অতঃপর জ্যোৎস্না রাত : ফারহানা সুমী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

অন্ধকারে ঠিক দেখা যায় না রাস্তাঘাট বিচ্ছিরি কালো শাড়িতে যেন মুড়ে আছে। পাশে চা দোকানে পুলকি আলো দিব্যি টের পাচ্ছে বাতাসের অস্থিরতা, বুড়ো চাচা চাদর টেনে নিচ্ছেন সাথে চায়ের কাপে চামুচের শব্দ করছেন, পিক করে মুখ ভর্তি পানের পিক ফেলছেন, আর বলছেন

-তোর বাপ কবে ফিরলোরে রমিজ্জা? শুনলাম তোর বাপ নাকি মেলা টাকা আনচে…

ফিসফিস করে বললেন- এত টাকা পাইচে কই

জানস নাকি কিচু তোর বাপ কিচু কইচে?

-হু কইচে চাচা।

-তা কি কইচে বল শুনি, বল রমিজ্জা তোরে এক কাপ চা খাওয়ামু নে… আরে ভাবিস না টাকা নিমু না, এবার কি ভেবে যেন রমিজ বলল-

-চুরি কইরে আনচে চাচা, ঐ পাড় হইতে। মায়েরে কইতে শুনচি ওপাড়ে চুরি কইরতে যায়। দেহ না বাপ আমার কই জানি উদাও অয়। মাঝে সাঝে তো ১০/১৫ দিনও ফেরার নাম থাহে না। মা তো এ নিয়া খালি কান্নাকাটি করে। ফুলিরে নিয়াও চিন্তায় আচে।

ভ্রæ কুঁচকিয়ে আরো নড়েচড়ে বসেন রওশন চাচা,

-ফুলি’র কি হইলো রে রমিজ্জা?

-অরে নাকি ভূতে আচর করচে

-সর্বনাশ কচ কি!

-কয়দিন আগে মা জিন ঝারানি ঐ যে নাম হারুন মালিক, ঐ বেটার লগে কতা কইলো, একখান ডিম আর একখান কালা মুরগি দিতে কইলো ঐ বেটা, মাও কইচে বাপ আইলে দিবোনে।

-আমি তো কই দেওনের কাম কি, মাইয়া মানুষ বড় হইচে বিয়া দিলে ঠিক হইয়া যাইবো,

-চাচা এক গেলাশ পানি দাও তো। পানি গিলতে গিলতে আবার প্রসঙ্গ তুলে ফুলির।

-কি কও চাচা খারাপ কইলাম নাকি?

-ঠিক কইচস!

-খালি খাওনের বুদ্ধি বুঝলি?

-হু চাচা আমি তো কই ভূত-টুত কিচু না, টেলিভিশনে কয় যে দেহো না ভূত বইলতে কিচু নাই দুনিয়াতে খালি ভণ্ডামি,

-নারে রমিজ্জা পানের পিচকি ফেলে বললেন রওশন চাচা, এডা মানতে পারলেম নারে রমিজ্জা। আমাগো বাপ-দাদারা কি মিচা কইচে নাকি? জন্মের পর থেইকা তো কত শুইনলাম, আর ঐ দিন মসজিদের মোল্লা ভাইরে যে ভূত ধরচে দেহোচ নাই কি করচে বেটা। এডারে তো অস্বীকার করন যায় না।

-তা… ঠিক কইচো,.

-যাউকগা তোর বাপের কতাকান ‘ক’… আসলে কি তোর বাপ টেয়াগুলান চুরি করে আনচে রে রমিজ্জা?

-হু চাচা।

গলায় জোর দিয়ে বলে রমিজ,

-তা আর কই কি।

-নিজের বাপ নিয়ে এমনে কস্ খটকা আগতাচে আমার।

-বিশ্বাস অইলো না এডাই তো… !

-হইচে… তয়…।

পানির গøাসটা শব্দ করে রাখতে রাখতে বলে

-দেহো চাচা ছেলে হইয়া বাপের নামে তো এমনি এমনি কইতাচি না, কারণ আচে বইলাই তো কইতাচি।

-তা কারণ ডা ক দেহি, কি হইচে তুগো বাপ বেটার মইদ্যে?

-হ চাচা অন্যদিন কমু নে আজ যাইগা, রাত হইচে নে।

যাওয়ার সময় রমিজ আবারও পিছন ফিরে বলে ওঠে

-চাচা কাইল তমারে একখান জিনিস দেখামু নে, মজা পাইবা। অন্ধকারে দাঁত দেখিয়ে হাসি মুখে চলতে শুরু করে রমিজ।

রাস্তার দু’পাশে কয়েকটা আম গাছ দাঁড়িয়ে। পাতারা নড়ছে আপন মনে। কেঁপে উঠছে রাত্রির শরীর। একটু দূরে বাড়ির পাশে হেঁকে যাচ্ছে কয়েকটি কুকুর প্রতিরাতের মতো। কে যেন বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেবল বাড়িতে পা দিতে যাবে রমিজ, কাশির শব্দ শুনে চোখ নাড়িয়ে দেখে বাবা সিগারেট টানতে টানতে পা বাড়াচ্ছে দক্ষিণে। সামনে আছে বুক চওড়া এক মাঠ, পাশে কিছু আকাশি গাছ। আকাশ ছুঁই ছুঁই। তার পাশে যে রাস্তা চলে গেছে শহরের দিকে, সামনে গেলেই অনেকের আড্ডাখানার জন্য ঝোপঝাড়ের মতো একটি ছোট বাড়ি দেখা যায়, সেখানে প্রতিরাতে জুয়ার আড্ডা বসে। কেউবা আবার বোতলের খয়েরি জলে গিলে খায় তাদের সময়। রমিজের বাবা জাফরও তাদের একজন। শেষ রাত পর্যন্ত ওখানে পড়ে থাকে সে। জুয়ায় বোর্ডের পুরো টাকাই উড়ায়, বোতলে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে ছোট-বড় সঙ্গ পার্টিদের নিয়ে নিত্যদিন। সচ্ছল সংসারের কর্তা যে তিনি ঠিক তাও নয়। জন্মগত সূত্রে তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন কয়েক বিঘা জমি ও বসত ভিটেটা। কিছু জমি বিক্রিও করে দিয়েছেন বাবার মৃত্যুর পর পরই। সবই উড়ালেন জুয়া আর বোতল কেনায়। কয়েকবার পুলিশের ধাওয়াও খেয়েছেন কিন্তু হাতেনাতে ধরা পড়েনি একবারও। এক রাতে তো পুলিশের ধাওয়ায় তাকে দৌড়াতে হয় দুই কিলোপথ, পরনের লুঙ্গিটাও খুলে পরেছিল ধান ক্ষেতের আইলে। ঐদিন ছিল আষাঢ়ের রাত, রাতের শেষে অন্ধকার ছেয়ে যখন বাড়িতে ফিরলেন তিনি, সে কি কাণ্ড, স্ত্রী হালিমা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছিলেন।

-রমিজ্জার বাপ তুমি কি লইজ্জার মাথা খাইচো! এতবার পুলিশের ধাওয়া খাইচো লইজ্জা হয় না! দু’বাচ্চার বাপ হইচো ওরা যে বড় হইচে ঐ দিকে খেয়াল আচে কোনো?! স্বামীর কোনো সারা না পেয়ে আরো জোরে চেঁচিয়ে উঠেন হালিমা।

-আমার জীবন তো শেষ, আল্লারে আমারে তুইলা নাও না কেন, আমার আর বাঁচার ইচ্চা নাই। ছেলে রমিজ তখন মাকে সামাল দিতে বলে-

-চিন্তা কইরো না মা, সব একদিন ঠিক হইবো। এই বলে এমনভাবে তার বাবার দিকে তাকালো যেন তুমুল ঘৃণায় সে তখন তার বাবাকেও খুন করতে হাত কাঁপত না। তবুও মায়ের কথা ভেবে নিজের ক্রোধকে দমন করে অনেক কষ্টে। ১৫ বছরের মেয়ে ফুলিও কান্নার ঝড় বইয়ে দেয় মুখ চেপে যেন কেউ শুনতে না পায়। ভেতরের দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে যাচ্ছিল মেয়েটি। তাকেও সান্ত¡না দেয় রমিজ।

-কাঁনদিস নারে ফুলি, দেখিস একদিন বাবা ঠিকই বুঝবো।

এখন ঘরের দরোজায় বসে আছেন মা হালিমা। ফুলি উঠানে পায়চারি করছে দেখে মা বলে উঠেন

– ওই ফুলি চুল ছাইড়া দিয়ে উঠানে হাঁটছ কেন ঘরে আয়, এমনিই তো তোরে ভূতে আচর করছে ঘরে আয়। রমিজ দেখে বাড়ির আশপাশে প্রত্যেক ঘরের বাতি নিভানো, শুধু গোয়ালঘরের পাশের বাতিটা জ্বালানো প্রতিরাতের মতো। মা বললেন –

-কি রে রমিজ্জা আসছিস বাবা?!

-হু মা। ঘরের দরজায় আসতে আসতে ফুলির দিকে চোখ রাখে রমিজ।

-ঐ ফুলি, এতরাতে বাহিরে হাঁটোস কেন আয় ঘরে। এবার চুপচাপ ঘরের ভেতর ঢোকে রমিজকে খাবার দেয় ফুলি। মা হলিমা বলেন

-ঐ ফুলি তোর ভাইরে মাছের মাথাখান দিস, মাচায় দেখ টমেটোর খাটা আচে ঐডাও দে। রমিজ ভাতের এক লোকমা গিলতে গিলতে বলে-

-২টা মরিচ দে তো ফুলি, লগে একটা পেঁয়াজের ফালা দে।

মা পাশের ঘরে শুয়ে থেকে বলে ওঠেন

-রমিজ্জারে পেঁয়াজ খাইস নারে বাজান, ২ খান পেঁয়াজ আচে কাল লাগবো ২ খান। একটু থেমে আবার বলেন-

-তোর বাপ তো কোনো বাজারও আনে নাই, আজ ২ দিন… বাড়ি ফেরার পর থেইকা তো কতাবার্তাও নাই। মানুষটা যে কই যায় কি করে কইয়াও যায় না। বলতে বলতে চোখের কোণে সুতো টেনে ধরে হতাশার জল দুই ফোঁটা। খাবার থালায় বসে রমিজ বলে

-কই যায় তুমি জানো না?…জানোই তো… খাবার গিলতে একটু সময় নিয়ে আবার বলে, পতিদিন যেহানে যায়, মতিনগো লগে আর। কি, বেটা বুইড়া অইয়াও আমাগো লগের পোলাপানগো নিয়া তামাসা কইরা বেড়ায়, বেটা বজ্জাত একটা!-

-রমিজ্জারে এমনে কইস না, শত হোক তোর বাপ। ভেতরের ঘরে সুপারি কাটার শব্দ হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে হালিমা বেগম পান বানাচ্ছেন। চিন্তিত হলে তিনি পান চাবান। ঘুমাবার আগে তো খেতেই হয় তার নিয়মমতো। সাথে জর্দা। আজ না থাকায় জর্দা ছাড়াই খাচ্ছেন।

-কাইল সহালে মার জন্যে একখান জদ্দার ডিব্বা আনিস তো বাপ, কয় দিন ধইরা তোর বাপরে কইলাম শুনে নাই। না শোনার ভান!

-ঠিক আছে মা, আনমু নে, এহন চুপ থাকো! কথা শুরু করলে থামার নাম নেন না তিনি, এবার ফুলিকে বলে উঠলেন

-ফুলি ও ফুলি ফুলিরে! বাসন কাসন গুলান দুইয়া ঠিক কইরা রাখিস, নাইলে তেইল্যাচোরা চাটবো নে। ভালো কইরা ধুইস্ দাগ যাতে না থাহে। নুড়ি আর ছাই দিয়া ধুইস্।

ফুলি রীতিমতো বিরক্ত

-বারেবারে এক কথা কইও না তো মা! একবার কইলেই তো অয় আমি সব ধুইয়া রাখমুনে।

ফুলির কথায় এবার কিছুটা চুপ হলেও মিনিট পাঁচ পর আবার বললেন

-দরজা জানালা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখ তো ফুলি। ঘরের চিপাচাপাও দেখ। প্রতিরাতেই হালিমা এভাবে ঘরের সব দেখেশুনে ঘুমাতে যান। মাঝেমধ্যে ফুলিকে দেখতে বলেন। একরাতে ফুলিকে দেখতে বলায় সে তো রীতিমতো বেঁকেই বসেছে

-চিপায় কি কেউ বইসা থাকে মা? যতসব আজগুবি কতা!

-আজাইরা নারে পুলি তুই জানস না কারণ আছে। হালিমা তখন ফুলিকে পুরোনো কিছু কথা খুলে বলেন,

-তোর বয়স তহন চার মাসের মাথায়, পুরান বাড়িতে তহন তোর দাদা-দাদি তোর বাপ আর আমি আছিলাম, তোর ভাই আর তুই তহন ছোট আছিলি, তুই তো কোলে। ঐসময় আমাগো সব চুরি হইছিলোরে ফুলি! ঘরের মইধ্যে চোরডা আগে ঢুইকা আছিল, হগলে ঘুমানের পর আর কি আমাগো সব নিয়া গেল চোরে। সেই ঘটনা চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শুনল ফুলি। এখন নতুন বাড়ি, খোলামেলা জায়গায়। ঐরকম বিপত্তিতে পড়তে হয় না আগের মতো। তবে কদাচিৎ চুরি হয় ঠিকই ঘরের লোকেই তা হাতিয়ে নেয়। হালিমা তা বুঝেন, জানেন তার স্বামীর হাত নাড়ানোর স্বভাব আছে অনেক আগ থেকেই। একরাতে ঘুমের মধ্যে হালিমার নাকফুল খুলে নিয়েছিল তার স্বামী জাফর। রাতে টের না পেলেও যখন পেলেন তখন নাক শূন্য।

-বাটি চালান দেওন দরকার কবিরাজ রে ডাইকা আইনো তো … বিকালে বাটি বা পানি চালান দেয়ামু, সব পরিষ্কার হইবো চোর কেডা। আমতা আমতা করে প্রসঙ্গ এড়াতে চেষ্টা করেন জাফর।

-আরে মনে হয় তুমি ভুল করতাছো, নাকফুলডা হারাইয়া ফেলছো টের পাও নাই?

-না রমিজের বাপ, আমার ঠিক মনে আছে ঘুমাইবার আগেও আছিল, ঘুমে কিছু একটা ঠাওর পাইছি, আমার নাকে কেউ হাত দিচে। ঘুমের ধান্দায় চোখ খুইলতে পারি নাই…।

জাফর তবুও জোর দিয়ে বলেন

-তোমার মনের ভুল… দেহো কই পইরা আছে পাইবা কোনো একসময়। বুঝার বাকি থাকে না হালিমার, চোর তবে…অন্য কেউ না… এলাকাতেও একাধিকবার চুরিতে সঙ্গ বাড়িয়েছিল জাফর কিন্তু কোনোবারেও ধরা পড়েনি বলে চোর নামটা তার ঘারে এসে পড়েনি কখনো। জানাজানিও হয়নি লোকের কাছে। যারা জেনেছিল স্ত্রী হালিমা ছেলে রমিজা আর মেয়ে ফুলি। হালিমা অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছেন -ছেলে মেয়ে বড় হইছে ওদের তো সবার লগে চলতে হইবো, আর ফুলির তো বিয়া দিতে হইবো নাকি? তোমার এগুলা আকাম কুকামের কথা শুনলে কে ওরে বিয়া করবো ভাবচো কিচু? কে শুনে কার কথা… জাফর তার নিজ মর্জিতে চলেন। কখনো ঘরে এসে পড়ে থাকেন বিছানার এক কোণে, কখনো সারাদিনই বাহিরে… বাড়িতে আসার নাম থাকে না। অনেক সময় কোথায় যে চলে যায় কয়েক দিনও ফেরার নাম থাকে না। মাঝে মাঝে দিনের অংশে এক দুসপ্তাহের শরীরেও ভেসে ওঠে জাফরের অনুপস্থিতি। কেউ কেউ বলে অন্য পাড়েও সে জুয়ার আসর বসিয়েছে, ব্রিজের এপাড়ে হাজতখোলা এলাকার হাইস্কুলের পাশে এলাকার অনেকে দেখেছে তাকে। আগে স্বামীর খুঁটিনাটি খুঁজে বের করলেও এখন আর খোঁজখবর নেয়ার আগ্রহ করেন না হালিমা, কি দরকার এতো পাহারা দেয়ার? যা খুশি করুক! পুরুষ মানুষ, ভাত কাপড় ঠিকঠাক দিলেই তো হলো। এভেবে স্বামীর হাল ছেড়ে এখন দিব্যি ছেলেমেয়েকে নিয়েই ভাবেন তিনি। ছেলে রমিজ্জার বিয়ের বয়স হয়েছে, এর মধ্যে মেয়েও দেখা হয়ে গ্যাছে কয়েকটা; পাশের গ্রামের মান্নান মিয়ার মেয়ে চামিলিকে রমিজের মনে ধরেছে। রমিজ নিজে জানিয়েছে এ কথা। বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হওয়ার পথে ছিল, সেই মুহ‚র্তেই প্রসঙ্গ তোলেন জাফর আদান প্রদানের কথা। মেয়ের বাবাকে বললেন

-এক লাখ টাকা, আর মেয়ের সোনার টিকলি কানে হাতের সোনার জিনিস কিন্তু আপনাগোই দিতে হইবো বেয়াই সাহেব।

মেয়ের বাবা শুনে তো সাফ নিষেধ,

-না এত কিচুু দিয়া বিয়া! মানতে পারলাম না। কথার এক পর্যায় মেয়ের বাপ বৈঠক ছেড়ে উঠে চলে যায়। রমিজ অনেক চেষ্টা করেও পারেনি পরিস্থিতি অনুক‚লে আনতে। সেই থেকে বাবার প্রতি ক্ষোভ শুরু হলো রমিজের। সাথে তার চালচলনের বিষয়ে যে রাগ ছিল তাও যোগ হয়ে একের পর এক ঘৃণার আকার হলো পাহাড় পরিমাণ। মনে হলেই মাঝে মাঝে নিজের ভেতর ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। হারামি! লোভী একটা! সব কিছুতে টাকা হাতানোর ফন্দি! বাপ না হইলে অনেক আগেই ব্যাটারে… !!! মাঝে মাঝে আপন মনে ফুসে ওঠে রমিজ্জা। বজ্জাত শালা।

আবছায়ার আবরণ কাটছে ভোরের রুপালি চাদরে। আধো আলোর মাঝে নিস্তব্ধতার আঁচল টেনে ধরে আছে আশপাশ। পাশে আমের ডাল থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ জানান দিচ্ছে সকালের, চারপাশ থেকে সুর ভেসে আসছে আজানের। কাছে দুটা মসজিদের আওয়াজই অধিক শোনা যাচ্ছে অন্যদিকের আজান থেকে। হালিমা ঘুমের দম ভেঙে ঘর ঝাড়ু দিয়ে এখন উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছেন। গ্রাম এলাকার একটা কথন আছে, সকাল সন্ধ্যা ঘর, উঠোন ঝাড়ু দিলে ঘরে লক্ষী আসে, ঘরে রহমত আসে। ফুলি এখনো ঘুমিয়ে। হালিমা ডাকাডাকি শুরু করলেন

-ও ফুলিলো আর কত ঘুমাবি উঠ্ আজান পড়ছে। ফুলি ঘুম থেকে উঠে সোজা চলে যেতে লাগে বাঁশঝাড়ের কাছে।

-ওই ফুলি সহাল সহাল ঐ হানে কেন্ যাস কি হইচে তোর আজকাল তোর কিছু আমার ভালা ঠেকতাছে না। কয়দিন ধইরা দেখতাছি…

ফুলি কিছু না বলে মুখ ভার করে চলে গেল ঐ দিকেই। রমিজ কেবলি বিছানা ছেড়ে ঘর থেকে বের হলো, হাত এদিক সেদিক করে শরীরের অলসতা ভাঙছে।

-রমিজ্জারে, শুন বাবা আজই তুই ভূত ঝারানির বেটারে নিয়া আইবি। ছেলের কাছে গিয়ে খুব চিন্তিত স্বরে বললেন হালিমা।

-কেন্ মা কি অইছে আবার…

-কি হইব রে বাপ, মাইয়া ডারে ভূতে যে আছর করচে ঐ ডা তো দিন দিন বাড়তাছে, কান্নার স্বরে বললেন তিনি। মাথায় হাত দিয়ে ঘরের দড়জায় বসে পড়লেন। এহন কি হইবো রে রমিজ্জা? মাইয়াডার তো বিয়া দেওন লাগবো, লোকে জানলে মাইয়াডারে বিয়া…।

হালিমার চোখ মুখ শুকিয়ে যায়। রমিজ চিন্তা করতে নিষেধ করে তাকে।

– আজি আমি ভূত ঝারানিরে নিয়া আমু মা এহন শান্ত হও, কাম থেইকা আসনের পতে নিয়া আমু নে,। তখনই চুপচাপ পাশ দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল ফুলি। রমিজ কাজে যাবে, তাই হালিমা ফুলিকে খাবার দিতে বলেন,

-ওই ফুলি তোর ভাইজান রে খাইতে দে তাড়াতাড়ি। কাঁচামরিচ আর পান্তা খেয়ে কাজে রওনা হলো রমিজ। ততক্ষণে সূর্য ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশ। সোনালি লেবাস উঠোন জুড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। রোদ দেখে ঘর থেকে কাঁথা বালিশ রোদে নিয়ে এলেন হালিমা। কয়েকটা ভেজা কাপড় ঘরে পড়ে আছে।

-ও ফুলি ঘর থেইকা ভিজা কাপড়গুলান নিয়া আয় রোদে দিইয়া দেই।

এমন সময় রমিজের বাপ উঠান পেরিয়ে ঘরে ঢোকে।

-এহন আওনের কাম কি লাগচে না আইলেই তো অইত! –

-বেশি চিল্লাবি না খিদা লাগচে খাওন দে।

-কিসের খাওন? খাওন কি আসমান থেইকা আহে। আইসা আইসা খালি খাওন গিলবা, বাজার কনে? কয়দিন হইলো পোলাপানগুলা খালি মরিচ ভাত খায় চহে দেহো না?

– কেন্ রমিজ্জা কি করে! ওরে দিয়া বাজার করাইতে পারলি না? খালি পেচাল পারস আমার লগে!

– খালি রমিজ্জারেই দেহ না? তুমি কি করো! পোলাডা আর কত করবো! খাবার দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলেন হালিমা

– হায়রে কপাল আমার! মরন যে ক্যান অয় না!

কাজ থেকে ফেরার পর রওশন আলী চাচার দোকানের বেঞ্চিটাতে এসে বসলো রমিজ। শরীরে গরম হয়ে আছে তাপে, কপাল থেকে ঘাম ঝরছে, শার্টও ভিজে চুপসে গেছে, চুল হালকা ভেজা খরের রূপ ধরে আছে।

-কিরে রমিজ্জা খুব গরম পড়ছে নাকি?

-কেন্ টের পাইতাছো না? ও তোমার তো সারাবচরই (সারাবছর) শীতকাল, চাদর একটা সারাবচর গায়ে দিয়া রাহো, যাগগা একগেলাশ পানি দেও…

-চা খাবি?

-হ লগে বিস্কুটও দিও?

-বেচাকেনা বালা হইতাছে নারে রমিজ্জা, দুই একটা লোকই আহে, তা দিয়া অয় না কিচু, সারাদিনে ৫০ টেয়াও ওডে না…

চা বানিয়ে রমিজ থেকে চোখ সরিয়ে পাশের লোকের দিকে তাকিয়ে বলেন রওশন চাচা,

-মিয়া ভাই চা লন। এবার রমিজকে এক গøাস পানি দিলেন। সে কুলি করে মুখ ধুয়ে নিল বাকি পানিটুকু দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিল কিছুটা।

– রমিজ্জা কাইল যাওনের সময় যে কি দেখাইবি কইছিলি। কি দেখাইবি? রমিজের মনে পড়ে

-অ হ্যাঁ বলছিলাম, খাড়াও বাড়ি থাইকা নিয়া আইতাচি। এই বলে বাড়ি চলে গেল রমিজ মিনিট দশের মধ্যে ফিরে আসল,

-চাচা…

হাসি মুখে শার্টের পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করল রমিজ

-দেহো কি আনচি।

-ওরে! চোখ মাথায় উঠে গেছে রওশন আলীর

-এ মোবাইল কই পাইছিসরে রমিজ্জা! কিনচিস! কোন্ থেইকা কিনচিস?

-থামো চাচা কইতাচি, এডা পুরান মোবাইল, কম দামেই কিনচি, আগের হাপ্তা যেহানে কাম করলাম, ঐহানে আমাগো লগে কাম করে, ওয় কইতাছিল মোবাইল বেইচা দিব,

-অয়ে এত দামি মোবাইল কই পাইলরে রমিজ্জা! চুরি করছে?

-না ঐডা নাকি ওরে কোন আত্মীয় বিদেশ থেইকা দিছে…

-হু… মাবাইলডা কিন্তুক দামি মাবাইলরে। নিজের হাতে নিয়ে এদিক সেদিক করে দেখছেন রওশন চাচা।

– হু দামি হইবো

এমন সময় এলাকার মেম্বর সাহেবের ছেলে হাকিম এসে হাজির,

-চাচা একটা সিগারেট দেও দেহি, ফুয়াই বইসা বইসা…

সে কার জন্য যেন অপেক্ষা করছে। এদিক সেদিক তাকানোতে বুঝা যাচ্ছে এবার রমিজের দিকে তাকিয়ে বলে

-কিরে রমিজ্জা কি অবস্থা তোর কামকাজ কেরুম…

বলে কথা একটু আটকে নিয়ে শুদ্ধ করার চেষ্টা করে…

-কিমুন চলে…

-হু বালো…ই…

-ওরে জানোস্ নাকি হাকিম আবার বলে উঠে

-কদিন পর আমাগো বড় ভাই মুনশি যাত্রার ব্যবস্থা করছে,

হুনছ…

-ইহ…আবার শুদ্ধরূপ দেয়ার চেষ্টা শুনছিস…?

হ হনছি।

-তাইলে আসিশনে, রওশন চাচা, তুমিও আইসো

দুষ্ট হাসিতে বলে হাকিম…

-ভালোই মাল আইবো, বুঝলা?

রমিজ বিরক্ত হচ্ছে শালাটা যে কখন যাইবো, মনে মনে বলে যা শালা! পেচাল কম ছার। কথার ফাঁকে ফাঁকে

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে হাকিম, আবারও এদিক ওদিক তাকাচ্ছে… মিনিট পাঁচ পর দেখা যাচ্ছে কয়েকজন এলাকার ছেলে হেঁটে আসছে এদিকে, হাকিমের সাঙ্গপাঙ্গ। ওই! এত দেরি করলি কেন?

বলে তাদের দিকে এগিয়ে গেল হাকিম। শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে রমিজ, শালা গেল!

-নে তোর মোবাইল।

-চাচা,

মোবাইল হাতে নিয়ে আবার মুখে হাসি ভাসিয়ে বলে রমিজ,

-এদিকে আহো তোমারে আরো কিছু দেহামু… এই দেহ…

ওরে! কেডারে এডা! কার চবি (ছবি)? বউ মার নাকিরে…? বলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলেন রওশন চাচা, বাড়ি কই মাইয়ার?

-চাচা চিনি না তো এগুলান ফেইজবুকের মাইয়া, টেলিভিশনে দেহো না ইন্টারনেটের কতা কয়, এই হইলো ইন্টারনেট।

-ও আইচ্ছা

-হু চাচা দেহো এ মাইয়াডা সুন্দর না?

-বাতিজা আমি যে তোর চাচা হই ভুইলা গেছস নাকি?

-আপন চাচা না হইলেও সম্পর্কে চাচা কিন্তক

-হা হা হা…!! কি যে কও চাচা হাসি থামায় রওশন আলী।

-চালাইয়া যা, পাইলে একখান সুন্দর বউ মা নিয়া আয় নেট থেইকা।

-হাহাহা তুমি না! লজ্জায় লাল হয়ে যায় রমিজ।

মায়ের কথা মনে হতেই চট করে বলল- চাচা এহন যাই এট্টু কাম আছে

-কই যাস

-ভূত ঝারানোর বাড়ি, মা কইচে বেটারে নিয়ে আইতে। যাই পরে আমুনে বলে চলে যায় সে হারুন মালিকের বাড়ির দিকে।

কয়েকদিন হলো হারুন মালিককে বাড়ি গিয়েও খুঁজে পাচ্ছে না রমিজ। শুনেছে অন্য এলাকায় সেই একই কাজে গেছে। সপ্তাহ খানেক পর ফিরবে, এ নিয়ে হালিমা খুব চিন্তিত হয়ে আছেন। কি যে করবে… ভেবে কুল পাচ্ছেন না তিনি। এদিকে ফুলিও কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কারো সাথে ঠিকঠাক কথা বলছে না কেমন যেন মুখ ভার করে বসে থাকে সারাক্ষণ। দিনের অবসরের অনেকটা সময় পুকুর ঘাটেই বসে কাটায়। রমিজদের বাড়ির একটু দূরে পুকুর ঘাট। ঘাটে বসলেই হালিমা চেঁচিয়ে ওঠেন

-ফুলিলো আর কোনো বালা জায়গা পাস না বসার জন্যে, খালি পুকুর

ঘাটে বসোছ। কিলো ওহানে কি তোর? গ্রামে সবার মতো হালিমাও বিশ্বাস করেন পুকুর ঘাটে ভূত জিন পরীরা আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে দুপুর ও সন্ধ্যা দ্বীপের সময়। অমন আচরণে বিরক্ত হয়ে ওঠে ফুলি তবুও কিছু না বলে ফিরে যায় ঘরে। সারাদিন মায়ের সাথে একাজ ওকাজে হাত বাটে। এখনও মায়ের সাথে কাজ করছে সে। রমিজ আজ সন্ধ্যায় বাজার থেকে মাছ নিয়ে আসার পর থেকে মাছ কাটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে ফুলি আর তার মা। রমিজ শার্ট পরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

-কি রে আজ নতুন শার্ট পরতাচিস্ কই যাইবি?

-হু বাইরে যামু এট্টু কাম আচে। শার্ট টেনে ঠিক করতে করতে বলে-

আইজ ঘরে আইতে দেরি হইবো, চিন্তা কইরো না, দরজা আটকাইয়া গুমাই যাইও।

-খাওন দিমু?

-হু দেও ভাত খাইয়াই যাই। মাছ কাটা শেষে রমিজকে খাবার দেয় মা, মাছের রসে ঘরে পিঁপড়া ধরেছে। রমিজের পায়ের কাছে কয়েকটা

পিঁপড়া হেঁটে যেতে থাকে,

-ইহ! কি বজ্জাত হিমরা, খেইতেও শান্তি দেয় না বজ্জাত! পিঁড়ি থেকে থেকে নড়ে খাবার শেষ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায় রমিজ। কিছুক্ষণ হেঁটে গিয়ে বসে রওশন চাচার দোকানে। রাত এগারোটা অব্দি ওখানে থাকে। এগারোটার পর রওশন চাচাকে নিয়ে চলে যায় জাম তলির ওদিকে। যেখানে শুরু হবার কথা যাত্রাপালা। গাছের আনাচে কানাচে লোকের অনেক ভিড় করে আছে। একটু দূরে এলাকার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে মেম্বারের ছেলে হাকিম। রমিজকে দেখে

-ঐ রমিজ্জা, এহানে আয়! চাচা আসো, নেও এহানে, শুদ্ধতার প্রয়াস ঘটাতে আবার বলে, -এখানে বসো।

-ঐ পিচ্চি আরেকটা চেয়ার নিয়া আয়। অন্ধকারে বসার জায়গা পাওয়া কঠিন তাও আবার এত ভিড়ের মাঝে হাকিমের কারণে পাওয়াটা সম্ভব হয়েছে। যাত্রা শুরু হয়ে গেছে, সবার মাঝে হইচই পড়ে গেছে ততক্ষণে। পাশে কেউ কেউ জুয়ার আসর নিয়ে বসেছে, যাত্রার দিকে চোখ করে আছে কেউ কেউ, কেউ আবার বোতল নিয়ে। হাততালি আর শিসের আওয়াজ ক্রমে বেড়ে উঠেছে। ভিড় আশপাশ, কেউ উত্তেজনায়- মুন্নি বদনাম হুয়ি ডার্লিং তেরে লিয়ে, গানের জটে মেতেছে। হাকিম বসা থেকে উঠে নাচতে থাকে, সেও বলে ওঠে

-না না না…আই এম এ শীলা শীলা কি জাওয়ানি হু…হু…

বাকিটা জানা না থাকায় না না না করে চিৎকার করতে থাকে, আর ওই একই লাইন গাইতে থাকে বারবার। রমিজও একটু একটু শরীর ঝাঁকাতে থাকে গানের তালে তালে। পাশ থেকে কে যেন বলছে

-নাইকাডা নতুন নাকি? এর আগে দেহি নাই।

-হু মনে অয় নতুন। ভিড়ে বোঝার উপায় নেই কে কাকে বলছে শুধু হইচইয়ের গমগম শব্দ শোনা হচ্ছে। দৃষ্টি এদিক সেদিক করে আশপাশ দেখছে রমিজ,

-এত মানুষ বাপরে!

কথাটা নিজ থেকে বের হয়ে আসে। রওশন আলী হঠাৎ

-ওরে রমিজ্জা! দেখ,

-কি?

-ঐ দেখ দেখ তোর বাপ!

-ও এডা আর নতুন কি চাচা, পতিবারই তো আহে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে কিলবিল করে বলে- বেডা একটা বজ্জাত! বয়সের খেয়াল নাই!!

-রমিজ্জা আমারও কিন্তু বয়স কম অয় নাই, তোর বাপরে বয়সের কাছাকাছি।

-চাচা তোমার কতা আলাদা, ঐ বেটারটা তো!! কি কমু চাচা শালা বজ্জাত চুরি-জুয়া ছাড়া কিছু বুঝে না। তুমি তো এসবের দারের কাছেও নাই। চাচির খেয়াল রাহো, আর ঐ বেটা? বলে চুপ হয়ে আবার যাত্রার দিকে চোখ রাখে রমিজ। রওশন চাচাও চুপ হয়ে দেখতে থাকেন। যাত্রার নায়িকার চেহারা দেখে রমিজার চামিলির কথা মনে পড়ে। কতদিন চামিলিকে দেখে না সে। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর আর দেখা যায়নি চামিলিকে। আগে তো মাঝেমধ্যে দেখা যেতো স্কুলের যাওয়ার পথে। এখন তাও না, তবে কি চামিলি আর স্কুলে আসে না? রমিজ চামিলিকে চেনে সেই ছোটবেলা থেকে। পাশাপাশি স্কুলে পড়াকালীন রমিজ তখন ১০ম শ্রেণির ছাত্র, চামিলি ৫ম শ্রেণির, রমিজ এসএসসি ফেল করার পর আর পড়াশোনা করার আগ্রহ করেনি। পরিবারে হাল ধরাই ঠিক মনে করে। বাবা যেহেতু পরিবার নিয়ে এত উদাসীন এই ভেবে তার নিত্যদিনের কাজ পরিবারকে নিয়ে। একসময় যখন রমিজের বিয়ের কথা আসে, চামিলিকে দেখার কাজ চলতে থাকে তখনই প্রথম কথা হয় রমিজের সাথে চামিলির। জানাশোনা থাকা সত্ত্বেও এর আগে কখনো কথা হয়নি ওদের। তারপর বিয়ে ভাঙার পর… ভাবতে বুকে কেমন চিকন একটি ব্যথা অনুভব করে রমিজ। নিজেকে সামলিয়ে আবার যাত্রার নায়িকার দিকে মনোযোগী হয়। রাতের শেষ ভাগে কয়েকজন পড়ে আছে জামতলীর রাস্তার মুখে। রমিজের বাবা জাফর, আর কয়জন এলাকার জুয়াড়ি লোকজন, বোতল গিলতে গিলতে

-ওই! তুই এহানেও! কি রে হালিমা তুই সব খানে আমারে এত জ্বালাস কেন। ওই দেখ হালিমা গাছ থেইকাও নাইমা আইতাছে। জাফর বোতল ছোড়ে। যা একদম কাছে আইবি না, হারামি! যদি না যাস যাহ! দূর হ!!!

শরীর ওঠানোর শক্তি নেই জাফরের, এদিক থেকে ওদিক এলিয়ে বসেন।

-ওরে! পাশে পড়ে থাকা বোতলের দিকে চোখ মাথায় তুলে বলেন- তু…ই… বুতলেও… ক… কেম…নে ডোকলি…বু…তলে? হেহে হে হে……. ওরে দেখ্… সাথের আরেক নেশাখোরকে দেখিয়ে বলেন বউ… না… ব…উ না… দজ্জাল ব…উ আমার, বুতলের ভিতরে…।

হু… ভা…ই… বুতলে… দেখতাচি… বউ… তোমার বই… না বউ মা…নে…আমাগো বউ… আমা…র ব…উ। ঠি…ক কইচি না জাফর ভাই? আঙুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে সাথের জন। হু ঠিক… হেহেহে… দেখচো…আ…মি ঠি…ক ঠিক কতা…ই

কই। রাস্তা অন্ধকার হয়ে আছে। শুধু কয়েকটা টর্চ লাইট জ্বলতে দেখা যাচ্ছে হাকিমও তার সাঙ্গপাঙ্গের হাতে। যাত্রা থেকে ফেরার পথে আসতে

-ঐ কেরে!!

মেরে দেখে হাকিম

– ঐ রে রমিজ তোর বাপেরে দেখা যায়! রওশন আলী বলেন

-হরে রমিজ্জা তোর বাপ দেখ কি অবিস্থা। বাবার প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ হলেও এমন অবস্থায় তাকে দেখে কিছুটা নরম হলো রমিজ। এগিয়ে আসে বাবাকে তুলে নিতে

-ওঠো বাবা। রমিজ তার বাবাকে বাবা বলে ডেকেছে দীর্ঘদিন পর।

– কেরে…রমু… বাপ… তু…ই।

-হ বাবা ওডো…বাড়ি চলো।

-না… তুই যা…তো…র…মার কাচে… ঐ বেটির কাচে আ…মি যামু না… যা তুই… ঐ দেখ্ …! তোর মা এহা…নে ও… কয়েকটা…। বেটি সব খানে জ্বালায়… যা তুই… যা…!!!!! অনেক জোর করে বাবাকে কাঁধে ভর করে তুলে নেয় রমিজ, রওশন আলীও একদিকে ধরে চলতে থাকেন পথে, কিছু পথ হাঁটলেই বাড়ি পৌঁছে যাবে ওরা, আর কিছু পথ বাকি।

শরীর ঝিমঝিম করছে সেই সকাল থেকে। মাথা ভার হয়ে আছে। আজ বের না হয়ে শুয়েই কাটাচ্ছে জাফর মিয়া।

– কই রে! একখিলি পান দে রমিজ্জার মা, মুখ হুগনা হুগনা লাগতেচে, ওই রমিজের মা হুনছোস? নাই নাকি ঘরে। রমিজ পাশের রুম থেকে শুনছে। ফুলি উঠোন থেকে খরকুটো রান্নাঘরে নিয়ে রাখছে,

-ফুলি?! এতক্ষণ হালিমা বেগম পাশের বাড়িতে ছিলেন, প্রতিবেশী নাদিমের বউয়ের কাছ থেকে শুনে এসেছে, পাশের গ্রামে আরেক ভূত ঝারানি আছে।

-ওলো ফফুল, আইজ আমার লগে এক জায়গায় যাবি দুপুরের পর। হুনচোসনি?

-হু মা হুনচি, ঠিক আছে, যামুনে। ফুলি রান্নাবান্নার সব গুছিয়ে দিল রান্নাঘরে। রমিজ বের হতেই

– মা কামে গেলাম

-কিরে এহন কনে কামে যাবি, দুপুর তো হইয়া আইল। ভাবচিলাম যামু না, এহন মনে অইতাচে যাওন দরকার, আর বাড়ি থাইকাও কি করুম… যাই। হালিমা রান্না শেষ করতে প্রায় দুপুর গড়াতে থাকে। সূর্য ক্লান্ত হতে হতে বিকেল।

-কই বাড়ির সব। রওশন আলী বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে হেঁকে বলেন

-জাফর ভাই আচো নি? রাস্তায় রমিজের কাছে শুনেছিল ঘরে আছে, তাই জেনে জাফরকে দেখতে এলেন রওশন আলী। ঘরে ঢুকে- কেমন আচো ভাই? রাতে তো যা অবস্থা দেখচিলাম তোমার! এহন বালোনি, জাফর বিচানা থেকে ওঠে বসতে বসতে বলেন

-হু বালোই আচি এহন, তা দোয়ান কি বন্ধ কইরে আইচো।

-না ভাই এক পিচ্চি রে বসাই দিয়া আইচে, ভাবলাম ভাইডারে দেইখা যাই।

-হু বালা করচো, শরীর মন কোনো ডাই বালা নাইরে রওশন, কিচু বালা লাগে না…।

-কি অইচে, ঐ শরীর ম্যাজম্যাজ করতে আচে, বিচানার উত্তরে একটা ব্যাগ দেখে মনে করেন রওশন, এ ব্যাগ এই তো ঐ দিন হাতে দেখচিলাম! মনে মনে একবার ভাবে, জাফরকে জিজ্ঞাস করলে কেমন অয়! বলেন রওশন আলী

-ভাই একখান কতা কমু?

-কি কতা কও। কইচিলাম কি, আমতা আমতা করতে করতে পরক্ষণে বলে ফেলেন তিনি -তুমি নাকি মেলা টাকা আনচো? কই পাইলা এত টাকা?

-হা হা হা! রওশন হাসাইলা। কিছুক্ষণ হেসে বলেন তোমারে কেডা কইচে আমি মেলা টাহা আনচি?

-হগলেদো কই হুনি, আর আমিও দেখচি তোমারে ঐ দিন একটা টাকার ব্যাগ আনচো।

-ঐ ব্যাগটার কতা কইতাচো?

-হু।

রওশন রে, ঐডাতে কোনো টাকা নাই, কয়ডা কাগজ আচে, আসলে খুইলাই কই, কাউরে কমু না ভাবছিলাম, রমিজ্জারেও না।

-টিক আচে।

-তুমি তো জানো বাপ-দাদার কিচু জমি আছে। ভাবচি ঐ গুলান পোলার নামে কইরা দিমু…এরপর… কথার মাঝে হালিমা বেগম এসে হাজির। মাথায় কাপড় দিয়ে বলেন, – রওশন ভাই অনেক দিন পর আইলেন। ভাবির খবর কি? হু বালাই তয় এট্টু অসুখ, অ…বেশি কথা না বাড়িয়ে অল্পতে কথার ইতি টানেন -নেন ভাই পান খান হালিমাও পান মুখে নিয়ে বলেন, ভাইজান, আপনেরা কতা কন্ আমি এট্টু আইতাচি। -ঠিক আচে। এবার ফুলিকে ডেকে ওঠেন হালিমা

– ও ফুলি ফুলিলো চল চল্ তাড়াতাড়ি

– ফুলি মাথায় নারিকেলের তেল দিচ্ছে। -খাড়াও মা আইতেচি। আরে এত সাজন লাগবো না আয়, দুজনে বের হলো বাড়ি থেকে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রমিজ এর আগেই ফিরেছে, জাফর ততক্ষণে বের হয়ে গেছে আবারও সেই জুয়ার আসরে। ফুলি ক্লান্ত মুখে বসে পড়েছে, আর ও… আহ শব্দ করছে। রমিজ জানতে চাইলে হালিমা বেগম তাকে খুলে বলেন

-আরে ভূত ঝারানির কাছে গিয়ে ফুলিরে ঝারাই আনচি, ঝাড়ু দিয়া দুই একটা বাড়ি মারচে তো এ কারণে এট্টু ব্যথা পাইচে মনে অয়। এডা কিচু না ঠিক হইয়া যাইবো পরে।

-মা তুমি ঠিক করতাচ না। অকারণে মাইয়াডারে কষ্ট দিতাচো কেন? হুনো ভূত-টুত কিচু না। মাইয়া বড় অইতাচে এডাই কতা।

-হইচে এত জ্ঞান দিবি না। আমি কম বুঝি না তোর থেইকা। ছেলের কথায় কোনো গুরুত্ব দিলেন না হালিমা। সন্ধ্যা গাঢ় হতে শুরু করেছে ততক্ষণে। অভাবী বাতাস জানান দিচ্ছে জানালার পাশে। চালে গাছ থেকে ছোট ছোট ডানের শব্দ হচ্ছে দুএকটা। একসময় বাতাস তার অভাবের লেভাস ছিন্ন করে ঝড়ো বাতাসের রূপ ধরে ওঠে। এমন অবস্থায় কে যেন উঁচু স্বরে হেঁকে ওঠে বাহিরে

– ওরে রমিজ্জা! রমিজ্জা তাড়াতাড়ি বাইর হ! তোর বাপ জানি কেমন করতাচে। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে টর্চ নিয়ে ঘর থেকে ত্বরিত বের হয় রমিজ। আরেকজনের কাছ থেকে বাবাকে কাঁধে তুলে নেয়। নিতে নিতে কেমন যেন ভেতরে হু হু করে কেঁদে ওঠে তার। হালিমাও বের হয়ে আল্লারে বলে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন। স্বামীকে ঘরে নিয়ে নিজের পাশে জায়গায় শুইয়ে দেন। কত রাত একসাথে শোয় না তারা? হালিমার মনে পড়ে যায় তারা শ্রাবণের কোনো এক রাতে শুয়েছিল শেষবার। তবে তার বেশি মনে পড়ে এক ভরা পূর্ণিমা রাতের কথা। মনে পড়ে জাফর বলেছিলেন-

-হালিমা পূর্ণিমা রাইত আমার খুব পচন্দের রাইত। মাঝেমধ্যে দেখা যেত পূর্ণিমা রাতে লুঙ্গির নিচের এক মাথা ধরে উঠোনে হেঁটে বেড়াতেন অনেকটা রাত। কিন্তু জীবনের বাঁক উপবাঁকে এখন সব পাল্টে গেছে। কেমন যেন ভুলে গেছেন পূর্ণিমার স্বাদ বিলাস। এখন তো দেখেনই

না আর। না দিনের সূর্য না রাতের ঝাঁকে বুক চওড়া পূর্ণিমা, হালিমাও সংসারে বাঁকে ঝুঁকে পড়েছেন। জাফর জুয়াতে গিয়ে চুরিতেও জড়িয়ে নিয়েছে নিজেকে। বাতাস অনেকটা থেমে গেছে এখন। টের পেয়ে হালিমা স্বামীর পা টিপা বন্ধ করে জানালার পাশে শাড়ির আঁচল টেনে

দাঁড়ালেন। দেখেন আজ আকাশে কোনো পূর্ণিমা নেই। অসুস্থতা ক্রমে বেড়ে যাচ্ছিল জাফরের। শুয়ে বসেই সময় কাটাচ্ছেন ইদানীং। গ্রামের এক ডাক্তারকেও দেখিয়েছিলেন। ডাক্তার বলেছেন শহরে নিয়ে যাওয়ার কথা। রমিজও শহরে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কয়েক দিন ধরে। একটি জমি বিক্রির করা কথাও হচ্ছে, তাই আজ সকালে কাজে না গিয়ে ত্বরিত রওশন আলীকে নিয়ে চলে গেলো মেম্বারের বাড়ি। হালিমা বসে বসে শুধু চোখের জল-ই ফেলছেন। আশপাশের অনেকে তাকে সান্ত¡না দিচ্ছে – রমিজ্জার মা আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যেই করে। কাইনদো না সব ঠিক হইবো ধইর্য ধরো। মায়ের মনমানসিক অবস্থা ভালো না থাকায় কয়েকদিন ধরে ফুলিই সম্পূর্ণ করছে ঘরের সমস্ত কাজ। সবার জন্য চা বানিয়ে হাতে তুলে দিল ফুলি। নেন চাচি আশপাশের যারা এসেছে তাদের দুজনকে ফুলি চাচি বলে ডাকে

-চা নেন, আপনেও নেন চাচি। মা নেও তুমিও।

-হু ভাবি তুমিও খাও কদিন ধরে তো মুখে কিচু নাও নাই। চা ডা খাও। মাথাব্যথা করছে হালিমার তাই চা হাতে নিয়ে ফুলিকে বলেন

-ফুলি তোর চাচিগোরে মুড়িও দে। ঘরের মাচায় দেখ্ মুড়ির বাক্স, জাফর ঘরের ভেতর থেকে হালিমাকে ডাকছেন

-রমিজের মা এদিকে আয় এট্টু…কইরে…

-আইতাচি খাড়াও। কিচু লাগবো?

– হু। কি লাগবো কও।

-কাচে এট্টু বয় কথা আছে। দুর্বলতার কারণে গলা কাঁপছে জাফরের। কাশি হচ্ছে, হালিমা পাশ থেকে গøাসের পানি ঢেলে দিলেন।

-নেও পানিডা খাও

-দে। এহন বয় এট্টু কথা আছে। জাফর উঠে বসলে পাশে হালিমাও বিছানার এক পাশে বসে। কও কি কইবা। কথার এক পর্যায় চামিলির প্রসঙ্গ তুলেন জাফর। তার বাবাকে আসার জন্য খবর দিতে বলেন, হালিমা তেমন কোনো কথা না বলে মাথা ঝাঁকালেন

-ঠিক আচে আইজই খবর পাটামু তুমি শুইয়া পরো। কতদিন পর হালিমা আর জাফর দুজনই শান্তভাবে কথা বলছে পরস্পরের সাথে। রমিজের কথা জিজ্ঞাস করলেন

– পোলাডা কইরে। -কামে গেচে?

-না মেমবরের বাড়ি গেচে। এটটু পর আইয়া পরবো তুমি ঘুমানুর চেষ্টা করো আমি যাই। ভাবিগো পান খাওয়াই আইতেচি বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন হালিমা। সবাইকে বিদায় করলেন। রমিজ বাড়ি আসতে রওশন আলীকে খবর দিতে বললেন।

-রমিজ্জারে তোর নওশন চাচারে এটটু বাড়ি আইতে কইস তো। রাতে আইতে কইস হালিমার কথামতো রওশন আলীকে বাড়ি আসতে বলে

রমিজ। সন্ধ্যার পর আসলে কথা হয়

-রওশনরে একটা কাম করে দে ভাই। -কি কাম কউ। -চামিলির বাপরে এটটু খবর দে, বাড়ি আইতে ক’ ওর লগে কতা কওন দরকার। আরো দু একজনকেও খবর দিতে বলেন এলাকার। – চামিলির বাপের ব্যাপার টা না অয় বুঝলাম, বাকিগুলার লগে কি কাম জাফর ভাই? -টেয়া পয়সার লেনদেন আচে নাকি? -জীবনে তো অনেক পাপ করচিরে রওশন, চুরি চামারি বাটপাড়ি, কম করি নাই শহরে যাওনের আগে ওগো কাচে ক্ষমা চাইয়া যাই! – বুকে হাত দিয়ে অনেক কষ্টে কথাগুলো বলছেন জাফর। বারবার বুক চেপে কথার মাঝে কাশি দিচ্ছেন, আর বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। অবস্থা বুঝে তাকে চুপ থাকতে বলেন রওশন।

-ঠিক আচে সব করমু নে এখন তুমি চুপ থাহো। হালিমা ভাবি ভাইরে দেখে রাখেন আমি যাই। জাফরের কথামতো পরের দিন সবাইকে খবর দিলেন রওশন আলী, চামিলির বাবা মান্নান মিয়াকেও আসতে বললেন। যার যার সময়মতো এলাকার অনেকে হাজির হলেন জাফরের বাড়ি।

জাফর সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। কেউ কেউ সব শুনে ক্ষমা করে দিলেন, কেউ আবার বিপরীত মুখা তার চুরির কথা শুনে চুপ হয়ে গেল। -শালা এত পাপ করচে আর কেউ টেরও পাইলো না! শালা তোর ক্ষমার গুষ্টি কিলাই। মুখে কিছু না বললেও এমন ভাব ধরে চলে গেল গুটি কয়েকজন। তবুও ক্ষমা চেয়ে অনেকটা শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ছেন জাফর। সবাই যাওয়ার পর বউয়ের কাছেও ক্ষমা চাইলেন বউরে মাপ করে দিস। তোর সাথে অনেক অন্যায় করচি, মাপ করে দিস, আর দোয়া করিস। ভালোয় ভালোয় যাতে শহর থেইকা ফিরা আসি। স্বামীর অমন কথায় কান্নায় ভেঙে পড়েন হালিমা। আমিও অনেক অন্যায় করচি, তোমারে কথায় কথায় অসম্মান করচি। আমারেও মাপ কইরে দিও। কান্না থামাতে পারছে না হালিমা মাথা নিচু করে কেঁদেই যাচ্ছেন…

কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল আসার কোনো নাম নেই চামিলির বাবার। জানা যায় শহরে গেছে তার দোকানের মাল আনার কাজে। আজই ফিরবে রওশন আলীর মাধ্যমে বিকেলে জানিয়েছেন চামিলির মা। শুনে হালিমা মেয়ে ফুলিকে নিয়ে আয়োজন করেছেন নাস্তার। রমিজকে বলেছেন- চানাচুর আর পান নিয়া আইস তো বাপ, যা আচিল এ কয়দিনে শেষ হইয়ে গেচে, লগে একটা বিস্কুটের পেকেটও আনিস। ফুলি ঘরে নতুন চাদর বিছিয়েছে মায়ের কথায়। সন্ধ্যা হতেই ফুলিকে ঘর ঝাড়ু দিতে বলেন,

-ও ফুলি আজান দিবো তাড়াতাড়ি ঝাড়ু দিয়া ঘরে বাতি দে। হালিমা পায়েস রান্না করতে রান্নাঘরে গেলেন। জাফরের খুব ইচ্ছে হয়েছে পায়েস খাবে সকালে বলেছিল।

-রমিজের মা আমার খুব পায়েস খাইতে মন চাইচে। আইজ এটটু পায়েস রাইনদা দিস তো। মেলা দিন তো অইলো পায়েস খাই না। কাল যেহেতু শহরে যামু তার আগে খাইয়া যাই। পায়েস চুলোয় বসিয়ে হালিমা নারকেল কোরাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে হয়ে যাবে, তার মাঝে

হঠাৎই ফুলির চিৎকার

-মা গো বাপ জানি কেমন করতেচে! ও মা দেহো না মা ও মা !! হালিমা বাকরোধ হয়ে দৌড়ে গেলেন। তিনিও চিৎকার

করে বলতে লাগলেন। ও রমিজার বাপ কি হইচে তোমার! ও আল্লাহরে এমন করতাচো কেন্! ও রমিজের বাপ, ওরে রমিজ রে দেখ্ তোর

বাপ কি করতাচে ওরে রমিজ…!!! রমিজ রে! বুকে আঘাত করতে করতে চিৎকার করতে থাকেন হালিমা, রমিজ তখনও ফেরেনি দোকান থেকে। যখন ফিরল ততক্ষণে তার বাবা… চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মা কাঁদছে একদিকে…অন্যদিকে বোন। রমিজা যেন

বাক হারিয়ে সব দেখছে। চারপাশ মানুষ জড়ো হয়েছে, চামিলির বাবাও। ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে নিজেকে সামলাতে না পেরে হু হু করে কেঁদে ওঠে রমিজ। ও বাবা…বাবা গো! তোমার কাছে তো আমি ক্ষমাটাও চাইতে পারলাম না! গুঙিয়ে গুঙিয়ে কেঁদে যাচ্ছে রমিজ, রওশন আলী ও চোখের জল আটকাতে পারলেন না রমিজকে জড়িয়ে নিলেন।

-ও চাচা দেহো বাবা… কান্নায় কথাও শেষ করতে পারে না রমিজ হু হু করে কেঁদে যায়। কিছুক্ষণ পর চামিলি আর চামিলির মাও খবর পেয়ে উপস্থিত হলেন ফুলিকে সান্ত¡না দিচ্ছেন চামিলির মা। চামিলি ওড়নার আড়ালে চোখ মুছে যাচ্ছে, রমিজের কান্না দেখে সেও নিজেকে সামলাতে পারেনি। রাত বাড়তে লোক ক্রমে কমে যাচ্ছে বাড়ি থেকে। কেউ কেউ কবরের জায়গা ঠিক করছে। পরের দিন সকালে দাফন হবে।

সারারাত লাশের পাশে বসে রইল রমিজ, হালিমা ও ফুলি, চামিলি ও তার মা বাবাও বসে রইলেন সাথে আরো অনেকে। লাশের পশ্চিমে খোলা রয়েছে জানালাটা। লাশের গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে জ্যোৎস্না। উঠোনের আম গাছে কা কা করছে কাক, যেন বলছে জাফরকে, জাফর দেখ্ শেষবারের মতো দেখে নে, আজ জ্যোৎস্না উঠেছে। হ

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj