সরাইলের জন্য একটু ভালোবাসা

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০১৬

জন্মভূমিকে কে না ভালোবাসে? এ নিয়ে কে না গর্ব করে? কিন্তু সে ভূমিতে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মারামারির ঘটনা জাতীয় পত্রিকার পাতায় বা বৈদ্যুতিক (ইলেক্ট্রনিক) গণমাধমে যদি প্রায় প্রতিদিনের খবর হয় সেই ভালোবাসা বা গর্ব কোথায় যায়? লজ্জায় মাথা নত হওয়া ছাড়া? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গ্রাম বা এলাকার ‘ইজ্জত’ বাঁচাতে দু’দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার দিক দিয়ে দেশে এখন সম্ভবত শীর্ষস্থানে সরাইল। ২০০৯ সালে প্রথম প্রাথমিক সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় সরাইল থানার ফল ছিল দেশের মধ্যে সর্বনিম্নে। তখনো সরাইল জাতীয় গণমাধ্যমের খবরে স্থান পেয়েছিল। সর্বশেষ সরাইল পাইলট বালিকা বিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি স্থানে মার্কেট নির্মাণকে কেন্দ্র করে ১৮ জুন শনিবার দুদল গ্রামবাসীর সংঘর্ষের দেশবাসী জেনেছে গণমাধ্যমের খবরে।

অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরাইল বুঝি শুধুই মারামারির জায়গা? কেন এমন হলো? অথচ সরাইল সমগ্র বাংলা তথা ভারতবর্ষের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক স্থান। ১৫৪১ সালে শেরশাহ্ বাংলাকে যখন ১৯টি পরগণায় বিভক্ত করেন তখন সরাইল ছিল তার একটি। বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের প্রতিষ্ঠিত এবং মোঘল-ত্রাস ঈশা খাঁ মসনদ-ই-আলার পূণ্য জন্মভূমি হিসেবেই শুধু নয়, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলেও ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-খেলাধুলা সংস্কৃতি-আধ্যাত্ম সাধনা ইত্যাদি সব দিক দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল সরাইল। সরাইলের জমিদার পরিবারটি ছিল অসাম্প্রদায়িক এবং সেই পরিবারে পালিত সরাইলের হাউন্ড কুকুর ও হাসলি মোরগ ছিল সমগ্র বাংলার ঐতিহ্য। সর্বশেষ জমিদার দেওয়ান মোস্তফা আলী ওরফে মোস্তু মিয়া সাহেব একবার এমএলএ হন এবং তিনি ‘সরাইলের চেরাগ’ নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সরাইল দেওয়ান বাড়িরই সন্তান ন্যাপ নেতা দেওয়ান মাহবুব আলী কুতুব মিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সেনানী। তার মৃত্যুবার্ষিকী ৪ জুন এবার নীরবেই পার হয়ে গেল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে প্রচারণার জন্য তিনি আবদুস সামাদ আজাদ ও ডা. সারোয়ার আলীর সহযাত্রী হিসেবে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে দিল্লিতে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। কৃতজ্ঞ সরাইলবাসী উচালিয়াপাড়া মোড়ে কুতুব মিয়ার নামে একটি তোরণ নির্মাণ করে তার স্মৃতিকে ধরে রেখেছেন। সেই মোড়ের পাশেই সরাইল বালিকা বিদ্যালয়। আর এই বালিকা বিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। সরাইলে কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭০ সালে। একটি কলেজ ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সন তারিখ দেখে এলাকাটির ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্ক ধারণা করা যায়। সরাইলের সোনালী ও গৌরবোজ্জ্বল অতীতের ধারাবাহিকতায়ই গড়ে উঠেছিল এই দুটি প্রতিষ্ঠান এবং এর পেছনে ছিল কিছু মানুষের কল্যাণধর্মী চিন্তাভাবনা ও নেতৃত্ব যাদের কেন্দ্র করে সরাইলবাসী একত্রিত হয়েছিল। আজকের দিনে সরাইলে শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারা, সবকিছুই আছে কিন্তু নেই সঠিক নেতৃত্ব। ফলে কেউ কাকে মানতে চায় না। হিংসা, বিদ্বেষ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা আছেই।

অতীত দিনের স্মৃতি কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে। সরাইলের সন্তান ইতিহাসবিদ, ভাষা সৈনিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী, সরাইল ডিগ্রি কলেজ ও সরাইল থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ সরাইলকে নিয়ে গর্ব করেছেন আজীবন। সরাইল কালচারাল এসোসিয়েশন নামের সংগঠন করে সরাইলের সার্বিক উন্নতির জন্য কাজ করে গেছেন। সরাইলের ঐতিহ্য বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য সরাইল ইতিহাস পরিষদ নামের সংগঠন করেছেন। ১৯৪৭-পরবর্তী সরাইলের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির ইতিহাস লিখেছেন। আজকে যে সরাইল বালিকা বিদ্যালয়-সংলগ্ন স্থানে মার্কেট নির্মাণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয় সেই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ওই সরাইল কালচারাল এসোসিয়েশন। ১৯৫২ সনে সরাসরি ভাষা আন্দোলনের চেতনায় বাংলাদেশে কয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে? সরাইলবাসী এই দিক দিয়ে বিরাট ঐতিহ্যের অধিকারী ছিলেন। সেই ঐতিহ্য সরাইল কতটুকু আজ কতটুকু ধারণ করে সেটাই বড় কথা। সরাইল বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৫২ সালে সরাইল তথা দেশে একটি জাগরণ এসেছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সে চেতনাসম্ভুত স্পৃহায় সরাইলের নারী শিক্ষার প্রয়োজনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুর্বার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গঠন করেছিলাম সরাইল কালচারাল এসোসিয়েশন। .. ১৯৫৩ সালের ২২ নভেম্বর সরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ের টালিঘরে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় সরাইল বালিকা বিদ্যালয়ের ঘোষণা দিয়েছিলাম। নির্দিষ্ট দিন ১ ডিসেম্বর আঁখিতারা হতে লাহুর নদী পেরিয়ে সূর্যকান্দি শেখ নাছির (রা.)-এর দরগাহের পাশ দিয়ে কোনাকোনি উচালিয়াপাড়া গ্রামের বড়বাড়ির ভেতর দিয়ে যখন আমি এসে পৌঁছালাম তখন রাস্তার দুই পার্শে¦র বাড়িঘর হতে পূর্ব ঘোষণায় উজ্জীবিত উচালিয়াপাড়ার মেয়েরা হাতে খাতাকলম নিয়ে উৎফুল্ল চিত্তে নব উন্মোচিত বিদ্যালয়ে (সরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়েই শুরু করা হয়) ক্লাস করতে এগিয়ে আসে। বিদ্যালয়ে স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন বেড়তলাগ্রামের মরহুম মৌলভী আবদুল আজিজ খান, সাগরদীঘির সাবেক প্রেসিডেন্ট ওসমান গণি সাহেব, উচালিয়াপাড়ার মুন্সীবাড়ির প্রবীণ ব্যক্তিত্ব সুলতান মিয়া, মীরবাড়ির মীর সিদ্দিক আলী ও বণিকপাড়ার সারদা বণিক। প্রধান শিক্ষক হিসেবে ছিলেন সরাইল অন্নদার ক্রীড়া শিক্ষক মূলুক হোসেন সাহেব। সপ্তাহখানেক পরে অর্থ সংগ্রহের জন্য ফরিদউদ্দিন ঠাকুরের নেতৃত্বে নাটক অভিনীত হয়েছিল। এ থেকে প্রাপ্ত প্রায় দুশ’ টাকা বড় দেওয়ানপাড়ার মফিজউদ্দিন ঠাকুর (মনু মিয়া) সাহেবের কাছে গচ্ছিত রাখা হয়। এ অর্থ থেকে প্রধান শিক্ষককে ১৫ টাকা ও অন্যান্য শিক্ষককে ১০ টাকা করে মাসে প্রদানের জন্য নিয়ম করে দেয়া হয়। বিদ্যালয় খোলার এক মাসের মধ্যেই কোনো গৃহাদি না থাকলেও উদ্দীপনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসডিও আর আর ফারুকী (পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর জামাতা) ছিলেন প্রধান অতিথি। আমেনা খাতুন নাম্নী এক পরিদর্শিকা আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করে এর পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন। আর আর ফারুকী সাহেবও একটি সুপারিশ লিখেছিলেন। আমি সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে ঢাকার সেগুনবাগিচায় শিক্ষা বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিদর্শিকা মিস্ ম্যাকক্রিন্ডেলের নিকট সরাইল বালিকা বিদ্যালয়টির সরকারি স্বীকৃতি লাভের জন্য সাক্ষাৎ করলে তিনি ফাইল এনে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এ প্রচেষ্টায় আমার সঙ্গে ছিলেন উচালিয়াপাড়া গ্রামের মনিরউদ্দির আহমদ, নিজসরাইল মোল্লাবাড়ির আমম শহীদুল্লাহ, বড় দেওয়ানপাড়ার ফরিদউদ্দিন ঠাকুর, সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর ও আনোয়ারউদ্দিন ঠাকুর, আলীনগর সৈয়দবাড়ির সৈয়দ আকবর হোসেন বকুল মিয়া। বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি বিশেষ ঘটনাও কাজ করেছিল। ওই সময় বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সচেতন ব্যক্তিত্ব আশেক উল্লাহ মোল্লা সাহেব নারী শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে সমাজে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষা প্রচলনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাঁর কন্যা আমাতুল্লাহ বিলকিছকে সরাইল অন্নদা (বালক) বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। এ কারণে তিনি তথাকথিত ধর্মবেত্তাদের তীব্র সমালোচনার পাত্র হন। কিন্তু তাঁর উদ্যোগ সফল হয়েছিল। এই পথ ধরেই সরাইলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বালিকা বিদ্যালয়’। (তথ্যসূত্র : সরাইল যুগে যুগে, ঢাকাস্থ সরাইল থানা সমিতি, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৪৫)।

সরাইলের এই ঐতিহ্যের দিকে তাকানোর সময় আজ তাই যেন কারোরই নেই। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুুল্লাহ বলেছিলেন, ‘যে দেশে গুণীর সমাদর নেই, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না’। অশুভ এক প্রতিযোগিতাটা যেন অন্য কোনো দিকে। এই প্রতিযোগিতাই আজ সরাইলের জন্য নিয়ে আসছে দুর্নাম, বদনাম। এছাড়া, সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার পরিবেশ না থাকায় সমস্যা আরো বেড়েছে। অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ লোকান্তরিত হয়েছেন দেড় বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু তার স্মরণে একটি মিলাদ বা একটি আলোচনা সভার আয়োজন করল না সরাইলের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! অথচ সারা জীবন তিনি এ জাতীয় অনুষ্ঠান করে সরাইলকে মুখরিত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। গত বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি সরাইল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরাইল থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এডভোকেট সায়েদুল হক বলেন, ‘১৯৭৩-এর নির্বাচনে আবু হামেদ সাহেব আওয়ামী লীগের নমিনেশন চেয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন কেন যে তাকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। আজ মনে হচ্ছে, সেদিন তাকে নমিনশেন দেয়া হলে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক ঘটনাবলি হয়তো ঘটত না’। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরাইলের ইতিহাসও পাল্টে গেছে। উল্লেখ্য, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেয়েছিলেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। তিনি পরে তথ্য ও বেতার প্রতিমন্ত্রী হয়ে অধ্যক্ষ আবু হামেদের প্রতি রুষ্ট হন। এর পরিণতিতে কলেজটিই সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সরাইলের অগ্রগতির পথে সেই যে ছন্দপতন ঘটে সেই ছন্দ সরাইল আজও ফিরে পায়নি, ঘটেনি সুষ্ঠু নেতৃত্বের বিকাশ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো অনেক অকৃতজ্ঞতা, মিথ্যাচারের সংস্কৃতি তথা সঙ্কীর্ণতা। সেই সঙ্কীর্ণতা দূর করা না গেলে সরাইলের সামগ্রিক অগ্রগতির পথটুকুতে গতির সঞ্চার হওয়ার আশা করা যায় না। সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে আলোর সন্ধান পাওয়া কঠিন- এই সত্যটুকু সংশ্লিষ্ট মহল ও ব্যক্তিবর্গ যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করতে পারবেন এবং সচেতন হবেন ততই সরাইলবাসীর মঙ্গল।

:: শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ, সভাপতি, সরাইল ইতিহাস পরিষদ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj