প্যারিস-বাংলা হƒদয় রেস্তোরাঁ : রবিশঙ্কর মৈত্রী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

প্যারিসে অভিবাসীদের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত ববিনি। ববিনি পাবলো পিকাসো থেকে পাঁচ নম্বর মেট্রো ধরল ওরা। ওরা মানে শামিম মাহমুদ, তার স্ত্রী নাজনিন ফাতেমা, আট মাস বয়সের মেয়ে নভেরা মাহমুদ। মেট্রো পাঁচ থেকে রিপাবলিকে নেমে নয় নম্বর লাইনের মেরি দ্যু মনথাইল ডিরেকশনে চলে গেল। ওদেরকে নামতে হবে পোর্ত দ্যু মনথাইলে।

রাত সাড়ে নটা। প্যারিসের পক্ষে রাতটা বেশি নয়। কিন্তু পোর্ত দ্যু মনথাইল মেট্রো থেকে বেরিয়ে শামিমের মনে হলো কেমন একটা নিশ্চুপ অচেনা জায়গা। ববিনি এলাকাটা এরচেয়ে অনেক বেশি সরগরম থাকে। ববিনির চেয়ে এখানে শীতটাও বেশি মনে হচ্ছে। নাজ বলল, ‘তোমার বন্ধু কই?’

শামিম কোনো উত্তর করল না। ট্রাম লাইন পার হয়ে ক্যাফে বারের সামনে দাঁড়াল। ক্যাফে বার থেকে বের হয়ে এসে শামিমের বন্ধু তারেক বলল, ‘বোঁসুয়া ভাবি। বোঁসুয়া শামিম।’

নাজনিন বোঁসুয়া বলে প্রতি উত্তর করল। শামিম বলল, ‘তোর এই ফ্রেঞ্চ ভাবভঙ্গি রাখ দোস্ত। হোটেল এফ ওয়ান কোনদিকে?’

‘আতোনদে সিলতু প্লে। ভাবি, বোয়া ক্যাফে?’

‘ম্যাকসি, তারেক ভাই।’

শামিম বলল, ‘তুই কি বের হতে পারবি?’

‘আধঘণ্টার জন্য বের হব।’

‘চল তাহলে।’

পোর্ত দ্যু মনথাইল থেকে হোটেল এফ ওয়ান দশ মিনিটের হাঁটা পথ। কিন্তু নাজনিনের আর পা চলছে না। তার খুব কান্না পাচ্ছে। ববিনিতে যে বাসায় সাবলেট ছিলসেই বাসার ভাবির সঙ্গে এটা ওটা নিয়ে কথা কাটাকাটি হতো, কিন্তু ভাব হতেও দেরি হতো না। বাসা ছেড়ে এখন তাদের হোটেলে থাকতে হবে।

হোটেল এফ ওয়ান। বেশ সুন্দর। চকচকে। প্রথম দুই তলায় সামু সোশ্যাল ভাড়া নিয়েছে ঘরবাড়িহীন অনাশ্রিতদের জন্য।

রিসিপশনে সামনে ভিড় ছিল না। নম প্রেনো বলার পরেই শামিম রুমের চাবি পেয়ে গেল। রুম নাম্বার দুশ এগারো। চাবি নিয়ে ওরা নিজেরাই রুম খুঁজে নিল। তারেক রুমে ঢুকে বলল, ‘ভালো ব্যবস্থা তো। টিভি আছে। দোতলা খাট। ধবধবে বিছানা। রুমের মধ্যেই বেসিন। টয়লেট বাথরুম বাইরে। অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে।’

নভেরা ঘুমিয়ে পড়েছে। শামিম মেয়ের জন্য বিছানা গুছিয়ে নিল।

নাজনিন টয়লেট আর বাথরুম দেখে এসে বলল, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর। কিন্ত কতো মানুষের সঙ্গে যে শেয়ার করতে হবে কে জানে?’

শামিম বলল, ‘এখন ওই সব ভাবার সময় না। আগে বাঁচা।’

‘বাঁচার জন্য আর কতো ছাড় দেব?’

তারেক বলল, ‘ভাবি, একবার চিন্তা করেন-এটা ঢাকা সিটি। আপনি আর শামিম ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সব হারিয়েছেন। রিকশা ভাড়ার টাকাও নাই। ফোন নাই। রাত এগারটা। কোথায় যাবেন? একটা রাত থাকার জন্যও কি কেউ সাহায্য করবে? বিনা ভাড়ায় একটি রাতও কি হোটেলে থাকতে পারবেন?’

নাজনিন বলল, ‘এটা বাংলাদেশ না, ফ্রান্স। ঢাকা না প্যারিস। অতএব ওই গল্প এখানে চলে না। তারেক ভাই। এই হোটেল কি কিচেন নাই? রান্না খাওয়ার কী ব্যবস্থা?’

শামিম বলল, ‘আমি সামু সোশ্যালরে বলছিলাম, কুজিনের ব্যবস্থা আছে এমন একটা হোটেল দেন। তারা বলল পরে হয়তো শনজে করে দেবে। এফ ওয়ানে রান্নার ব্যবস্থা নাই। কমন ওভেন আছে। খাবার গরম করে নেয়া যাবে।’

নাজনিনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে বলল, ‘তুমি আমারে আগে বলোনি কেন?’

‘বললে কী হতো?’

‘ওই বাসা থেকে আসতাম না।’

‘ভাড়া দিতাম কীভাবে? এই মাস থেকে তো অফির টাকাও পাব না। সোর্তি লেটার পাবার পর সব বন্ধ, তুমি জানো না?’

তারেক বলল, ‘ভাবি একটু রেস্ট নেন। সব হবে। একটু ধৈর্য ধরেন প্লিজ। শামিম, আমি দুটো পিৎজা নিয়ে আসি। কাছেই আরাবিয়ান দোকান আছে।’

নাজনিন বলল, ‘আমি রান্না করে এনেছি। আমাদের দুদিনের খাবার আছে। গরম করলেই চলবে।’

শামিম বলল, ‘তারেকের বাসা তো কাছেই। ওরা ছয় বন্ধু মিলে একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। সেই বাসা সারা দিন খালি।’

নাজনিন বলল, ‘আমি একটা ব্যাচেলর বাসায় যেয়ে ডেইলি রান্না করে নিয়ে আসব?’

‘আমি যাব। আমি ওদের সঙ্গে রান্না করে নিয়ে এসে তোমারে খাওয়াব।’

‘তুমি যে কী পারো আমার জানা আছে।’

তারেক বলল, ‘ভাবি, ভাববেন না। আমরা আছি তো।’

নাজনিন বলল, ‘আপনাকে আর কতো জ্বালাব আমরা?’

শামিম বলল, ‘দোস্ত, কিছু মনে করিস না। তোকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।’

তারেক বলল, ‘দেজলি, সময় মেনেই চলতে হয়। আমি সাড়ে এগারটায় ফ্রি হয়ে যাব। ভাবি, যদি এর মধ্যে না ঘুমান আমি আবার আসব। দুটো পিৎজা নিয়ে আসব, এখানেই তিন জনে বসে খেয়ে নেব। শামিম, দুইটা পিৎজায় তিনজনের হবে না?’

‘তোর ইচ্ছা। তাড়াতাড়ি আসিস।’

দুই.

শামিমের মুখে কোনো কথা নেই, সে মেয়ের পাশেই শুয়ে পড়ল। আবাসিক হোটেলে আজ থেকে তাদের নতুন জীবন। ইতালিতে ওরা সাড়ে চার বছর থাকার পরও ইমিগ্র্যান্ট হতে পারেনি। তেমন কোনো কাজও ছিল না। মিলান শহরে অনিশ্চিত জীবনটাকে কোনোভাবেই আর টেনে নিতে পারছিল না। ইতালির আগের ঘটনা আরো করুন। পাঁচ বছর আগে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে শামিম আর নাজনিন এসেছিল চেক রিপাবলিকে। ভর্তি হয়েছিল প্রাগের চার্লস ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু ওদের লক্ষ্যই ছিল ইতালিতে পৌঁছনো। প্রাগে বিচ্ছিন্নভাবে তিন শো বাঙালির বসবাস। প্রায় সবারই লক্ষ্য ছিল অন্য কোনো দেশে গিয়ে সেটেল হওয়া। চেক ভাষা শেখার কোর্সেও ভর্তি হয়েছিল নাজনিন। কিন্তু শামিমের আগ্রহ ছিল না। ইউনিভার্সিটিতে দুই মাসও ক্লাস করা হয়নি। অবশেষে বাংলাদেশ থেকে টাকা এনে লোক ধরে অনেক ঘুরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালিতে পৌঁছেছিল ওরা।

নাজনিন বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে শরীর আর মনে সতেজ ভাব আনার চেষ্টা করল। ওর ভেতরে কেমন একটা অচেনা অস্থিরতা ভর করেছে। শামিম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। নাজনিন নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতেই রুমের দরজায় টোকা পড়ল। নাজনিন দরজা খুলে একটু অবাক হলতারেকের হাতে একটা গোলাপ আর একটা পিৎজা।

‘ফুল কেন?’

‘আজ আপনাদের নতুন জীবন শুরু হল। শুভেচ্ছা তাই।’

কেমন যেন উপহাসের মতো শোনাল কথাটা। এই অনিশ্চিত জীবনকে কীভাবে নতুন জীবন বলা যায়? নাজনিন কষ্ট চেপে বলল, ‘ম্যাকসি, ধন্যবাদ।’

‘দরিয়া, স্বাগতম।’

‘আপনার সঙ্গে ফ্রঁসে বাংলা মিলিয়ে কথা বলতে ভালোই লাগে।’

‘ভাবি, একটা পিৎজা আনলাম। এটা আপনার জন্য, আপনি খান। আমি শামিমকে নিয়ে বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি।’

‘সে তো দিন দুনিয়া ভুলে ঘুমিয়ে গেছে।’

শামিম উঠে বলল, ‘ঘুম আসে নাই। চোখ বুজে পড়ে আছি।’

‘দোস্ত চল, বাইরে যাই। ভাবি থাকুক হোটেলে।’ তারেক বলল।

শামিম বলল, ‘পিৎজাটা আমি খাই। তুই নাজকে নিয়ে যা।’

নাজনিন বলল, ‘তুমি যাও, রুমে সিগারেট টানতে পারবে না। তারেক ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরে আসো।’

তিন.

প্যারিস শহর রাতে ঘুমায় না। কিন্তু উজ্জ¦ল আলো আর পেরিফেরির রাস্তা ছাড়া পোর্ত দ্যু মনথাইল ঘুমিয়ে পড়েছে। কোথাও কেউ নেই। নভেম্বরের গাঢ় শীত রাস্তাগুলোকে আরো গভীর নীরবতায় মুড়ে রেখেছে। নাজনিনকে পাশে নিয়ে চুপচাপ হেঁটে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ল তারেক।

‘ভাবি কিছু মনে করবেন না। আমি বাসায় গিয়ে ভাত খাব। আপনি পিৎজা স্যান্ডউইচ একটা কিছু খান।’

‘এটা কেমন হলো? আমাকে আনলেন কেন?’

‘ভাবলাম, বাইরে এলে আপনার একটু ভালো লাগবে।’

‘আমার তো আসার কথা ছিল না।’

‘আমি জানতাম, শামিম আসবে না।’

নাজনিন কথা বাড়াল না। তারেক একটু রেড ওয়াইন নিতে চায়। নাজনিন মাথা নেড়ে জানাল তার আপত্তি নেই।

‘আপনি একটু নেবেন?’

‘না।’

একটা জুনিয়র পিৎজা এল; চিজ আর মাশরুম দেওয়া পিৎজা।

‘আমি সবটা খেতে পারব না। আপনি একটু নিন।’

‘খাওয়া শুরু করেন, আমি তো আছি।’

তারেক ওয়াইনে দুচুমুক দেয়ার পর নাজনিনের পিৎজা থেকে এক টুকরো মুখে তুলে নিল।

‘ভাবি, একটা কথা বলি।’

‘কথা বলতেই তো আসা। বলেন প্লিজ।’

‘আপনাকে সব সময় ভাবি বলতে ভালো লাগে না।’

‘ফ্রান্সে তো সবাই সবার নাম ধরেই ডাকে। আমরাই ভাই ভাবি আপা সম্বোধন করি।’

‘আমি বাঙালিই থাকতে চাই। সবাইকে নাম ধরে ডেকে ফরাসি হওয়ার চেষ্টা করতে চাই না।’

‘আমাদের সমস্যা তো এখানেই।’

‘কী রকম?’

‘এই যে, আমি আপনি এখানে বসে খাচ্ছি। আমার স্বামী হোটেলে ঘুমাচ্ছে। বাংলাদেশে এটা সম্ভব? ঢাকায় কি আপনি আমাকে কোনো রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে ওয়াইন বা ভদকা অফার করতে পারতেন?’

‘না। হয়তো পারব না।’

‘তার মানে আমরা এদেশের সামাজিক সুযোগ নিচ্ছি, আবার বাঙালি স্বভাবটাও ধরে রাখতে চাইছি।’

‘আপনি খুব সোজা কথা বলেন।’

‘এখন আমি সোজা কথাই বলতে চাই। বলতেই হবে। অনেক তো রেখেঢেকে মেনে কিছু না বলে মুখ বুজে চলেছি। আর পারছি না।’

‘খোলাখুলি ভাবে একটা প্রশ্ন করি?’

‘আপনি আমার নাম ধরেই বলতে পারেন।’

‘সেটা শুধু আমি বললে তো চলবে না। আপনাকেও বলতে হবে।’

‘কেমন একটা বাঙালির প্রেম প্রেম গন্ধ পাচ্ছি।’

তারেক এবার একটু জোরে হেসে ফেলল। রেস্তোরাঁটা একটু সরব হয়ে উঠল। কজন বয়স্ক লোক একটু দূরে ডিনার করছিলেন তাঁরা একবার আলতো করে তাকালেন মাত্র।

নাজনিন বলল, ‘আমি রিয়েলিটি মেনে চলতে চাই। বাস্তব পরিস্থিতি আমাকে যেখানে এনে দাঁড় করিয়েছে সেখানে আমাকে খুব বেশি ইমোশনাল হলে চলবে না।’

‘এ কথা কেন বলছেন নাজ?’

‘আপনি আমাকে তুমি করেই বলেন। তুই করে বললেও আপত্তি নেই। আপনি শামিমের বন্ধু। ওকে তুই তুই করে কথা বলেন। আমাকেও বলতে পারেন।’

‘মেয়েদের সঙ্গে তুই আপনি কোনোটাই আমার পছন্দ নয়।’

‘অনেক মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা হয়েছে?’

‘দেশে থাকতে দু’একজন ছিল। এখানে কে আমারে পাত্তা দেবে? কটা বাঙালি মেয়ে আছে প্যারিসে?’

‘অন্য দেশের?’

‘এই বাঙালি কালাকুলা খাটো মোটাদের কোনো দেশের মেয়ে পাত্তা দেবে?’

‘যাক ভালো লাগলসত্য কথা বলার সাহস আছে।’

‘আমরা আজ থেকে তুমি তুমি করেই বলি?’

‘বলো। কিন্তু শামিমের সামনেও একই কথা। কোনো লুকোছাপার দরকার নাই।’

‘তুমি অনেক সাহসী।’

‘সাহসী না-হলে সদ্য স্বামীর সঙ্গে অজানার পথে কেউ পা বাড়ায়?’

‘স্বপ্নই মানুষকে অজানার পথে নিয়ে যায়।’

‘স্বপ্ন ছিল শামিমের। আমি নেট থেকে পড়ে পড়ে ওকে শুধু নেগেটিভ কথাগুলোই জানাতাম। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হবার জন্য চেক রিপাবলিকে আসার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না।’

‘দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর তো পার হয়ে গেল।’

‘প্রাগ, মিলান, প্যারিস। দারুণ তিনটা শহরে নিদারুণ জীবন আমাদের।’

‘ফ্রান্সে তোমাদের কাগজ না-হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।’

‘হবে কেন? শামিম গড়গড় করে সকল সত্য ঘটনা লিখে আজাইল ডিমান্ড করেছে। আমিও ভেবেছি, সত্য বললেই হয়তো রিফুজি স্ট্যাটাস পাওয়া সহজ হবে। কিন্তু কী হলো? অফরা থেকে নেগেটিভ, সেএনদা থেকে নেগেটিভ। এবার দেশে ফিরে যাও।’

‘এরা তোমাদের জোর করে দেশে পাঠাবে না। এখন তো থাকার ব্যবস্থা হলো। শামিম মাকশিতে কাজটাজ করে চালিয়ে নিতে পারবে।’

‘আমি কি বসে থাকব?’

‘এক বছরের নভেরাকে নিয়ে কী করবে? ওকেও তো দেখতে হবে।’

‘ওকে আমি ডে কেয়ারে দিয়ে ল্যাংগুয়েজ কোর্স করব। ফরাসি ভাষা আমাকে শিখতেই হবে।’

‘বিয়াঁ সুর অবশ্যই। এই তো পথে এসেছ।’

‘আমি আর খেতে পারছি না। আরেক পিস তুমি নাও।’

তারেক আপত্তি করল না, নাজনিনের প্লেট থেকে পিৎজার শেষ টুকরো সে খেয়ে ফেলল। দুশো পঞ্চাশ মিলির ওয়াইনের বোতলটা শেষ করল শেষ চুমুকে।

নাজনিন বলল, ‘রেস্টুরেন্টে আমরা দুজন ছাড়া আর কোনো ক্লায়েন্ট নেই।’

‘চলো এবার ওঠা যাক।’

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়েই ওরা ঠাণ্ডা বাতাসের ধাক্কা খেল। টিপটিপ বৃষ্টিও শুরু হয়েছে।

‘নাজ হুডিটা মাথায় তুলে নাও।’

‘লাগবে না। দুএক ফোঁটা বৃষ্টিতে আমার কিছু হয় না।’

‘এদেশে একবার ঠাণ্ডা লাগলে সহজে সারে না। অনেক কঠিন অসুখ হতে পারে।’

তারেক নাজনিনের মাথাটা ঢেকে দিল। গভীর নির্জন রাস্তাটা পার হয়ে হোটেল এফ ওয়ানের গেটের কাছে এসে তারেক বলল, ‘অভাবিদায়’।

নাজনিন অভা বলে গেটের কাছে গিয়ে আবার ফিরে এসে তারেকের গালে গাল লাগাল। একবার দুবার তিনবার।

তারেক বলল, ‘এই প্রথম কোনো বাঙালি মেয়ের ফরাসি বিজু। ম্যাকসি।’

চার.

হোটেল এফ ওয়ানের বারান্দাটা ভীষণ লম্বা। একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে তাকালে কেমন গা ছমছম করে। দোতলার প্রতিটি রুমেই ভিনদেশি গৃহহীন মানুষের অস্থায়ি বাস। শামিম অনেক চেষ্টা করে ওয়ান ওয়ান ফাইভ নাম্বারে ফোন করে সামু সোশ্যালের কাছ থেকে হোটেলে থাকার ব্যবস্থাটা করতে পেরেছে।

ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলে আবাসিক সুবিধাটাও পাওয়া যায়। শামিম নাজনিনরা প্রথম থেকেই আবাসিক সুবিধাটা নেয়নি। ফরাসি সরকারের আবাসিক সুবিধা নিলে ওদেরকে প্যারিস থেকে চলে যেতে হতো অনেক দূরের কোনো শহরে। ওরা দেশের মানুষের সঙ্গে প্যারিসেই থাকতে চেয়েছে। পরিচিত একটা পরিবারের সঙ্গে সাবলেট নিয়ে টানা এক বছর ওরা প্যারিসের সারসেলে থেকেছে। আশ্রয় আবেদন না-মঞ্জুর হওয়া পর্যযন্ত প্রতি মাসে সাতশ ইউরো পেয়েছে সংসার খরচের জন্য। তিনশ ইউরো খরচ হয়েছে এক রুমের বাসা ভাড়ায়। বাকি টাকার সঙ্গে তারেকের কিছু কাজের টাকা যোগ হয়েছিল বলে ওদের সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন ওরা চরম বিপদে। ওরা রাজনৈতিক আশ্রয় পায়নি বলে এখন সবকিছুই বন্ধ হয়ে গেছে। বাসা ভাড়া দেয়া সম্ভব নয় অতএব সামু সোশ্যালের হোটেল সুবিধা নিয়ে ওরা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে।

আট মাস আগে প্যারিসে জন্ম হয়েছে নভেরার। নাজনিনের গর্ভে সে এসেছিল ইতালির মিলান থেকে। ফ্রান্সে বসবাসের জন্য বৈধ কাগজ না থাকলেও একটা ঠিকানা বা দোমিসিল লাগে। প্যারিসের কিছু সংস্থা আছে বাস্তুহীনদের দোমিসিল দেয়। নাজনিন এরই মধ্যে মেরি দ্যু মনথাইলের ইমাউস থেকে দোমিসিল পেয়েছে। হোটেল এফ ওয়ান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে গেলেই ইমাউস। কোথাও কোনো চিঠি লিখলে কিংবা আবেদন করলে তার প্রতি উত্তর আসবে ইমাউসে। ইমাউসে সপ্তাহে অন্তত একবার গিয়ে চিঠিপত্রের খোঁজ নিয়ে আসতে পারবে।

পাঁচ.

শেষ ডিসেম্বর। মঙ্গলবার সকাল। মুখভার করা প্যারিসের আকাশ। থেকে থেকে একটু একটু বৃষ্টিও হচ্ছে। শামিমের কোলে গরম কাপড়ে মুড়েরাখা নভেরা। নাজনিন তার প্রিয় মুখ শিল্পী নভেরাকে মনে রেখেই মেয়ের নাম রেখেছে নভেরা। নভেরাকে এখন নাজনিনের চেয়ে শামিমই বেশি সময় দেয়; সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে আগলে রাখে মেয়েকে।

ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিল নাজনিন। সে বলল, ‘শামিম, একটু কফি খেলে ভালো লাগত। তুমি খাবে?’

একটা ক্যাফে বারের সামনে দাঁড়িয়ে গেল নাজনিন। শামিম বলল, ‘ইমাউসে ক্যাফে ক্রোয়াসা সব পাবে। আর একটু হাঁটো।’

নাজনিন বুঝল দুকাপ কফি খেতে গেলে পকেট থেকে দুই ইউরো চল্লিশ সেনতিম বেরিয়ে যাবে। নাজনিন দুচোখ বেয়ে গরম জল গড়াল। চোখের গরম জল গাল বেয়ে নামতে নামতে একটু যেন আরাম দিল। শামিম দেখতে পেল না নাজনিন কাঁদছে। দুজন দুজনকে আড়াল করে এভাবেই ওরা কতো কেঁদেছে। এই কান্নার শেষ কোথায় ওরা জানে না।

মেরি দ্যু মনথাইলের ইমাউস অফিস গেটের কাছে বেশ ভিড়। একটু পরেই গেট খোলা হবে। সিরিয়া, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সুদান, নাইজেরিয়া, মাদাগাসকারসহ কতো দেশের কতো বিচিত্র উদ্বাস্তু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কারো বা দোমিসিল বা ঠিকানা দরকার, কারো বা গরম কাপড়, কেউ কেউ কেবল কফি আর বাগেত খেতে এসেছেন।

গেট খোলা মাত্র সবাই ঢুকে গেল ভিতরে ডাইনিং স্পেসে। শামিম অফিসে ঢুকে সেক্রেটারির টেবিলের সামনে দাঁড়াল। অফিস সেক্রেটারি মেয়েটি বিনীতভাবে বলল, ‘বোয়া ক্যাফে সিল-ভু-প্লে।’

নাজনিন বলল, ‘ম্যারসি।’

একটা লম্বা ডাইনিং টেবিল। টেবিলের উপরে বাগেত ক্রোয়াসা শকোলা আপেল কমলা কফি দুধ চিনি সাজানো। কাপ পিরিচ সবই সাজানো। যার যার ইচ্ছেমতো ভদ্রভাবে খেতে কোনো বাধা নেই। নাজনিন সংকোচ করছিল। শামিম নভেরাকে কোলের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি কফি ঢেলে নিতে পারব না। তুমি ঢালো।’

‘আগে একটা ক্রোয়াসা খাও। আমিও খাচ্ছি।’

একটা কালো ছেলে এসে দুকাপ কফি বাগেত ক্রোয়াসা আপেল কমলা সব সাজিয়ে ওদের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘সুক আন উ দো?’

নাজনিন প্রথমত বুঝে উঠতে পারল না। ছেলেটি এক চিনির টুকরো দেখিয়ে বলল, ‘ওয়ান অর টু?’

নাজনিন বলল, ‘ম্যারসি, ওয়ান সিল-ভু-প্লে।’

নানান বর্ণ ধর্ম জাতির মানুষের সঙ্গে সকালের নাস্তাটা বেশ হলো।

ছয়.

ইমাউস থেকে দুটো দারুণ বেবি ক্যারিয়ার পেয়েছে নাজনিন। নভেরাকে এখন থেকে বুকে বহন করবে শামিম, পিঠে বহন করতে পারবে নাজনিন। দুটো বেবি ক্যারিয়ারই নিরাপদ আরামদায়ক। ইমাউস থেকে ছয় মাস পরেই ওরা নভেরার জন্য ট্রলি পাবে। আজ ওরা রেস্ত দ্যু কোর থেকে খাবার আনার অ্যাটাসটেশনও পেয়েছে। এখন থেকে ওরা প্রতি মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার সকালে রেস্ত দু কোর থেকে খাবার আনতে পারবে। বিশেষ করে নভেরার জন্য নভেরার জন্য শিশুখাদ্য আর জামাকাপড়ও পাবে।

সকাল দশটার মধ্যেই ওরা হোটেলে ফিরে এল। নাজনিন বলল, ‘আজই তো মঙ্গলবার। তুমি কি খাবারটা নিয়ে আসবে?’

‘আমি নভেরাকে দেখছি। তুমি যাও।’

‘চিনতে পারব?’

‘বানিওলে লুই মিশেল, এখান থেকে বেশি দূর হবে না। মোবাইলে জিপিএসে ওয়াকিং ডিরেকশনটা ফলো করে চলে যাও।’

‘এরপর কিন্তু তুমি একদিনও যাবে না।’

‘তুমি মঙ্গলবারে যাও, আমি বৃহস্পতিবার।’

‘না, তোমার যাওয়া লাগবে না।’

‘রাগ করছ কেন? চলো নভেরাকে নিয়েই যাই।’

‘নাঃ, আমি একাই পারব।’

নাজনিন ট্রলি ব্যাগ নিয়ে হোটেল থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল। বানিওলে যাবার রাস্তায় দু’একটা গাড়ি। পাশেই প্যারিস পেরিফেরির চরম ব্যস্ত সড়ক। নাজনিন মোবাইল ফোনের জিপিএসে দেখলওকে দেড় কিলো মিটার হাঁটতে হবে। সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তারেককে ফোন করল। তারেক কল কেটে দিয়ে নিজেই ফোন করল, ‘বোঁজু নাজ। কমঁ তালে ভু?’

‘বোঁজু তারেক। সাভা মিউ। এ ভু?’

‘জো স্যুই কনতো। তুমি কোথায়? ইমাউসের কাজ শেষ?’

‘আমি রাস্তায়, রেস্ত দ্যু কোর-এ যাচ্ছি।’

‘শামিম কি হোটেলে?’

‘হুঁ।’

‘তোমাদের জন্য তিন দিনের ছুটি নিয়েছি। আমি আসছি। তুমি কি তিন নাম্বার মেট্রোর মুখে দাঁড়াতে পারবে?’

‘আমি চিনব?’

‘তুমি কি রু এথেন মারসেলে?’

‘এফ ওয়ান থেকে বের হয়েছি।’

‘এফ ওয়ানের সামনের রাস্তাটার নামই রু এথেন মারসেল। বের হয়ে কি কারিফু মার্কেটের সামনে এখন?’

‘না, ডান দিকে নভোতেল হোটেলের সামনে।’

‘তাহলেই তুমি সুইত নভোতেলের সামনে আছ, ঠিক?’

‘আমি চিনে যেতে পারব।’

‘আমার কথাটা শোনো নাজ। সুইত নভোতেলের রাস্তাটা ধরে দক্ষিণে যেও না, উত্তরের দিকেই যাও। একটু এগোলেই তিন নাম্বার মেট্রো স্টেশন গালেনি পাবে।’

‘আমি উত্তর দক্ষিণ চিনি না।’

‘এখন সকাল সাড়ে দশটা, সূর্যয মাত্র পুব থেকে একটুখানি দক্ষিণে ঘুরে গেছে। তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, ওখান থেকে কারিফুর দিকটা দক্ষিণ। ওদিকে কি সূর্য দেখা যায়?’

‘মেঘলা আকাশ। বোঝা যায় না। নভোতেল থেকে কারিফুর মার্কেটের অপজিটে যাচ্ছি, উত্তরেই যাচ্ছি। তুমি আসতে থাকো।’

‘মোবাইলে চার্জ আছে তো?’

‘ধ্যাত আমি কি বাচ্চা মেয়ে?’

‘এসো সুইট বাচ্চার মা।’

নাজনিন কল কেটে দিয়ে মেট্রো গালেনির দিকে এগোতে লাগল। রাস্তায় তাকে কেউ একটুও খেয়াল করছে না। নাজনিন খুঁটে খুঁটে সব দেখছে। গার সারসেল থেকে এই জায়গাটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটু ফাঁকা ফাঁকা। আইল্যান্ডগুলো দারুণ ফুলে ফুলে সাজানো।

পাঁচ ছয় মিনিট হাঁটার পরই মেট্রো সাইন দেখা গেল। মেট্রোর সামনে বেশ বড়ো একটা বাস স্যান্ড। বেশ বড়ো একটা খোলা চত্ত¦র। বেশ কজন পুলিশও দাঁড়িয়ে আছে মেট্রোর সামনে। নাজনিনের বুকটা কেঁপে উঠল। এখন তাদের ফ্রান্সে থাকার অনুমতি নেই। পুলিশ ধরে দেশে পাঠিয়ে দিতে পারে। অবশ্য তারেক আর শামিমের বন্ধুরা বলেছে, মেয়ের জন্ম এই দেশে। বার্থ সার্টিফিকেট আছে। এখন তাদের দোমিসিল আছে। হোটেল এফওয়ানে থাকার বরাদ্দপত্রটাও দিয়েছে সামু সোশ্যাল। পুলিশ ধরে বেঁধে তাদের পাঠিয়ে দেবে- এমনটা না-ভাবাই ভালো। তবু ভয় হয়, জরুরি অবস্থা চলছে। গত মাসেই ঘটে গেছে ভয়াবহ প্যারিস ট্র্যাজেডি। একশো বত্রিশ জন ফরাসি নাগরিককে হত্যার ঘটনায় সারা বিশ্ব আজ কেঁপে উঠেছে। প্যারিস এখনো শোক স্তব্ধ। কোথাও যেন স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসছে না। আইএস জঙ্গিদের পাপে আজ সব বিদেশি বিশেষ করে মুসলিম উদ্বাস্তুরা শঙ্কিত। নাজনিন জানেফরাসিরা কখনো কারো ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করে না। শামিম তবু খুব ভয় পায়যদি কন্ট্রোলে পড়ে কাগজপত্র দেখাতে হয়। পারতপক্ষে শামিম এখন বাইরে বের হতে চায় না। বাইরে গেলেও সে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়।

গালেনি মেট্রো স্টেশন থেকে নাজনিনের কাছে এগিয়ে এল তারেক। তার চোখে মুখে ভুবনজোড়া হাসি। তাকে আজ খুব খুশি খুশি লাগছে। তারেক নাজনিনের গালে গাল লাগাল তিন বার। নাজনিন কোনো উষ্ণতা বোধ করল না। কিন্তু মনে মনে একটা নির্ভরতা খুঁজে পেল যেন।

সাত.

গ্যালেনি থেকে সোজা পশ্চিম দিকে খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে কেবলই উপরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেল নাজনিন। কিন্তু তারেককে সেসব বুঝতে দিল না। লম্বা নিঃশ্বাসও গোপন করার চেষ্টা করল। তারেকের মনটা বেশ ফুরফুরে। বহুকাল পরে পথে একজন নারীকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া গেছে। দুজনের কথা হলো না। পরস্পরে মাঝে মাঝে চেয়ে চেয়ে গন্তব্যে পৌঁছে গেল। লুই মিশে এলাকাটা বেশ উঁচুতে। একটা আবাসিক এলাকায় ছোট্ট একটা নেম প্লেট রেস্তোরাঁ দ্যু কোর। অফিস রুমে ঢোকার মুখে চা কফি বিস্কুট বাগেত সাজানো, কজন স্বেচ্ছাসেবক আগতদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। তারপর একটি রুমে জামা কাপড় খেলনা জুতো ইত্যাদি সাজানো। অফিস ঘরের পাশেই বড়ো একটা জায়গা জুড়ে নানান খাবার সাজানো।

অফিস রুমে ঢুকে নাজনিন ইমাউসের চিঠিটা দিল। সঙ্গে তিনটা বার্থ সার্টিফিকেট। বয়স্কা একজন ফরাসি স্বেচ্ছাসেবী সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে নীল রঙের একটা কার্ড দিলেন নাজনিনকে। বলে দিলেন, ‘জো সুই সিলভি- আমি সিলভি। প্রতি মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার সকাল নটা থেকে এগারটার মধ্যে খাবার নিতে হবে। মাঝে মাঝে জামাকাপড় জুতো নিতে পারবে। যদি তুমি আরো কিছু চাও। কোনোরকম সহযোগিতা দরকার হয়, আমাকে এসে বলতে পারবে। অভা মাদাম নাজনিন।’

কৃতজ্ঞতায় নাজনিনের চোখে জল এল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে নীল রঙের কার্ড নিয়ে খাবারের ঘরের সামনে দাঁড়াল। তারেক বলল, ‘আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি। পারবে তো?’

‘ঠিক আছে। আমাকেই কাজগুলো করতে দাও।’

নাজনিনের কার্ডের নাম্বার সত্তর- ফরাসি ভাষায় সোয়াসন্ত দিজ। নাজনিন এখন ফরাসি কিছুটা বুঝতে পারে, বলতে পারে না। ডাক পড়ল সোয়াসন্ত উইত- অর্থাৎ আটষট্টি। একজন বাঙালি নারী কফির চুমুক শেষ করে ভেতওে ব্যাগ নিয়ে ঢুকে গেল। নাজনিন একটু লজ্জা পেল। বুকের ভেতরটা উথাল-পাতাল করতে লাগল। রেস্তরাঁ দ্যু কোর থেকে সে খাবার নিচ্ছে আজ। সাহায্য। ভিক্ষা বললেও বাড়িয়ে বলা হয় কী? কিন্তু এদেশে এতো পরিশীলিতভাবে সাহায্য করা হয় যে কেউ ছোট হয়ে যায় না। তবুও নাজনিনের কেমন যেন লাগছে। সে আজ লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিচ্ছে।

নাজনিন দুকান থেকে গরম বাতাস বের হচ্ছে। দুবার করে সোয়সন্ত দিজ ডাকার পরও সে কিছুই শুনতে পায়নি। একজন স্বেচ্ছাসেবক তার কাছে এসে বললেন, ‘অনিভা সিল-ভু-প্লে।’

নাজনিন লজ্জা পেল। কাঁপা হাতে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে ঢুকল খাবারের ঘরে। প্রথম টেবিল থেকে তাকে দেয়া হলো দুই লিটার দুধ। তারপরের টেবিল থেকে ছটা ডিম, তারপর গুনে গুনে পাঁচটা আলু, তারপর আপেল কমলা, ছোট ছোট প্যাকেটে দই, জুস, মাছ, মুরগি, বাগেত, কেক, পাস্তা, আটা, সাবান, তেল। নাজনিনের ট্রলি ব্যাগ উপচে পড়ল। তাকে খুব সতর্ক হয়ে ব্যাগ সামলে বাইরে আসতে হলো।

‘দিদি নমস্কার। কেমন আছেন?’

নাজনিন অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। সে কথা বলতে সংকোচ বোধ করছিল।

‘আমার নাম বিশাখা সরকার, বাড়ি মাদারিপুর। আপনার?’

‘আমি নাজনিন, বাড়ি টাঙ্গাইলে। তবে ঢাকায় মিরপুরে বড়ো হয়েছি।’

‘আমরা থাকি রোমাভিলের একটা হোটেলে। স্বামী মাকশি করে। দুই ছেলে, স্কুলে পড়ছে।’

নাজনিন ভাবছে- প্রথম দেখাতেই কতো কথা বলছে বিশাখা। সে কী বলবে?

বিশাখা বলল, ‘মঙ্গলবার বৃহস্পতিবার দেখা হবে। আপনি কি এই সময়েই আসেন? আমি আসি সকাল নয়টায়। আজ একটু দেরি হয়ে গেছে।’

নাজনিন বলল, ‘আবার দেখা হবে। আমি সকালেই আসব।’

‘ভালো থাকবেন নাজনিন দিদি। আমি এইখান থেকে বাসে যাব। আপনি?’

‘আমি নতুন এলাম। হেঁটেই এসেছি। ভালো থাকবেন।’

বিশাখা চলে গেলে তারেক নাজনিনের সামনে এসে দাঁড়াল। নাজনিন কোনো কথা বলল না। তারেকের ওপর খুব রাগ হচ্ছে তার। শামিমের কেমন বন্ধু সে। বন্ধুর স্ত্রীকে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেয়ার জন্য সে সাহায্য করতে এসেছে- বন্ধুর মর্যাদা কোথায় রাখল সে?

তারেক নাজনিনের কাছ থেকে ট্রলি ব্যাগটা নিতে চাইল। নাজনিন তাকে ফিরিয়ে দিল। তারেক বলল, ‘আমরা এখানে একবার কফি আর ক্রোয়াসা খাই।’

নাজনিন এবারো কথা বলল না। তারেক মৌনতাকে সম্মতির লক্ষণ ভেবে নাজনিনকে সঙ্গে নিয়ে কফি বারে ঢুকল।

আট.

কফি আর ক্রোয়াসা নিয়ে ক্যাফে বারের এক কোণায় বসে নাজনিন আর তারেক। দুজনে এখনো চুপচাপ। কফির কাপ এগিয়ে দিল তারেক। নাজনিন ক্রোয়াসা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল। কালো কফির গন্ধটা নাজনিনের ভালোই লাগছে। তারেক বলল, ‘খুব মন খারাপ হল?’

নাজনিন চুপ। তারেক আবার বলল, ‘তোমরা প্যারিসে এসে সাবলেট নিয়ে থেকেছ। শামিম কিছু কাজ করেছে। অফি থেকে টাকা পেয়েছ। প্রবাসের কষ্টটা বুঝতে পারোনি। অল্প কিছুদিন একটু বোঝার চেষ্টা করো।’

নাজনিন প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, ‘হঠাৎ ছুটি নিলে?’

‘আগেই বলা ছিল। আজ থেকে তিন দিন ছুটি। তারপর সাতদিন কাজ। তারপর চাকরি থেকে একেবারে ছুটি।’

‘তার মানে?’

‘আমরা তিন বন্ধু মিলে একটা রেস্টুরেন্ট নিচ্ছি।’

‘এতো ভালো খবরটা এতোদিন কেনো দেয়া হয়নি?’

‘ভাবছিলাম, সব গুছিয়ে নিয়ে বলব।’

‘গোছানো হলো?’

‘না। দেরি হবে। প্যারিসে এতো বড়ো ট্র্যাজেডি একটু স্বাভাবিক হোক সবকিছু।’

‘আমাকে না শামিমকে চাকরি দেবে?’

‘চাকরি বলছ কেনো? তোমরা পার্টনার হবে।’

‘ধুর, আমাদের কি টাকা আছে?’

‘টাকা লাগবে না। একটু বেশি সময় দেবে।’

‘তোমার আর দুজন বন্ধু মানবে কেন?’

‘আর দুজন বন্ধু তো অচেনা নয়।’

‘তার মানে?’

‘তুমি আর শামিম।’

নাজনিন ভীষণ অবাক হলো। বলল, ‘ফাজলামো হচ্ছে।’

‘হোক। জীবনটাকে ভীষণ সিরিয়াসলি নিয়ে আমি খুব ফাতিগে হয়ে গেছি। জো সুই ফাতিগে।’

‘ফাতিগে মানে?’

‘ক্লান্ত।’

‘এখন কি ক্লান্তি বাড়বে না?’

‘বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গ পেয়ে সকল ক্লান্তি দূরে সরে যাচ্ছে।’

‘তুমি কতো বছর প্যারিসে?’

‘সাত বছর। তার আগে লন্ডনে এক বছর। আট বছর আগে ঢাকা ছেড়েছি।’

‘তখন আমরা শাহবাগে আড্ডা দিতাম। জগন্নাথ থেকে ক্লাস শেষ করে মিরপুরে বাসায় যাবার আগে দুতিন ঘণ্টা শাহবাগে তুমুল আড্ডা হতো।’

‘শামিম সে আড্ডায় আমাকে ডাকত। যাওয়া হতো না। আমি তখন তিতুমীরে পড়ি। গুলশান এলাকায় ছিলাম বলে বিদেশটা আরো বেশি করে টানত। সুযোগ এল স্টুডেন্ট ভিসার। ব্যাস বাংলাদেশের সব চুকে গেল।’

‘তিন বছর পর তুমিই লোভ দেখালে শামিমকে। শামিম কোনোদিন চেক রিপাবলিক নামে কোনো দেশকে চিনতই না। আমিও না।’

‘ঢাকার কথা মনে হয়?’

নাজনিন হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। বলতে পারল না। কিছুতেই সে চোখের জল গোপন করতে পারল না। তারেক টিস্যু পেপার দিয়ে নাজনিনের চোখ মুছতে গিয়েও থেমে গেল।

নাজনিন বলল, ‘আজ ভোর রাতে- বাংলাদেশে তখন সকাল দশটা। আম্মার সঙ্গে কথা হল। আব্বার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ভাইয়া ভাবি উত্তরায় থাকে। এখন তো ক্যান্টনমেন্টের ওপর দিয়ে ফ্লাইওভার হয়েছে। ভাইয়া ভাবি মাসে একবার উত্তরা থেকে মিরপুর ছয়ে যাবার সময় হয় না। আমার খুব কান্না পায়। ভাবছিলাম, এখানে কাগজ হলে আব্বা আম্মাকে এখানে নিয়ে আসব। মিরপুরের বাড়িটা আম্মা আর আমার দুই খালার। খালারা বাড়িটা বিক্রি করার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমার খুব অসহায় লাগে।’

তারেক অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারছিল না। এবার বলল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। শান্ত হও। এখন ধৈর্য ধরে কাজ করতে হবে।’

নয়.

নভেরা কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে। এক ফাঁকে শামিম কমন বাথরুম থেকে স্নান সেরে নিয়েছে। হোটেল এফ ওয়ানের ক্লিনার এসে রুম পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বিছানার চাদর, কম্বল, বালিশ, তোয়ালে- সবই থ্রি স্টার হোটেল-মানের। আশ্রয়হীন মানুষের জন্য এতো যতœ। শামিম ল্যাপটপ অন করে হোটেলের এফ ওয়ানের ওয়াইফাই কানেকশন পেয়ে গেল। নেটে ঢুকেই বাংলাদেশের নিউজ পেপারগুলোর অনলাইনে ঢুকল। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আন্দোলন দানা বাঁধছে না। থার্টি ফার্স্ট নাইটে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। যমুনা সেতুর পশ্চিমপাড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত। খুন অপহরণ ধর্ষণ- শুধুই খারাপ খবর। হঠাৎ একটা ভালো খবর নজর কাড়ল। বগুড়ায় স্টবেরি চাষে সাফল্য। শামিমের মনটা ভালো হয়ে গেল। প্যারিসে দারুণ স্টবেরি পাওয়া যায়। দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে প্রচুর স্টবেরি আসে। সে মাকশিতে পাঁচশ গ্রামের এক বক্স স্টবেরি বিক্রি করেছে চার ইউরো পঞ্চাশ সেনতিমে।

দরজায় নক করল নাজনিন। শামিম দরজা খুলে কিছু বলল না। নাজনিন বলল, ‘নভেরা ঘুমিয়ে গেছে। দুধ গরম করে দিয়েছিলে?’

শামিম বলল, ‘হ্যাঁ, একটু খেয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ল একটু আগে।’

‘আমাকে একবার ফোন করলে না?’

‘আমারও একই প্রশ্ন তোমাকে।’

দুজনের আর কথা হল না। নাজনিন খাবারগুলো ট্রলি থেকে নামিয়ে টেবিলের নিচে উপরে সাজিয়ে রাখা শুরু করল। শামিম বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে বোসো। নিউজ দেখো। আমি গুছিয়ে নিচ্ছি।’

শামিম একে একে সব গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘খুব দামি আর স্বাস্থ্যসম্মত খাবার।’

‘বাগেত খেয়ে থাকতে পারবে?’

‘রাতে বাগেত খাব, সঙ্গে মুরগির মাংস।’

‘এখানে রান্না করব কীভাবে?’

‘মুরগির মাংস ওভেন থেকে গরম করলেই হবে।’

দরজায় নক করল কে? নাজনিন একটু ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘খুলে দেখো তো।’

শামিম দরজা খুলে একটুও অবাক না হয়ে বলল, ‘আয় ভেতরে আয়।’

তারেক বলল, ‘তুই চল আমার সঙ্গে।’

নাজনিন বলল, ‘এখন?’

‘দুপুরে খাওয়া লাগবে না? আমার বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসবি। আমার সঙ্গে একটু হাত লাগাবি; তাড়াতাড়ি মাছ ভাত হয়ে যাবে।’

নাজনিন বলল, ‘আমি সার্ডিন মাছ পেয়েছি রেস্তোরাঁ দ্যু কোর থেকে।’

তারেক বলল, ‘ওগুলো ওভেনে গরম করলেই খাওয়া যায়। রান্না করা লাগে না।’

শামিম বলল, ‘তোর বাসায় কী মাছ আছে?’

তারেক বলল, ‘বাংলাদেশের ইলিশ। পরশু গা দু নদ থেকে কিনেছি।’

‘নাজনিন ইলিশ দারুণ রান্না করে। নাজকে নিয়ে যা। ও রান্না করুক। তোর ভালো লাগবে।’

নাজনিন বলল, ‘নভেরাকে খাওয়াতে হবে।’

নভেরার ঘুম ভেঙে গেল। একটু কেঁদেই উঠে গেল বাবার কোলে। শামিম বলল, ‘আমি মেয়েকে দেখছি। তুমি যাও। ভাত মাছ মেখে নিয়ে আসো। তারেক লেবু থাকলে দিস।’

নাজনিন মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে ফিরিয়ে দিল শামিমের কাছে।

তারেক বলল, ‘তুই কেক টেক খেয়ে নে। আমাকেও একটা দুটো দে। তোদের টেবিলে দেখছি অনেক খাবার।’

নাজনিন বলল, ‘এসব দেখতে ভালোই লাগছে। খিদে পেটে খেতেও খারাপ লাগবে না। কিন্তু ইলিশের নাম শুনেই আজ আর অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে করবে না।’

দশ.

তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্ট। দুটো রুমে দুটো করে দোতলা বিছানা। একটি রুমে একটিই বিছানা। নাজনিন ঘুরে ঘুরে দেখে বিছানা হিসাব করে দেখল- মোট নয়জন থাকার ব্যবস্থা।

কিচেনটা অপরিষ্কার। বিছানা জামাকাপড় আসবাব সবই অগোছালো। তারেক বলল, ‘ব্যাচেলরদের বাসা। দোষ ধোরো না।’

নাজনিন বলল, ‘সিঙ্গেল বেডের রুমটাই তোমার?’

‘ম্যাকসি।’

‘ম্যাকসি কেন?’

‘ধরতে পারলে বলে।’

‘খুব সহজ। কাল রাতে যে ওভারকোট পরেছিলে- এই রুমেই দেখতে পাচ্ছি।’

‘মেয়েরা এতো খেয়াল করে?’

‘ছেলেরা কি কিছুই খেয়াল করে না?’

‘করে। মোটা দাগে কিছু খেয়াল করে।’

‘কী খেয়াল করছ?’

‘তুমি খুঁজছ- এখানে কোনোদিন কোনো মেয়ে এসেছিল কিনা?’

‘নাঃ। আমি দেখছি..।’

‘এই মুহূর্তে বাসায় কেউ আছে কিনা।’

‘নেই তো দেখতেই পাচ্ছি।’

‘এ বাসার সকলেই সকালে বের হয়ে যায়, ফেরে রাত নটা থেকে তিনটার মধ্যে।’

‘তুমি এখন একলা থাকবে জানলে আসতাম না। কই তোমার ইলিশ মাছ বের করো।’

‘খুব সকালেই রান্না করে রেখেছি। এখন শুধু ভাত রান্না লাগবে।’

‘মিথ্যুক, তুমি বলোনি কেন?’

তারেক নাজনিনকে কাছে টেনে বলল, ‘এই জন্য।’

নাজনিন আপত্তি করল কিন্তু তারেককে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল না। নাজনিন জানে, তার কোনো চেষ্টাই আর কাজে লাগবে না- কাল রাতেই সে মৃদু প্রশ্রয় দিয়ে তারেককে চরম অবাধ্য করে তুলেছে।

দুপুর গড়িয়ে গেছে। ব্যাচেলর ছেলেদের বাসা থেকে এখন কেবল পুরুষের গন্ধ পাচ্ছে নাজনিন। তার কেমন গা গুলিয়ে উঠছে। সে কিছুতেই বিছানা থেকে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার মনোবল ফিরে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সে কি শুধু শামিমকেই ঠকাল? সে কি নিজেকেও অপমান করল না?

তারেক এরই মধ্যে ভাত রান্না করে ইলিশ মাছের তরকারি গরম করতে দিয়ে ফিরে এল নাজনিনের কাছে। বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নাও।’

নাজনিন বলল, ‘আমার কেমন বমি বমি লাগছে।’

‘মুখ ধুয়ে আসো। এক গেলাস আপেল জুস খাও, ফ্রেশ লাগবে।’

এগার.

‘তুমি ইলিশ রান্না ভুলে গেছ?’

‘শুধু কি রান্না? কান্না ছাড়া সব ভুলে গেছি।’

নাজনিনের মুখে আর ভাত ঢুকল না। ইলিশ মাছের টুকরো পড়ে রইল প্লেটে। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে নিল। শামিম অপ্রস্তুত হয়ে গেল। শামিমের প্লেটে মাছের কাঁটা পড়ে আছে। ঝোলমাখা ভাতগুলো সে আর মুখে নিল না। হাত ধুয়ে নাজনিনকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? আমাকে বলবে না?’

‘আমি নভেরাকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যাব।’

বারো.

নাজনিন এখন ঘুমে ডুবে আছে। তার মুখটাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। নভেরা জেগে বাবার সঙ্গে হাত-পা ছুড়ে খেলছে। শেষ ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা বিকেল। একটু পরেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামবে। শামিম তিনপ্রস্থ গরম কাপড় পরে নিয়ে নভেরাকে বেবি ক্যারিয়ারে নিয়ে নাজনিনকে ডেকে বলল, ‘নভেরাকে নিয়ে বেরুচ্ছি। একটু হেঁটে আসি। চিন্তা কোরো না।’

নাজনিন দুচোখ মেলে একবার মেয়ের মুখটা দেখল। কোনোরকমে বলল, ‘খুউব ঠাণ্ডা। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।’

হোটেল এফ ওয়ান থেকে বের হয়েই পশ্চিম দিকে একটু এগিয়েই অবাক হলো- একটা রেস্টুরেন্টের নাম লা নুই বেঙ্গলি। বাঙালির রেস্টুরেন্ট মনথাইলে। সে জানত না। মনে করল- এক্ষুনি একবার রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকি। পা বাড়িয়েও সে পিছিয়ে এল। লা নুই বেঙ্গলিকে ডান দিকে রেখে সে উত্তরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুটো ক্যাফে বার পেরিয়ে একটু এগিয়ে গিয়েই একটা ছোট্ট পার্ক দেখতে পেল। পার্কে কেউ নেই। ভেতরে দারুণ বসার জায়গা। শামিম জ্যাকেট খুলে বেঞ্চিতে রাখল- কিছুটা বিছানার মতো হয়ে গেল। একটু শীত লাগছে তারেকের। জ্যাকেটের উপরে নভেরাকে শুইয়ে দিল। নভেরার মাথার নিচে উলের মাফলারটা বালিশ করে দিল। আট মাসের শিশুকন্যাটি এবার আকাশের দিকে তাকাল- বড়ো বড়ো চোখ করে বিপুল কৌত‚হল নিয়ে নভেরা আকাশ দেখছে। বাবা তার আকাশ আড়াল করে ঝুঁকলেই মেয়ে হাত-পা ছুড়ে আপত্তি জানাল। শামীমের বুকের ভেতর হুহু করে উঠল। বহুদিন আগে থিয়েটারে শেখা একটা রবীন্দ্রগান তার খুব মনে পড়ল। আস্তে আস্তে গলা ছেড়ে সুরে বেসুরে সে গাইতে লাগল-

এ পরবাসে রবে কে হায়!

কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে।।

হেথা কে রাখিবে দুখভয়সঙ্কটে-

তেমন আপন কেহ নাহি এ প্রান্তরে হায় রে।।

তেরো.

প্যারিস থেকে সহজে শীত যেতে চায় না। সময় মেনে বসন্ত এসেছে। রাস্তার পাশে আইল্যান্ডে উদ্যানে দারুণ টিউলিপ ফুটেছে কিন্তু শীত এখনো বিদায় নিতে রাজি নয়। মধ্য মার্চেও তাপমাত্রা প্লাস সাতের উপরে ওঠেনি।

তারেক তার সব সঞ্চয় এবং ব্যাংক লোন নিয়ে বাংলা খাবারের রেস্তোরাঁ চালু করছে প্যারিসের পাশেই ম্যাসসি ফালেজুতে। তারেকের সঙ্গে নাজনিন আর শামিম সময় দিচ্ছে। শামিমের আগ্রহ কম থাকলেও নাজনিন অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। ম্যাসসি ফালেজুতে রেস্তোরাঁর উপরেই থাকার ব্যবস্থা। উপরে সুন্দর ছিমছাম বাসা, নিচে রেস্তোরাঁ।

পহেলা বৈশাখ, চৌদ্দই এপ্রিল চালু হতে যাচ্ছে প্যারিস-বাংলা হৃদয় রেস্তোরাঁ। ওরা তিন বন্ধুই আশা করছে- বাংলাদেশ আর ভারতের প্রবাসী বাঙালি বন্ধুরা উদ্বোধনের দিন তাদের রেস্তোরাঁয় আসবেন। নাজনিন আমন্ত্রণ জানানো, অনুষ্ঠান আয়োজন, রেস্তোরাঁ সাজানো ইত্যাদি কাজ নিজের কাঁধের তুলে নিয়েছে। রেস্তোরাঁর আগের মালিকপক্ষ আজই চাবি বুঝিয়ে দিয়েছে। আজ তাই তারেকের দারুণ খুশির দিন।

শামিম মেয়েকে রেস্তোরাঁর একটি টেবিলে বসিয়ে হাত পা ছুড়ে খেলা করছে। নাজনিন আর তারেক কেনাকাটার তালিকা করতে ব্যস্ত।

তারেক বলল, ‘তোমরা তো কাল থেকেই এই বাড়িতে থাকতে পারো।’

নাজনিন বলল, ‘শামিম এক্ষুনি রাজি হবে না। হোটেল এফওয়ানে আমরা তো ভালোই আছি।’

‘কী যে বলো, কমন বাথরুম টয়লেট। কিচেন নেই। একটা রুমের মধ্যে সারা দিন রাত থাকতে ভালো লাগে?’

‘মানুষ অভ্যাসের দাস।’

‘সারা জীবন কি কেউ দাস হয়ে থাকতে চায়?’

‘শামিমও চায় না। আমিও না। কিন্তু আমরা একটু সময় চাই।’

‘বুঝতে চাও, রেস্টুরেন্টটা কেমন চলে? তোমাদের সংসার চলবে কিনা?’

‘ধ্যাত। বাজে কথা কেন বলছ?’

‘এইসব ইনসিকিউরিটি নিয়ে ভাবনা আসতেই পারে।’

‘দেশ ছেড়ে এসে এসব ভাবনা প্রবাসীদের মানায় না। তুমি জানো, আমরা এখানে কাজ করলে একসময় ইমিগ্র্যান্ট হয়ে যেতে পারব।’

‘তোমাদের কাগজ হয়নি বলেই তো আমি তাড়াহুড়ো করে রেস্টুরেন্টটা করলাম।’

শামিম মেয়েকে কোলে নিয়ে এসে ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘নামটাও আমি দিলাম- প্যারিস-বাংলা হৃদয় রেস্তোরাঁ।’

‘সেজন্য তোকে বহুবার ম্যাকসি বোকু দিয়েছি।’

‘আমিও কৃতজ্ঞতায় বুঁদ হয়ে গেছি।’

‘তুই হঠাৎ হঠাৎ কবি হয়ে যাস। বেশ লাগে।’

নাজনিন বলল, ‘চেক থেকে সরাসরি প্যারিসে আসার কথা ছিল। তুমি যদি বন্ধুর কথামতো চলে আসতে, আমরা আজ এতো পিছিয়ে পড়তাম না।’

‘আমি তো এগিয়ে যেতে চাই না নাজ। সবার শেষে যা বাকি রয় তাহাই লব।’

তারেক বলল, ‘মিলানে যে তোরা কী পেয়েছিলি- আমি আজো জানি না।’

নাজনিন বলল, ‘প্রথম তিন বছর কিন্তু খুব ভালোই চলছিল।’

‘পুরোনো গন্ধ ডেকে এনে নতুন ঘ্রাণটা নষ্ট করবার মানে হয় না নাজ।’ শামিম বলল।

ওরা তিন জন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। আধো আধো কথা বলে উঠল নভেরা। পিতৃমুখ মেয়েটি বাবান্যাওটা হয়েছে। সে এখন বাবার কোলে ওঠার জন্য চিৎকার শুরু করল। তারেক আর নাজনিন আবার রেস্তোরাঁর কাজে মন দিল।

চৌদ্দ.

বিশাখার চোখে আজ জল। কিছুতেই সে কান্না থামাতে পারছে না। প্রায় তিন মাস হল প্রতি মঙ্গলবার বৃহস্পতিবার নাজনিনের সঙ্গে দেখা হত তার। রেস্তোরাঁ দ্যু কোর থেকে খাবার নিয়ে ওরা কিছুক্ষণ গল্প করত। দারুণ বন্ধু হয়ে উঠেছে বিশাখা নাজনিন। বিশাখারা এখনো রোমাভিলেই আছে। নাজনিনরা রেস্তোরাঁ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে বলে সংস্থার খাবার নিতে আর আসবে না। এপ্রিল মাসেই হোটেল এফ ওয়ান ছেড়ে দেবে তারা, চলে যাবে ম্যাসসি ফালেজুতে।

বিশাখা বলল, ‘আমাদেরও আর প্যারিসে থাকা হবে না। প্যারিস থেকে অনেক দূরের কোনো শহরে বাসা দেবে। এখানে তো ভালো-মন্দ নিয়ে ভালোই ছিলাম। কিছু হিন্দু মানুষজনও পেয়েছিলাম। কয়দিন আগে সরস্বতী পূজাও করলাম সিলেটের হিন্দুদের সঙ্গে। কোনখানে যে আমরা ভেসে যাব- জানি না। ভগবান আমাদেও ভাসাতে ভাসাতে কোথায় নিয়ে এল।’

নাজনিন বলল, ‘আমরাও ভাসছি এখনো। কবে ক‚ল পাব জানি না। মন খারাপ কোরো না দিদি, সব ঠিক হয়ে যাবে। ফোন করো। কবে কোথায় যাও জানাবে কিন্তু।’

বিশাখা চোখের জল মুছে বিদায় নিল। নাজনিন খাবারের ট্রলি নিয়ে ছিয়াত্তর নাম্বার বাস ধরার জন্য এগিয়ে যেতেই দেখল তারেক সামনে।

‘তুমি এখানে? এখন?’

‘ভাবলাম তোমাকে লিফট দিই।’

‘মানে কী?’

‘সারপ্রাইজ।’

‘আমার এক বন্ধু থাকে তুলুজে। ও গাড়ি নিয়ে এসেছে। রেস্টুরেন্ট চালু করার পর সে যাবে। এখন তো ওর গাড়িটাও দরকার, ওকেও দরকার।’

‘তুমি কি শুধু দরকারের কারবারি?’

‘সবকিছুই কি দরকারের মধ্যে পড়ে? কিছু অদরকার নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে জীবনটাই তো রেস্টুরেন্ট হয়ে যাবে। চলো বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।’

ঝকঝকে মধ্যবয়স্ক এক তরুণ এগিয়ে এল নাজনিনের কাছে। সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি প্রদীপ বড়–য়া। এক সময় আমিও রেস্তোরাঁ দ্যু কোর থেকে খাবার নিয়েছি। ডোন্ট ওরি।’

নাজনিন সংকুচিত হয়ে গেল। প্রথম পরিচয়েই এমন কথা কেউ বলতে পারে সে ভাবতে পারেনি। প্রদীপ একটু থেমেই বলল, ‘আপনারা একসঙ্গে অনেক সময় দিয়ে সাহস নিয়ে কাজ করুন, হৃদয় দিয়ে কাজ করুন; প্যারিস-বাংলা হৃদয় রেস্তোরাঁ সফল হবেই। আমি সব রকম সহযোগিতা করব।’

তারেক বলল, ‘প্রদীপদা, আসেন আমরা একটা ক্যাফে বারে বসি।’

প্রদীপ বলল, ‘নাজনিনের সমস্যা নেই তো?’

তারেক বলল, ‘না না। নাজকে আমরা হোটেল এফ ওয়ানে একটু পরেই নামিয়ে দিয়ে যাব।’

প্রদীপ আবার ধার দেয়া কথা পাড়ল, ‘হোটেল এফ ওয়ান। ওখানে সামু সোশ্যালের রুম আছে। নাজনিন, ওসব জায়গাতে বেশিদিন থাকতে নেই। মন ছোট হয়ে যায়। স্বাবলম্বী হওয়া যায় না।’

লোকটার সামনে থেকে নাজনিন পালাতে পারল বাঁচত। কিন্তু তারেক তার কোনো ইশারা বুঝল না। মনে হল তারেক কোনো এক অদৃশ্য দড়িতে লোকটার সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছে।

তারেক ক্যাফে বারে ঢুকে তিন কাপ কফি আর ক্রোয়াসা অর্ডার দিল। নাজনিন কফি পান করতে চাইল না। কিন্তু তার আপত্তি কানে তোলার কোনো ইচ্ছেই নেই তারেকের। নাজনিন ক্রোয়াসা ছিঁড়ে ছিঁড়ে একটু একটু করে মুখে দিল। কফির কাপ ছুঁয়েও দেখল না।

প্রদীপ বলল, ‘প্যারিস-বাংলা হৃদয় রেস্তোরাঁ। নামটা এমন হল কেন? মাঝখানে হৃদয় শব্দটা খুব ডিস্টার্ব করছে।’

নাজনিন বলল, ‘নামটা আমার স্বামী শামিম দিয়েছে।’

‘উনি কি একটু গানবাজনা থিয়েটার শিল্প সাহিত্য করতেন?’

তারেক বলল, ‘আমিও একটু আধটু করেছি বন্ধুদের সঙ্গে। নাজনিন আর শামিম শিল্প সাহিত্যে ডেভোটেড ছিল।’

প্রদীপ বলল, ‘বিজনেসে শিল্প সাহিত্য একটু মান বাড়ায়, দাম বাড়ায় না।’

‘আমরা কিন্তু নামটার মান দাম কিছু ভাবিনি। একটা কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে এই নামটা রাখা।’ নাজনিন বলল।

তারেক বলল, ‘রেস্তোরাঁ দ্যু কোর- ফরাসি এই সংস্থার বাংলা নামটা কী হয়- হৃদয়ের রেস্তোরাঁ। হার্ট থেকে, হৃদয় থেকে খাদ্যদান। আমার বন্ধু শামিম এই সংস্থাটির প্রতি এতোই থ্যাংকফুল যে আমরাও নামটা নিয়ে আর দ্বিতীয় চিন্তা করিনি।’

নাজনিন বলল, ‘শুনতে শুনতে ভালো লাগবে একদিন।’

প্রদীপ বলল, ‘প্যারিস-বাংলা হৃদয় রেস্তোরাঁ। হৃদয় থেকে কি রান্না হয় নাজনিন?’

‘হৃদয় থেকে উৎসারিত সুবাস দিলেই রান্না ভালো হয় প্রদীপদা।’

প্রদীপ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এতো সুন্দর কথার পরে আমি উঠে না দাঁড়ালে আপনাকে যথাযথ সম্মান করা হয় না। জানেন, আমিও চট্টগ্রামে গানবাজনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সে সব কথা মনে পড়লে কতো দুঃখ হয় যে..।’

প্রদীপ একটু থামল। তারপর বলল, ‘বিদেশে আসা মানেই টাকা- এই সত্যটাই যখন সবাই চোখে আঙুল দিয়ে বুুঝিয়ে দিল তখন আর কোনো পিছুটানকেই আর পাত্তা দিই নাই। দেশ থেকে সবাই খালি টাকা চায়। মিসড কল দেয়। অথচ বাংলাদেশে নাকি এখন টাকা ওড়ে। ওরা একটা ফোন করতে পারে না। মিনিটে আট দশ টাকা খরচ করতে ভয় পায়। ওরা ভাইবারে ফোন দেয়। হোয়াটস আপে ফোন দেয়। ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে ফোন দেয়। ডাইরেক্ট নাম্বারে ফোন করতে পারে না। ছিঃ আমার বন্ধু আত্মীয় স্বজন

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj