মানুষের সত্য সৃজনের সত্য : মতিন বৈরাগী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

মানুষের প্রাথমিক ভাবনা তার নিজেকে নিয়ে, তার খাদ্য রসদ সুখ আনন্দ নিয়ে তার ভোগ উল্লাস নিয়ে আর এসব পেতে তাকে প্রতি মুহ‚র্তে যুক্ত হতে হয় চলমান সমাজে বসবাসরত অন্যান্য মানুষের সঙ্গে। সংঘটিত করতে হয় উৎপাদন বিনিময় বণ্টনের ক্রিয়া। বিনিময় বণ্টনের মধ্যদিয়ে যে সম্পর্ক মানুষ গড়ে তোলে তাকে আমরা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলি। অর্থনৈতিক সম্পর্কের বাইরে আজ আর কোনো মানুষ রাষ্ট্র সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অতীতেও ছিল না। মানুষের এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক মানুষকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন করতে হয় যা অতীতের উন্নত সংস্করণ বৃহৎ সমাজ-রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত এক নিয়মরীতির আর তাই মানুষকে একজনের সাথে অন্যের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সম্পর্ক দৃঢ় করে দিয়েছে ব্যক্তির ইচ্ছে ভোগ আনন্দকে অব্যাহত রেখে। লাগাতার চলমান এই ক্রিয়ার মধ্যদিয়ে মানুষের বিকাশ সভ্যতায় অগ্রসরমানতা এবং প্রতিটি ধাপে নতুন পদ্ধতির প্রবর্তনায় যে ধারণাগুলো স্পষ্টতর যৌক্তিক ন্যায়ে স্থির বলে প্রতিপন্ন হয়েছে তাকেই আমরা সত্য বলি। এই সত্য বিশ^ময় এক এবং অভিন্ন। অভিন্ন ততটুকু যতটুকু যে সমাজ তার অর্থনৈতিক সঞ্চালন রীতিনীতির উন্নয়ন করতে পেরেছে এবং তাদের জীবন প্রণালী অন্য থেকে পৃথক করতে পেরেছে। সে কারণে সত্যের স্থির কোনো পরিমাপক না থাকলেও কিছু কিছু সত্য ন্যায় ও সমতাভিত্তিক যা মানবীয় এবং সুদীর্ঘ ব্যবহারে মানব কল্যাণকেই ধারণ করেছে সেগুলো আজো মানুষের সত্য বলে মেনে নেয়া হয়। তবে একথাও সত্য যে মানুষের চেতনা সামাজিক, ব্যক্তি সত্তাকে অটুট রেখে।

মানুষের এই সত্য বস্তু ভিত্তিক, কোনো বায়বীয়তা নেই এর মধ্যে। মানুষ উৎপাদন ক্রিয়ায় বস্তুকে বস্তুতে রূপান্তর করে, যা সে উৎপাদন করে তাও বস্তু। যা সে বিনিময় করে তাও বস্তু, মাধ্যম ও বস্তু। বস্তুময় পৃথিবীতে আর কোনো রফা নেই মানুষের। এমন কোনো কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না যা বস্তু অথবা বস্তু থেকে রূপান্তুরিত বস্তুর ভিন্ন আকার বা রূপ নয়। কিন্তু সমাজে নানা ক্রিয়া চলমান থাকায় এবং মাানুষের ভোগপিপাসায় অনন্ততর তৃষ্ণারূপ বহমান থাকায় গোষ্ঠী দখল করেছে গোষ্ঠীকে, নগর রাষ্ট্র দখল করেছে নগর রাষ্ট্র, আধুনিক রাষ্ট্র দখল করছে আধুনিক রাষ্ট্র এবং তার জনগণ, সম্পদ দখল করে নিজ নিজ ভোগ আনন্দ উৎসবকে প্রসারিত করছে বা করার নানা রূপের পাঁয়তারা করছে। ফলে যুদ্ধ বিগ্রহ, হত্যা খুন ধ্বংস ইত্যাদি সব ন্যায় সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে তারা হুংকার দিচ্ছে এবং পদদলিত করছে স্থির সত্য- মানবিকতার। তারপরও কিন্তু মানুষ সেই স্থির সত্যে লগ্ন থাকতে চায় এর মৌলিক কারণ হলো মানুষ সংবেদনশীল এক প্রাণী যার রয়েছে ভাবনার আগাম চিন্তা যা তৈরি করে আবেগ ও কল্পনা। এই আবেগ ও কল্পনাই মানুষকে সভ্যমানুষের স্তরে উপনীত করেছে এবং আগামী সভ্যতার বাহন হয়ে মানুষের জয়যাত্রাকে অনিঃশেষ জীবনের দিকে নিয়ে যাবে। এখন এ প্রশ্নটি এসে যাবে যে মানুষ কি কেবল উৎপাদন বিনিময় বণ্টনের মধ্যের সীমিত এক প্রাণী না কি আরো বিশেষ কিছু সে তৈরি করছে যা ঠিক সরাসরি বস্তু নয়? বস্তুরই প্রতিভাষ। উত্তর হ্যাঁ, মানুষ প্রাণী জগতের অন্যান্য প্রাণী থেকে ভিন্ন, কারণ তার ভাবনা আছে আবেগ আছে কল্পনা আছে উদ্ভাবনী ক্ষমতা আছে অর্থাৎ তার মধ্যে সেই শক্তির উদয় আছে যে তাকে প্রকৃতির প্রতিটি কারণকে বুঝতে তার স্বভাব থেকে নিতে এবং সে সব বিশ্লেষণ করে নিজ কাজে লাগাতে বুদ্ধি জুগিয়েছে। প্রকৃতির স্বভাব ও শব্দ থেকে সে নিজের ভাষা সংকেত তৈরি করে প্রকাশকে সহজ করে ফেলে। একজন আরেকজনের আরো নিকটবর্তী হয়ে ওঠে। এই খানে সত্যের উদ্ভব, সে জানল মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়, বাতাস হলে গাছপালা নড়ে, সে জানল আগ্নেয়গিরি থেকে আগুন বের হয় আগুন থেকে ঝলসানো প্রাণীর মাংস কাঁচা থেকে সাদু হয় আর এই সত্য থেকে নির্ণয় করতে পারল পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্পদ সংগ্রহ, ভোগ ও অবকাশের আনন্দ। এসব কোনো কাণ্ডই একসঙ্গে ঘটেছে তেমন নয়; কোনো কোনোটি হাতে পাওয়া গেলে অন্য আরেকটি পেতে জানতে ও বুঝতে মানুষকে ভাবতে হয়েছে অনেক। কাজের মধ্যদিয়ে শ্রমকে লাঘব করতে যে শব্দ সুরের উচ্চরব সেগুলোর উৎকর্ষতায় কাব্য, শিকার খোঁজা, শিকারের উপরে গোষ্ঠীর একাগ্র নিবীষ্টতা তৈরি ইত্যাদির প্রকাশ ঘটে অঙ্কনে। এমনি ইতিহাসের চলমান ধারায় নানা কিছুর যে উত্তরণ তা সম্ভব হয়েছে মানুষের প্রয়োজনে আবেগ ও কল্পনার জোরেই। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব যা প্রাণিজগতে অন্য কারো বেলায় ঘটেনি। মানুষের আদি সমাজটি পারস্পরিক সহযোগিতায় সাম্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা বলেন, প্রামাণও মিলেছে। আর এই সমাজ কৃষিতে প্রবেশ করলে উদ্বৃত্তের ভোগ থেকে জন্ম লয় আধিপত্য, পরিণামে দখল। এখানেই সাম্যের ন্যায়ে ভাঙন ধরে এবং গোষ্ঠীপ্রধানের আবির্ভাব ঘটে। অবশ্য আরো অনেকগুলো বিষয় এখানে বিবেচ্য রয়েছে। তারপর থেকে যেমন মানুষের অগ্রযাত্রা ঠিক রয়েছে তেমনি বিপর্যয়। গমন ও পিছিয়ে পড়া পিছিয়ে পড়া আবার সামনে এগুনো এর মধ্যে ভেজাল বাড়তে থাকে ফলে ভাবনায় ও প্রকাশে নানারূপ পরিবর্তন সূচিত হয়। বস্তু লগ্ন মানুষ ভাবলগ্নতায়ও বিরাজমান হতে থাকে আর এসবে তার আবেগ ও কল্পনা নানাভাবে নানা আকারে প্রকাশমান হয়। দখল ক্রিয়ার মূল লক্ষ্য যদিও সম্পদ কিন্তু সম্পদ সৃষ্টির মৌলিক শক্তি হলো মানুষের শ্রম। কাজেই শ্রম দখলে মানুষও ধীরে ধীরে পণ্যে রূপান্তরিত হয় এবং দখলের নানা ক্রিয়ায় যুদ্ধে সংঘাতে দখলের বিস্তারে কেবল সম্পদ দখলই হয়নি মানুষও দখল হয়েছে এবং কৃতদাসে রূপান্তরিত হয়ে বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছে। যাই হোক গোষ্ঠী জীবনের এই পর্যায়ে জন্ম হয় মিথ। [বা লোক পুরাণ] ইয়ুঙ এ কথাটি উল্লেখ করেছেন যে, যৌথ নির্জ্ঞাতা থেকে একদা মিথের জন্ম হয়েছিল। লেভি স্ট্রস সাহিত্যের সম্পর্ক নির্ণয় করতে গিয়ে মিথ ও সাহিত্যের উপাদানে মিথের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন।

এই যে পরম্পরা চলে আসা এই সত্য মানুষের। মানুষই আলোকের যাত্রী আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আলোকের সন্ধানে তার চেষ্টায় প্রভাত খুঁজেছে সে নিজেই। মধ্যে যা কিছু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাকে আমরা বাই প্রোডাক্ট বলতে পারি আর তার পেছনে রয়েছে শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানুষের নিদান খোঁজায় পরনির্ভরতা, কিংবা অধীনতা চাপিয়ে দেয়ার এক অলিক সত্য। ভাববিলাসের সূত্রটি বোধ করি সেখান থেকে শুরু, বয়ে আনছে মানুষই আজতক যা সত্য নয়, যার কোনো প্রমাণাদি এখনো মানুষ হস্তগত করতে পারেনি। প্রয়োজনের সৃষ্টিকে অপ্রয়োজনীয় করে আনন্দদান সত্য থেকেই সরিয়ে নেয়া এবং সেই প্রয়োজনকে শক্তিশালী করা যার সঙ্গে সামাজিক সত্যের বৈপরীত্য রয়েছে। সামাজিক সত্যটি ছিল সৃষ্টির; বিনোদন তার উদ্দীপনায় শ্রমকে উৎসাহিত করবে, লাঘব করবে, নতুন উদ্ভাবনে শক্তি জোগাবে সেখানে ভাববাদিতা তাকে এমন এক জগতের সন্ধান দিল যে তার নিজের শ্রমে সৃষ্ট বিষয়টি ন্যস্ত হলো অন্যের কৃপার ওপর এবং সেই শক্তিকেই সাহায্য করছে যে রয়েছে নিরাপদ। সে আরো বেশি উৎসাহ জোগাল যাতে শ্রম শ্রমিকের আস্থা হয়ে না উঠতে পারে, যাতে সে এমন এক দৈব শক্তির ওপর নির্ভর করে যে সে কিছুই করছে না, করছে উপরের একজন যে তার ওপর এই কাজগুলো নির্ধারণ করে রেখেছে। এভাবে সত্যের স্থান বদল ঘটেছে এবং অধিকাংশ মানুষ এই সত্যের মধ্যে বসবাস করে প্রমাণ চেষ্ট রত যে সত্যি সব কিছু তার জন্য নির্ধারিত এবং যে বসে বসে তার শ্রম লুটছে নিয়তি তার জন্য ওরকম ব্যবস্থাটি করেই রেখেছেন। সভ্যতা যত এগিয়েছে তত সব চলমান সমাজে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে শ্রমক্রিয়ার বিভাজন ঘটেছে। সৃষ্টি হয়েছে নানা শ্রেণির। উৎপাদনের নানা অংশে যুক্ত মানুষ নানাভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। পাশাপাশি একটি শ্রেণিও গড়ে উঠেছে বুদ্ধিবৃত্তিক। যারা দর্শন, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, ন্যায়বাদ, ইত্যাদির সন্ধানে লিপ্ত থেকে সমাজকে আলোকিত করেছে, নির্ণয় করার চেষ্টা করেছে সত্য। আর সে সব সত্য যে পলকেই মানুষ গ্রহণ করেছে বা শাসক গ্রহণ করতে দিয়েছে তা সত্য নয়। সে সময়ের অনেক জ্ঞান এ সব শক্তি পুড়িয়ে দিয়েছে। অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অস্বীকার করেছে বা সেই বিজ্ঞানীকে পুড়িয়ে মেরেছে দেশান্তরী করেছে। তবু কিন্তু ঠেকিয়ে রাখা যাযনি মানুষই তার প্রয়োজনে সেসব তুলে নিয়েছে কিন্তু সভ্যতা পিছিয়েছে অনেক। শিল্প সাহিত্য তারই অংশের এক সত্য যা আরেক অনুসন্ধানে রত। ভাব প্রবণতা অলিক চিন্তার, অন্ধকার ভেদী হারপুন যে নয় সেই সত্যটাই হারিয়ে গেছে শিল্প-প্রকাশে ব্যক্তির অবস্থানকে দূরে সরিয়ে না দেয়ার কারণে। কারণ ব্যক্তির খ্যাতি যশ মধ্যস্বত্বভোগিতা তাকে প্রকৃত সত্য থেকে আরেক সত্যে উপনীত করে এই বলে যে শিল্প কোনো উদ্দেশ্য কে সফল করে না তার উদ্দেশ্য আনন্দদান। আনন্দ শব্দটি কেমন, কি রকম, কার প্রয়োজন, কার স্বার্থের এই বিবেচনা তারা রাখতে চান না, তাদের ভাষণ হলো এরকম যে একদল লোক কে শিকল পরিয়ে চাবুক হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মরুভূমিতে ফেলে আসতে, তারা কৃতদাস ছিল এবং শ্রমপ্রদান শক্তি নিঃশেষ করেছে প্রভু। এখন তাদের বসিয়ে তো আর খাওয়ানো যাবে না তাই এই ব্যবস্থা আর সেখানে একজন কবি বা গায়ক গাইছে তাদের আনন্দ দেয়ার জন্য যাতে এই নির্ধারিত মৃত্যুর মানুষগুলো যেতে যেতে ভুলে থাকতে পারে তার আগামী যন্ত্রণা, সেটাও তো আনন্দ! আহারে, কি চমৎকার শিল্পভাবনা। তবু তাই ঘটছে যেহেতু সুদীর্ঘকাল তাই ঘটে এসেছে এবং মানুষের মনে এমন ধারণা তাকে আবদ্ধ করে রেখেছে যে এটাও একটা সত্য। যা তার জন্য নির্ধারিত হয়েছে তার নিয়তির দ্বারা। লোকজ একটা কথা আছে ‘বুঝবি কত ধানে কত চাল’ সে বোঝে কিন্তু ফেরে না। কারণ সে আবদ্ধ, এই আবদ্ধতা সমাজেরই সৃষ্টি যা শ্রেণির স্বার্থকেই সুরক্ষা দেয়। দায়হীন দায়িত্বহীন শিল্পীসত্তা আর্ট আর্ট বলে চিৎকার করে।

শিল্পের জগত মূলতই বস্তুজগত, সৃষ্টিতে নানা ভাবের বিস্তার থাকলেও বস্তুজগতকে সে অতিক্রম করতে পারে না কারণ বস্তুরই অভিজ্ঞতা রয়েছে তার মনে। বস্তুবিহীন কল্পনা একজন মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। মানুষ যে অনুমান করে এবং নতুনের কল্পনা করে, ব্যবহারে সেই কল্পনার রূপ দেয় সেও বস্তু বা বস্তুর গুণাগুণ বিশিষ্টতা নিয়ে গড়ে ওঠা কোনো দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান বস্তুই বা বস্তুর ক্রিয়া। যদিও একজন শিল্পী তার সৃষ্টিতে প্রকৃতির অন্যান্য গুণকে অবলোকন করেন গভীর অন্তরদৃষ্টি দিয়ে কিন্তু সে তার সৃষ্টিতে হুবহু সেই দৃশ্যটিকে স্ফূর্ত করে না, করে ভিন্ন কিছু যার রূপ আছে যার ভিন্নতা আছে এবং ভিন্নকিছুকে পরিস্ফুট করেছে। কবিতাও তেমনি, এর প্রেরণা সমাজ ক্রিয়া এবং ক্রিয়া একজন কবির মনে যে উদ্দীপনের সৃষ্টি করে তা আবেগে প্রবাহিত হয়, কল্পনায় রূপ লাভ করে এবং রূপে বর্ণিত হয়। কবিতা ঠিক তাই নয় যা প্রাথমিক অন্তর ভাবনায় ধরা পড়েছিল, কেবল মাত্র একটা ইমেজ যার দিগন্ত আছে, ভাষণে সম্মোহন আছে ক্রিয়ায় হ্যাঁ বোধকতা আছে। সে কারণে বস্তু পৃথিবীটা শিল্পী কবি চিত্রি সৃজনশীল মানুষের কাছে কেবল একটা জড়পিণ্ড নয়, বরং বলাযায় জড়জগত থেকে সংগৃহীত এই উপাদান শিল্পী তার মন মস্তিষ্ক ও কল্পনার সাহায্যে গ্রহণ-বর্জনের দ্বারা চলমান করে তোলেন। একটা গতি তার ভেতর ধরে দেন। এখানে শিল্পীর বা কবির হৃদায়াবেগের সক্রিয়তাই প্রধান। ফলে পাথর আর পাথর থাকে না, নদী কেবল বহমান জলস্রোত থাকে না, পাহাড় স্থবির এক শিলাস্ত‚প নয় সব কিছু পেয়ে যায় গতি। মানুষ সেই গতির মধ্যে স্থাপিত হয় সে পেয়ে যায় আরেক ভাবনার দিগন্ত। তাই কবির কবিতা শিল্পীর শিল্প তার পাঠকের কাছে নতুন হয়ে ধরা দেয়, নতুন ভাষার গতিতে সংস্থাপিত হয়। এখানেই নান্দনিকতার প্রকাশ, সে কি তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু ভালো লাগছে এবং কেমন ভালো লাগছে তা নির্ণয়ের কোনো পরিমাপক থাকে না। এই ভালো লাগাটাই আনন্দ নানা রূপের সুন্দর,চমৎকার, অসম্ভব সুন্দর এবং তারপরও যদি সব কিছু অতিক্রম করে যায় যদি একজন ব্যক্তির যে আর কোনো ভাষা নেই তখন সে বলে স্বর্গীয়। প্লেটো সুন্দরকে স্বর্গীয় ব লেছিলেন তার বিশ^াস ছিল বস্তুজগত সুন্দর নয়, আর এ্যরিস্টেটল সুন্দরকে অপার্থিব ভাবেননি। এসব নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক বিস্তর কালতক চলছে আরো চলবে কারণ শিল্পতো একখণ্ড পাথর নয় যার অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া আছে কিন্তু বাহ্যিক গতি নেই, কিন্তু মানুষের মন সে তো গতিময় এবং সব কিছুকে মুহ‚র্তে প্লাবিত করে পাড়ি দিতে পারে ব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো দূরত্বে।

তবু মানুষের সত্য আজ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। বিপুল মানুষ পিছিয়ে পড়েছে তার তৈরি সত্য থেকে। সে এখন এক নতুন সত্যকেই সত্য বলে জানছে কিংবা তাকে জানতে এমন কতগুলো বিধি ব্যবস্থা তৈরি করে দেয়া হয়েছে যে সে ভুলে গেছে প্রকৃত সত্য। এখন তাকে যা কিছু শোনান হয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই তা শোনানো হয় কারও স্বার্থে। আর সে স্বার্থটা পুঁজির। পুঁজির একমাত্র খাদ্য হয়ে মানুষের শ্রম লুটে নেয়া, স্থানিক উৎপাদন উপকরণগুলো করায়ত্ত করা, এমন শিক্ষায় উৎসাহিত করা যে কেবল দাস্য মনেবৃত্তিতে গড়ে উঠবে এবং পুঁজিপতির সেবায় লাগবে। তারা সেবা করছে গণমানুষকে ঠেঙাছে, তাকে প্রয়োজনে ষাঁড় বানিয়ে লড়াইয়ে লাগিয়ে দিচ্ছে। যাতে তার নিজের বলতে আর কিছু থাকবে না, সে নিজ ঘরেই পর হয়ে গেছে। আর কবি-সাহিত্যিকরা রাষ্ট্রিক এই ক্রিয়ায় দালালের ভূমিকা নিয়ে শিল্পের মূল সত্যকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। তারা জীবনের অংশ বলে যৌনতাকে ছড়িয়ে দিয়েছে, নারীকে পণ্য করছে, আবার দ্বিচারীর মতো নারী স্বাধীনতা বলে চিৎকার করছে। আর এসব করার জন্য আমদানি করছে চূড়ান্ত ভাববাদিতা, অলৌকিক বিশ^াস, ফ্যান্টাসি, যাতে মেহনতি মানুষের আকাক্সক্ষাগুলোর পাখা ভালোভাবে ছেঁটে কেটে রাখা যায়, যাতে তারা এমন এক চেতনালুপ্ত জগতের বাসিন্দা হয় এবং পুঁজির স্বার্থটা অটুট অক্ষুণœ থাকে নিজেরও কিছু প্রাপ্তি ঘটে। এরা দালাল, দালালীই এদের একমাত্র লক্ষ কিছু পাওয়ার জন্য। ফলে শিল্পের সেই শাশ্বত রূপটিও আর নেই অনিন্দ্য সুন্দরও উড়ে গেছে। আর মূল সত্য লড়াই টিকে থাকার লড়াই সেই সত্য হারিয়ে গেছে। এখন তাই সত্য যা সত্য নয়।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj