যদি পুরনো কথাই আবার বলি মোচন হয় কী কিছু : শহীদ ইকবাল

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বাংলাদেশ যে কোনো রাষ্ট্রের মতোই এখন ইনফরমেশন টেকনোলজির আওতায় যুক্ত। ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা ডিজিটাল জীবনযাপনে অনিবার্যভাবেই সকলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিংবা বলা চলে বাধ্যও হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এখন সচেতনতা অনেক তুঙ্গে। অনেকেই আছেন লেখাপড়ায় আগ্রহী, চাকরি পাবার জন্য উন্মুখ। দেশ গড়তে চায় সকলেই। দেশাত্মবোধও আছে চরমভাবে। বিশাল জনশক্তি দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করতে চায়। প্রতিযোগিতায় দেশকে ঊর্ধ্বে দেখতে চায়, দুর্নীতিমুক্ত-স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ চায়। এমন একটি দেশের তারা স্বপ্ন দেখে যে দেশে মানুষ সুস্থভাবে নিরাপত্তার সঙ্গে খেয়েপরে বাঁচতে পারবে। দেশের অনেক মেধাবী মানুষ আছেন তারা মেধা বা যোগ্যতাবলে বিদেশে ভালো কাজ করছেন, দেশের হয়ে সুনাম কুড়াচ্ছেন। দেশকে নিয়ে গর্বও বোধ করেন তারা। কিন্তু দেশের মুক্তির স্বপ্নও তো তাই ছিল। স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশক আমরা শুধু স্বপ্নই দেখে চলেছি। কিন্তু কাক্সিক্ষত কিছু অর্জন করতে পারিনি। যে উন্নতি ও উত্থান আমরা দেখতে পাই তা স্বীয় উদ্যোগে, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়। কর্পোরেট বাণিজ্য বা পুঁজিবিশ্ব গোটা অঞ্চলকে দখল করেছে। এবং এমনটা ঘটবে তার আর বিচিত্র কি? সবকিছুই তো উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। উপযোগিতা থেকেই মানুষ তার ক্ষেত্রকে বেছে নেয়। কর্মচাঞ্চল্যের প্রবাহও তার সঙ্গে যুক্ত। বিপুল জনশক্তির বাজার যে ধরতে পারবে সেই প্রতিষ্ঠা পাবে। মানবিক মূল্যবোধগুলো সেভাবেই আটকে গেছে, থমকে গেছে বিশেষ আবর্তে। চিন্তার স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্যও কমে গেছে। অনতিক্রান্ত বৃত্তেই ঘোরাফেরা করছে সবকিছু। একদিকে বিপুল পরিমাণে চলছে ভোগবাদের উল্লাস অপরদিকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-ত্রাস-নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। পুঁজিবাজারে মানুষের বৈষম্য কমছে না। বৈষম্য থেকে ক্ষোভ-ক্রোধ-উষ্মা বাড়ছে। বৈধতার বদলে অবৈধ চিন্তা বাড়ছে, নিজের স্বার্থ কিংবা নিজের আখেরে লাভ সবাই হিসেব গুনছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব নির্বিশেষে মোহে আচ্ছন্ন। জীবনবোধ সম্পর্কে ধারণা অপ্রতুল। ইহলৌকিক বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের মনগড়া আখ্যা আর ব্যাখ্যানে জীবনের অর্থ সমাপন করছে। অথচ কি দুর্দৈব! সে মানুষ আবার বিপুল ও প্রচণ্ডভাবে ধর্মভীরু, অবৈজ্ঞানিক। এমনটা এখন সত্যে প্রতিষ্ঠিত, যে বেশি ধর্মভীরু সে তত বেশি লোভী ও ভোগবাদী-স্বার্থনিষ্ঠ। মানবিক মূল্যবোধের চাইতে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে যে ইহলৌকিক জীবনাচারে ব্যস্ত সেখানে নিজের নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ নিশ্চিন্তির লোভ ছাড়া আর কিছু করতে পারছে না। একদিকে ল্যাপটপ ব্যবহার করছে, দামি গাড়িতে উঠছে, বিদেশ ভ্রমণ করছে আর অন্যদিকে নেকাব লাগিয়ে বা কপালে দাগাঙ্কিত ধর্মচিহ্ন নিয়ে নির্বিচারে দুর্নীতি আর লোভে-লালসায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত করে তুলছে। ভেবেই নিচ্ছে যে পাপী-গোনাহগার তার জন্য ক্ষমা বা মাপ অনিবার্য। সুতরাং পাপে ক্ষমার বিধান যেহেতু আছে সুতরাং পাপে অশান্তি নেই। এভাবে আমাদের সমাজে লেজেগোবরে একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পণ্যবৃত্তির অবাধ নিমজ্জন চলছে। মিডিয়ায় অসংস্কৃত উদ্দামতা কার চোখে না পড়ছে? কিভাবে তারকা হওয়া যায়, খুব সস্তা শ্রমে বিত্তের মালিক হওয়া যায়, প্রতিষ্ঠা পাওয়া যাবে সে যে মানেই হোক তা আদায়ের ওষুধ কোথায় তা খোঁজা নিয়ে ব্যস্ত। যে নায়িকা নাচে সে অভিনয় করে, গান গায়, বিজ্ঞাপনচিত্রে অংশ নেয়, উপস্থাপনার কাজ করে, বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইন্টারভিউ নেয়- সবকিছুই তার কাছে সোজা ও স্বাভাবিক। নিজে জেনে যান যে তিনি খুব মেধাবী। লেখালেখির জগতেও খুব তাড়াতাড়ি একজন লেখক অলেখক আর অলেখক লেখক বনে যান। সম্পর্ক আর যোগাযোগই সবকিছুর মানদণ্ড। একবার জনপ্রিয় হলে তো আর কথাই নেই কাড়ি কাড়ি টাকা আসবে মিডিয়ায় উল্লম্ফন আসবে এ আর কম কি? এটাই এখন জীবনের মোক্ষ। অথচ যিনি লেখক হতে চান বা কবি হতে চান তার সাধনা কেমন হওয়া উচিত, কতোটা মেধাবী হওয়া উচিত, কতোটা চর্চায় থাকা উচিত- তা কে-না জানে? ত্যাগ-সহিষ্ণুতা-ধৈর্য-চর্চা-অর্জন-অধ্যবসায় এসব আজ বোনোজলে গেছে। সবকিছু শুষে নিয়েছে পুঁজি। পুঁজি পেতে যা লাগে তাতে নারী-পুরুষ, প্রণয়-প্রেয়সী-ক্লায়েন্ট সবাই সন্তুষ্ট। এই সন্তুষ্টের জন্য যে যা করা দরকার তাই করছে। এভাবে অসততা, অদক্ষতা, অগভীরতা, বৈচিত্র্যহীনতা তুমুুলভাবে বাড়ছে। কোয়ালিটি হারিয়ে ফেলেছি। মুনাফা করতে গিয়ে যে কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয় নিতে আমরা পিছুপা হই না। সেখানে মূল্যবোধ-সূ²তা কোনোভাবেই গুরুত্ব পায় না। এতে করে জন্ম নেওয়া অবিশ্বাস ও অস্বস্তি থেকে জীবনের স্পন্দনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নে বাংলাদেশ বাধা পড়ছে পুঁজি ও প্রতিক্রিয়ার কোপানলে। এগুনোর বদলে পড়ছে পিছিয়ে। বলতে দোষ নেই তাতে করেই মৌলবাদ এবং জঙ্গিবাদ আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কারণ, বৈষম্যের সুযোগে ধর্ম লেবাসে ভয়কে গ্রাস করছে এবং ক্রমশ দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাকে নিজ দলে ক‚পমণ্ডূকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে। লেখাপড়া ও মুক্তজ্ঞানের চর্চা যত কম সে তত বেশি ধার্মিক ও ওহাবি। গরিব মেধাবী ছাত্রদের অর্থলিপ্সা বা মাসোহারা দিয়ে বিভিন্ন কায়দায় মৌলবাদী সংগঠন তাদের সেন্টিমেন্টকে নিজের করে নিচ্ছে। বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, ইন্সুরেন্স কোম্পানি, হাসপাতাল, গালফ স্টেটের ব্যাংকসমূহ, বিভিন্ন মেয়াদি চাঁদাবাজির মাধ্যমে তাদের কোটি কোটি টাকার ফান্ডে লেখাপড়ার নামে প্রশিক্ষিত হচ্ছে গরিব মেধাবী ছাত্ররা। তারা দীক্ষা নেয় ‘গাজী’ বা ‘শহীদ’ হওয়ার। এরূপ কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে গত পঁয়তাল্লিশ বছরে বেড়েছে এবং এখনও বেড়ে চলছে। সুতরাং গণতান্ত্রিক ও অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশে স্বাধীনতার স্বপ্ন এক ‘কাগুজে বাঘ’ রূপে পরিগণিত হয়েছে তাতে আর সন্দেহ কি? আমাদের একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের তরতাজা স্বপ্ন যেমন আছে তেমনি একটি গড়ে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিচিত্রভাবে ভোগবাদে হয়ে উঠেছে প্রবুদ্ধ। আর এ ভোগবাদের হাত ধরেই ঢুকে পড়েছে বিচিত্রমাফিক ফ্যানাটিক, অযৌক্তিক, মোহান্ধ কর্মকাণ্ডসমূহ। যা দেশের সম্মুখবর্তী হওয়ার পথ করে তুলেছে অবরুদ্ধ। আর দুর্ভাগ্য হলেও এমনটা সত্য, ইতিহাস না জানা বা ইতিহাস-বিরোধী একটি অসংস্কৃত ভোগবাদী ধারা নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠছে। আর তারা গত সময়গুলোতে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে মানুষকে বোঝাতেও সক্ষম হয়েছে অযৌক্তিক ও ক‚পমণ্ডূক যুক্তিসমূহ। কারণ, ধর্মভীরু ও দরিদ্র-সরল মানুষকে ভারত বিরোধিতার কথা বলেও ভোট নেওয়া সম্ভব। এগুলোর মাত্রামান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু সাধারণত ভুল বলে প্রতিপন্ন হওয়ার কিছু নেই।

আমরা বলতে চাই কিভাবে মুক্তি সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতগুলো রচিত হয়েছিল, কিভাবে সা¤প্রদায়িকতাকে অস্বীকার করে বাঙালি মুসলমান তার আত্মপরিচয়কে চিনে নিয়েছিল, জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হলো; কিংবা তার পরের ইতিহাস কতো মর্মন্তুদ ও ঘোলা জলের ডোবায় নিপতিত হলো। রাষ্ট্রদ্রষ্টাকে সমূলে উৎপাটন করার অপচেষ্টায় আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছিল ‘আইয়ুবি শাসনকাল’। ফলে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের স্তম্ভগুলো নিয়ে বিতর্ক ও বিপক্ষের জ্ঞানপাপ গৃহীত হলো। তখন সেখানে ঢুকে পড়ে স্বার্থান্ধরা, গণতন্ত্রের ধ্বংসকারীরা। ফলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বিচারে অগণতান্ত্রিক অপশক্তি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে। বৃথা বিতর্ক জুড়ে দিয়ে কোমলমতি মানুষদের নিয়ে শুরু হয় অপরাজনীতি। অবরুদ্ধ করে ফেলা হয় মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানের-চিন্তার নিরন্তর চর্চারেখা। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যেভাবে পৃথিবীর সব দেশে গর্বিত স্বাধীনতার বার্তা প্রচারিত হয় জাতীয় ইস্যুসমূহে ঐকমত্যে পৌঁছায় সেই আগুন ছড়িয়ে দিতে হবে সবার প্রাণে। জাতিকে মুক্তির স্বাদে করে তুলতে হবে উৎসবমুখর। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ করে তুলে জাতির গর্বিত সন্তান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আজকে বিভ্রান্তির অমানিশা কেটে গেছে, সময় এসেছে প্রকৃত সত্যে ও ইতিহাসে পৌঁছানোর। প্রগতির চাকা আর পেছনে নয় সম্মুখের দিকে চালাতে হবে। যে স্বপ্ন নিয়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা তা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। এটি ডিজিটাল যুগ, দ্রুততর সুবিধায় অনেক কিছু অর্জন করে ফেলা সম্ভব। কিন্তু আমরা সে জন্য প্রস্তুত তো? প্রস্তুত হতেই হবে- আর তা-ই তো অস্তিত্বের যুদ্ধ বা মুক্তির পরতকথা।

কিছু প্রসঙ্গকথায় আসি- যা অস্তাচলের পুনরাবৃত্তিই বলতে হবে। কারণ, এসব তো অনেকবার অনেকেই বলেছেন। প্রথম রাষ্ট্ররূপে এই ভূখণ্ডে চিহ্নিত হয়েছিল, জাতি স্বরূপে বাঙালি- একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধের পর। তার আগে কি তার দেশ ছিল? জাতিতত্ত্বের পরিচয়ে চিহ্নিত ছিল? হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তার কি কোনো আত্মপরিচয় ছিল যা সে আন্তর্জাতিকভাবে গর্বিত উচ্চারণে প্রকাশ করে সামর্থ্য হতে পারত? নিশ্চয়ই না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তা দিয়েছে। স্বাধীন দেশ, পতাকা। আত্মপরিচয়। প্রথম দৈশিক ভূখণ্ডে বাঙালি মুসলমানকুলের হাতে রাজদণ্ড উঠল। প্রথম সে রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তির অধিকারী হলো, প্রথম বাংলাভাষা রাজদরবারে পৌঁছল। সবকিছুর মূলে ওই মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ জয়ী হলো বলেই গাড়ি হলো, বাড়ি হলো, ড্রইংরুম হলো আর তাতে ঢুকল ইলেকট্রনিক সামগ্রী। যাতে করে আমরা হয়ে উঠতে সক্ষম হলাম ভদ্র, শিক্ষিত, সিভিল, আধুনিক, গণতন্ত্রমনা বলে। আমরা পৃষ্ঠপোষকতা পেলাম নিরঙ্কুশভাবে রাষ্ট্র থেকে, কারণ আমার ভাই মন্ত্রী বা নিজরক্তের ভাষা এখন রাষ্ট্রভাষা, রাষ্ট্রীয় পতাকা বহন করে আমার শাসক ভাইয়ের গাড়ি, সে ভাই এখন মিন্টোরোডের অধিবাসী, শান-শওকত সে ডিজার্ভ করে- যেহেতু সে সরকারের মন্ত্রী বা সরকারপ্রধান। সবকিছুই ওই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ পাওয়ার জন্য। অ-মুক্তির ভেতর থেকে মুক্তির জন্য, অ-শাসনের ভেতর থেকে মুক্তির জন্য অ-নিরাপত্তার ভেতর থেকে মুক্তির জন্য, অ-নিশ্চিতির ভেতর থেকে মুক্তির জন্য এই যুদ্ধ। যুদ্ধটি দৃঢ়তর, কালক্রমে হয়েছিল পুনর্গঠিত। সাতচল্লিশে আমরাই তো পাকিস্তান চেয়েছিলাম, মুসলমান হিসেবে। মুসলমানের শাসন-আইন-বিচার নয় মুসলিমভিত্তিক রাষ্ট্র হলে কিছু সুবিধা পাওয়ার জন্য। খাওয়া-পরার সুযোগের নিশ্চয়তার জন্য। স্বতন্ত্র স্ট্যাটাসও পাওয়া যাবে, মর্যাদা নিয়ে এক সংস্কৃতিতে বড়ও হওয়া যাবে। মানুষ হিসেবে ন্যূনতম যা কিছু তা পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মর্যাদা বা অহং-এরও একটা বাড়তি মূল্যায়ন বা গুরুত্ব পাওয়া সম্ভব হবে। এসব বিবেচনা থেকে ধর্ম-নামক দৃশ্যমান মোহে এক হওয়া। একত্রিত হওয়া। এক সঙ্গে জিগির তোলা। আর প্রমাণে তো আমরা জানি, তখন নেতা হয়ে গেছেন জিন্নাহ সাহেব। জিন্নাহ নিজেও জানতেন চিন্তা অবাস্তব কিন্তু রাষ্ট্র গঠন সম্ভব। কারণ, জনতা স্বার্থে একত্রিত। নিজে সে অর্থে ধার্মিক না হলেও বা জন্মসূত্রে একজন ভারতের নাগরিক হলেও হিন্দু-বিরোধিতার ভেতর দিয়ে পৃথকতার নিমিত্তে রাজনীতি করলেন। রাজনীতি সফল হলো, হিন্দু-মুসলমানের পৃথক রাষ্ট্র হলো। আমরা এও জানি জিন্নাহ এ রাষ্ট্র-কাঠামোতে বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রথম ভাষণেই তিনি তার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তার উক্তি ছিল, সব ধর্ম, সব বর্ণ, সবরকমের মানুষের জন্য পাকিস্তান। সেভাবেই আমরা পাকিস্তানে আটকাই। মেনে নিই। এবং আমরা এও জানি এ রাষ্ট্রে আমাদের হয়তো মুক্তির একটি পথ থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। দ্রুত সব মায়া আর ভেতরের রোগশোক বিপুল আবহে বেরিয়ে পড়ে। খুব দ্রুত পাকিস্তান মুখথুবড়ে পড়ে। কায়দে আজম নির্মমভাবে অসহায় রোগশয্যায় নিহত হন, তারপর একের পর এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর গণতন্ত্র হত্যার পাঁয়তারা চলে। পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতি বিরূপ বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করেন নানভাবে। অব্যাহতভাবে তা চলতেই থাকে। প্রথমে ভাষা তারপর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক অধিকার হরণ। সংস্কৃতিকে কুক্ষিগত করে ফেলা হয়। অপসংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। সংস্কৃতিকে বিকৃত করে এক ধরনের বিরোধিতায় ফেলা হয়। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার তামিল দেওয়া হয়। চালান হয় বিশেষ ধর্মের লোক হিসেবে। তার সাহিত্যকৃতিকে বিরূপভাবে দেখার জন্য আরোপিত চাপে বন্দি করা হয় জনতাকে। নজরুলকে ‘মুসলমান’ বানানোর প্রয়োজন পড়ে। রীতিমতো সংস্কারের ব্যবস্থা হয়। মুসলমান নামে প্রাণপাত তৎপরতা থাকলেও তার সবৈব ব্যবহার হচ্ছে নিজ স্বার্থে পাঞ্জাবীর স্বার্থ কায়েম আর বাঙালি নিধনের প্রচেষ্টা। এরূপ অযৌক্তিক বিরুদ্ধতায় সবকিছু মিলে ভেতরে ভেতরে বাঙালি যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হলো। এ যুদ্ধ বাঁচার, মুক্তির, বন্ধন থেকে মুক্তির। অ-মুক্তি থেকে মুক্তির। বাঙালি এ যুদ্ধের জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিল না। প্রস্তুত সে নয়, কারণ সে তো অভ্যস্ত নয়। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র-সম্পর্কিত তাপ বা উত্তাপ সে বোঝে না নিরন্তর সে নিজের অধিকারের কথাই বলল। যেন মায়ের ভাষার কথা বলল, যেমন যুক্তফ্রন্টে ভোট দিয়ে বলল আমাদের অধিকারটুকু দাও এরপর সামরিক শাসন এলে তখন আতঙ্কিত হলো। রবীন্দ্র বিরোধিতা এলে মোকাবেলা করল- কারণ নিঃশ্বাসবায়ু তো রবীন্দ্রনাথ! তাকে অস্বীকার করা মানে জাতিসত্তাকে অস্বীকার করা, জীবনকে অস্বীকার করা। তা তো সম্ভব নয়! তাই মোকাবেলা এবং বর্ষবরণ বা পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলের আয়োজন সেসব তো ওই প্রতিরোধের ক্ষেত্র। হতাশ হয় যখন নয় বছর পর সংবিধান তারপর তার ভুণ্ডুল আর সামরিক শাসন চালু। এবং অব্যাহত গতিতে সর্বমুক্তির পথ রুদ্ধ। তখন প্রতিরোধ ছাড়া উপায় কি? বাঙালি প্রতিরোধ করতে শিখে ফেলল, নিজেকে চিনল, রবীন্দ্রনাথকে চিনল, নজরুলকে নিজের করে নিল, প্রকৃত অর্থে অখণ্ডিত করে দেখল রবীন্দ্রনাথকে। শিক্ষা আন্দোলনও করতে হলো, ছয় দফার মধ্যে সব অধিকারের ম্যাগনাকার্টা থাকল। সবকিছুই যেন ঠেকে শেখা। এবং সেভাবেই যুদ্ধ এবং অ-মুক্তির দিক থেকে মুক্তির দিকে যাওয়ার যুদ্ধ। এভাবে একাত্তরে পৌঁছে একতায় জয়। কী সে মন্ত্র! আর উল্লাস। চতুর্দিক থেকে যেন ডাক আসে। এক হওয়ার পর যেন আরও একতা বাড়ে। সর্বশক্তি নিহিত থাকে তাতে। দেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয় সবাই। অথচ বোধ করি জানা ছিল না অনেককিছুই। জাতির পিতাও বুঝি জানতেন না তার কর্মকীর্তি গাথা প্রসঙ্গে। অনেক কিছুর, অনেক প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে যে অর্জন, শেখার ভেতর দিয়ে যে অর্জন, পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যে অর্জন তা আমরা এক সময় জেনে যাই, হয়ে যাই নিজেরাই ইতিহাস। সত্যিকাররূপে দৃঢ়তর হয়ে উঠি যখন বুঝে ফেলি অনেক বড় কামিয়াব অর্জন করে ফেলেছি তখন আত্মস্বার্থ আর পরাভূত থাকে না। আত্মস্বার্থের ভেতর দিয়ে লোভলালসার সূত্রসমূহ অনেকরকম হয়ে উঠতে থাকে। অপরাধে-আত্মহত্যায় হেরে যাই আমরা। সত্যিই বিরাগভাজন হতে থাকি। উচ্ছিষ্টগুলো গলাধঃকরণ করতে থাকি। চর্ব্য-চুষ্য-লেহ্য-পেয় অনর্গল হয়ে ওঠে। চিনতে পারি না শত্রু-মিত্র। বিজয়ের প্রভূত বার্তা তখন আমরা বেহুঁশ। হুঁশহারা হয়ে পড়লে তখন সুযোগ বুঝে নির্বিচারে ঢুকে পড়ে শত্রুরা, সুযোগ সন্ধানীরা। ভেতরে ভেতরে তারা নস্যাৎ করতে থাকে সবকিছু। আত্মসাৎ করতে থাকে আমাদের জীবনের অনেকরকম বার্তাসমূহ। বিপরীতে জমে ওঠে কালোমেঘ। পরাজিত আবার আদর্শের কথা বলে একত্রিত হতে থাকে। যে আদর্শ মৌলবাদের, ক‚পমণ্ডূকতার, পেছনে চলার, প্রথাবদ্ধতার, আড়ষ্টতার, অনৈতিকতার তা করালরূপে আঘাত হয়ে আসার প্রস্তুতি নেয়। সে আঘাতে প্রতিশোধ চরমে ওঠে। অ-মুক্তির রশিগুলো আবার গভীর ও সূ²তর হয়ে ওঠে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে জয়ী আমরা ওসব গোপন ষড়যন্ত্র বুঝে উঠতে পারি না। তখন দেশ-রাষ্ট্র-পতাকা-সংবিধান-সোনার বাংলা বলে আমরা আনন্দিত, মাতোয়ারা, দিশেহারা, প্রাণবন্ত, অহংতাড়িত। তখনই হঠাৎ জাতির পিতা সপরিবারে ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়েন। তারপর অনেককাল ঘোলা জলে নিপতিত। আবার ঐক্যে আসে দ্বিখণ্ডণ। ফিরে আসে পরাজিত শত্রুরা আরও বিশালরূপে। আন্তর্জাতিক গংরা তাদের প্রভূত সহায়তা ও সমর্থন দেয়, সাহস জোগায়। ইসলামের নামে আবার ইসলামি রাষ্ট্রের কথা আসে। যে রাষ্টের ভেতর থেকে বেরিয়ে আমরা হয়েছিলাম ঐক্য, আবার সে রাষ্ট্রের ভেতরে সেঁধানোর চেষ্টা, ইসলামের নামে, ধর্মের নামে। তা না করলে হত্যা, নিপীড়ন-নির্যাতন। অপশাসনের কথা আসে, জয়ের পরে সেই মাতোয়ারা সময়ে আমরা দিশেহারা হয়ে যে পাপ করেছি সেই পাপের প্রশ্ন আসে। দৃঢ়তরভাবে স্বাধীন দেশকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দেখা যায় সিভিল শাসকের জায়গায় আবার উর্দি পরিহিত পোশাকধারীর মুখে গণতন্ত্রের বুলি আর তার পর্ষদরা তাতে চাটি মারে। তোষামোদকারীরা জুটে যায় তারা মনে করে ঐক্য ভাঙতে হবে, নইলে নতুন রাজনীতি স্টাব্লিশ করা সম্ভব নয়। পুরনো আমলা, পুরনো সামরিক অফিসার, পুরনো মুসলিম লীগার আর মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা স্বার্থান্বেষী ও প্রভূত অপশক্তির দোসরকুল সব একত্রিত হয়ে জাতির জনকের হত্যার আস্ফালন বাণীমন্ত্র শোনায় রাষ্ট্রীয় বেতারযন্ত্রে। সত্যিকার অর্থে, স্বাধীনতার অপব্যবহারপূর্বক তারা আবার ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে চাপিয়ে দেয় ভিন্নতর অলৌকিক জাতীয়তাবাদী আদর্শ। মূলত মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে নস্যাৎ করে প্রকারান্তরে তারা জানিয়ে দেয় দেশ স্বাধীন কারাই ভুল বা অকার্যকর কর্ম ছিল। এরূপ আদর্শের নামে, অনাদর্শকে চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ইতিহাসের চাকাকে দেয় পিছিয়ে। নানাভাবে অপপ্রচারে মূলে স্টাব্লিশ করতে থাকে ধর্মচিহ্নিত রাষ্ট্রের ক্রিয়াকাণ্ডসমূহ। এরূপে চলে অনেককাল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আইন-আদালত-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর বিভ্রান্তির জাল বুনিয়ে অপ-সাংস্কৃতিক পরিবেশের রাহুপরিব্যাপ্ত চারা রোপণ হতে থাকে। সে চারা ক্রমাগত মহীরুহ হয় একদিকে যেমন অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রজন্ম আর নিজেদের মধ্যেও বিভ্রান্তি ঘটাতে থাকে। বিভ্রান্তির ভেতরে হতাশা দানা বাঁধে। সাংস্কৃতিক পরিবেশ হতে থাকে ব্যাহত। আর্থ-সামাজিক চালচিত্র ও মনস্তত্ত্বও পাল্টাতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐক্য ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। সামরিক শাসনের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা যেমন থাকে পরাহত তেমনি জীবনের মূল্যবোধ কিংবা খাওয়া-থাকা-পরার নিরাপত্তাসমূহ ক্রমশ দূরে সরে যায়। ইতিহাস বিকৃতির ভেতরে পক্ষ-বিপক্ষের তাণ্ডবগুলো বাড়তে থাকে। চলমান বিশ্বের সঙ্গে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মানবসম্পদ হয়ে ওঠে বিপুল বোঝা। পার্শ্ববর্তী দেশ যখন নানাভাবে উন্নতির চেষ্টায় ব্যাপৃত তখন আমাদের নিজেদের ভেতরে অ-মীমাংসা কিংবা অ-মুক্তির ক্ষেদগুলো অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে থাকে। বিপুল বিশ্বের যে শনৈঃ উন্নতি সেখানে দাঁড়ানো মুশকিল হয়ে পড়ে। নবপ্রজন্ম জানতে থাকে ডানপন্থী রাজনীতির সব বিকৃক অপ-ইতিহাস। এরূপে সাংস্কৃতিক পরিবেশও ব্যাহত হয়। মূল্যায়ন-শ্রদ্ধার জায়গাগুলো ঠুনকো দুর্বল হয়ে পড়ে। জীবনবাদী রূপ হয়ে পড়ে দূরপরাহত। আমরা আদর্শ ও আধুনিকতা হতে সরে যাই অনেক দূরে। তবে সব এককভাবে হলেও প্রগতিশীল ধারা যে মুছে যায় তা নয়। কেউ তা কোনো কালে মুছতেও পারে না। ন্যায় ও সত্য তো চিরদিন অভয় বাজে হৃদয় মাঝে। সে কারণেই উন্নতি অবলুপ্ত নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও বিনাশী নয়। অবিনাশী আদর্শ সর্বদা উচ্চকিত। সে সূত্রে সতের কোটি জনতার অভিপ্রায়ের বিচিত্র ধারাকৌশলে কর্ম-কাজের স্বপ্ন দেখে সম্মুখগামী। অনেককিছুই তো খণ্ড-বিখণ্ড ছিল- সে সব দায়মুক্তি ও সত্য উন্মোচনের কৌত‚হল তো এখন তৈরি হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই অতিশয়োক্তি বা আতিশয্য নয়। যা কখনো কখনো যেন আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়। স্তাবকের দল আবার কিছু করে না ফেলে। আমাদের পূর্ব-অভিজ্ঞতা তো ভালো নয়। সে বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, মাত্রামাফিক পরিমাণ-নির্ধারণই সকলের কাম্য।

সত্য-মিথ্যা, নতুন-পুরনোতে অনেক কথাই চলে। কিন্তু আমরা যে শ্রেষ্ঠত্ব চাই, এবং এ বিশ্বে শ্রদ্ধাসম্ভূত জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই- সেটি তো আর বলার অবকাশ নেই! কাজে- কর্মগুণেই আমাদের তা প্রমাণ করতে হবে। প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠা পেতে হবে। উপরে যা বলেছি, তার পূর্বাপর ইতিহাস ও সচেতন অভিমুখগুলো চিনে নেওয়ার প্রয়োজনও এখনই- যদিও তা অনেকেই জানেন অধিক পুনরাবৃত্তির কারণে। তবে উপলব্ধিতে আনতে হবে। সবকিছু পেরিয়ে আমাদের চলার পথ তো আমাদেরই রচনা করতে হবে- তার তো কোনো বিকল্প নেই!

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj