জাতির পিতার সমাধি : শামসুল আলম বেলাল

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

এখানে শান্তিতে সমাহিত চিরনিদ্রায় কৃষ্ণচূড়ার নিবিড় ছায়ার নিচে

আমাদের পিতা-নিপীড়িত মানুষের মহান ত্রাতা,

এখানে ঘুমায় চির বিশ্রামে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা-

সত্যের বাহক-ধরিত্রী মায়ের জঠরে।

এখানে ঘুমায় সাদা মারবেল পাথরের ছাদের নিচে

এক বিপ্লবী, এক মহান কবি, যে কখনো আর জাগবে না,

কখনো আর গর্জে উঠবে না লক্ষ-কোটি মরু সিংহের মতো-

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।

এখানে ঘুমায় নির্বাক একটি যুগ, সংগ্রামের এক অনন্য ইতিহাস

মুক্তিকামী কোটি জনতার বুকের ভেতর,

যাদের ভালোবাসায় আবিষ্ট এক বিরাট স্বপ্ন, তাজা রক্তে রঞ্জিত।

এখানে ঘুমায় স্বর্গের মহিমা নিয়ে এক কালজয়ী বীর,

যে আমাদের নিয়ে গেছে যুদ্ধে দাসত্বের শেকল ভাঙার জন্য,

এখানে আমরা সবাই অসীম কৃতজ্ঞতায় দুদণ্ড থামি প্রতিদিন,

মহান আল্লাহর কাছে দোয়া চাই

আমাদের নেতার বিদেহি আত্মার শান্তির জন্য।

ঠিক এখানেই এক দেবশিশু প্রাণ খুলে হেসেছিল বসন্তের ঊষার মতো

মায়ের কোলে বসে কোন এক সোনালি রাত্রির শেষে,

ঠিক এখানেই এক অস্থির বালক বেড়ে উঠেছিল মরু সিংহের মতো

বুকভরে নিয়েছিল মাটির গন্ধ,

বাতাসের স্বাদ আর সারা গায়ে মেখেছিল ধানক্ষেতের গাঢ় সবুজ,

চোখে-মুখে ছিল তার একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবার দারুণ এক প্রতিজ্ঞা।

ঠিক এখানেই সে প্রথম চোখ তুলে চেয়েছিল বিস্তৃত নির্মেঘ আকশের দিকে,

ঠিক এখানেই সে প্রথম এঁকেছিল লাল এক পতাকা স্বাধীনতার,

ঠিক এখানেই সে প্রথম শুনেছিল ক্ষুধার্ত জনতার তীব্র চিৎকার,

ঠিক এখানেই সে প্রথম গ্রীষ্মের সূর্যের মতো তেজোদীপ্ত দৃষ্টি মেলেছিল,

ঠিক এখানেই সে প্রথম গেয়েছিল বিদ্রোহের গান মুক্তির জন্য।

কে জানতো একদিন এক আশ্চর্য বালক মানুষের মুক্তি ছিনিয়ে আনবে?

কে জানতো একজন শেখ মুজিব সব কালো রাত্রিকে আলোকময় করে তুলবে?

কে জানতো একজন জাতির পিতা একদিন এক সোনালি সকাল নিয়ে আসবে?

কে জানতো একজন বঙ্গবন্ধু একদিন আমাদের ভয় ভেঙে বিদ্রোহ নিয়ে আসবে?

কে জানতো একদিন এক বিদ্রোহী আমাদের মরা নদীতে জোয়ার নিয়ে আসবে?

সে আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে কিন্তু আমরা দিয়েছি তাকে এক নিষ্ঠুর মরণ

সে আমাদের একটা পতাকা দিয়েছে, কিন্তু আমরা তাকে দিয়েছি একঝাঁক বুলেট

সে আমাদের একটা পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু আমার তাকে দিয়েছি নীরব বিদায়।

বুকে নিয়ে বোবা শোক আমরা তাকে কবর দিয়েছি ঠিক এখানেই ১৫ই আগস্ট,

ছিনিয়ে নিয়েছি সেই সুন্দর পৃথিবীকে, যে পৃথিবী সে এনেছিল আমদের জন্য,

ঠিক এখানেই আমরা তাকে সমাহিত করেছি গাছের ছায়ার নিচে অন্ধকারে-

ছিল না কোনো বিদায় অভিবাদন, শোকগাথা অথবা অশ্রæর বন্যা।

মধুমতির বুকে এখন আর আগের মতো খরস্রোত নেই,

বহু আগে হঠাৎ থেমে গেছে মৌসুমী বাতাসের প্রচণ্ড বেগ,

ধূলিকণাও এখন আর আকাশে ওড়েনা পাগলা হাওয়ায়,

মানুষের স্তব্ধ মুখে শুধু একটি জিজ্ঞাসার ফ্যাকাশে স্মৃতি।

তবুও সে আছে এখনো দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে উঁচু স্মৃতিস্তম্ভের চূড়ায়,

তার সেই আঙুল এখনো খাড়া আবারো মুক্তির ডাক দিতে,

তার সেই অনলবর্ষী ভাষণ এখনো বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে পারে,

এখনো সে ঢেউ তোলে দুখী মানুষের চেতনায় আরেক যুদ্ধের।

তার গভীর কালো চোখ এখনো খুঁজে বেড়ায় সকল সুন্দর

পবিত্র মাতৃভূমি বাংলাদেশের মাঠে প্রান্তরে,

তার শাহাদাত আঙুল সুতীক্ষè তীরের ফলার মতো এখনো

তাক করা আছে আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের পানে।

মারবেল পাথরের কবর থেকে আমরা এখনো শুনি

ভরাট গলায় সেই আওয়াজ-মুক্তির ডাক,

এখনো আমরা শুনি সেই ডাক পাহাড় ও সমতলে দোল খায়

এক সার্বভৌম দেশের খোঁজে।

এখনো আমরা শুনি এক দেবশিশু বাঁশি বাজায় উচ্চস্বরে

সবার প্রাণে স্পন্দন জাগাতে,

এখনো আমরা শুনি সেই বজ্রকণ্ঠ আরো এক সংগ্রামের

চিরতরে শত্রু নিধনের জন্য,

এখনো আমরা শুনি সেই কণ্ঠস্বর রেসকোর্স ময়দানে

আমাদের রক্তে রঞ্জিত পতাকার জন্য,

এখনো আমরা শুনি সেই ডাক বৈশাখের রক্তলাল সকালের মতো,

চেতনায় জাগাতে নব উদ্দীপনা,

এখনো আমরা শুনি সেই আহ্বান সব কমরেডের প্রতি

তার তুলে ধরা ব্যানারকে সালাম জানাতে,

এখনো আমরা শুনি সেই ডাক জনতার একতার জন্য

মৃত্যুর শেকলকে ছিন্ন-ভিন্ন করতে,

এখনো আমরা শুনি সেই ডাক যেন সবাই মিলে আবারো

এক হয়ে নিষ্পেষণের সব চিহ্ন উপড়ে ফেলি,

এখনো আমরা শুনি সেই ডাক শহীদের কবর ছুঁয়ে যায়

দেশের সকল প্রান্তরে।

এসো সবাই আবার জ্বালাবো মোমের বাতি স্বর্গের দ্যুতি ছড়াবো চারদিকে

এসো সবাই আবার শুনবো সেই মহান কবিতা ঘুমন্ত এ চেতনাকে জাগাতে,

এসো সবাই আবার গাইব সেই অনলবর্ষী গান মায়ের চোখের অশ্রæ মুছতে,

এসো সবাই আবার আনন্দ করি বিজয়ের সুখে, শত্রুর কবর দলি সহাস্যে।

জেগে ওঠো পিতা আবার জেগে ওঠো

আমাদের আগামী দিনগুলোকে আবার সুন্দর করে দাও

ভোরের প্রথম আলোর নরম স্পর্শে,

যে ভোর আসে ঝরনার মতো ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে।

জেগে ওঠো পিতা আবার জেগে ওঠো

মারবেল পাথর ভেঙে,

আমরা কোটি জনতা এখনো প্রস্তুত

আবারো শুনবো তোমার মার্চ ৭-এর মহান কবিতা।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj