সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর সুন্দর অভিজ্ঞতা : বিকুল চক্রবর্ত্তী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

যেখানে কোনো মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি দুর্ভাগ্যক্রমে কিংবা সৌভাগ্যক্রমে আমাদের কয়েকজনকে সেখানেই পদার্পণ করতে হয়েছে। যেখানে কেউ কোনোদিন যায়নি সেখানে কি এমনি এমনি যাওয়া যায়। নেহাত বিপদে না পড়লে। সোজা কথায় বলা যায়, এক মৃত্যুর ক‚প থেকে আরেক মৃত্যুর ক‚পে পা দেয়া। আর সেখান থেকে ফিরে আসতে পারা মানে দ্বিতীয় জীবন পাওয়া। অনেকের কাল্পনিক গল্প আমরা শুনেছি। আবার ডিসকভারি চ্যানেলে বিপদসংকুল জায়গা থেকে বেঁচে আসার বানানো দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাটি অন্যরকম এক বাস্তবতা। বড় রকমের একটি বিপদ থেকে ১০ জনের বেঁচে আসার এক বাস্তব গল্প। হতে পারে সেখানে মানুষ হিসেবে আমরাই প্রথম পদচিহ্ন রেখে এসেছি।

ঘটনার সময় ২০১৫ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ। শ্রীমঙ্গলের একজন ভ্রমণ পিপাসু ব্যক্তি আশিষ রঞ্জন দে, মাইটিভির সাংবাদিক সঞ্জয় ও আমি। আমরা তিনজন প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাই। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম খুলনা বিভাগ ঘুরে আসবো। একই সাথে ‘মুদ্রণবিদ’ থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত সংকলন গ্রন্থ ‘আপন আলোয় বিশ্বভুবন’-এর মোড়ক উন্মোচন ও বিভিন্ন জেলায় স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তা বিনামূল্যে বিতরণ করবো। ভ্রমণ এবং বই বিতরণ এই দুটি উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা যাত্রা করি। অবশ্য এই যাত্রায় আমাদের সাথে যোগ দেন শ্রীমঙ্গলের এক ব্যবসায়ী বিষ্ণুপদ ধর, শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সজল দেব ও হীরা নামে আরো একজন।

আমরা শ্রীমঙ্গল থেকে প্রথমে হবিগঞ্জ জেলা, তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর হয়ে গোপালগঞ্জ জেলায় যাই। সেখানে আমরা একরাত একদিন অবস্থান করি। গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসককে খলিলুর রহমানকে নিয়ে গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবে ‘আপন আলোয় বিশ্বভুবন’ সংকলনের মোড়ক উন্মোচন করি। গোপালগঞ্জ থেকে আমরা পরদিন সকালে বাগেরহাটে যাই সেখানে বাগেরহাট জাদুঘর ও ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদসহ অনেকগুলো প্রাচীন মসজিদ দর্শন করি। বাগেরহাট থেকে আমরা চলে যাই খুলনা শহরে। সেখানে রাত্রি যাপন করে পরের দিন খুব ভোরে রওয়ানা হই মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে। সেখানে আগে থেকেই আমাদের সফরসঙ্গী ও পথ প্রদর্শক হিসেবে অপেক্ষায় থাকেন মংলার এক অতিপরিচিত কর্মঠ ব্যক্তিত্ব একুশে টেলিভিশনের বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি মোখলেছুর রহমান মিঠু ও তার সাথে আরো একজন স্থানীয় সাংবাদিক বাবুল ভাই। আগে থেকেই তিনি আমাদের জন্য একটি ইঞ্জিন চালিত জালি বোট রিজার্ভ করে রাখেন। সাথে রান্না করে খাওয়ার জন্য মাছ মুরগিসহ আনুষঙ্গিক আরো কিছু সামগ্রীও প্রস্তুত রাখেন। মংলা যাওয়ার পথে আমরা বেশ কিছু চিংড়ি ঘের দেখি। অনেক বড় বড় চিংড়ি। এক একটি ৭/৮ শত গ্রাম ওজনের। এরকম চিংড়ি এর আগে যা আমরা কোনোদিনই হাতে নিয়ে দেখিনি। রাস্তায় একটি নারিকেল বাগানও ঘুরে দেখা হলো। এই দুটি স্থান পরিদর্শনের জন্য মংলা পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়। যাই হোক সকাল ১০টার মধ্যেই আমরা মংলা যাই। সেখানে গিয়ে আমরা আগে থেকে রিজার্ভ করা নৌকায় উঠি। মিঠুভাই নৌকার উপরে ৭/৮টি চেয়ার ও একটি টেবিলের ব্যবস্থা করেন। আমরা সবাই নৌকার উপরেই উঠি। এই নৌকাগুলো এখানে প্রসিদ্ধ। প্রথমে তিনি আমাদের সুন্দরবনের বনবিভাগ নিয়ন্ত্রিত সুন্দরবনের করমজল অংশ দেখাতে নিয়ে যান। মাটি থেকে দুই হাত উঁচু কাটের ছাউনির ওপর দিয়ে সরু পথে প্রায় ১ কিলোমিটার সুন্দরবনের করমজল ঘুরে দেখি। এই জায়গাটি দেখে আমি সুন্দরবনের কোনো স্বাদই পাইনি। প্রায় ১ কিলোমিটার পথ ঘুরে কিছু লাল কাঁকড়া, বনবিভাগের খাঁচায় বন্দি কিছু কুমিরের বাচ্চা, কয়েকটি হরিণ এবং উন্মুক্ত কিছু বানর দেখতে পাই। তবে বাঘের বন সুন্দরবনে বাঘ দেখতে না পেলেও বনবিভাগ দ্বারা সজ্জিত বাঘের একটি কংকাল দেখতে পেরেছি। কাঠের সরু পথের উপর দিয়ে ঘোরার সময় মিঠুভাই জানালেন, এটাই সুন্দরবন। লোকজন এটাই দেখে সুন্দরবনের স্বাদ নেয়। নিজের কাছে আবাক লাগে। মনে হলো এরচেয়ে অনেক সমৃদ্ধ মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বন। যেখানে অনেক প্রজাতির প্রাণী এখনো দেখা যায়। তবে মিঠুভাই জানালেন, সুন্দরবনের ভিতরে দুর্গম অনেক জায়গা আছে যেখানে অনেক প্রাণী বিচরণ করে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার অনুমতি বা ব্যবস্থা নেই। মিঠুভাইকে বলে কাঠের ছাউনি থেকে কাদামাটিতে হেঁটে একটু জঙ্গলের ভিতরে হাঁটতে চাইলাম। তিনি জানালেন, এখান থেকে আরো ৪ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে গিয়ে একটি ইন্দোনেশীয় জাহাজে রান্না করে খাবো এবং বিশাল একটি জাহাজ ঘুরে দেখবো। অবশ্য সিভিল কোনো লোক এভাবে জাহাজে যাওয়ার অনুমতি নেই। মিঠুভাই এর নিকটাত্মীয় এক চাচা সিদ্দিকুর রহমান এই জাহাজে চাকরি করেন তাই তিনি আগে থেকেই সেখানে আলাপ করে রাখেন। তার কথায় অল্প সময়ের জন্য আমি ও আশীষ বনের ভিতরে প্রবেশ করি। যদিও বাঘ এতো কাছে কাছাকাছি সময়ে আসার কোনো খবর নেই, তবুও বনের ভিতরে বেশ ভয় পাই আমরা। ভিতরে কয়েকটি ছবি তুলে দ্রুত ফিরে আসি।

আবারও জালি বোটের উপরে উঠে বসি। ইতোমধ্যে হাল্কা খাবার খেয়ে নেই সবাই। পশুর নদী হয়ে আমরা সাগরের দিকে রওয়ানা হই। আমরা যে জাহাজে যাবো এটি সর্বশেষ চ্যানেলে আছে। ঐ জায়গার নাম হারবাড়িয়া ৫ সুন্দরবন থেকে নদী পথে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টার রাস্তা। পশুর নদী থেকে বেশ কিছু সরু খাল সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করেছে। মিঠুভাইকে অনুরোধ করালাম এরকম যে কোনো একটি খাল দিয়ে একটু ভিতর ঘুরে আসা যায় কিনা। তিনি জানালেন, এগুলো দিয়ে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ, বনদস্যুর ভয় আছে। কিন্তু আমাদের মনের ভাবনায়, এই সরু খালের পথে গেলে হয়তোবা কিছু দেখা যেতে পারে। আমার অনুরোধে মিঠুভাই একটি খালের ভিতরে কিছুটা প্রবেশ করলেন। কিন্তু কোনো কিছুর দেখা নেই। কয়েকটা ছবি তুলে যথারীতি ফিরে আসি। পশুর নদীর প্রায় মধ্য দিয়ে আমাদের হ্যাজ-বোটটি দ্রুত গতিতে চলছে। ইতোমধ্যে আসে জোয়ার। নৌকার গতি কমে যায়। নৌকার মাঝিকে জানালাম একটু বনের পাশ ঘেঁষে যেতে। উদ্দেশ্য জঙ্গলের ভিতরে কিছু দেখা যায় কিনা। নৌকার মাঝি কিছুটা কিনারা ঘেঁষেই চলতে লাগলেন। ইতোমধ্যে আমরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা অতিক্রম করেছি। কয়েকটি জাহাজের চ্যানেলও অতিক্রম করেছি। হঠাৎ করে চোখে পড়লো আমাদের সামনে প্রায় দুইশ গজ দূরত্বে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ভারী বর্ষণ। আশ্চর্য জনক হলেও সত্য বৃষ্টি পশুর নদীর মধ্য ভাগ থেকে আমরা যে পাশ দিয়ে যাচ্ছি সে পাশেই হচ্ছে। কিন্তু আমরা যেখানে আছি এবং নদীর মধ্য থেকে বা পাশে কোনো বৃষ্টি নেই। নৌকার মাঝি তৎক্ষণাৎ নৌকাটি পুরো বাঁ দিকে ঘুরিয়ে বৃষ্টিকে ডানে রেখে নদীর অপর পাড়ের দিকে যেতে লাগলেন। মধ্যখানে গিয়ে আবার নৌকাটি ডান দিকে ঘুরিয়ে দিলেন তখনও আমাদের ডানে বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা প্রত্যেকেই প্রকৃতির এ লীলা কৌতূহল ভরে উপভোগ করি।

আস্তে আস্তে বৃষ্টি কমে যায় আমরা আবারো পশুর নদীর ডান পাশে সুন্দরবনের কিনারায় চলে আসি। মিঠুভাই আরো ১ ঘণ্টা আগেই জানিয়েছিলেন এখন আর কোনো পর্যটকের নৌকা পাবো না কারণ পর্যটকরা এতো দূরে আসেন না। যদি কেউ দোবলার চড়ে যান তা হলে হয়তো এদিকে আসেন। ঐ দিন ছোটখাটো কোনো মাছ ধরার মাঝিকেও দেখা যায়নি। এ সময় তিনি আরো জানালেন, এ সব এলাকায় প্রায়ই জলদস্যুর কবলে পড়েন সাধারণ জেলেরা। এ সময় আমাদের অনেকের মনের মধ্যে বেশ ভয়ও কাজ করে। বেলা তখন ৩টা। সবাই ক্ষুধার্ত। মিঠুভাই জানালেন, আরো প্রায় ১ ঘণ্টার রাস্তা। মোবাইল নেটওয়ার্কও নেই। নদীও উত্তাল। কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখে পড়লো আমাদের বোটের বাঁ দিকে বিরাট বড় একটি কুমির নিচ থেকে ভেসে উঠেছে। মিঠুভাই মাঝিকে সাবধান করে বললেন দেখেশুনে যেতে। কুমিরের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তাক করতে করতেই কুমিরটি আবার পানির নিচে চলে গেলো। আরো কিছুক্ষণ যেতেই শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ইতি মধ্যেই আমাদের দু’একজন নৌকার ভেতরে চলে গেছেন। আস্তে আস্তে বৃষ্টি বাড়তে থাকে আমরাও নিচে চলে যাই। মাঝি একটি ছাতা টানিয়ে বোট চালাতে থাকেন। এদিকে মিঠুভাই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তার চাচার জাহাজ তো এতো দূরে থাকার কথা নয়। চাচার বর্ণনা অনুযায়ী সেই জাহাজের দেখা পাননি তিনি। একে একে আমরা প্রায় ৮/১০টি জাহাজ অতিক্রম করেছি। একদিকে পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, অন্য দিকে খুঁজে পাচ্ছি না আমাদের জাহাজ। আবার ফেরারও ভয় আছে। সকলেই বেশ দুশ্চিন্তায়। এ সময় নৌকার ভেতর থেকে জানালা দিয়ে চোখে পড়ে একটি ছোট কুমির নদী থেকে পাড়ে উঠে বনের ভিতরে প্রবেশ করছে। সবার দৃষ্টি চলে যায় কুমিরের দিকে। দুটি জানালা দিয়ে সবাই কুমিরটিকে দেখি। তবে খুব কম সময়ে কুমিরটি জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যায়। এর মিনিট পাঁচেক পরেই হঠাৎ করে আমাদের নৌকায় প্রচণ্ড একটি শব্দ হলো। আমরা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেলাম। বোটটির সস্মুখ নদীর মাঝ বরাবর হয়ে যায়। নৌকার পেছন থেকে মিঠুভাই কি হয়েছে জানতে চাইলেন। আর মিঠুভাইয়ের সাথে আসা অপর সাংবাদিক ভাইয়ের পায়ে পানির পরশ অনুভব করে বিষয়টি বুঝতে তিনি সামনের দরজা খোলে দেন। আর দরজা খোলে দিতেই নৌকার সামনা থেকে প্রচণ্ড বেগে ভেতরে পানি আসতে থাকে। নৌকা ডুবে যাচ্ছে কিনারা ভিড়ানোর জন্য মাঝিকে সজোরে জানালে মাঝি নৌকার মাথা দ্রুত পাড় অভিমুখে ঘুরিয়ে দেন। কোনো রকমে পাড়ের কাছাকাছি বোটটি গেলে একটি গুল গাছের পাতাভর্তি ডাল নদীতে ভাসছিল। বোট থেকে হাত বাড়িয়ে সে ডালটিকে ধরে সেটিকে টেনে টেনে গভীর জঙ্গলে আবৃত সুন্দরবনের পাড়ে নৌকার মাথা ভিড়াই। নদীতে প্রচণ্ড স্রোত। একে একে সবাইকে গভীর জঙ্গলাকীর্ণ বনে প্রবেশের জন্য অনুরোধ জানাই। একে একে সবাই উপরে উঠেন। মাঝি খুঁজে বের করেন নৌকার সামনে প্রায় ১ হাত অংশ ভেঙে নৌকায় পানি প্রবেশ করছে। তিনি দ্রুত বোটের রসি দিয়ে বোটটিকে একটি গাছের সাথে বেঁধে দেন এবং নৌকায় রাখা কম্বল, কাঁথা, বালিশ দিয়ে সেখানে চাপ দেন এবং নদীর কিনারা থেকে মাটি তুলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করেন। ততক্ষণে নৌকা বেশ পানিতে তলিয়ে যায়। এদিকে বৃষ্টিও হচ্ছে। আমি বৃষ্টির মধ্যেই ক্যামেরা বের করে ছবি ও ভিডিও করতে থাকি। সবাই পাড়ে, আমি শুধু নৌকায়। এদিকে নৌকা ডুবে যাচ্ছে। সবাই আমাকে দ্রুত উপরে উঠতে অনুরোধ করছেন। ছবি তোলা শেষ করে আমিও উপরে উঠি।

ঘন লতাপাতা ও গাছের শিকড়ে আবৃত এই স্থানে আমরা ১০ জন দাঁড়িয়ে আছি। আমরা ৬ জন আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ও মিঠুভাই ও তার সাথের একজন। আর হ্যাজ বোটের ড্রাইভার। নিচ দিকে তাকালে আমাদের গা চম চম করে উঠে। আশপাশে কোনো লোকালয় নেই। চোখের দৃষ্টিতে যতটুকু যায় কোনো নৌকাও চোখে পড়ছে না। এদিকে মাঝি প্রায় ২০ মিনিট চেষ্টা করে নৌকার ছিদ্র বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রত্যেকেই দুশ্চিন্তায়। আর আমার বার বার মনে হচ্ছে শুরু থেকেই বনের ভিতরে পায়ে হেঁটে ঘুরানোর ইচ্ছা ছিল হয়তো উপরওয়ালা এভাবেই বিপদে ফেলে বনে ঘোরার ব্যবস্থা করে দেন। অনেকের মনেই এভাবে অনেক কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এদিকে ভারী বর্ষণ অন্যদিকে সন্ধা ঘনিয়ে আসছে। আর গভীর বনে বাঘ-সাপসহ অনান্য প্রাণীর তো ভয় আছেই। পায়ে হেঁটে প্রায় ৫০/৬০ কিলোমিটার বিশাল বন ও বেশ কয়েকটি খাল পাড়ি দিয়ে লোকালয়ের কাছাকাছি পৌঁছা কিছুতেই সম্ভব নয়। এখানেই কোনো নৌকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মিঠুভাইয়ের চোখে মুখে বেশ টেনশনের চাপ ফুটে উঠেছে। এদিকে নৌকার চালক বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ। নৌকার ইঞ্জিন পানিতে তলিয়েছে। নৌকাটি হ্যাজ বোর্ডের হওয়ায় এটি হয়তো পানিতে ভাসমান থাকবে কিন্তু আমরা ১০ জন এর উপর উঠলে আর ভাসমান থাকবে না। আর কিছুক্ষণের মধ্যে জোয়ারের ভাটা আসবে আমাদের উপরের দিকে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। আমাদের মধ্যে একজন খুব চটফটে ছিল। সে একটি গুলগাছের মাঝা ভেঙে তার উপর এক পায়ের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নানান সব ভয়ঙ্কর কথাবার্তা বলতে থাকে। তখন বৃষ্টি কিছুটা কমে যায়। হঠাৎ জঙ্গলের ভিতরে গাছের পাতার প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। মিঠুভাই সবাইকে চুপ থাকতে বললেন। শুধুই গাছের পাতা নড়ার শব্দ আসছে কিন্তু চোখে কিছু পড়ছে না। কেউ বলছেন হয়তো ভেতরে বাঘ আছে মানুষের গন্ধ পেয়েছে। কেউ বলছে গাছ চোর গাছ কাটছে। আবার কেউ বলছে হয়তো ভেতরে বনদস্যু আছে গাছ নেড়ে শব্দ করে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। আমরা মহাবিপদে। যদি বাঘ আসে আর পানিতে নামি তাহলে সেখানে কুমিরের ভয় আছে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ভয় আছে। সবার দৃষ্টি বনের দিকে। কেউ কেউ হাতে ডাল পালা বা অন্য কিছু নেয়ারও চেষ্টা করেন কিন্তু সেখানে জীবন রক্ষার জন্য কিছুই পাওয়া যায়নি। এদিকে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যায়। জঙ্গলের শব্দ আরো বড় হচ্ছে। অর্থাৎ কিছু একটা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। সবাই স্তব্ধ। আমরা সিন্ধান্ত নেই রশি দিয়ে বেঁধে রাখা পানিভর্তি হ্যাজ বোটটিতে গিয়ে উঠবো কিনা। এসময় শব্দ খুব জোরেশোরে আসে এবং তা অনুমান হয় আমাদের মাথার উপরের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চোখে পড়ে আমাদের পেছনে গাছের পাতাগুলো প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিচ্ছে। আমরা অনেকটা পানিভর্তি হ্যাজ বোটে উঠার জন্য উদ্যত হই। এ সময় আমাদের ভ্রমণসঙ্গী সজল দেবের চোখে ধরা পড়ে কয়েকটি বানর আমাদের কাছাকাছি এসে বসেছে। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। এদিকে বানর দেখে আমাদের অপর সঙ্গী হীরা শুরু করে দেয় বানরের সাথে বাঁদরামি। দু’একজন এতে মজা পেলেও মিঠুভাই জানালেন এই এলাকার বানর মানুষের সাথে পরিচিত নয়। এরা জংলি বানর তাদের বিরক্ত করলে ক্ষতি করতে পারে। হীরা মিঠুভাইয়ের কথা শুনলো। আবারও বৃষ্টি আসে।

আমাদের গাছ নড়ার ভয় কাটলেও আমাদের এখান থেকে উদ্ধারের কোনো উপায় না দেখে সবারই মন ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। অনেকেই যে যার মতো করে যার যার ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা শুরু করেন। তখনো দুটি বানর আমাদের দেখছে। বিপদের মধ্যেই মনে এলে হয়তো তাদের (বানর) রাজ্যে আমাদের আগমন উপলক্ষে তারা আমাদের স্বাগত জানাতে এসেছে। অথবা এই বনের ভিতরে প্রবেশ করলে আরো বিপদ হতে পারে সেই আভাস দিতে এসেছে। এ সময় সফরসঙ্গী হীরা খুব জোড়ে চেঁচাতে শুরু করলো ‘কেউ আছো আমাদের উদ্ধার করো, আমাদের নৌকা ডুবে গেছে’। বারবার সে তা রিপিট করছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ করে সে আবারও চেঁচিয়ে উঠলো ‘ও ভাই কেউ আছো আমাদের সাপে কেটেছে, আমাদের বাঁচাও’। তার এ অলুক্ষণে চেঁচামেচির জন্য আমরা সবাই তাকে তিরস্কার করতে থাকি। এর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আমাদের কানে আসে একটি ইঞ্জিন বোটের শব্দ। মিঠুভাই দ্রুত পানি ভর্তি হ্যাজ বোটের পেছন অংশে চলে যান। তার সাথে সাথে আমিও যাই। কিন্তু শুধু শব্দই কানে ভাসছে। কোথাও কোনো নৌকার দেখা নেই। কিছুক্ষণ স্থির থেকে কোন দিক দিয়ে এই শব্দ আসছে তা অনুমান করার চেষ্টা করলাম আমরা। এ সময়ই চোখে পড়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সাগর অভিমুখে মংলার দিক থেকে একটি ট্রলার আসছে। মিঠুভাই খুব জোরে নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদের বিপদের কথা জানানোর চেষ্টা করেন। নৌকাটি আমাদের দিকেই আসছে দেখে সকলের মনের মধ্যে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। তবে নৌকাটি আমাদের মধ্যে আসার আগ পর্যন্ত আবারো আমরা নতুন এক আতঙ্কে জড়িয়ে পড়ি। আমাদের মধ্যে কেউ একজন বললেন আমরা কাছাকাছি কোথাও নৌকা দেখলাম না হঠাৎ কোথা থেকে এই নৌকাটি আমাদের দিকে আসছে। ভয় এরা জলদস্যু নয়তো। মিঠুভাই জানালেন ওরা আসলে শুধু তিনি কথা বলবেন আমরা যেন কোনো কথা না বলি। ক্রমশ নৌকাটি কাছে আসতে লাগলো নৌকার উপরে বেশ কয়েকজন লোক প্রায় সমানে সিগারেট টানছেন। প্রত্যেকের চোখে-মুখেই পরিশ্রমের ছাপ রয়েছে। কাছে আসতেই মিঠুভাই ঐ নৌকায় শামীম সাহেব নামে তার পরিচিত একজনকে দেখতে পান। তাকে জানালেন বিপদের কথা। ঐ নৌকার অপর একজন জানান, তার কানে একটি শব্দ আঘাত করে- কেউ একজনকে সাপে কামড়িয়েছে। এটি শুনেই তারা এ দিকে ছুটে আসেন। আমরা তাদের জানালাম অনেকক্ষণ ধরে আমরা এখানে আটকা রয়েছি। উদ্ধারের জন্য নানাভাবেই আমরা ডাকাডাকি করেছি। এ সময় আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসায় তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিভাবে ঘটনাটি ঘটেছে জানতে চাইলে আমাদের বোট চালক তাদের সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। আমাদের ধারণা জোয়ারের পানিতে কোনো গাছ তলিয়ে গিয়েছিল যা বোট চালক দেখতে পাননি। তবে সমস্যা বাধে আরো একটি ।

আমরা যেখানে আটকা পড়ি সেখান থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টার রাস্তা মংলা বন্দর। দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের মতো হবে। কিন্তু তারা এখন মংলায় যাবেন না। এখানে জাহাজে তাদের কাজ। মিঠুভাই তাদের কাছে তার চাচা যে জাহাজে আছেন সে জাহাজ কোথায় জানতে চাইলে ঐ নৌকা থেকে মিঠুভাইয়ের পরিচিত শামীম সাহেব বলেন এখান থেকে সাগর অভিমুখে আরো আধাঘণ্টার রাস্তা। এ সময় মিঠুভাই ঐ জাহাজে পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ করলে তারা হাসি মুখে তাতে সম্মত হন। আমাদের জিনিসপত্রসহ আমরা ঐ নৌকায় উঠে পড়ি এবং হ্যাজ বোটের চালককে মিঠুভাই জানান, জাহাজে গিয়ে নৌকার মালিককে ফোন করে তাকে উদ্ধারের জন্য আসতে বলবেন। এ সময় উদ্ধারকারী নৌকার একজন আমাদের মাঝিকে বললেন তার নৌকার পানি কমানোর চেষ্টা করতে তারা আমাদের জাহাজে দিয়ে আবার তার কাছে আসছেন। তারা আমাদের জাহাজে তুলে দেন। সেখানে জাহাজের শেফ আগে থেকেই আমাদের জন্য ডাল, ভাত, ভাজি রেঁধে রাখেন। আমরা যাওয়ার পর আমাদের মাছ ও মাংস রান্না করেন। আমরা খাওয়া দাওয়া করি। খাওয়া দাওয়ার পর বিশাল জাহাজটি ঘুরে দেখি। তবে দুশ্চিন্তা তখনো কাটেনি। ফেরার নৌকার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তবে মিঠুভাই বন্দরে ফোন করে নৌকা পাঠানোর জন্য বেশ কয়েকজনকে অনুরোধ করেন। কেউই দীর্ঘ পথ আসতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ জলদস্যুর ভয় আছে। মিঠুভাই জানালেন প্রয়োজনে আজ রাত জাহাজেই কাটাবো পরের দিন সকালে যাওয়ার ব্যবস্থা করবো। এ সময় মিঠুভাইয়ের চাচা জানালেন কিছুক্ষণ পর তাদের জন্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ছোট একটি ইঞ্জিন নৌকা আসবে। তাকে তিনি অনুরোধ করে দেখবেন। যথারীতি ছোট একটি নৌকা আসলো। কিন্তু নৌকায় বেশ কয়েকজন মানুষও আছেন। আমরা বলার আগেই ঐ নৌকার মাঝি সামনের জাহাজ থেকে কয়েকজন লোক নিয়ে মংলা বন্দরে যাবে বলে জানায়। আমাদের নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে সে জানায় নৌকায় জায়গা হবে না তবে এক দুইজনকে হয়তো নিতে পারবে। এক পর্যায়ে আমাদের সকল ঘটনা বলার পর এবং মিটু ভাইয়ের চাচার অনুরোধে তিনি আমাদের নিতে রাজি হন। আমরা চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নৌকায় উঠি। মাঝি সতর্ক করে দিলেন আমরা যেন মোবাইলের লাইট না জ্বালাই, কথাবার্তা কম বলি এবং নড়াচড়া কম করি। কারণ পথে জলদস্যুর ভয় রয়েছে এবং নৌকা ছোট নড়াচড়া করলে ডুবে যেতে পারে। আমরা মাঝির কথামতোই নীরবে নৌকায় বসে রইলাম। ভরা নৌকা তার উপর সামনের আরো একটি জাহাজ থেকে আরো কয়েকজন লোক নৌকায় উঠে। আমরা প্রায় দুই ঘণ্টায় মংলা থানায় নির্মাণাধীন সাইলো/খাদ্য গুদামের কাছে চলে আসি। মিঠুভাই বললেন, এখন আর ভয় নেই। তবে আমরা ইচ্ছে করলে মংলা পোর্ট থেকে মটরসাইকেল আনিয়ে এখান থেকেও যেতে পারি। এতে কমপক্ষে এক ঘণ্টা সময় বাঁচবে। আমরা রাজি কিনা। আমরা রাজি হয়ে গেলাম। আমরা নেমে পড়লাম স্যালোর পাশে। ফোন করে মোটরসাইকেল আনা হলো। সেখানে ৫টি মোটরসাইকেলে আমরা আরো আধা ঘণ্টায় রাত ১২টার দিকে মংলা বন্দরে এসে পৌঁছি। এরপর খেয়া পার হয়ে আমরা রাত দেড়টার দিকে খুলনা সদরে আমাদের হোটেলে যাই। রাতে সবাই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ি। পর দিন সকালে মনে হয় আগের দিনের পুরো ঘটনা যেন আমরা স্বপ্নে দেখেছি। পরের দিন খুলনার বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন জায়গা দেখি। খুলনার প্রসিদ্ধ চুইঝাল দিয়ে রান্না করা খাসির মাংস খাই। আমাদের সাথে ভ্রমণসঙ্গী আশিষ দে নিরামিষ ভোজী। তিনি খুলনা ইস্কন মন্দিরে আহার সারেন।

ভ্রমণের পাশাপাশি খুলনার বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব বিএমএ-র সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ বাহারুল আলম, মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াছ আলী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মহেন্দ্র নাথ সেন, সাংবাদিক বাবুল আক্তার ও সাংবাদিক শিশির রঞ্জন মল্লিকসহ আরো কয়েকজন সুধীজন ও সাংবাদিকসহ আমরা এসওএস হ্যারমান মেইনর স্কুল ও খুলনা সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজে ‘আপন আলয় বিশ্বভুবন’ সংকলন বিতরণ করি।

বলতেই হয় ভ্রমণকালে খুলনার সাংবাদিক, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় আমরা সিক্ত হই। আরো একরাত খুলনায় থেকে আমরা যশোর, নড়াইলের প্রখ্যাত চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের বাড়ি হয়ে পদ্মার ফেরি পার হয়ে ঢাকা আসি। ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল। আনন্দ উপভোগ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যদিয়ে সাপ্তাহব্যাপী খুলনা ভ্রমণ শেষ হয়, তবে আমার খুব প্রিয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে উপহার পাওয়া একটি হাই রেজুলেশনের ক্যামেরা মোবাইল মিসিং হয়ে যাওয়া স্মৃতিবহ এই ভ্রমণে কালিমা লেপে দেয়। প্রিয় ব্যাক্তির উপহার ছাড়াও ঐ মোবাইলটিতে ছিল পুরো ভ্রমণের অনেকগুলো ছবি। যা আবার উঠানো হয়তো সম্ভব নয়। আর শেষ কথায় বলা যায়, এই ঘটনার জন্য আমাদের বাকি জীবনে স্মৃতির পাতায় ভাসমান থাকবে সুন্দরবন।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj