শশাঙ্কমোহন সেন বাংলা সাহিত্যের পথিকৃৎ : ড. অনুপম সেন

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

সমালোচনা-সাহিত্য সাহিত্যের একটি প্রধান শাখা। যখন থেকে সৃজনশীল সাহিত্যের সূচনা ঘটেছে প্রায় তার অব্যবহিত পরেই সেই সাহিত্যকে বোঝার জন্য, তার রসোপলব্ধির জন্য, সমালোচনা-সাহিত্য বিকশিত হয়েছে। প্লেটো, এরিস্টটল, লনজিনাস, ভরত, আনন্দবর্ধন, বিশ্বনাথ প্রমুখ সাহিত্য-সমালোচক হোমার, সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, বাল্মীকি, ব্যাস, কালিদাস ও ভবভুতির সৃষ্টিকর্ম কেন অনন্যসাধারণ এবং তাঁদের সৃষ্টির সৌন্দর্য ও মাহাত্ম কোথায় তা আমাদের কাছে যে-ব্যাখ্যার মাধ্যমে উদ্ভাসিত করেছেন তা নিজেই এক অভিনব সাহিত্যে পরিণত হয়েছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলায় যে- নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল তা ছিল মুখ্যত সাহিত্য-কেন্দ্রিক। ইউরোপের সংস্পর্শে এসে আমাদের কাব্য-চেতনায় যে বিপ্লব ঘটেছিল তার উদগাতা ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাঙালির এই ভাববিপ্লব কেবল কাব্য-রচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এইসময় বাংলা গদ্যেরও বিকাশ ঘটে মুখ্যত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে। এঁদের অনেকেই কেবলমাত্র সৃজনশীল কবি-ঔপন্যাসিক ছিলেন না, সমালোচকও ছিলেন। মধুসূদনের চিঠিগুলোর মধ্যেও আমরা এক অসাধারণ সাহিত্য-সমালোচকের পরিচয় পাই, যিনি বিশ্বসাহিত্যকে মন্থন করেছেন। বাঙালির রেনেসাঁসের মহত্তম প্রকাশ অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিংশ শতাব্দী প্রথম দু’দশকের মধ্যে বাংলা সাহিত্যকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করেছিলেন যে, বাঙালি আজ স্পর্ধা করে বিশ্বসাহিত্যকে তার সাহিত্য-কুটিরে একাসনে বসার আমন্ত্রণ জানাতে পারে। কাব্য-কবিতা, গীতিকবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, সঙ্গীত, নৃতনাট্য, কাব্যনাট্য, মননশীল প্রবন্ধ- এক কথায় সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যা রবীন্দ্রস্পর্শে ও রবীন্দ্র জাদুকরী প্রতিভায় দীপ্ত হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ সমালোচনার ক্ষেত্রে অসাধারণ কিন্তু তাঁকে সমালোচক বলাটা হয়ত যথার্থ হবে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- “সমালোচনা হচ্ছে একটি ফুলের পাশে আরেকটি ফুল ফোটানো।” তাঁর সমালোচনা আসলে ফুলের মতো। তার সৌরভ আমাদের আমোদিত করে। তার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু সমালোচনা বলতে যা বোঝায় প্রকৃত অর্থে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা তা নয়। তাঁর সমালোচনাকে আমরা আত্মগত (ংঁনলবপঃরাব) সমালোচনা বলতে পারি, যথার্থ বিষয়ভিত্তিক সমালোচনা নয়।

বাংলা সমালোচনা-সাহিত্য যাঁদের হাতে বিকশিত ও পুষ্ট হয়েছে কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন তাঁদের অন্যতম পুরোধাপুরুষ। বস্তুত তিনিই বাংলার তুলনামূলক সমালোচনা-সাহিত্যের জনক। অধ্যাপক আহমেদ শরীফ ‘বিশ শতকে বাঙালি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেও বলা চলে বাংলা ভাষায় প্রতীচ্য আদলের ও মানের সাহিত্য সমালোচনা প্রথম শুরু করেন কবিভাস্কর শশাঙ্কমোহন সেন (১৮৭২-১৯২৮), দ্বিতীয় ব্যক্তি মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২); তারপর আমরা শ্রী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধ সেনগুপ্ত, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুুখ অনেকতায় বহু সমালোচক প্রাবন্ধিক পেয়েছি। সাহিত্যের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণমূলক ইতিহাসকার রূপে পেয়েছি দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৬), সুকুমার সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ এনামুল হক, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। এঁদের অনেকেই সম্পূর্ণ কিংবা বিশেষ শাখায় মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণমূলক ইতিহাস রচনা করেছেন।”

বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত বিনয় সরকার যাঁকে অনেকে বাংলার বিশ্বকোষ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তিনিও শশাঙ্কমোহন সেনকে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যের পথিকৃৎ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরও অভিমত, “মোহিতলাল মজুমদার শশাঙ্কমোহনের পরবর্তী ধাপ।” (বিনয় সরকারের বৈঠকে, পৃ. ৭৪৫)

শশাঙ্কমোহনের ‘বঙ্গবাণী’-ই বাংলা তুলনামূলক সমালোচনা-সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হলে তৎকালীন প্রসিদ্ধ সাময়িকী ‘প্রতিভা’তে ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী এভাবে শশাঙ্কমোহন সেনের মূল্যায়ন করেছিলেন, “যাহার আবির্ভাবে ইউরোপ ও আমেরিকায় কাব্য, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতির ন্যায়, সমালোচনাও সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র শ্রেণীর স্থান অধিকার করিয়াছে; যেরূপ সমালোচনা সম্পর্কে সাহিত্যের মধ্য দিয়া জাতীয় জীবনের বিশেষত্বের বোধ জন্মে, বিশ্বসাহিত্যের সহিত পরিচয় সংস্থাপিত হয় এবং সংস্কারগত সংকীর্ণতা ঘুচিয়া গিয়া মানবমনের পরিধি বিস্তৃত ও সাহিত্যরুচি উদার হইয়া ওঠে ও সমালোচনা মৌলিক সাহিত্যসৃষ্টির গৌরব লাভ করে- বাস্তবিকপক্ষে এ পর্যন্ত বঙ্গসাহিত্যে তাহার অত্যন্ত অভাবই ছিল বলিতে হইবে- শশাঙ্কমোহন সেই অভাব পূরণ করিলেন।….. বিশ্বসাহিত্যের সমালোচনার ইতিহাসে শশাঙ্কমোহন, সাঁবু (ঝধরহঃ ইবাঁব), তাঁ (ঞধরহব), ব্রুনেতিয়ের (ইৎঁহবঃরবৎব), ম্যাথু আর্নল্ড বা হার্ডার, হেগেল যুগের জার্মান সমালোচকগণের, কোনো একজনের শিষ্য, না উহাদের সকলের মতের ভালোমন্দের সমষ্টির ফল, বা উহাদের সকলের সারভাগ মন্থনপূর্বক অভিনব আদর্শের স্রষ্টা, এক্ষণে তাহার বিচারের অবকাশ নাই। কিন্তু এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে, তাঁহার সমালোচনা সাহিত্যের মৌলিক সৃষ্টি।” (প্রতিভা, আশ্বিন-কার্ত্তিক, ১৩২২)

‘বঙ্গবাণী’তে শশাঙ্কমোহন যে সমালোচনা-আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন তা ছিল অনন্য ও বহুমাত্রিক। সাহিত্যসৃষ্টিকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কালের একটা পটভূমিতে স্থাপন করে। সাহিত্য যে কোনো স্বতঃস্ফ‚র্ত ব্যাপার নয়, এর একটা স্থান-কালের ব্যাপার আছে, সামাজিক পটভূমি আছে তা শশাঙ্কমোহনের সমালোচনাতেই প্রথম পরিস্ফুট হয়। তিনি মার্ক্সীয় পদ্ধতির শ্রেণীসংগ্রামের ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিলেও কবি-সাহিত্যিককে এবং তাঁদের কাব্য ও সাহিত্যকর্মকে কালের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর ‘বাণীপন্থা’ যা ধারাবাহিকভাবে ‘নব্য ভারত’, ‘প্রতিভা’ ও ‘গৃহস্থ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, তাকেই বাংলা ভাষায় সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রথম সার্থক ঐতিহাসিক-সমাজতাত্তি¡ক বিশ্লেষণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এক্ষেত্রে তিনি নীরেন্দ্রনাথ রায়, গোপাল হালদার ও বিনয় ঘোষের পূর্বসূরি।

‘বঙ্গবাণী’তে অন্তর্ভুক্ত ‘বঙ্গসাহিত্যের জাগরণ’ ও ‘বঙ্গসাহিত্যের বিকাশ’ প্রবন্ধ দু’টিতে তিনি বাংলার প্রাচীন সাহিত্যকে- মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলীকে সমাজ মানসের স্ফুরণ হিসেবেই দেখেছেন (তখনও বৌদ্ধ চর্যাপদ ও দোহা আবিষ্কৃত হয়নি)। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল বাঙ্গালীর নিজস্ব বলিয়াছি। উহারা সর্ব্বতোভাবে বঙ্গদেশজাত এবং উহাদের সংস্কৃত সম্পর্কও সামান্য। প্রাচীন বঙ্গদেশের সমাজ ও পরিবারের রীতিনীতি এই সকল কাব্যে নানাদিকে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল মূর্ত্তি ধারণ করিয়াছে। আবার এই সকল কাব্য নাগরিক জীবনের এবং রাজসভারও সৃষ্টি নহে। গ্রামদেশে প্রাত্যহিক জীবনের ছায়ায় বসিয়া মানবজীবনের সুখদুঃখ রসে গভীরগাহী, সবল সুস্থদেহ বাঙ্গালী কবি আপনার হৃদয়মধ্য হইতে এই স্বভাবসঙ্গীত উৎসারিত করিয়াছেন।

…নারায়ণ দেব বিশেষত মুকুন্দরাম প্রাচীন বঙ্গভূমির অমূল্য সম্পত্তি।… কালকেতু ও চাঁদ সদাগর, বেহুলা ও খুল্লনা প্রস্তর খোদিত জীবন্ত ভাস্কর্য্যমূর্ত্তি। বিশেষত কালকেতু! ঐ চরিত্রে সংস্কৃত সাহিত্যের কিছুমাত্র প্রভাব নাই। বঙ্গসমাজের প্রত্যন্তবাসী ঘৃণিত অস্পৃশ্য ব্যাধযুবকের প্রতি কোন ব্যক্তি সদয় দৃষ্টি করিবে?… বঙ্গসাহিত্যের সেই অর্দ্ধজাগরণের উষাযুগে, এই মুকুন্দরাম বাঙ্গালার পল্লীপথে আনন্দোন্মিষ্ঠনেত্রে চারিদিক পরিদর্শন করিয়া, আচন্ডাল মনুষ্যহৃদয়ের সঙ্গে নিজের হৃদয়কে সহানুভাবক করিয়া চলিয়াছেন।… প্রকৃত বাঙ্গালী জীবনের মধ্যক্ষেত্রে আসর গাড়িয়া সাধারণের মধ্য হইতেই অসাধারণতার ভাব উজ্জ্বলিত করিয়া, জাতীয় সাহিত্য নির্ম্মাণের সুদৃঢ় ভিত্তি পত্তন করিতে কবিকঙ্কনের এই ভাষা, এই দৃষ্টি এবং সৃষ্টিশক্তি পরম মহার্ঘ্য বিবেচিত হইবে।” (‘বঙ্গসাহিত্যের জাগরণ’, বঙ্গবাণী : পৃ. ১৪-১৫)। প্রাচীন বাঙালি কবির কাব্যস্ফ‚র্তির সদর্থক সামাজিক দিক যেমন শশাঙ্কমোহন অনুপম ভাষায় ব্যক্ত করেছেন, তেমনি তার নঙর্থক সামাজিক ভিত্তিও তাঁর কাছে পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “বৈষ্ণব কবিগণের পদাবলী ব্যতীত নিখুঁত সাহিত্য নামের উপযুক্ত কবিতাও প্রাচীন সাহিত্যে বিরল।… ধর্মের এক প্রকার অঙ্গাবরণ জড়াইয়া লেখাগুলি প্রকাশ করিতে হইত- বিদ্যাসুন্দরের মত পুস্তকও দেবীমাহাত্ম্যের সঙ্গে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। তখন ধর্ম্মেরও তেমন কোন প্রচলিত উচ্চ আদর্শ ছিল না- স্তবস্তুতি এবং পূজা-অর্চ্চনাই ধর্ম্মের প্রধান লক্ষণ ছিল। চরিত্রের স্থৈর্য্যমাধুর্য কিংবা পবিত্রতা, চিত্তের স্বাধীনতা আত্মনিষ্ঠা বিংবা নৈতিক বল সাধারণের ধর্ম্ম আদর্শের মধ্যে কোথাও উদ্দিষ্ট ছিল না- অন্তত উহা কবিকল্পনাকে উত্তেজিত করিতে পারে নাই।…কোনরূপ জাতীয়তার আদর্শে কিংবা বিপ্লবের আদর্শেও পরিচালিত না হওয়ায় প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে প্রকৃত মনুষ্যত্বের আদর্শও অবাধে পরিপুষ্ট হইতে পারে নাই।

…তাই চন্দ্রধরকে মনসার হস্তে পরাজিত হইতে হইয়াছিল; সাহিত্যলোকের একটি অত্যুন্নত বীর পুরুষকে লৌকিক বিশ্বাসের যূপমূলে বলি দেওয়া হইয়াছিল, এই আদর্শে কবিকঙ্কনও কারকেতুর বীর চরিত্রকে ভীরুতা ও কলঙ্কের অতলে ডুবাইয়া দিয়াছেন।… দেবদেবীর পীঠস্থানে বারংবার মহাবলি চলিয়াছে; এই উপলক্ষে কেবল গৌনভাবে কবিত্ব ফুটিয়াছে, বই নহে।” (প্রাগুক্ত : পৃ. ৬৫-৬৬) মঙ্গলকাব্যের এই ধরনের ব্যাখ্যা আজ হয়ত খুব অজানা নয়, কিন্তু যা জানা নেই তা হলো এই ধরনের ব্যাখ্যার সূচনা শশাঙ্কমোহনেরই হাতে হয়েছিল।

প্রাচীন বাংলার কাব্যসাধনাকে শশাঙ্কমোহন হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধের যৌথ-সাধনা হিসেবে চিহ্নিত করে লিখেছেন : “বঙ্গদেশে মুসলমানের অধিকার ও প্রভাবের ফলে সমুন্নত পারস্য সাহিত্যের ভাবপ্রবাহও নানামুখে বঙ্গসাহিত্যে প্রবিষ্ট হইয়াছিল।… মুসলমানের ভক্তি আদর্শ ও পরম ঋজু উপাসনা প্রণালীর সম্বন্ধে আসিয়া ভারতবর্ষও প্রভূত উপকার লাভ করিয়াছে। ভারতবর্ষের নানক কবির প্রভৃতির মধ্যে মুসলমান প্রভাব সুস্পষ্ট।….. বঙ্গদেশে মৌলিক মোগল পাঠানের সংখ্যা পরিমিত; ক্রমে তাঁহাদের পরিচিহ্ন পর্যন্ত লুপ্ত হইয়া যাইতেছে… বঙ্গদেশ ও বঙ্গভাষা হিন্দু-মুসলমান উভয়ের। প্রাচীন বঙ্গসাহিত্য মুসলমানের প্রাণস্পন্দনে বিশেষভাবে স্পন্দিত।… বঙ্গভাষা, উহার অভিধান, বাঙ্গালীর ব্যবহার-বিধি, বাঙ্গালার রীতিনীতি, ভদ্রতা ও শিষ্টাচার নানাদিকে মুসলমানের নিকট ঋণী। উপাখ্যানকাব্য পারস্য সাহিত্যেরই সৃষ্টি। এই ক্ষেত্রেই বঙ্গসাহিত্য মুসলমানের প্রভাবে বিশেষ উপকৃত হইয়াছে।…. সেইদিন পর্যন্ত রঙ্গলালের পদ্মিনী উপাখ্যানে এবং কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সদ্ভাবশতকে এই পারস্য প্রভাব ছিল, দেখিতে পাইতেছি। মুসলমানের এই উপাখ্যানকাব্যে ধর্ম্মের বা সা¤প্রদায়িকতার সম্পর্ক নাই। সাহিত্যরসই মুখ্য উদ্দেশ্য।” (প্রাগুক্ত; পৃ. ২৮)

২.

শশাঙ্কমোহন কেবলমাত্র প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অভিনব ব্যাখ্যাকারই ছিলেন না, মধুসূদন-সমালোচনারও তিনি পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম সমালোচক যিনি মধুসূদনকে তাঁর অন্তর্জীবনের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।

কিশোর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতী’ পত্রিকায় মধুসূদনের যে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, তার যোগ্য প্রত্যুত্তর তৎকালীন কোনো সমালোচকই দিতে সক্ষম হননি। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক তারাপদ ভট্টাচার্যের মতে, এর ফলে প্রায় দীর্ঘ ৪৪ বৎসর মধুসুদন অনেকটা অবজ্ঞাত বা অবহেলিত থেকে যান। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কমোহন ‘গোপাল দাশ চৌধুরী অধ্যাপক’ হিসেবে মধুসূদন সম্পর্কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যে বক্তৃতা দিন তা-ই ‘মধুসূদন : তাঁর অন্তর্জীবন ও প্রতিভা’- এই নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থেই শশাঙ্কমোহন মধুসূদনকে বাংলা সাহিত্যের অনন্যসাধারণ স্রষ্টা এবং তিনিই যে বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত মহাকবি তা প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রথমে ষোল বছর বয়সে ১২৮৪ সালে, আবার ১২৮৯ সালে মধুসূদন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতী’তে যে আলোচনা করেছিলেন তার মূল বক্তব্য ছিল- একটি মহাকাব্য এক বা একাধিক মহাবীরকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়। তেমন মহৎ চরিত্র ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ কোথায়? তিনি লিখেছেন, “হীনক্ষুদ্র তস্করের ন্যায় অথবা পুত্রশোকে অধীর হইয়া লক্ষণের প্রতি শক্তিশেল নিক্ষেপ করাই কি একটি মহাকাব্যের বর্ণনীয় হইতে পারে যাহাতে তিনি উচ্ছ¡সিত হৃদয়ে একটি মহাকাব্য লিখিতে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইতে পারেন?…দেখিতেছি ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ ঘটনার মহত্ত্ব নাই, একটা মহৎ অনুষ্ঠানের বর্ণনা নাই। ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র পাত্রগণের চরিত্রে অনন্যসাধারণতা নাই, অমরতা নাই। মেঘনাদবধের রাবণে অমরতা নাই, রামে অমরতা নাই, লক্ষণে অমরতা নাই, এমনকি, ইন্দ্রজিতেও অমরতা নাই।… এখনকার যুগের মনুষ্য চরিত্রের উচ্চ আদর্শ তাঁহার কল্পনায় উদিত হইলে তিনি আরেক ছাঁদে লিখিতেন।”

এখনকার যুগের মনুষ্যচরিত্রের উচ্চ আদর্শের যে-কথা কিশোর বা নবযুবক রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন সেই আদর্শেই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতার রাম চরিত্র, “সম্পদে কে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক; কে পেয়েছে সবচেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক?” কে সে- “অযোধ্যার রঘুপতি রাম।” এই রামচরিত্র মুখ্যত রাল্মীকির রামায়ণ থেকে আহৃত। মধুসূদনের রাম বা রাবণ বাল্মীকির নয়, তা মধুসূদনের নিজেরই সৃষ্টি।

রবীন্দ্রনাথের কবিহৃদয়ে অবশ্য অচিরেই তাঁর ‘মেঘনাদবধ’ ব্যাখ্যা ত্রুটি ধরা পড়েছিল। ১৯১২ সালে ‘জীবনস্মৃতি’তে তিনি লিখেছিলেন, “অল্পবয়সে স্পর্ধার বেগে মেঘনাদবদের একটি তীব্র সমালোচনা লিখেছিলাম। কাঁচা আমের রসটা অ¤øরস, কাঁচা সমালোচনাও গালিগালাজ। অন্য ক্ষমতা যখন কম থাকে তখন খোঁচা দিবার ক্ষমতা খুব তীক্ষè হইয়া উঠে। আমিও এই অমর কাব্যের উপর নখরাঘাত করিয়া নিজেকে অমর করিয়া তুলিবার সর্বাপেক্ষা সুলভ উপায় অšে¦ষণ করিতেছিলাম। এই দাম্ভিক সমালোচনাটা দিয়া আমি ভারতীতে লেখা আরম্ভ করিলাম।”

পরবর্তীকালে ‘সাহিত্যসৃষ্টি’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রায় বিংশতি বাক্যে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র যে অসাধারণ ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন তা তাঁর কৈশোরের কাঁচা সমালোচনার স্খলনই শুধু ছিল না, তাতে মেঘনাদবধ কাব্যের অমর ঐশ্বর্যও ফুটে উঠেছিল। কিন্তু তাঁর এই ব্যাখ্যা তখনকার গীতিকবিতা-প্রভাবিত পাঠকসমাজে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের কাঁচা বয়সের মেঘনাদবদ সমালোচনাই দীর্ঘকাহিনী-কাব্যবিমুখ সাহিত্যরস-পিপাসুদের মধুসূদনের অমর প্রতিভার সঙ্গে আত্মিক পরিচয় সাধনের ক্ষেত্রে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শশাঙ্কমোহনের মহৎকীর্তি এই বাধার অপসারণ। তিনিই দেখালেন মধুসূদন অমর কবি, আধুনিক বাংলা কাব্যের কাব্যের ভগীরথ।

তারাপদ ভট্টাচার্য লিখেছেন, “বঙ্গসাহিত্যে অনেক কৃতী সমালোচক আবির্ভূত হয়েছেন বটে, কিন্তু শশাঙ্কমোহনের কাজের মতো এতবড় মহৎ কাজ আর কারো দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়নি।… তাঁর প্রধান পুণ্যকর্ম মহাকবি মাইকেল মধুসূদনের অপহৃত গৌরবের পুনরুদ্ধার। এজন্য বাঙালি পাঠক মাত্রই শশাঙ্কমোহনের কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবে। তাঁর এই কীর্তি অমর। মাইকেলের রাহুগ্রাস আর রাহুমুক্তির কাহিনী বঙ্গসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেই ঐতিহাসিক কাহিনী স্মরণীয়; তবে দুঃখের বিষয়-এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রবীন্দ্রনাথের রচিত একটি ধ্বংসাত্মক সমালোচনা- ১২৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ সাতটি সংখ্যায় মধুসূদনকে প্রচণ্ড আঘাত করেন। এই তরুণ সমালোচকের সুতীক্ষè যুক্তির শরবর্ষণে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র মহিমা প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সেকালের খ্যাতিমান ও শক্তিশালী সাহিত্যিকরা কেউই রবীন্দ্রনাথের যুক্তির যথার্থ প্রতিবাদ করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল, সীতাহরণকারী পাপিষ্ঠ রাবণের স্মরণে যাঁর কল্পনা উত্তেজিত হয় এবং ধার্মিক রামচন্দ্রের স্মরণে যাঁর ঘৃণা- এহেন ইতর ব্যক্তিকে মহাকবি কেন, কবিও বলা চলে না।… বোদ্ধা না হলে মুগ্ধের দ্বারা এর উত্তর সম্ভব নয়। চুয়াল্লিশ বছর পর শশাঙ্কমোহন এসে এই ভ্রান্তি দূর করলেন।” (শশাঙ্কমোহন স্মারকগ্রন্থ : পৃ. ২২-২৪)

এই ভ্রান্তি দূর করতে শশাঙ্কমোহনকে প্রমাণ করতে হয়েছে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র কাব্যাদর্শনের মর্মমূলে রয়েছে সেকালের বাঙালি কাব্যাদর্শের এমনকি ভারতীয় কাব্যাদর্শের বহির্ভূত এমন এক কাব্যাদর্শ, যে-কাব্যাদর্শে নায়ক শত প্রতিক‚লতা এবং বিরাট ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েও নতিস্বীকার করে না। অনমনীয় মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই কাব্যাদর্শ গ্রিক কাব্যাদর্শ।

মধুসূদনের সৃষ্টিসম্ভার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কীভাবে বিশ্বপথের পথিক করেছিল এবং একই সঙ্গে তার মূল বাঙালি বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখেছিল, বাংলা কাব্যে ইয়োরোপের রেনেসাঁসের বিশেষত তার মানবতাবাদের-গ্রিক মানবতাবাদের- বাণীকে, বিদ্রোহের বাণীকে তত্ত্বের মাধ্যমে নয়, দর্শনের মাধ্যমে নয়, কবিতার ঐশ্বর্যেই ধারণ করেছিল শশাঙ্কমোহন তা এমন অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে উন্মোচন করেছিলেন যে, তাঁর মধুসূদন-ব্যাখ্যা আজো তাই মধুসূদনের কবি-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ বিশ্লেষণ হিসেবে স্বীকৃত। প্রমথনাথ বিশী লিখেছিলেন “মাইকেল সম্বন্ধে যতগুলি পুস্তক আছে (খুব বেশি নাই), তন্মধ্যে এক হিসেবে শশাঙ্কমোহনের বইখানি শ্রেষ্ঠ : বোধ করি সে বই এখন আর কিনিতে পাওয়া যায় না। বাংলা শ্রেষ্ঠ বইয়ের শেষ আশ্রয়স্থল ফুটপাতে মাঝে মাঝে বিক্রয় হয়- আমি সেইখান হইতে কিনিয়াছিলাম।” (শ্রী প্রমথনাথ বিশী, মাইকেল মধুসূদন, পৃষ্ঠা-ভূমিকা)। কেবলমাত্র প্রমথনাথ বিশীই নন, পরবর্তীকালে যাঁরাই মধুসূদনের কবি প্রতিভার মর্মমূলে প্রবেশ করে তাঁর সৃষ্টির অসাধারণ সৌন্দর্য উদঘাটনে ব্রতী হয়েছেন তাঁদের প্রায় সবাই শশাঙ্কমোহনের কাছে তাঁদের ঋণ স্বীকার করেছেন।

বর্তমান যুগের মনস্বী সমালোচক ড. শিশিরকুমার দাস তাঁর ‘মধুসূদনের কবি- মানস’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন, “শ্রদ্ধেয় শশাঙ্কমোহন সেন মধুসূদনের মানসলোকে প্রবেশের প্রথম চেষ্টা করেন। তারপর কবি মোহিতলাল মজুমদার ও শ্রদ্ধেয় প্রমথনাথ বিশী তাঁদের স্বকীয় দৃষ্টির আলোকে মধুসূদনের জীবনরহস্য প্রকাশ করেছেন। মধুসূদনের আলোচনা এখানেই থামেনি বরং তা ক্রমবিকশিত। বাংলাদেশে অধ্যাপনার ক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয় জনার্দন চক্রবর্তী তাঁর হৃদয় ও মনীষা উভয়ের যোগে মধুসূদন পাঠের একটি বিশিষ্ট ধারা স্থাপন করেছেন। এঁদের সকলের কাছেই আমাদের দেশ ঋণী। আমার ঋণের অন্ত নেই।” (পৃ. প্রথম সংস্করণের ভূমিকা)

ড. অধীর দে ‘আধুনিক বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারা’ গ্রন্থে শশাঙ্কমোহন সম্বন্ধে লিখেছেন, “রচনার মাধুর্য ও বিশ্লেষণের গুণে তাঁহার সাহিত্যালোচনা উচ্চাঙ্গের শিল্পকৃতির মর্যাদায় ভূষিত হইয়াছে। শশাঙ্কমোহন দেশী ও বিদেশী সাহিত্য একনিষ্ঠভাবে পরিক্রমা করিয়া ‘কবি শ্রী মধুসূদনের’ ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের অন্তরশায়ী শক্তি আবিষ্কার করিয়াছেন এবং এই প্রসঙ্গে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা দ্বারা তাঁহার সমালোচনা-শক্তির স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিক রস-চিন্তার পরিচয় প্রকাশ পাইয়াছে। তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্যে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র যথার্থ নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা করেন।” (আধুনিক বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ১৪৮)

কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহনের পরবর্তী কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার, যিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অপর কোনো সমালোচককেই সমালোচক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে যথেষ্ট কুণ্ঠিত ছিলেন, তিনিও শশাঙ্কমোহনের, মধুসূদন-সমালোচনার অনন্য-গভীরতা স্বীকার করে লিখেছেন, “সুপণ্ডিত ও সুকবি স্বর্গীয় শশাঙ্কমোহন সেন মধুসূদন নামে এই পুস্তক প্রকাশিত করিয়াছিলেন। মধুসূদন সম্বন্ধে তিনি এমন অনেক কথাই বলিয়াছেন, যাহার মৌলিকতা ও গভীরতা অতিশয় চমকপ্রদ। কবিচিত্তের সহিত যে আধ্যাত্মিক যোগ স্থাপিত না হইলে কবি-পরিচয় যথার্থ হইতে পারে না, সেই সহানুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকৃষ্ট প্রমাণ এই প্রবন্ধে আছে।” (মোহিতলাল মজুমদার, শ্রী মধুসূদন, পৃ. ৭)

মোহিতলাল উপলব্ধি করেছেন, শশাঙ্কমোহনের মধুসূদন-আলোচনা একজন কবির আলোচনা। শশাঙ্কমোহন কবি-হৃদয় নিয়ে মধুসূদনের কাব্যের মর্মমূলে প্রবেশ করেছিলেন। মোহিতলালের মধুসূদন-আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই শশাঙ্কমোহন অনুসারী। তারাপদ ভট্টাচার্য, ক্ষেত্র গুপ্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ, নীলরতন সেন, অমৃতাভ মুখোপাধ্যায় ও আরো অনেকে মোহতলালের ওপর শশাঙ্কমোহনের প্রভাব সম্পর্কে উল্লেখ ও আলোচনা করেছেন। উভয় সমালোচকদের বিভিন্ন বক্তব্য পাশাপাশি স্থাপন ও বিশ্লেষণ করে এই প্রভাব দেখানো যেতে পারত, কিন্তু স্থানাভাবে তা করা গেল না। অন্য এক প্রবন্ধে তা করার প্রত্যাশা রাখি।

৩.

বিভিন্ন সমালোচকের ওপর শশাঙ্কমোহনের প্রভাব কেবলমাত্র মধুসূদন আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল প্রমুখ অনেকের আলোচনার ক্ষেত্রেই তা প্রসারিত। মোহিতলাল মজুমদারের সমালোচনা-খ্যাতির দুটি প্রধান ভিত্তি মধুসূদন ও বঙ্কিম-সমালোচনা। এই দুই ক্ষেত্রেই মোহিতলাল শশাঙ্কমোহন দ্বারা প্রভাবিত। মোহিতলালের ‘কপালকুণ্ডলা’ সমালোচনাকে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় মোহিতলালের সমালোচনা-শক্তির অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন। মোহিতলাল ‘কপালকুণ্ডলা’র সমালোচনার প্রারম্ভেই লিখেছেন, “কপালকুণ্ডলা’ বঙ্কিমচন্দ্রের অপর সকল উপন্যাস হইতেই স্বতন্ত্র। এই জন্যই ‘কপালকুণ্ডলা’র সমালোচনায় একজন পূর্বসূরি প্রতিভাবান কবি ও সমালোচক এমন অপূর্ব মন্তব্য করিয়াছেন : ‘কপালকুণ্ডলা’ প্রতিভার আনন্দস্ফ‚র্তি। কবি আপনাকে চিনিয়াছেন, আপন হৃদয়ের প্রতিভা-মূর্তির পরিচয় পাইয়াছেন, কিন্তু সে তখনও বন্য, অসামাজিক, সামুদ্রিক। নবীনচন্দ্রের যেমন পলাশীর যুদ্ধ, তেমনি বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা- উভয়ের কোনো অর্থ নেই, চঁৎঢ়ড়ংব নাই। তবুও সুন্দর, অদৃষ্টপূর্ব, একক সৌন্দর্য। কপালকুণ্ডলা ঞধষব নহে, উপন্যাস নহে, উহা গদ্যরীতির কাব্যনাটক, গ্রীক নাটক’ (শশাঙ্কমোহন)। এমন উক্তি সেকালের কোনো সমালোচক করিতে পারিতেন না। আমি এই মন্তব্যগুলো উদ্ধৃত করিয়াছি, তাহার কারণ, আমার আলোচনায় ঐ মন্তব্য-নিহিত প্রশ্নগুলোর মীমাংসার উক্তি- প্রতিবাদ ও সমর্থন দুই-ই পাওয়া যাইবে” (মোহিতলাল মজুমদার, বঙ্কিম বরণ)। মোহিতলালের ‘কপালকুণ্ডলা’ সমালোচনা গড়ে উঠেছে শশাঙ্কমোহনের ঐ অসাধারণ উক্তিকে কেন্দ্র করেই।

পরবর্তীকালে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের হাতে বঙ্কিম আলোচনা আরো প্রসারতা পেয়েছে। তাঁরা দু’জনেই বঙ্কিম সমালোচনার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন (দ্রষ্টব্য : অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, বাংলা সমালোচনার ইতিহাস)। কিন্তু এঁদের প্রত্যেকের ওপরেই শশাঙ্কমোহনের প্রভাব রয়েছে। শশাঙ্কমোহনই তুলনামূলক-সমালোচনার মাধ্যমে বঙ্কিম-সমালোচনার আধুনিক ধারার সূচনা ও প্রতিষ্ঠা করেন। উজ্জ্বল-কুমার মজুমদার ‘গল্প-উপন্যাস রচনা ও চর্চায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, “শশাঙ্কমোহন ছিলেন কবি ও সমালোচক। তাঁর মধুসূদন (১৯২২), বঙ্গবাণী (১৯১৫) ও বাণীমন্দির (১৯২৮) দুর্লভ সমালোচনা শক্তির নিদর্শন। যদিও বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ডে বাংলাকাব্য বিচারই তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, তবু বিশেষ করে গল্প-উপন্যাসের সমালোচনায় বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর মৌলিক সিদ্ধান্ত বিশেষ স্মরণীয়।… তিনিই প্রথম লক্ষ্য করেন য়ে, ‘অদৃষ্টের পরিহাস’ ও ‘প্রকৃতির বিধ্বংসীরূপ’ বঙ্কিম উপন্যাসের ট্রাজেডির স্বরূপলক্ষণ এবং পাপের ধারণা বঙ্কিমের উপন্যাসের শিল্পরূপে গভীর তাৎপর্য আনতে সক্ষম হয়েছে। বঙ্কিমের শিল্পজগৎ ও মননশীলতার নানাদিকগুলিকে ইতিপূর্বে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের সমালোচকরা নানাভাবে স্পর্শ করেছেন কিন্তু বঙ্কিমের মনোজগৎকে ইতিপূর্বে কোনো সমালোচকই এমন গভীরভাবে স্পর্শ করেননি। এই নিয়তিধারণা ও পাপবোধের সূত্র নিয়েই পরবর্তীকালে মোহিতলাল, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত বঙ্কিমের জগৎকে বিস্তৃতভাবে দেখিয়েছেন। বঙ্কিম সম্পর্কে আধুনিক মনোভঙ্গির বিকাশ শশাঙ্কমোহন থেকেই শুরু হয়েছে বলে মনে হয়।” (সুবর্ণলেখা : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ, পৃ. ২৬৪)

৪.

শশাঙ্কমোহন কেবলমাত্র মধুসূদন বা বঙ্কিমকেই নন, রবীন্দ্রনাথকেও বিশ্বসাহিত্যের পটভূমিতে স্থাপন করে তাঁর সমগ্র সাহিত্যকৃতিকে তুলনামূলক-সমালোচনার মানদণ্ডে বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির চেষ্টা করেন। ১৯০৫ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের অনেক মুখ্য লেখাই প্রকাশিত হয়নি, সেসময়েই শশাঙ্কমোহন উপলব্ধি করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসাহিত্যের মহত্তম স্রষ্টাদের অন্যতম। তিনিই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সমভূমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রবীন্দ্র-সাহিত্য সমালোচনার ধারা গ্রন্থের গবেষক-লেখক আদিত্য ওহদেদার লিখেছেন, “রবীন্দ্রকাব্যকে সমগ্র দৃষ্টিতে বিচার করার প্রথম প্রয়াস যদি করেন মোহিতচন্দ্র, গোটা রবীন্দ্রসাহিত্যকে এরকম একটা বিচার প্রথম করেন শশাঙ্কমোহন সেন (১৯৭৩-১৯২৮)। ইনি ‘সাহিত্যে’ এই সময় (১৩১২) ‘বঙ্গ সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা’ নামে যে প্রবন্ধ লেখেন তাতে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-কৃতির একটা মূল্যায়ন করেন। তিনি জানালে, রবীন্দ্রনাথ আপনার প্রতিভাবলে বঙ্গসাহিত্যকে পৃথিবীর অন্যান্য সাহিত্যের সমক্ষ করে তুলেছেন। তাঁর ভাষায় : ‘কবি রবীন্দ্রনাথ মৌলিক প্রতিভার অধিকারী। এখনও তাঁহার সমালোচনার সময় আসে নাই। সেসময় বহু দূরবর্তী থাকুক, বঙ্গসাহিত্য রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার প্রভায় কৃতার্থ, সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত হউক। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গসাহিত্যে যে সকল মৌলিক উপকরণ ও স্থায়ী চিহ্ন রাখিয়া যাইতেছেন, তাহা ইতিপূর্বে কোন কবি কিংবা লেখক পারেন নাই। তাঁহার প্রতিভা নিত্য নবনব পথে খেলিতেছে। তিনি বঙ্গসাহিত্যকে এমন শব্দ-সম্পদ, ভাবের উপাদান, রচনার কারুকার্য, চরণের গাম্ভীর্য, অলংকারের পারিপাট্য ও ছন্দের শত সহস্র প্রকার বৈচিত্র্যে ভূষিত করিয়া যাইতেছেন যে, বঙ্গভাষা স্পর্ধা করিয়া পৃথিবীর অন্য সাহিত্যকে আপন কুটিরে নিমন্ত্রণ করিতে পারে।’ সমালোচক রবীন্দ্রনাথের এই উন্নতির মূল কারণ বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হন। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের এই উন্নতির মূল কারণ স্বাধীনতা**। তিনি শৈশব হইতেই সম্পূর্ণ স্বাধীনতার, এমনকি, সময়ে সময়ে স্বেচ্ছাচারের বশবর্তী হইয়া, স্বীয় শক্তির অনুসরণ করিতেছিলেন; সমস্ত শক্তিশালী মানবের চরিত্রে প্রকৃতি এক অপূর্ব দাম্ভিক উগ্রতা মিশ্রিত করিয়া দেন। তাঁহারা সমস্ত প্রশংসা তুচ্ছ করিয়া অবিশ্রান্তপ্রবাহে আপন উদ্দেশ্যের দিকে ছুটিয়া যাইতে পারেন, আপনাকে চরিতার্থ করিতে পারেন। এই স্বাধীনতায় রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ও অপ্রকৃতি উভয়ই চরিতার্থ হইয়াছে; আমরা বঙ্গীয় সাহিত্যের রঙ্গমঞ্চে এক অপূর্ব অভিনেতার অভিনয় দেখিতেছি।” (রবীন্দ্রসাহিত্যে সমালোচনার ধারা??, পৃ. ৬৪)।

‘বঙ্গসাহিত্যের বিকাশ’ প্রবন্ধ থেকে অতি-দীর্র্ঘ এই উদ্ধৃতি দিয়ে আদিত্য ওহদেদার শশাঙ্কমোহন কীভাবে রবীন্দ্র-প্রতিভাকে বিশ্লেষণ করেছেন, রবীন্দ্রনাতের অসাধারণ ব্যাপ্তি ও গভীরতা শশাঙ্কমোহনের দৃষ্টিতে কীভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করেছেন। এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে উৎকলন করা সম্ভব নয়। আমরা তাই ‘স্বাধীনতা’ বলতে শশাঙ্কমোহন কী বুঝিয়েছেন তা বোঝার জন্য এই অংশটুকু উদ্ধৃত করছি : “রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই ছন্দের বন্ধন কিংবা ভাষার সৌকুমার্যের প্রতি তাচ্ছিল্য দেখাইয়া কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন; তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল ভাবপ্রকাশ। যে রূপেই হউক, ভাবপ্রকাশ করিতে পারিলেই কবিতা হইল, ইহাই তাঁহার আদিম আদর্শ ছিল। ওই আদর্শের বশীভূত হইয়া তিনি প্রকৃত কবিতাও লিখিয়াছিলেন, অনেক তুচ্ছ জিনিসও লিখিয়াছিলেন। কারণ, তখন তিনি ভাবকে স্বাধীন প্রণালীতে আপনার আয়ত্তাধীন করিতেছিলেন। যখন কবি কোনোও সুন্দর ভাবকে বশীভূত করেন, তখন সেই ভাব যে ছন্দে বা যে ভাষায় প্রকাশিত হয়, তাহা কবিতা। কিন্তু ভাবকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত না করিয়া, অথবা ভাবের আভাষমাত্র ধরিয়া, উৎকৃষ্ট ভাষায় অনবদ্য ছন্দোবন্ধে গ্রথিত রাশিরাশি পুঁথিও কবিতা নহে। উহা কেবল দুর্ব্বলতার, দরিদ্রতার এবং ভাবোন্মাদের পরিচায়ক। রবি কবির কিশোর বয়সের প্রায় সমস্ত কবিতাই শেষোক্ত শ্রেণীর। তিনি পরিণত বয়সে উক্ত দোষ পরিহার করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথ যখন ক্রমে ভাবের উপর প্রাধান্য ও প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করিলেন, তখন ভাষা ও ছন্দ তাঁহার হস্তে আপনি আসিয়া ধরা দিয়াছে, তাঁহার চির জীবনের সাহিত্য-সাধনা সফল করিয়াছে।”

(বঙ্গসাহিত্যের বিকাশ, বঙ্গবাণী পৃ. ১০৮)।

আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে শশাঙ্কমোহন রবীন্দ্রনাথের সর্বতোমুখী ও বিচিত্রগামী সৃষ্টিশীলতার জন্য তাঁকে ভিক্টর হিউগোর সঙ্গে তুলনা করে লিখেছিলাম, “…আধুনিক সাহিত্যের খণ্ড কবিতার ক্ষেত্রে, বিশেষত গদ্যপদ্য চেষ্টার সম্মিলিত সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে, সাহিত্যে সঙ্গীততন্ত্রতা এবং আধ্যাত্মিকতার বিস্তার ক্ষেত্রে, নানাদিকে ভিক্টর হিউগো ব্যতীত আর এইরূপ অবিশ্রান্ত ক্রিয়াশীল এবং অবিরাম ক্ষুদ্র তরঙ্গশীল প্রকাণ্ড প্রতিভার সঙ্গম লাভ করিতে পারা যাইবে বলিয়া মনে হয় না। উহার মধ্যে হিউগো- প্রতিভার বৃংহিতভাব, উহার অমৃতমত্ততা, সমুদ্রগর্জ্জন, সমুদ্রউচ্ছ¡াস অথবা সামুদ্রিক সহৃদয়তার পরিচয় নাই সত্য, দ্বীপ মহাদ্বীপ মহাদেশ সৃষ্টি করিবার জন্য প্রচণ্ড গভীর তৎপরতাও নাই; কিন্তু উহা ভারতবর্ষের ব্রহ্মপুত্র। অন্তত একভাবে ভারতের বিশিষ্ট সুর তালের অপত্য-পরিণতি। …উহার শক্তি ভাষার তরল তরঙ্গভঙ্গী উচ্ছ¡াস, ছন্দের নিত্য নবলীলা নৃত্য, এবং সর্ব্বত্র অনন্তের প্রতিচ্ছবি ধারণাক্ষম ভাবুকতা, উহার কোথাও কুলকিনারা পরিস্ফুট হইয়াছে, কোথাও বা উহা আপাতদর্শনে অসীম এবং অপার কোথাও হয়ত হাঁটিয়া পার হওয়া যায়, কোথাও এত গভীর এবং ডহর যে মনুষ্যের ওলন-দড়ী খাই পায় না কোথাও উহা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লীলা কৌতুকের লহরী তুলিয়া নাচিতেছে (যাহা হিউগোতে নাই) কোথাও বা উত্তাল তরঙ্গের আভোগ দেখাইয়া সমুদ্রের সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করিতেছে। যেখানে উহা গদ্যপদ্যের ধারা সম্মিলন করিয়াছে কি অপরূপ মিলন উর্ব্বশীর সহিত মিনার্ভার সম্মিলন করিয়াছে কি অপরূপ মিলন উর্ব্বশীর সহিত মিনার্ভার সম্মিলন জগতের অন্য কোন নদনদীর বেলায় এই বিশিষ্টতার তুলনা মিলিবে না। স্বল্পনিষ্ট হইলেও ক্ষণে ক্ষণে দিনে দিনে, জীবনের পক্ষমাস-ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উহার কত চিত্রবিচিত্র মর্জ্জি! কোথাও ফেনিল-আবিল! কোথাওবা স্বচ্ছ নির্ম্মল! কোথাও শান্তিনিকেতন, কোথাও বা বাসনা বৃত্তির ক্ষুদ্র কুরুক্ষেত্র।” (প্রাগুক্ত : পৃ. ১২৭-১২৮)। রবীন্দ্রনাথের গদ্যপদ্যের অসাধারণ লালিত্যে ফরাসি প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছেন শশাঙ্কমোহন। তার ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ লিপিরীতির উজ্জ্বলতায়, তারল্যে, অলংকারের শিঞ্জনে এবং ভাবের লীলামন্দ বিভ্রমে ফরাসি। তাহার গদ্যেপদ্যে বিশেষত ক্ষুদ্র গল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে ফরাসি রীতি সর্বত্র সুস্পষ্ট। ফরাসি নিয়মের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের উপন্যাস রচনায় রবীন্দ্রনাথ বঙ্গসাহিত্যে অতুলনীয়। পদ্যে, খণ্ডকাব্যে, উহার ভাবুকতায় এবং সঙ্গীত-ধর্ম্মে, রবীন্দ্রনাথ এদেশে তত্ত্বগত বা নিখুঁত ভাবগত গীতিকবিতার জনক বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। প্রথম বয়সে ইংরাজ কবি শেলীর অনুকারী হইলেও, তিনি পরে শেলীর অলৌকিক বায়ুতত্ত্বীয় উচ্ছ¡াস এবং প্রচণ্ড শক্তি-প্রগলভতার সম্পর্ক পরিহারপূর্বক প্রাণমনে বদলেয়ার ভার্লেন এবং গাতিয়ের লালিত্যধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। অনির্বচনীয় সঙ্গীততত্ত্ব এবং চিত্রতত্ত্বের সঙ্গমে, নিত্যনূতন ছন্দের বৈচিত্র্যে, রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে অত্যন্ত আধুনিক.. রবীন্দ্রনাথ সন্দর্ভরচনার ক্ষেত্রেও ফরাসি ইযুজিন-দি-গরীন হইতে আরম্ভ করিয়া আমিয়েল এবং জুবেয়ার প্রভৃতির মধ্যে ওতপ্রোত হইয়া গিয়াছেন। অন্যদিকে, ঐকান্তিকী ভাব-গতি এবং ভাবনার গাঢ়তায় রবীন্দ্রনাথ জর্ম্মন। অনেক স্থলে জর্ম্মনীর সিম্বোলিস্ট কবিসংঘের প্রভাব ও তাহার মধ্যে পরিদৃষ্ট হইবে। ফলত এ দুটি সমুন্নত সাহিত্যের আধুনিক আকৃতি-প্রকৃতি এবং দোষ-গুণ-সমুন্নতি নানামতে, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেদীপ্যমান হইয়া, সাহিত্যে তাহার স্বতন্ত্র আসন নানামতে সুস্থির করিয়া গিয়াছে। রবীন্দ্রনাথ নানাদিকে ইয়োরোপীয় আধুনিকতাকেই আত্মসিদ্ধ করিয়াছেন।” (প্রাগুক্ত : পৃ. ১১৬)।

রবীন্দ্রনাথের অসাধারণত্বের মর্মমূলে প্রবেশ করে তার রসোপলব্ধির প্রয়াস যেমন আমরা শশাঙ্কমোহনে দেখি তেমনি তার শিল্প-দোষ উল্লেখ করতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি। কারণ, তিনি সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে বিচার করেছেন বিশ্বসাহিত্যের আলোকে। তিনি লিখেছেন, “সঙ্গীততন্ত্রবশে কবি কায়া অপেক্ষা বরঞ্চ ছায়ারই অধিক পক্ষপাতী। তাহার এই বস্তু ভীতি এবং প্রাকৃত ভাব মাত্রকেই ঘৃণাপূর্বক পরিহার করার লক্ষণটুকু সর্বাগ্রে নোট করিয়া রাখিয়াই, তাহার কাব্য পাঠে মনোযোগী হইতে হইবে। ক্ষুদ্র গল্প এবং নবেলের ক্ষেত্রে আসিয়া তিনি এই লক্ষণ বহু পরিমাণে উতরাইয়া গিয়াছেন সত্য জীবনের রক্তমাংসময় শরীরী চরিত্রমূর্তি অপেক্ষাও বরং তিনি ভাবতত্ত্বময়ী প্রকৃতির অঙ্কনে সংকেতে এবং আভাষেই অধিক অনুরাগী এই একটা কথাতেই কাব্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমস্ত দোষগুণ বুঝিতে পারা যাইবে।

ইংলণ্ডে এই ভাবাপন্ন, অথচ বিভিন্ন ক্ষেত্রের কবি শেলী! শেলী আকাশে উড়িতেন; লোক-সীমার ঊর্দ্ধে উঠিয়া এই কুহেলিময়, ছায়াময়, অবিভক্তাবয়ব পৃথিবীর দিকে চাহিয়া চাহিয়া সেই সৌন্দর্যের উপভোগ করিতেন। কায়া অপেক্ষা ছায়ার কোনও কোনও বিষয়ে মাহাত্ম্য বা আকর্ষণ অধিক; এবং কবি সেখানে অপ্রতিহত-প্রভাবে আপনার ঐন্দ্রজালিক জগতের সৃষ্টি করিয়া পরমানন্দে বিচরণ করিতে পারেন।” (প্রাগুক্ত : পৃ. ১২২)

শশাঙ্কমোহন আরও লক্ষ করেছেন, ভাষা ও ছন্দের ওপর অত্যধিক দখলের ফলে রবীন্দ্রনাথের কাব্য ভাষা যেমন অতিভূষিত হয়েছে তেমনি অনেক সময় ভাবও আবৃত হয়েছে। শশাঙ্কমোহন লিখেছেন, “কখনও বা রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও ছন্দ ভাবকে আবৃত ও আচ্ছন্ন করিতেছে। সোনার তরী ও চিত্রা হইতে আরম্ভ করিয়া গীতাঞ্জলী ও খেয়ার মধ্যস্থিত সংগীত-চিত্র-ধর্মাক্রান্ত অনেক কবিতা তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নৃত্যে, ভাষার ঝংকারে, সংগীততন্ত্রীয় আবেগে, ভাবের সুচিক্কণ রশ্মি বা অর্থ ডুবিয়া গিয়াছে, অনেকস্থলে অস্তিত্ব এবং সঙ্গতি পর্যন্ত অনুভব করা দায় হইয়াছে। এই জাতীয় অনেক কবিতা বাহুল্যময়, অতিরঞ্জিত ও অতিভূষিত। তিনি মহৈশ্বর্যশালী চিত্রকর; তাহার ভাবুকতার বর্ণভাণ্ডার অপরিমেয়। আঁকিতে আঁকিতে তিনি ভাবের বশে এত আত্মহারা হইয়া পড়েন যে, স্থানে স্থানে বুঝি তুলি দূরে নিক্ষেপপূর্বক সমস্ত ভাণ্ডটি রিক্ত করিয়াই নিষ্কৃতি লাভ করেন!” ( প্রাগুক্ত : পৃ. ১২৩)।

বুদ্ধদের বসুও রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী ও চিত্রার কবিতা সম্পর্কে প্রায় অনুরূপ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সোনার তরীর বসুন্ধরা কবিতা সম্পর্কে প্রায় অনুরূপ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সোনার তরীর বসুন্ধরা কবিতা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “সমিল ও প্রবহমান পঙ্ক্তিগুলোর যে রুদ্ধশ্বাস গতি ও অধৈর্য আছে, যেভাবে এরা পরস্পরের পা মাড়িয়ে অনবরত ধাবমান ও বিবর্ধমান তার অভিভাব সম্পূর্ণ লাভজনক নয়। অংশবিশেষ আমাদের মনে উত্তেজনা আনে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আমরা ভুলে যাই কবিতাটির বিষয় কী, কেন্দ্রিক ধারণাটি যেন হারিয়ে যায়, পাঠকের ও কবিতার মধ্যে বাণীপ্রপাত অন্তরায় রচনা করে। বিস্তারে অনুপুঙ্খের আতিশয্যে আমরা যেন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি।… বসুন্ধরা যেন সেই কবিতা যেখানে কবির উপর কবিতা জয়ী হয়েছে- অর্থাৎ কবি তাকে শাসনে রাখতে পারেননি। সে নিজেই গতিবেগ অর্জন করে নিয়ে কবিকে তার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।” (বুদ্ধদেব বসু, কবি রবীন্দ্রনাথ : পৃ. ১৬-১৭)।

ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও দুই সমালোচকেরই বক্তব্য অভিন্ন। ভাষা ও ছন্দের অবিরাম প্রবাহ ও বর্ণাঢ্যতা ভাবকে আবৃত করছে। অনেক ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে শশাঙ্কমোহন ও বুদ্ধদেবের ভাষা বা শব্দ প্রয়োগও প্রায় এক। বুদ্ধদেব জানাচ্ছেন, “রবীন্দ্রনাথে কী নেই, কোন প্রত্যাশা তার পক্ষে অবান্তর, সেইটেই প্রথমে বুঝে না নিলে আমরা তার প্রতি সুবিচার করতে পারবো না। তার কবিতায় তীক্ষèতা নেই, নেই কোনো বিসংবাদী সুর, তার কোনো পঙ্ক্তি হাতুড়ির মতো আঘাত করে না, যখন তিনি সবচেয়ে মর্মস্পর্শী তখনও তিনি উপরিস্তরে মধুর।” (প্রাগুক্ত : পৃ. ২৮)।

শশাঙ্কমোহনও বলেছেন, “রবীন্দ্রনাথ নিজের সবিশেষ কবিধর্মে, সাহিত্যক্ষেত্রে কোনো প্রকার তীব্রতা, তীক্ষèতা, পুরুষাচার কিংবা বাস্তবতন্ত্রী রুক্ষতা ভালবাসেন না।” (বাণীমন্দির : পৃ. ১০৬)।

রবীন্দ্রনাথের নাটকের ব্যাপারে-বিশেষত কেন তিনি রূপক নাটক লিখেছিলেন এবং এই ক্ষেত্রেই যে তাঁর অসাধারণ সিদ্ধি- এই মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও দুই সমালোচকের সিদ্ধান্ত এক বা অভিন্ন। তীব্রতা, তীক্ষèতা, প্রচণ্ড সংঘাত ও জীবনের অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতা সম্পর্কে অনীহা এবং তাঁর অসাধারণ মন্ময়ী গদ্যই রবীন্দ্রনাথকে রূপক নাটক রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল- এই হলো উভয় সমালোচকের অভিমত। বুদ্ধদেব লিখেছেন, “[রবীন্দ্রনাথকে] লিখতে হয়েছিল রূপক নাটক, যাতে চরিত্রচিত্রণের দায়িত্ব নেই, আর উত্তরজীবনে এমনসব উপন্যাস যাতে পাত্রপাত্রীরা অবস্থানির্বিশেষে রবীন্দ্রনাথের মতই সাহিত্যিক ভাষায় কথা বলে।” (কবি রবীন্দ্রনাথ : পৃ. ১০)।

শশাঙ্কমোহনও দেখেছেন, রবীন্দ্রনাথের নাটকে সবই আছে, “নাই কেবল প্রাণ। এত বর্ণনার পারিপাট্য সাহিত্যে অল্প নাটকেই আছে। কিন্তু, সেই সর্বাপেক্ষা অপরিহার্য এবং অন্তরতম পদার্থটির অভাবে যেন সমস্ত বিফল হইয়া গিয়াছে। এই কারণে তাঁহার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমাদের প্রকৃত সহানুভূতি হয় না; সকলেই অভিনয়ের জন্য ব্যস্ত এবং সঙ্গীতভারাক্রান্ত বাক্য বিন্যাসের জন্য একান্ত ব্যাকুল! অবশ্য বাংলার অন্য সমস্ত নাট্যকাব্য সৌন্দর্য বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ছায়াও স্পর্শ করিতে পারে না। …প্রকৃত কবিমাত্রেই সতর্ক বা অতর্কিতভাবে আত্মসমালোচক এবং অন্তরে অন্তরে জানিতে পারেন যে, এক কবির যাহা প্রকৃত বিশেষত্ব, উহা তাহার জীবনতরুর অতুলনীয় ফল বলিয়াই অপরের নহে। রবীন্দ্রনাথ ক্রমে বুঝিতে পারিয়াছেন যে, সেক্সপীরীয় বা সফোক্লীসীয় নাটক লিখিয়া সাফল্য লাভ তাহার নহে। এই অনুভব হইতেই পরে পরে কবির স্বকীয় জীবনের অতুলনীয় ফল, ‘রাজা’ ও ‘ডাকঘর’ আমরা পাইয়াছি।* উহারা নাটকের কথাবার্তার প্রণালীমাত্র রক্ষা করিয়াই-তত্ত্ব এবং ভাবুকতার ক্ষেত্রে প্রতিপদে সংকেত বার্তা উপস্থাপনপূর্বক নিজের মাহাত্ম্য সিদ্ধ করিয়াছে। উহাদের মূল প্রাপ্তি নানাদিকে কবির নিজস্ব সিদ্ধি এবং উহারা আপন মাহাত্ম্যেই উজ্জ্বল।” (বঙ্গসাহিত্যের বিকাশ, বঙ্গবাণী : পৃ. ১৫১)।

শশাঙ্কমোহনের সঙ্গে কেবলমাত্র বুদ্ধদেব বসুই ঐকমত্য পোষণ করেননি, একই অভিমত সুধীন্দ্রনাথ দত্তেরও, “রবীন্দ্রনাথের নাটকের চরিত্রাবলী চমকপ্রদ বাকচাতুর্যে আমাদের তাক লাগায় বটে, কিন্তু সংক্রামক আবহের সমর্থন পেয়েও তারা শেষ পর্যন্ত কলের পুতুলের মতো নিষ্ক্রিয় থেকে যায়।” (সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ : পৃ. ২১৫)। তিনি এ প্রশ্নও তুলেছেন, ‘গীতিকবিতার ক্ষেত্রে তিনি যে উৎকর্ষে পৌঁছেছেন, নাটক রচনার বেলা সেই পরাকাষ্ঠা তার নাগালে আসেনি কেন?’ তার মতে এর কারণ, ‘যদিও [রবীন্দ্রনাথ] সংস্কৃত কবিদের আবশ্যিক শুভবাদ কাটিয়ে একাধিক বিয়োগান্তুক নাটক লিখেছেন, তবু মহাপুরুষেরা শুদ্ধ যে অন্ধ নিয়তির পদানত, এ কথা তার কাছে অশ্রদ্ধেয় ঠেকে, অর্থাৎ তিনি মানেন না যে, শুভবাদের বিকল্প অনিবার্য’। (প্রাগুক্ত : পৃ. ২৬৪)। অর্থাৎ নিয়তির পীড়নে মানুষের দ্ব›দ্ব-সংক্ষুব্ধ জীবন ও শুভাশুভের সংঘাত, নির্মমতা, কাঠিন্য, বাস্তবতা যা সফোক্লিস বা শেক্সপীরীয় নাটকের অবলম্বন তা রবীন্দ্রনাথের গীতিময় কবিসত্তার অনুক‚ল ছিল না। তাই তাঁর নাটকের বৈশিষ্ট্য চরিত্রসৃষ্টি নয়, ভাবসংবেগের প্রাবল্য। শশাঙ্কমোহনের মতো সুধীন্দ্রনাথের অভিমত, ‘রাজা ও রাণী’ ও ‘বিসর্জনের’ বাগবাহুল্য এই নাটক দুটিকে সার্থক নাটকে পরিণত করেনি, ‘রাজা ও রাণী’ ও ‘বিসর্জন’-এর বাগবাহুল্য ও বয়নশৈথিল্য যদিও এত বেশি যে সে দুটি আধুনিক কালের উপযোগী নয় ভেবে রবীন্দ্রনাথ উভয়ের নামটুকু ছাড়া আর সবই বদলে দিয়েছেন, তবু সা¤প্রতিক সংস্করণেও বই দুখানি শুধু বুদ্ধিজীবীদের সাধুবাদ পায় না, সাধারণ দর্শককেও মাতিয়ে তেলে। এমনকি ঘটনাঘটনের ইচ্ছাকৃত অভাবেও ‘চিত্রাঙ্গদা’র সক্রিয়তা হারিয়ে যায়নি, এবং ‘অচলায়তন’, ‘রাজা’, ও ‘রক্তকরবী’ প্রভৃতির মতোই তাতেও রবীন্দ্রনাথ জ্ঞানত নীতিকারের ভূমিকা নিয়েছেন বটে, কিন্তু ভাবসংবেগের প্রাবল্য বা অবৈকল্যে সে নাটিকা রবীন্দ্রসাহিত্যে প্রায় অদ্বিতীয়।’ (প্রাগুক্ত : পৃ. ২৩১)।

রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজেই তার ‘রাজা ও রাণী’ ‘বিসর্জন’ নাটকের দৌর্বল্য বা ত্রুটি সম্পর্কে সজাগ হয়ে এই দুটি নাটকে বড় ধরনের পরিবর্তন করেছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই মন্তব্য ১৯৪০ সালের। ১৯২৮-এ শশাঙ্কমোহন লিখেছেন, “আধুনিক বঙ্গসাহিত্য ‘রাজা’ ও ‘অচলায়তন’- দুইটি অতুলনীয় কাব্যসিদ্ধি; রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট কবিত্বের রতœসম্পত্তি ও গীতিকাশক্তির অনুত্তম ভাণ্ডার। সেক্সপীয়র পদ্ধতির জীবনচিত্র রচনা রবীন্দ্রনাথের নহে। সৌভাগ্যক্রমে ‘বিসর্জন’ এবং ‘রাজা ও রাণী’র পর রবীন্দ্রনাথ আত্মশক্তির রহস্য বুঝিয়াছিলেন। জীবনার্থের দার্শনিকা-প্রকাশরীতি, গীতিকা ও রূপকরীতিই তাহার পক্ষে স্বাভাবিক। তিনি এই দিকে বাঙালির সমক্ষে আধুনিক আদর্শের গতিপথ কাটিয়া গেলেন।” (বাণীমন্দির, পৃ. ১০৯-১১০)।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, শশাঙ্কমোহন, বুদ্ধদেব ও সুধীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথের নাট্যসিদ্ধি বিষয়ে যে আলোচনা তা বিশ্বনাটকের পটভূমিতেই স্থাপিত।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj