশ্নটি এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, সেটি হলো ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির কথা স্বীকার করলেই অর্থমন্ত্রী বা সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় কি না? কখনোই নয়। অর্থমন্ত্রী মহোদয় কিংবা সরকারের দায়িত্ব সেই অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। সেদিন সংসদে অর্থমন্ত্রী অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা স্বীকার করেও ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বাড়তি মঞ্জুরির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। কেননা, তিনি তো টাকা খরচ করে ফেলেছেন। এখন সেই টাকা সংসদ পাস করাতে না পারলে তিনি থাকেন না। সরকারও থাকে না। তাই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যতই সাগর চুরি হোক না কেন, সংসদে বাড়তি মঞ্জুরি পাস করাতেই হবে।

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে গত ৪৫ বছরে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বড় বড় কেলেঙ্কারির কাছে পুকুর চুরি কিছুই না। এখানে জমি নেই, সম্পদ নেই, কারখানা নেই, ব্যবসা নেই; অথচ এসবের নামে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। সেই লোপাটকারী ব্যক্তিদের কেউ এ সরকারে, কেউ ও সরকারে আসর জাঁকিয়ে বসেন। কেউবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কক্ষে ঢুকে তাকে হুমকি দেন। এই যে একের পর এক ব্যাংকে সাগর চুরির ঘটনা ঘটছে কিন্তু এই সাগরচোরদের ধরতে সরকার কী করছে? সরকার ফি বছর এই সাগর বা পুকুরচোরদের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে যাবে? বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্বে আছেন সাড়ে সাত বছর। আগের চুরিচামারির কথা বাদ দিলেও এই সাড়ে সাত বছরের দায় কিন্তু তিনি এড়াতে পারেন না। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে পুরো অজ্ঞ অথচ তদবিরবাজিতে অভিজ্ঞ, বিএনপি আমলে বিএনপির লোক, আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগের লোকদের পরিচালনা পর্ষদে বসিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সর্বনাশ করা হয়েছে, হচ্ছে ।

এখন এই নিরিখে অর্থমন্ত্রী বলতেই পারেন- সাগর চুরির কাছে পুকুর চুরি কিছুই না, আবার পুকুর চুরির কাছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত আধুনিক দাসত্বের শিকারের ঘটনা কিছুই না। অথবা এটাও বলতে পারেন- দেশের উন্নতির গ্রাফে এইসব ছোটখাটো নিম্নমুখী ঘটনা অবচয় মাত্র। জাস্ট বোগাস! কিন্তু আমরা অনুমানে বুঝি আর অর্থনীতিবিদরা হিসাব কষে বোঝেন- মানব সম্পদের উন্নতি না হলে দেশের অর্থনীতির উন্নতির উল্লম্ফন ঘটে গেলেও সেটিকে উন্নতি বলা যায় না, বরং বিশ্ববাসী দেখে-শুনে হাসবে, ব্যঙ্গ করবে! তাই সবার আগে দেশের মানবসম্পদের উন্নয়ন করুন। মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উঠে দাঁড়াতে সহযোগিতা করুন। মানুষের জীবন-জীবিকাকে নিশ্চিত করুন। মানুষের উন্নতি হলে আপনা আপনি দেশের উন্নতি হয়। হবে।

১০ জুন, ২০১৬

মনজুরুল হক : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj