পতন : শুভ্রা নীলাঞ্জনা

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ধ্রæব ঘুমন্ত রুমকীর মুখের দিকে চেয়ে আছে। কি থেকে যে কি হয়ে গেল। নিষ্পাপ সরল মেয়েটার সাথে ঈশ্বর অনর্থ না ঘটালেই পারতেন। ধ্রæব কিছু ভাবতে পারে না, নিজের মাথার চুল নিজে নিজে খামচাচ্ছে। মাঝে মাঝে মানুষ খুব অসহায় হয়ে পড়ে। নিজের হাতের মুঠোয় যখন নিয়ন্ত্রণ থাকে না তখন ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। সময়ের ওপর ছেড়ে দিতে হয় অনাগত ভবিষ্যৎ। ধ্রæব জানে না রুমকী কতদিন এই হুইল চেয়ারে চলাফেরা করবে। কবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। রুমকী প্রেগন্যান্ট কিন্তু বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি। শুধু কোমরে প্রচণ্ড চোট পেয়েছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছে না। বাচ্চাটারই বা কি হবে? রুমকীকেই সবকিছু একজনের করে দিতে হয়। বাচ্চাটাকে সামলাবে কি করে এই অসুস্থ শরীরে?

ধ্রæব আর ভাবতে পারে না। ও আস্তে আস্তে যেয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ও জানে না কিভাবে সব সামাল দিবে। ওর মাথা ঘুরছে, চারদিকে সব অন্ধকার দেখাচ্ছে। ধ্রæব তো আর সারাক্ষণ বাসায় থাকতে পারবে না। অফিস আছে, সংসারের সব কাজ এখন ধ্রæবকেই সামলাতে হয়। তার ওপর আগত ছোট বাবু। এতসব কিভাবে সামলাবে। ধ্রæব এসব ভাবতে ভাবতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যমনস্ক হয়ে মাথায় বিলি কাটতে কাটতে ধ্রæব আবার ঘরে ফিরে এলো।

এসে দেখল রুমকী ঘুম থেকে জেগে বসার চেষ্টা করছে। ধ্রæব তাড়াতাড়ি ওকে ধরে বসিয়ে দিল। রুমকী খুব মন খারাপ করে বলল, দেখ তোমাকে খুব বিরক্ত করছি। এভাবে আর কতদিন? দেখতে দেখতে ৩/৪ মাস হয়ে গেল। আমার নিজেরও অসহ্য লাগছে। কোনো ইমপ্রæভ দেখছি না। ধ্রæব বলল, ডাক্তার বলেছেন সময় লাগবে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। এত অধৈর্য হয়ো না। সামনে বেবি আসছে তোমাকেই সামলাতে হবে সব। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে আমি তো আছি তোমার পাশে সারাক্ষণ। ভেব না লক্ষীটি একটু ধৈর্য ধরো। রুমকী বলল, শোনো আমার এক দূর সম্পর্কের মামাতো বোন আছে। খুলনাতে ওদের বাড়ি। ওর বিয়ে হয়েছিল কিন্তু রোড অ্যাক্সিডেন্টে ওর হাজবেন্ড মারা যায়। ওর সাথে আমার কথা হয়েছে। ওকে নিয়ে আসি বেবি হওয়ার পর। ও খুব শান্ত। আমার আর বেবির ভালো দেখাশুনা করতে পারবে। ধ্রæব বলল, আমি বুঝতে পারছি না কি করব? তুমি যা ভালো বুঝো কর। আমি চাই সবকিছুর বিনিময়ে তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র। নিজের ছকে আঁকা ছবির মতো করে জীবন চলে না। জীবন তার আপন গতিতে নদীর মতো করে গতিপথ পাল্টায় প্রয়োজনের তাগিদে। কখনো মোহে কখনো আকর্ষণে। রুমকীর জীবনও পাল্টে গেল সামান্য অসাবধানতার জন্যে। এই পা ফসকে যাওয়া থেকেই তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল জীবনের ছোট ছোট আনন্দ, সুখ, উচ্ছলতা, জীবনের নানা রং। রুমকী হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি এ জীবনের মুখোমুখি হবে। মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। মানুষ তো ইচ্ছে করলেই জীবনকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে পারে না। সবকিছু মেনে নিয়েই জীবনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। মানুষ নতুন করে আশায় বুক বাঁধে রুমকীও তার অসুস্থতার কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করতে লাগল। অনাগত শিশুর আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল। এই নিঃসঙ্গতা হয়তো সে কাটিয়ে উঠবে ধীরে ধীরে। ভাবতে ভাবতে হুইল চেয়ারটা টেনে নিয়ে যায় রুমকী জানালার কাছে। কষ্ট করে পর্দাটা সরিয়ে দেয়। থালার মতো করে একটি রুপালি চাঁদ উঠেছে আকাশে। রুমকীর রাতের আকাশ খু-উ-ব প্রিয়। মনে হয় এই আকাশ, চাঁদ, তারাদের সাথে ওর জন্ম-জন্মান্তরের পরিচয়। খুউব আপন লাগে। মন খুলে তারাদের সাথে কথা বলা যায়। রুমকী পায়ের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ শুক্লা পঞ্চমী রুমকী; পা ভালো থাকলে দৌড়ে এতোক্ষণে ছাদে চলে যেত। রুমকী হুইল চেয়ারটা ঘুরাতে ঘুরাতে তানপুরাটার কাছে গেল। তানপুরাটা কোলে তুলে নিল। হাত দিয়ে টুংটাং আওয়াজ তুলতে যেয়ে মনের অজান্তে সুর চলে আসল গলা দিয়ে-

‘যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে

এই নিরালায় রব আপন কোণে।

আমার এ ঘর বহু যতন করে

ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।

সুরের মূর্ছনায় চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়েছে রুমকীর। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল রুমকী। কষ্টের সাথে মনে হয় অন্ধকারের প্রগাঢ় বন্ধন। এই আলো আঁধারিতে রুমকীর কষ্টগুলি চোখের জল হয়ে গড়িয়ে পড়ছে তার প্রিয় তানপুরাটার ওপর। কান্না করলে কি মানুষের মন হালকা হয়? রুমকীর অনেক কষ্ট হচ্ছে। চাপা কান্নাকে সে কিছুতেই আটকে রাখতে পারছে না; গলার ভেতর মনে হচ্ছে কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে উঠছে। ও ডুকরে কেঁদে উঠল। এতোক্ষণ রুমকী এই অন্ধকারে বসে ছিল স্থানুর মতো করে। হঠাৎ কারো স্পর্শে সম্বিৎ ফিরে পেল। ধ্রæব খুব আলতো করে রুমকীর ঘাড়ে হাত রেখেছে। রুমকী ঘুরে তাকাল। চাঁদের আলোয় ধ্রæবকে স্পষ্ট দেখতে পেল। ধ্রæব পেছন থেকে রুমকীকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ঘরটাকে অন্ধকার করে বসে আছো? এত মন খারাপ করো না রুমকী। তোমার কষ্ট হলে আমার দ্বিগুণ কষ্ট হয়। আমার ইচ্ছে করে তোমার কষ্টগুলো আমি শুষে নেই। দেখ মানুষের জীবনে ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ইচ্ছে করে কেউ করে না। তোমার সেরে ওঠাটা সময় সাপেক্ষ; তুমি একদিন সেরে উঠবে, নিজের পায়ে আবার উঠে দাঁড়াবে। ডাক্তার হোপ দিয়েছেন, তুমি এতো নিরাশ হয়ো না। আমি তোমার পাশে ছায়ার মতো আছি। আলট্রাসনোগ্রামের রিপোর্ট এসেছে। আমি অনেক হ্যাপি। আমি একটি মেয়েই চেয়েছিলাম। আসতে আসতে আমি নামটাও ঠিক করে ফেলেছি।

রুমকী মৃদু হেসে বলে কি নাম ঠিক করেছ?

ধ্রæব বলল তোমার পছন্দ হবে। তোমার কথা ভেবেই নামটা পছন্দ করেছি।

রুমকী বলল, বল না শুনি।

ধ্রæব বলল চাঁদ।

রুমকী বলল চাঁদ তো ছেলেদের নাম, চাঁদনী হতে পারতো।

ধ্রæব, না চাঁদই হবে আমার মেয়ের নাম। তারপর তুমি অন্য নাম রাখলে রাখতে পারো। তুমি তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা চাঁদ দেখেই কাটিয়ে দিতে পারো। চাঁদের সাথেই তোমার যত প্রেম। একসময় চাঁদটাকে আমি হিংসেই করতাম; আমি কেন চাঁদ হলাম না। তাই ভাবলাম মেয়েটাকেই চাঁদ বানিয়ে ফেলব। তুমি যাতে কাছে থেকে দেখতে পারো, আর আমারও আর জেলাস হবে না।

রুমকী হেসে বলল, তোমার মাথায় এত বুদ্ধি! ধ্রæব হেসে বলল হুম, অনেক বুদ্ধি করেই তোমাকে পেয়েছি। আর একটু হলেই তো প্রায় ফসকে গিয়েছিলে।

রুমকীর বিয়েটা প্রায় ঠিকই হয়ে গিয়েছিল আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে। পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ধ্রæবর পোস্টিং ছিল রুমকীদের শহরেই ময়মনসিংহে। ধ্রæব একদিন বাইকে করে যাচ্ছিল হঠাৎ রুমকীকে দেখতে পায় রিকশা করে কলেজ থেকে ফিরছে। ধ্রæব তখন বাইক নিয়ে পেছন পেছন ফলো করছিল। রুমকী বুঝতে পারছিল কেউ একজন তাকে অনুসরণ করছে। রুমকী তাড়াতাড়ি বাসার কাছে এসে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে বাসায় ঢুকে গেল। রুমকীদের বাসাটা ছিল রাস্তার পাশে। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে রাস্তা দেখা যায়। রুমকী বাসায় ঢুকে কৌত‚হলের বসে ব্যালকনিতে উঁকি মেরে দেখে বাইকের ছেলেটি ওদেরই ফ্ল্যাটের সোহাগের সাথে কথা বলছে। ঐ দিনই ধ্রæব সোহাগের কাছ থেকে রুমকীদের ডিটেলস জেনে নিয়েছিল। রুমকী ভাবতেও পারেনি দুই দিন পরই ধ্রæব তার এক বন্ধু মামুনকে নিয়ে সরাসরি রুমকীদের বাসায় হাজির। কোনোরকম ভনিতা না করে সোজাসুজি রুমকীর বাবাকে বলেছিল বিয়ের কথা। রুমকীর বাবার খু-উ-ব পছন্দ হয়েছিল ধ্রæবর এই সাহসিকতা। কারণ রুমকীর বাবা কখনো চাইতেন না রুমকীকে বিদেশ বিভুঁইয়ে বিয়ে দিয়ে একা ছেড়ে দিতে। ছোটবেলা থেকে রুমকী একটু সরল টাইপের ছিল বলে রুমকীর বাবার ধারণা ছিল মেয়েটা বিদেশে গেলে হারিয়ে যাবে। পথ চিনে একা একা বাসায় ফিরতে পারবে না। ধ্রæবকে দেখে রুমকীর বাবার ভালো লেগে গেল। এই ছেলেও পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। সরকারি চাকরিজীবী। রুমকীর বাবা মনে মনে এমন ছেলেই খুঁজছিলেন। রুমকীর বাবার অপছন্দের মধ্যে একটাই ছিল ছেলেদের বাড়ি পটুয়াখালী। লঞ্চে করে যেতে হবে।

রুমকীর বাবা নদীকে খুব ভয় পান। তাই রুমকীর বাবা বিয়ের ফাইনাল কথার দিন বলে দিলেন আমার একটা দাবি আছে আমার মেয়ে কিন্তু নদী পার হয়ে পটুয়াখালী যাবে না। বিয়ে তোমাদের এদিকেই অ্যারেঞ্জ করতে হবে। সবাই সমস্বরে হেসে উঠেছিল। রুমকী এই দু’বছরে একবারই শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে। মা আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন। এসব কথা কখনো কেউ বলে? মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে না, তাদের ছেলের বউ তাদের বাড়িতে নিবে না?

রুমকীর আরেকটি কথা মনে পড়েও হাসি পাচ্ছিল। বিয়ের ৪/৫ দিন আগে হবে হয়তো। রুমকী ওর বৌদির সাথে নিচে তাদের বাউন্ডারির ভেতর রাস্তায় হাঁটতে বের হয়েছে রাতের বেলা। রুমকী একটু পিছিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ একটা বাইক এসে থামল ওর সামনে। কিছু বুঝার আগেই ছোঁ মেরে ওর গলার চেইনটা নিয়ে বাইকটা উধাও হয়ে গেল। রুমকী এতটাই অপ্রস্তুত ও ঘাবড়িয়ে গিয়েছিল যে জোরে একটা চিৎকারও দিতে পারেনি। শুধু গা-টা থরথর করে কাঁপছিল। বৌদিকে যখন বলল, বৌদি বললেন চুপ বাসায় আর বলো না। তাহলে তোমার দাদা আর বাবা আমাদের আস্ত রাখবেন না। রুমকী চেপে গিয়েছিল। কিন্তু শুভ রাত্রির দিন ঘটল আরেকটি ঘটনা। ধ্রæব রুমকীকে একটি আংটি পরিয়ে দিয়ে বলল এইটা হলাম আমি, সবসময় পরে থাকবে। রুমকীর কাছে ছিল না কিছুই। রুমকী গলা থেকে একটা চেইন খুলে দিয়ে বলেছিল এইটা তোমার। ধ্রæব তক্ষুনি রুমকীকে অবাক করে দিয়ে রুমকীর ছিনতাই হয়ে যাওয়া চেইনটা চোখের সামনে ঝুলিয়ে বলল উঁহু এইটা আমার। রুমকী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এও কি সম্ভব? ধ্রæব এই চেইন কোথায় পেল? ধ্রæব বলল এইটা সারপ্রাইজ। চেইনটা আমিই নিয়েছিলাম বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে। একসময় আমি অনেক দুরন্ত ছিলাম। ঝালাই করে দেখলাম সাহসটা আছে কিনা। ধ্রæব বলল, সেদিন তুমি আমাকে চিনতে পারোনি? আর ফোনে তো কখনো আমাকে বলোনি যে ঐদিন রাতে তোমার চেইনটা কেউ নিয়ে গেছে। রুমকী বলল, বৌদি নিষেধ করেছেন কাউকে না বলতে। তোমাকে তো সবার আগে না। রুমকী হেসে হেসে বলল আমি কি স্বপ্নেও ভেবেছি আমার হবু বর একজন ছিনতাইকারী। ধ্রæব হাসতে হাসতে বলে শুধু আমার সাহসটা তোমাকে দেখালাম।

সত্যি ধ্রæবটা যে কি না। এমন কাজ কেউ করে? পরে অবশ্য কথাটা এক কান দু’কান হতে হতে আত্মীয়-স্বজন সবাই জেনে ফেলেছিল। এ নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি হয় এখনো সবাই একসাথে হলে। ধ্রæবর ডাকে রুমকী সম্বিৎ ফিরে পেল। ধ্রæব ট্রলিতে করে রুমকীর রাতের খাবার নিয়ে এসেছে। ধ্রæব প্লেটে ভাত নিতে নিতে বলল আজ আমি তোমাকে খাইয়ে দেই। রুমকীর চোখ জলে ভরে এলো, ধ্রæব এতো ভালো কেন? রুমকী বলল আরে না না, আমি খেতে পারব। হাতে তো আর কিছু হয়নি। রুমকীর ধ্রæবর হাতে খেতে কেমন অস্বস্তি হয়, মনে হয় ধ্রæবর কষ্ট হচ্ছে। মিছেমিছি ধ্রæবকে ঝামেলায় ফেলা। ধ্রæব যেটুকু ওর জন্য করছে এটুকুই রুমকী সারাজীবনে শোধ করতে পারবে না। রুমকীর শুয়ে বসে থাকতে থাকতে শরীরটা ভারী হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই মেয়েরা প্রেগন্যান্ট হলে ওজন বেড়ে যায়। রুমকীর বিছানাতেও এপাশ থেকে ওপাশ ফিরতে অনেক কষ্ট হয়। রুমকী সব মিলিয়ে যে কি নিদারুণ কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে রুমকীই বুঝতে পারছে পলে পলে। ধ্রæব সবসময় খেয়াল রাখে রুমকীর যাতে কোনোরকম কষ্ট না হয়। সার্বক্ষণিক একটি মেয়ে আছে ওর সাথে সাথে থাকার জন্য। বয়স ১২/১৩ হবে। মেয়েটার নাম আঁখি। ওরা মা ও মেয়ে একসাথেই থাকে। সারাক্ষণ রুমকীর পেছনে আঠার মতো লেগে থাকে। কখন কি লাগবে তটস্থ থাকে। সবসময় বলবে দাদাবাবু বলেছে সারাক্ষণ তোমার কাছে থাকতে। তোমার যাতে অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে।

রুমকীর মনটা ক’দিন থেকেই বড় এলোমেলো, অর্থহীন ভাবনাগুলো ঢেউ খেলে যায় মাথার ভেতর। একা থাকলেই পুরনো দিনের কথা ভাবতে থাকে। মানুষের মন বড় বিচিত্র জটিল রহস্যে ঘেরা। তবে রুমকী একটু অন্যরকম। রহস্যের ভেতর নেই। সত্যকে অবলীলায় প্রকাশ করে কোনো সময় মিথ্যা দিয়ে নিজেকে অলংকৃত করে না। সবকিছুর মাঝেই সহজ সরল পবিত্রতায় নিজেকে ভরিয়ে রাখতে চায়। মেকি কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। তাই ওর চারপাশে যা ঘটে যায় তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। রুমকী কখনোই মিথ্যা সহ্য করতে পারে না। ও ভেবে পায় না মানুষ কথায় কথায় কেন এত মিথ্যার আশ্রয় নেয়। যা নেই তা বানিয়ে বানিয়ে বলে কি লাভ। যা আছে তা প্রকাশেই বা কিসের এত কুণ্ঠা। তাই রুমকীর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব কারো সাথেই হয়ে ওঠে না। কোথায় যেন একটা দূরত্ব থেকে যায়। কোথায় যেন মিলছে না কারো সাথে। সব সময় রুমকীর এমন মনে হয় সবার সাথেই সূ² একটা প্রাচীর মাথা তুলে দাঁড়ায়। ধুম করে কাউকে ভালো লাগার বয়সটা পেরিয়ে এসেছে খুব সযতেœ। মা-বাবার পছন্দসই ছেলের সাথেই বিয়ে হয়ে যায় রুমকীর। রুমকীর মনগড়া ধারণা ছিল বিয়ের আগে কাউকে ভালোবাসতে নেই। তাই বাসর রাতে ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে বলেছিল আমি যেন প্রাণভরে ধ্রæবকে ভালোবাসতে পারি। রুমকী যেটুকু চেয়েছিল তারচেয়ে বেশিই পেয়েছে। রুমকীর কোনো কোনো সময় মনে হয় ধ্রæব তাকে যতটুকু ভালোবাসে রুমকী হয়তো ততটুকু পারেনি। ধ্রæব তার সমস্ত ভালোবাসার রং দিয়ে রুমকীর হৃদয়ের গভীর থেকে মুঠো মুঠো সুখ তুলে আনতে পারে অনায়াসে।

ধ্রæবকে রুমকী যতই দেখে ততই মুগ্ধ হয়। ভুলে যায় পৃথিবীর সবকিছু। রুমকী পুরুষ বলতে ধ্রæবকেই বুঝে, প্রেমিক বলতে ধ্রæবকেই। রুমকী মাঝে মাঝে ভাবে ধ্রæবর জন্ম হয়তো শুধু ওর জন্যই হয়েছে। বিয়ের পরপর ধ্রæবের ভালোবাসায় রুমকী খেই হারিয়ে ফেলেছিল। এতটাই ধ্রæবর ভেতর বুঁদ হয়েছিল ও তখন আর কিছুই ভাবতে পারত না। এতটাই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিল যে, ধ্রæব অন্য কারো দিকে দৃষ্টি দিক রুমকী কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। সামান্য কোনো ঘটনাতেই রুমকী ভেতরে ভেতরে খুউব রেগে যেত। ধ্রæব যখন শুয়ে শুয়ে পুরনো দিনের গল্প বলত কোনো মেয়ের, রুমকীর চোখে জল চলে আসত। রুমকী নিজেকে নিজে বুঝাত এখন তো রুদ্রের ভালোবাসায় কোনো ফাঁকি নেই। বিয়ের আগে এমন কত হয়ে থাকে। কিন্তু রুমকী এক সময় নিজেকে নিজে বুঝাতে ব্যর্থ হতো। কোনো কোনো সময় রুমকী সত্যি কেঁদে ফেলত। সেই সময়টুকু ধ্রæবকে ধরতে ইচ্ছে করত না। সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করত।

ধ্রæবও ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছিল। তাই মাঝে মাঝে এক একটা গল্প ফেঁদে রুমকীকে খেপিয়ে মজা পেত। ধ্রæব ঐ সময়টুকু এনজয় করে। রুমকীর চোখের গড়িয়ে পড়া জলের ভেতর ধ্রæবের প্রতি রুমকীর ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করেনি। ধ্রæব মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে রুমকীর মতো এমন সহজ সরল মেয়ে খুউব কম হয়। সবকিছু এত সহজে বিশ্বাস করে যে মিথ্যা গল্প বানাতেও কষ্ট হয়। রুমকীর ধারণা ধ্রæব কখনো মিথ্যা বলতে পারে না অন্তত রুমকীর সাথে। রুমকী বেশিক্ষণ অভিমান বা মন খারাপ করে থাকতে পারে না ধ্রæবর সাথে। এই এক দোষ নিজেকে কেমন বেহায়া বেহায়া মনে হয় রুমকীর। কতদিন ভেবেছে আগে কথা বলবে না অথচ ধ্রæবর মুখের দিকে তাকালে রুমকীর রাগ, অভিমান পলকে হারিয়ে যায়। রুমকী আর রুদ্রের বিবাহিত জীবনে ঝগড়াঝাটি খুব কম হয়েছে তবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় কথা বলা বন্ধ হয়েছে অনেকবার।

ওদের রেষারেষি বেশি হয় সিগ্রেট আর গল্পের বই নিয়ে। ধ্রæব সিগারেট পেলে দুনিয়ার কথা ভুলে যায়। আর রুমকীর বই পেলে কিছুই মনে থাকে না। কতদিন যে চুলোতে কত কিছু নষ্ট হয়েছে তবুও বই পড়ার বাতিক বেড়েছে বৈ কমেনি। ধ্রæব যখন খুব মুডে একটা গল্প বলছে তখন হয়তো রুমকী কোনো বইতে ধ্যানস্ত। এই নিয়ে ধ্রæব কতদিন কথা বন্ধ করেছে, রুমকী হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে আর কক্ষণো এমন হবে না। অথচ হয়ে যায় রুমকীর অজান্তে। ধ্রæব যখন খুউব আয়েশি ভঙ্গিতে সব মনোযোগ একসাথে করে সিগারেটের ধুঁয়ো দিয়ে রিং বানিয়ে আকাশের দিকে ছুরে মারে তখন রুমকীর খুবই রাগ হয়; মাঝে মাঝে সিগারেটকে রুমকীর সতীন মনে হয়। রুমকী মাঝে মাঝে ব্যঙ্গ করে বলে তোমার সিগারেটে আসক্তি আর আমার তোমাতে। বিয়ের পরে দিনগুলো তাদের এমনি উথাল-পাথাল সুখের ভেতর গড়িয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কি থেকে যে কি হয়ে গেল ওদের। সুখের আকাশে দুঃখগুলো তারার মতো মিটমিট করে জ্বলতে শুরু করল। ঈশ্বর হয়তো মাঝে মাঝে মানুষকে দুঃখ-যন্ত্রণা দিয়ে মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। কেউ হয়তো পাস করে আর কেউ হয়তো ফেল।

রুমকী আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৭টা ছুঁই ছুঁই করছে। ও পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে ধ্রæব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রুমকী আলতো করে ধ্রæবের কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তাতেও ধ্রæবর কোনো হুঁশ নেই। আয়েশ করে ঘুমুচ্ছে। রুমকী অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল ধ্রæবের মুখের দিকে। এই মানুষটাকেই ঘিরে তার স্বপ্ন, তার ভালোবাসা, তার মান-অভিমান, ভালোলাগা, খারাপ লাগা, কি আছে ধ্রæবের ভেতর। রুমকীকে এত টানে কিভাবে? চুম্বকের মতো একটা আকর্ষণ আছে ধ্রæবর। সবাইকে নিজের দিকে টানে। শুধু রুমকী না যে একবার ধ্রæবর কাছাকাছি এসেছে সে সহজে ধ্রæবকে ভুলে না। ধ্রæবর সহজাত একটা গুণ আছে যা মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে। আশপাশের মানুষগুলোকে খুব কেয়ার করে। এই কেয়ারিং স্বভাবের জন্য মানুষ বারবার মুগ্ধ হয় ধ্রæবের প্রতি।

রুমকী তো প্রথম প্রথম ক্ষেপে যেত এই নিয়ে। সবার প্রতি দরদ উথলে পড়া দেখে। এখন অবশ্য অনেকটা মেনে নিয়েছে যে মানুষটার স্বভাবই এমন। এসব ভাবতে ভাবতে রুমকী একবার ডাক দিল এই শুনছ উঠো। দেরি হয়ে যাবে অফিস যেতে। ধ্রæব একবার উম করে আবার পাশ ফিরে শুলো। রুমকীর একা উঠতে অনেক কষ্ট হয়। ধ্রæব না উঠলে ওর ওয়াশরুমে যাওয়া হবে না। রুমকী আবার ডাকল এই উঠো না। ধ্রæব এবার চোখ মেলে তাকাল, ঘড়ির দিকে দৃষ্টি দিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ওহ সরি। ওয়েট আমি তোমাকে বসিয়ে দিচ্ছি। ধ্রæব আস্তে আস্তে করে রুমকীকে ধরে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিল। সকালের আনুষঙ্গিক কাজগুলো ধ্রæবের হেল্প ছাড়া রুমকী একা করতে পারে না। এই সময়টুকু রুমকীর অসহ্য মনে হয়। মাঝে মাঝে ভাবে ধ্রæব যদি কখনো ওকে করুণা করে তাহলে ও সইতে পারবে না। তার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। ধ্রæব স্নান সেরে ঝটপট রেডি হয়ে গেল। সকালের খাবার রেডি। আঁখির মা ডাইনিংয়ে খাবার দিয়ে দিয়েছে। ধ্রæব প্লেটে করে দু’জনের খাবার নিয়ে আসল। রুমকী বলল, এত তাড়াহুড়োর ভেতর তুমি আনতে গেলে কেন? আঁখি নিয়ে আসবে। তুমি খেয়ে অফিসে রওনা হও। তুমি যাওয়ার পর আমি আস্তে ধীরে খেয়ে নিব। রুমকীর আগের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। এই সময়টা ধ্রæব হুলস্থুল লাগিয়ে দিত। রুমকী; রুমকী বলে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলত। সব কিছু ওর হাতের কাছে চাই। হেসে হেসে বলত বিয়েই করেছি এই ভেবে বউ সব হাতের কাছে এনে দিবে। বাহক চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য। আবার বলত কি ঠিক বলিনি? রুমকী মুচকি হেসে বলে, তুমি যা বলবে তাই ঠিক, কার ঘাড়ে কয়টা মাথা যে বেঠিক বলবে, আর এখন ধ্রæব নিজেই সব করে নেয়ে। মানুষই সব পারে। ঠেকে শিখে নেয়।

রুমকীর খুব ভালো লাগত ধ্রæবের এই টুকটাক কাজগুলো করে দিতে। নিজেকে খুব সুখী সুখী লাগত। ধ্রæবর সবকিছু গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখাই ছিল রুমকীর প্রধান কাজ। ধ্রæব সাজগোছ পছন্দ করে। বাসা থাকবে নিখুঁত ও পরিপাটি। রুমকী যতদূর সম্ভব ধ্রæবের মনের মতো হয়ে থাকতে চাইত। ধ্রæব খুব খুশি হতো। বলত তুমি কি করে বুঝলে আমি এমনটাই চাই। রুমকী বিজ্ঞের মতো বলত আমি তোমার ভেতরটা দেখতে পাই। তুমি কি চাও না চাও আমি সব বুঝতে পারি। তুমি চাও অ ঃড় ত বউ তোমার সব কথা শুনবে ও তোমাকে বুঝবে। তাই আমি সারাক্ষণ চেষ্টা করি তোমাকে বুঝতে। রুমকী একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। ধ্রæব বেরিয়ে গেছে অফিসের উদ্দেশ্যে। পৌঁছে একটা ফোন দিবে। এই ফোনের অপেক্ষায় রুমকী বসে থাকে। ইদানীং ধ্রæব ঘন ঘন ফোন করে রুমকীর খোঁজ নেয়। কি করছে, ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা। এর মধ্যেই ফোনটা বেজে উঠল। রুমকী একটু অবাক হলো এতো তাড়াতাড়ি তো ধ্রæবর পৌঁছানোর কথা না। রুমকী ফোনটা তুলে নিয়ে হ্যালো বলতেই মালার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

রুমকী- মালা কেমন আছিস?

মালা- এই তো ভালোরে তুই কেমন আছিস?

রুমকী- আমার আবার ভালো থাকা, কোনো রকম চলছে।

মালা- শোন আমরা কালকে আসছি। বাবা আমাকে দিয়ে যাবেন। তোদের বাসার ঠিকানাটা এসএমএস করে দে। কাল সকালে রওনা হব।

রুমকী শুনে খুব খুশি হলো। বলল তাড়াতাড়ি চলে আয়। খুব ভালো হবে। আমি ভেবেছিলাম আরো দেরি করে আসবি।

আমিও ভেবেছিলাম তোর ডেলিভারির ১০/১৫ দিন আগে আসব। মা বললেন একটু আগেই যা, তুই থাকলে ওর একটু ভালো লাগবে। তাই চলে আসছি। তো এসে সব কথা হবে, সাবধানে থাকিস।

রুমকীর শুনে খুউব ভালো লাগছে। যাক কিছুটা হলেও একাকীত্মের অবসান হবে। একা একা একদম হাঁপিয়ে গিয়েছিল রুমকী; রুমকীর বাবা, মা অস্ট্রেলিয়া গিয়েছেন বেড়াতে বড় ভাইয়ের বাসায়। তাই আরো অসুবিধা। মা থাকলে রুমকীর কোনো অসুবিধাই ছিল না। মা একাই একশ। মা আসার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছেন। বাবা অসুস্থ থাকায় আসা হচ্ছে না। হয়তো খুবই তাড়াতাড়ি চলে আসবেন। সবার কথা ভাবলে রুমকীর আর পায়ের কথা মনে থাকে না। মনে থাকে না ও হাঁটতে পারে না। মনে থাকে না ও সারাক্ষণ হুইল চেয়ারে বসে থাকে। ধ্রæব যখন রাতে বাসায় ফিরে এলো রুমকী বলল জানো কাল মালা আসছে। ধ্রæব বলল, ভালো কথা, জমিয়ে দুবোন আড্ডা দিতে পারবে। আঁখির মাকে বলো গেস্ট রুমটা যেন ভালো করে গুছিয়ে রাখে। শত হলেও তোমার বোন তার যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রুমকী বলল, তোমার এ নিয়ে ভাবতে হবে না। সে আমি সব ঠিক করে রেখেছি। সাথে মামাও আসবেন মালাকে দিতে।

পরের দিন ঠিক সময়ে মালা ওর বাবাকে নিয়ে ঠিকঠাক মতো রুমকীদের বাসায় পৌঁছে গেল। রুমকী তো ওদের দেখে খুব খুশি হয়েছে। একা একা একদম হাঁপিয়ে উঠেছিল। যাইহোক নিঃসঙ্গ সময়গুলো এখন সুখের হয়ে উঠবে। মালা রুমকীকে জড়িয়ে ধরে বলল ভাবিস না। আমি তোকে হাঁটিয়ে ছাড়ব। ঈশ্বর কি অলক্ষে কথাটি শুনেছিলেন? পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই ঘটে যায় যা মানুষ ভাবে না, চিন্তা করে না; কিন্তু হয়ে যায় সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। নৈতিকতা বা বিশ্বাসের থেকে সময়ের দাবিটাই বড় হয়ে ওঠে তখন।

দেখতে দেখতে সেই সন্ধিক্ষণটা চলে এলো। রুমকীর কোল জুড়ে চাঁদের মতো ফুটফুটে একটা মেয়ে এলো। যার নাম হবে চাঁদ। আগে থেকেই ধ্রæব ঠিক করে রেখেছে। চাঁদকে পেয়ে রুমকী নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে যেতে লাগল। সারাক্ষণ চাঁদকে নিয়েই ব্যস্ত। মাঝে মাঝে ধ্রæবর কথাও ভুলে যায়। যখন মনে পড়ে রুমকী নিজে নিজে খুব অপরাধবোধে ভোগে। মেয়েরা কি এমনি হয়? সন্তান পেলে পৃথিবীর সব কিছু ভুলে যায়। ধ্রæব ফোন না করলে রুমকীর ফোন করার কথা মনেই থাকে না। কি ভাবে যে সময়গুলো হু হু করে চলে যায়। মাঝে মাঝে মালা ফোন রিসিভ করে বলে এই ধ্রæবদার ফোন। ফোনটা বেজেই যাচ্ছে তুই তো ধরছিসই না।

রুমকী বলে ফোনটা হাতের কাছে না থাকলে ধরতে পারি না। মাঝে মাঝে হয়তো ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে আসি। ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সবাই। ধ্রæবর সাথে রুমকীর এখন কথাও কম হয়। রাতে রুমকীর সাথে মালাই থাকে। ধ্রæবকে বাধ্য হয়েই অন্য রুমে ঘুমাতে হচ্ছে। রাত জেগে রুমকী একা পারে না চাঁদকে দেখভাল করতে। মাসখানেক পর একটু সামলে উঠলে ধ্রæব আবার এই রুমে ফিরে আসবে। রুমকীর মনে হয় আগের থেকে ইমপ্রæভ হচ্ছে, বিছানায় একা একা উঠে বসতে পারে অনেকটাই। মনের জোরেই হয়তো পারে রুমকী। চাঁদকে একাই কোলে তুলে নিতে পারে। রুমকী যখন চাঁদকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত এই ফাঁকে কি ধ্রæব একটু দূরে সরে যাচ্ছে? মালাই বেশির ভাগ ধ্রæবর খাবার দাবার দেখাশুনা করে। মালার সাথে একটু বেশি সখ্যও জমে উঠছে মনে হচ্ছে আজকাল। রুমকী আবার নিজেকে বুঝায় ছি! এইসব কি ভাবছে? রুমকী ধ্রæবর ব্যাপারে এমনিতেই একটু জেলাস আগে থেকেই। কারো সাথে যেচে কথা বললেই রুমকীর গা জ্বলে যেত। রুমকী নিজে নিজেই বলছে ছি! এসব আমি কি ভাবছি? মালা আমার বোন আর ধ্রæব কখনো এমন হতেই পারে না। মাথা থেকে বাজে চিন্তাগুলো সরিয়ে দিল। কিন্তু বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ঘি আর আগুন নাকি একসঙ্গে থাকলে গলবেই। তাহলে কি ভেতরে ভেতরে ধ্রæব আর মালা গলতে শুরু করেছে রুমকীর সরলতার সুযোগ নিয়ে? রুমকী এসব নিয়ে ভাবতেও চায় না, কিন্তু ভাবনাগুলো মাথা থেকে যাচ্ছেও না। ধ্রæবর ছটফটানি কথায় কথায় মালা মালা করে দৌড়ঝাঁপ রুমকীর সহ্য হচ্ছে না। ধ্রæবর সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি। কারো চোখে যে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু লাগতে পারে বুঝেও না মনে হয়। ঐদিন দুম করে বলে বসল মালার ফিগারটা কিন্তু অ্যাট্রাকটিভ, হাইটটাও পারফেক্ট। রুমকী জানে ধ্রæবর লম্বা মেয়েদের প্রতি একটু দুর্বলতা। রুমকীর হাইটটাও একদম খারাপ না ৫ ফিট ৩ ইঞ্চি। মালা ৫ ফিট ৫ ইঞ্চি। এ কথা স্বীকার করতেই হবে রূপসী বলতে যা বুঝায় মালার ভেতর সবই আছে। মালার চোখগুলো হরিণীর মতো টানা টানা। লম্বা চুল, গায়ের রংটা ফর্সা না তবে উজ্জ্বল। এক দেখায় ভালো লেগে যাবে যে কারো। আগের চেয়েও মালাকে এখন বেশি সুন্দর ও সপ্রতিভ দেখায়। রুমকী কি মালার রূপ নিয়ে শঙ্কিত। নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করে। রুমকী ইদানীং খুব হীনমন্যতায় ভোগে নিজেকে নিয়ে। হুইল চেয়ারের সাথে জীবনের যখন থেকে যোগসূত্র হয়ে যায় তখন থেকেই রুমকী কোনোকিছুই আর স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারে না। মালার আসার পর ধ্রæবর আচরণ কেমন জানি রিল্যাক্স মনে হয়। রুমকী যে সারাদিন হুইল চেয়ারে বসে থাকে তা নিয়ে এখন আর মাথা ঘামায় না। মনে হয় সারাজীবন বসে থাকলেও তার কিছু আসে যায় না। মালা তো আছেই। না চাইতেই সব করে দিচ্ছে। চাঁদেরও দেখাশুনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। রুমকীর শুধু ব্রেস্ট ফিডিং করানো ছাড়া ওর কোনো কাজ নেই মনে হচ্ছে। মালা ছোঁ মেরে সব করে দিচ্ছে। পাখির মতো উড়ে বেড়ায় এ ঘর থেকে ও ঘর। যত্রতত্র ওর যাতায়াত। অবাধ তার স্বাধীনতা। ইচ্ছে করলেই ধ্রæবর ঘর, রুমকীর ঘর, কিচেন, ব্যালকনি, ছাদ, বাইরে যেখানে ইচ্ছে যেতে পারে। রুমকী পারে না। ইচ্ছে থাকলেও শক্তি নেই, উপায় নেই। রুমকী মালার হেঁটে যাওয়া দেখে দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। একদিন রুমকীও সারাবাড়ি ঘুরে বেড়াত। এখন সে একটি বৃত্তের ভেতর আটকে গেছে। নিয়তি তাকে থামিয়ে দিয়েছে জাদু দিয়ে।

মালার মনে হয় পূর্ণজন্ম হয়েছে রুমকীদের বাড়িতে আসার পর থেকে। সে তার জীবনের দুর্ঘটনাকে একটু একটু করে ভুলে যেতে চাচ্ছে। দু’বছরের বিবাহিত জীবনে মালা খুব সুখী ছিল। সৈকত তাকে দু’হাত ভরে সুখ দিয়েছিল সাথে প্রেম, ভালোবাসা; অথচ কি থেকে যে কি হয়ে গেল। মালা এখনও ভাবতে পারে না। সৈকতের মরদেহটা দেখে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিল। যার সাথে ঘণ্টা খানিক আগেও ফোনে কথা হয়েছে সে ঘণ্টাখানিক পরে কিভাবে পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যেতে পারে মালা নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না। ওর মনে হচ্ছিল সব সাজানো নাটক। এমন ঘটনা কিছুতেই তার সাথে ঘটতে পারে না। সে পৃথিবীতে এমন কোনো অন্যায় করেনি যে ঈশ্বর তার কাছ থেকে সৈকতকে কেড়ে নিবে। সেই থেকে মালার ঈশ্বরের ওপর আস্থা নেই। সৈকতের মতো এত ভালো মানুষকে কিভাবে ঈশ্বর পৃথিবী থেকে তুলে নিলেন? কিভাবে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারলেন মালার সাথে। মালার দুচোখ জলে ভরে আসে। সে চোখ মুছে ফেলে তাড়াতাড়ি করে। তার চোখের জল কাউকে দেখাতে চায় না বিশেষ করে ধ্রæবকে। ধ্রæব খুউব উদার মনের ছেলে। কিছুকে কিছু মনে করে না, সবকিছুকে নিজের মতো করে দেখে। হুটহাট করে মুখে যা আসে বলে ফেলে। এটাকেই মালার যত ভয়। মালা মাঝে মাঝে এক তীব্র টান অনুভব করে ধ্রæবর প্রতি।

রুমকীর অসুস্থতার কারণে মালাকেই বেশিরভাগ সময় ধ্রæবর দেখভাল করতে হয়। দীর্ঘ দু’মাসে ধ্রæবর সাথে অনেক কথাই কথায় কথায় বলা হয়ে গেছে রুমকীর আড়ালে। চাঁদকে নিয়ে ২/৩ বার শিশু বিশেষজ্ঞের কাছেও যেতে হয়েছে মালাকে ধ্রæবর সাথে। ডাক্তার হয়তো না বুঝেই ভেবেছেন মালাই চাঁদের মা। ধ্রæবও আর ডাক্তারকে শুধরে দেয়নি। মালা খুউব একটা অস্বস্তির ভেতর পড়ে গিয়েছিল তখন। টুকটাক শপিংয়ে গিয়েছে ২/১ বার ধ্রæবর সাথে। নানা কারণে ধ্রæবর খুউব কাছাকাছি চলে আসছে মালা নিজের অজান্তে। মালা বারবার ভুলে যাচ্ছে ধ্রæব রুমকীর স্বামী। কোনো নৈতিকতাই কাজ করছে না মালার ভেতর। মালার মনে হয় ওরও তো এরকম একটা সংসার হওয়ার কথা ছিল। চাঁদের মতো একটা ফুটফুটে শিশু। মালা কি দুর্বল হয়ে পড়ছে দিন দিন ধ্রæবর প্রতি? মালা বিবাহিত জীবনের স্বাদ জানে। পেয়ে হারিয়েছে। তার ভেতরেও আছে শরীরের ক্ষুধা, যা কোনো কিছু দিয়েই রোধ করা যায় না। মানুষের জীবনে হয়তো এমন একটা মুহূর্ত আসে যে সমাজ, সংসার, সম্পর্ক কোনো রীতিনীতিই এক সময় ভেতরে কাজ করে না। জৈবিক চাহিদাই প্রবল হয়ে দেখা দেয় সবকিছু ছাপিয়ে। মালা ভেতর থেকে জলের ডাক শুনতে পায় যেখানে সে অহরহ ডুবতে চায়, ভাসতে চায়, ভিজতে চায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। ধ্রæব জল হয়ে জোয়ার হয়ে ঢেউ হয়ে মালাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে প্রবলভাবে। এই অপ্রতিরোধ্য পতনকে সে কোনোভাবেই আটকাতে পারছে না। ভেতর থেকে সে গুড়িয়ে যাওয়ার ধ্বনি শুনতে পায়। মালা নিজেকে আটকাতে পারছে না, সামলাতে পারছে না, বোঝাতে পারছে না।

পতঙ্গের যেমন পাখা উড়ে মরিবার তরে, মালাও তেমনি ধ্রæবর উত্তাপে ঝলসে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে, গলে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এই দুর্দমনীয় বাসনাকে সে এড়াতে পারছে না কিছুতেই। চুম্বকের মতো টানছে ধ্রæবর প্রতিনিয়ত মালাকে। এই পতন থেকে মালার নিস্তার নেই। এ যেন অবিশ্বাসের ভেতরে স্বেচ্ছায় অবগাহন। তলিয়ে যাওয়া নেশার ভেতর, মোহের ভেতর, পাপের ভেতর।

রুমকী ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসছে হুইল চেয়ার ঠেলে ঠেলে। হঠাৎ দেখতে পেল চাঁদ বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছে কেউ কোথাও নেই। রুমকী দিশেহারা হয়ে উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ল এবং দিব্যি হেঁটে চাঁদের কাছে চলে গেল। দৌড়ে চাঁদকে কোলে তুলে নিল। এই আকস্মিকতায় রুমকী হতবিহŸল। সে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যি ও হেঁটে এসেছে এতটুকু। আবার সে আগের মতো হাঁটতে পারবে। আবার সে সবকিছু ফিরে পাবে। নিজের সংসার, ধ্রæব, চাঁদ সব ওর নিজের হবে। কেউ আর ভাগ বসাতে আসবে না। কারো সাহায্য, করুণা, অবিশ্বাস, অনুকম্পা কিছুই লাগবে না। এখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে হাঁটতে পারে। ও দৌড়ে চাঁদকে নিয়ে জানালার সামনে দাঁড়ায়। মুক্ত আকাশ, পাখিরা উড়ে যাচ্ছে। রুমকীর নিজেকে পাখির মতো মনে হচ্ছে। ও এখন ডানা মেলে উড়তে পারবে। এ ঘর থেকে ও ঘরে দৌড়ে যেতে পারবে, বাইরে যেতে পারবে। পৃথিবীর সব রূপ যেন এক লহমায় ফিরে আসল রুমকীর কাছে। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখে জল ভরে এলো। ঈশ্বর তুমি মহান, তুমি সব পারো। আমাকে তুমি সব ফিরিয়ে দিয়েছো। সত্যি কি ঈশ্বর রুমকীকে সব ফিরিয়ে দিয়েছেন? ঈশ্বর এক হাতে দেন অন্য হাতে কেড়ে নেন। রুমকীও জানে না সামনে ওর জন্য কি অপেক্ষা করছে। রুমকী খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল এবং চাঁদকে নিয়ে ধ্রæবর রুমের দিকে দৌড়ে গেল। দরজাটা ভেজানো ছিল ধাক্কা দিয়েই দরজাটা হুট করে খুলে গেল। ধ্রæব বা মালা স্বপ্নেও ভাবেনি রুমকী এই মুহূর্তে নিজের পায়ে হেঁটে চলে আসবে।

বিধিবাম হলে যা হয়। রুমকী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না এ কি ধ্রæব! যাকে সে দেবতার মতো বিশ্বাস করে। এই দৃশ্য দেখার চেয়ে রুমকীর সারাজীবন হুইল চেয়ারে বসে থাকাও যে ঢের ভালো ছিল। মালা বসে আছে, ধ্রæব মালার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। ছি! ছি! ঘৃণায় রুমকীর বমি চলে আসল। মানুষ এতটা অবিশ্বাসী হয় কি করে? পুরুষরা কি এমনই হয় শুধু শরীরের প্রতি ভালোবাসা; হৃদয়ের কোনো মূল্য নেই। রুমকী চাঁদকে কোলে নিয়ে এক দৌড়ে ছাদে চলে গেল। আসলে রুমকী বুঝতে পারছিল না কি করবে। ও ছাদে গিয়ে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। রুমকীর আর ইচ্ছে করছিল না এ মুখ দ্বিতীয়বার ধ্রæবকে দেখাতে। লজ্জায় অপমানে রুমকীর মরে যেতে ইচ্ছে করছে। পুরুষ মানুষের ভালোবাসা এতো ঠুনকো, দেহসর্বস্ব, নারী পেলে তাতে ডুবে যাওয়া। রুমকী চাঁদকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে যাচ্ছে।

ও কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাকে দোষ দেবে? নিজেকে? অসুস্থতাকে? নিজের অদৃষ্টকে? মানুষ বুঝি দেহের আকর্ষণ থেকে নিজেকে আটকাতে পারে না; তাহলে কিসের বিয়ে? কিসের বন্ধন? কিসের কমিটমেন্ট? কিসের ভালোবাসা? প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস এই শব্দগুলোর প্রতি রুমকি একরাশ ঘৃণা ছুড়ে দিল। আকাশের দিকে চিৎকার করে বলল আই হেইট ইউ ধ্রæব। তুমি আমার ভালোবাসা-বিশ্বাসকে পায়ে মাড়িয়েছ। আমি কখনো তোমাকে ক্ষমা করবো না, পৃথিবী তুমিও ক্ষমা করো না। আমাকে, আমার অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়ার বেদনা, অপমানের বেদনা, আঘাতের বেদনা তুমি তিল তিল করে ফিরে পাবে এই পৃথিবী থেকে। রুমকী জানে না কি করবে এই মুহূর্তে। চাঁদের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ছাদের দরজায় মুহুর্মুহু শব্দ শোনা যাচ্ছে। হয়তো এখনি ভেঙে পড়বে। রুমকী চাঁদকে কোল থেকে নামাল। দ্রুত উদভ্রান্তের মতো রেলিংয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে মাতালের মতো করে একরাশ ঘৃণা, অবিশ্বাস আর শূন্যতাকে বুকে নিয়ে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj