বদলে যাওয়া চেহারা : ফরিদুর রেজা সাগর

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বাংলাদেশের একজন বিশাল ব্যবসায়ী তিনি।

এদেশের অনেক ব্যবসার প্রথম উদ্যোক্তা এই ভদ্রলোক। শুরু করেছিলেন। শুরু করে সাফল্যও পেয়েছেন। সেজন্য তাঁর ইমেজ আলাদা।

অনেকেই মনে করেন, অনেক ব্যবসা তিনি প্রথম করেছেন যেহেতু, সেহেতু ব্যবসার নাড়ি-নক্ষত্র তাঁর দখলে। তিনি অনেক কিছুই জানেন। বোঝেন। জলের মতো তরল এ কর্মযজ্ঞের সবকিছুই।

সেই হিসেবে তাঁকে সম্মানও করেন সবাই!

চিরদিন কাহারও সমানো নাহি যায়। তাই এই দুর্দান্ত প্রতাপশালী মানুষটিকে রাজনৈতিক কারণে চলে যেতে হয় দেশের বাইরে। যাঁর ক্ষমতা আর সম্মান ছিল আকাশছোঁয়া, তাঁকে নীরবে-নিভৃতে এয়ারপোর্ট ক্রস করে পাড়ি জমাতে হয় বিদেশের এক শহরে।

বিষয়টি সুখকর নয়। কিন্তু বাস্তবতা কখনো কখনো মানুষের জীবনে নির্মম হয়ে আবির্ভূত হয়।

স্টার ফলস আপওয়ার্ড। তারকার পতন ঊর্ধ্বমুখী। কেউ কেউ বলেন, পৃথিবীতে যিনি যত ওপরে ওঠেন তিনি তাঁর পতনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা ততটাই অনিবার্য হয়।

আর সেটা যদি হয় রাজনৈতিক কারণ তবে এখানে ভাঙাগড়া, ওঠানামা খুব স্বাভাবিক চর্চা।

তাই সফল ব্যবসায়ীটি রাজনৈতিক কারণে চলে যান বিদেশের মাটিতে।

পৃথিবীর নানা দেশে, নানা সময়ে এই আসা যাওয়ার ঘটনা আছে। এ খেলা নতুন কিছু নয়। স্বভাবতই ভদ্রলোক বিদেশে গিয়ে হারিয়ে যাবেন অনেকদিনের জন্য এটাই ছিল অমোঘ নিয়তি। এক্ষেত্রে তা হলো ব্যতিক্রমী উদাহরণ!

কেমন?

সেই কথাতে আসা যাক।

ভদ্রলোক পুরো পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে গেলেন। সেখানে থাকতে শুরু করলেন। কাহিনী জমে উঠল।

সেই সময় একদিন সেই দেশের সেই শহরে হঠাৎ আমার সঙ্গে দেখা। আমি গেছি আমার অফিসের এক বিশেষ কাজে। সঙ্গে আমার স্ত্রী কণা।

সেদিন কাজ শেষে আমরা দুজন বিকেলের মৃদু মন্দ বাতাসে ঘুরতে বেরিয়েছি।

হোটেল লবিতে দেখা হতে পারত। কারণ, তিনিও কোনো এক প্রয়োজনে নাকি হোটেলে এসেছিলেন। হলো না। হলো এক সুদৃশ্য মলে। চারপাশ আলো ঝলমল করছিল। ভদ্রলোক খোশমেজাজে তখন শপিং করছিলেন। আমি দূর থেকে দেখলাম এক পলক। কণাও দেখল। আমরা ছুটে এগিয়ে গেলাম না। এড়িয়েও গেলাম না। দূর থেকে লক্ষ্য করছিলাম, আরো প্রাণচঞ্চল আরো উদ্দীপ্ত মনে হচ্ছে ওই মানুষটিকে।

তীক্ষè, মেধাবী মানুষের মাথায় চোখ থাকে চারটা। সামনে সবার মতো দুটো। পেছনে আরো দুটো।

ভদ্রলোক সম্ভবত সেই জোড়া চোখে আমাদের আবিষ্কার করলেন। কাছে এগিয়ে এলেন দ্রুত। হাত মেলালেন। বুক মেলালেন। তাঁর সুদর্শনা স্ত্রী জড়িয়ে ধরলেন কণাকে। দাঁড়িয়ে দুচার কথা। উৎফুল্ল তরুণের মতো তাঁর অভিব্যক্তি।

বিদায় নেবার আগমুহূর্তে প্রস্তাব দিলেন।

আমাদের হাত ধরে খুব শোভনীয় কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি যখন এসেছোই এখানে, কাজের সিডিউল না থাকলে রাতেরবেলায় আসো বাসায়। আসবে?’

আমি আর কণা প্রস্তাব শুনে পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। হ্যাঁ, না কোনোটাই বলতে পারছিলাম না।

‘বাসায় চলো এসো। কথাবার্তা হবে। সমস্যা নাই তো?’

মাথা নাড়লাম আমরা। সমস্যা নাই।

সেই অনুযায়ী বললাম যে, ‘আমরা তো আর চিনব না আপনার বাসা কোথায়। আমাদের কাছে এই শহর তেমন পরিচিত না। এছাড়া এসেছি আমরা এখানে মাত্র একদিন হলো।’

ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে বললেন, ‘এ নিয়ে তোমাদের না ভাবলেও চলবে। আমি তোমাদের হোটেলে সময় মতো গাড়ি পাঠিয়ে দেব। গাড়ি তোমাদের নিয়ে আসবে আমাদের বাড়িতে।’

আমরা নিশ্চুপ।

ঠিক আছে তাহলে? তোমরা সেই গাড়িতেই চলে এসো। কথার সঙ্গে কাজের মিল পাওয়া গেল। রাত আটটায় গাড়ি চলে এলো আমাদের হোটেলে। গাড়ি দেখে চোখ ছানাবড়া। এত দামি গাড়ি পাঠিয়েছেন? গাড়িটা কি তাঁরই?

দেড়দিনে ওই শহরের বহু গাড়ি চোখে পড়েছে। মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু এত ঝকঝকে, নতুন বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের গাড়ি মনে হয় খুব একটা চোখে পড়েনি। যেন একটা সাদা রাজহাঁস দাঁড়িয়ে আছে!

ব্যতিক্রমী সেই গাড়ির পাশে গিয়ে যখন দাঁড়াই, গাড়ির পা দানি থেকে অটোমেটিক সিঁড়ি বেরিয়ে এলো স্বয়ংক্রিয় কায়দায়। দামি পোশাকের ড্রাইভার কষে স্যালুট দিয়ে বলল, ‘স্যার ওঠেন প্লিজ।’ সেই দেশের স্থানীয় সুদর্শন ড্রাইভার বেতন যে অনেক পায় তার মাখন-মাখন চেহারা তা বলে দিচ্ছে।

আমরা গাড়িতে উঠলাম। গাড়ির ভিতর সুগন্ধ ছড়িয়ে গেল।

স্যার এসির টেম্পারেচার কত রাখব? ভেতরের লাইট কি রঙের রাখা আপনাদের পছন্দ? টপ উইন্ডো কি খুলে দিলে ভালো হয়?

ড্রাইভারের ইত্যকার প্রশ্ন আর যতেœ আমরা তখন অস্থির। মনে হলো, ভদ্রলোকের বাড়িতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ড্রাইভারের অতি যতœ আমাদের কাহিল করে দেবে। নানারকম ব্যাপার স্যাপার।

গাড়িতে বসার পর সিট বেল্ট নিজেদের লাগাতে হলো। অটোমেটিকভাবে বুকে পেটে জড়িয়ে গেল। বুঝে গেলাম সব। বাহ্, ভদ্রলোক বিদেশে ভালোই তো আছেন।

বাংলো বাড়ি। সুদৃশ্য। সুশোভন। গেট খুলে যেতে নিঃশব্দ গাড়ি গিয়ে পৌঁছালো প্রশস্ত, সাজানো বারান্দায়। শ্বেত পাথরে বাঁধানো বারান্দা। এমন বারান্দা মনে হয় আর আছে রানী এলিজাবেথের গৃহে।

বারান্দায় রিসিভ করে তিনি আমাদের তাঁর লিভিংরুমে বসালেন। রক্তাক্ত রঙের ভারি কার্পেট। তুলতুলে, নরম, সোফা। বসবার ঘর তো নয় যেন ফুটবল মাঠ।

তবে লিভিং রুমটার সাইজ ছাড়া কিছুই আমার কাছে অপরিচিত মনে হলো না। ঢাকার বাসায় যখন গেছি একই প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি দেখেছি। মনে হলো, তাঁর ঢাকার বাড়ির ফার্নিচার, শো পিস, বইপত্রের আলমারি পেইন্টিং সব হুবহু এক। এমনকি তাঁর ছেলে, নাতি নাতনি, মা-বাবা সবার ছবি একই ঢঙয়ে দেয়ালে ঝোলানো। যেন ঢাকার বাড়ির ড্রইংরুমটা চার্টার্ড প্লেনে করে তুলে নিয়ে এসেছেন।

মনে হলো না, এটা ভদ্রলোকের অস্থায়ী ঠিকানা।

ড্রয়িংরুমে ঢোকার আগমুহূর্তে আমরা দেখলাম, বাড়ির আঙিনায় চমৎকার শেভ করা জায়গায় কমপক্ষে ছয়টা গাড়ি। ছয়রকমের ছয়টা! ছয় রঙের ছয়টা।

অথচ এ বাড়িতে মানুষ থাকেন দুজন। গাড়ি আছে ছয়টা। এমন নানা কিসিমের গাড়ি আমি চিনতেও পারলাম না। অস্থায়ী অবস্থানের জন্য এতগুলো গাড়ির সমাহার কেন, আমার কাছে সেটাও ছিল বিস্ময়ের!

আমাদের আতিথেয়তা করার জন্য বাড়ির ভেতরের লোকরাও বিদেশি।

ভাবী জানালেন, এতদিন ওইসব কাজের মানুষদের আমাদের কায়দায় রান্নাবান্নাও শিখিয়ে ফেলেছি।

এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি দেখে আমার কাছে মনে হলো, অস্থায়ী সংসারকে এমন পার্মানেন্ট চেহারা দেয়ার জন্য প্রাচুর্য অপরিসীম প্রয়োজন। খুব বিস্মিত হলাম। অবাক হলাম।

কিন্তু গল্পটা এখানে নয়।

গল্পটা হলো, যখন ভদ্রলোক বললেন, ডিনার করাবেন বাইরে। বাইরে কেন?

সমুদ্র পাড়ে ঝাঁ চকচকে দামি খোলা রেস্তোরাঁয় না খাওয়ালে তো ভালো আতিথেয়তা হয় না।

তাই তিনি একপর্যায়ে বললেন, ‘চলো, এবার তোমাদের বাইরে খাওয়াই। খেতে বসে বাকি গল্প।

কলের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়ালাম।

বললাম, বাইরে খাব কীভাবে? রাত তো অনেক।

বললেন তিনি, হ্যাঁ, যদিও এই দেশটায় সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যায় রাত এগারোটার মধ্যে, কিন্তু আমার ফোন পেলে অনেক রেস্তোরাঁ হয়তো অখুশি হবে না। জানা শোনা আছে। ফোনে অর্ডার দিলে হয়তো জেগে অপেক্ষা করবে। তৈরিও করে রাখবে।

বেরোতে যাবে।

ভদ্রলোক থামিয়ে দিয়ে বললেন, ছোট্ট একটা অসুবিধা আছে। এই দেশে কোনো ড্রাইভার রাত নয়টার পর কাজ করেন না। এটাই ওদের নিয়ম। গাড়ি ড্রাইভ করার মানুষ পাব না। তাই আমাদের গাড়ি নিতে পারবো না।

বললাম, ‘অসুবিধা কি?’

হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘না আমি তো আর এই বয়সে ড্রাইভ করি না। বহুদিন গাড়ি চালানো হয় না। দেখি একটা ট্যাক্সি কল করি।’

ট্যাক্সি কল করা হলো।

পাঁচ মিনিটে ট্যাক্সি হাজির।

কণা বলল, ‘ভাবী সঙ্গে যাবে না? তা কি করে হয়? তাই তো। ডাকছি।’

ভাবির তৈরি হতে পাঁচ মিনিট লাগবে। ভেতর থেকে খবর এলো। হলুদ গাড়ির ট্যাক্সি তখনই এমনভাবে চিৎকার দিয়ে উঠলেন, লেট হবে যদি তবে এত রাতে কেন ডেকে এনে ওয়েট করানো হলো? ব্যাপারটা খুব আন ফেয়ার। একদম ঠিক হচ্ছে না ব্যাপারটা। কেন আগে ডাকলেন?’

ড্রাইভারের চিৎকারে আমরা স্তব্ধ। থতমত খেয়ে গেলেন ভদ্রলোক।

ভদ্রলোক বললেন, ‘আমরা তো বেরোচ্ছিলামই। আইডিয়া একটু চেঞ্জ হওয়ায়…’

ওনার কথা কেড়ে নিয়ে ড্রাইভারটি অতি বাজেভাবে উপদেশ দিতে শুরু করলেন, ‘না না, এইরকম করবেন না কখনো। এটা হয় না।’

যে মানুষটির বাংলাদেশে এত প্রতিপত্তি, যে মানুষটির এখানেও এত প্রতিপত্তি দেখছি তাঁকে একজন ভাড়াটে ড্রাইভার যেভাবে বকলেন, তাতে ভদ্রলোকের মুখের চেহারাখানা যা হলো, তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না।

এইরকম বেকায়দায় পড়ে ক্ষমতাধর মানুষের মুখটা যে কেমন হয়ে যেতে পারে সেই রাতে পাশে দাঁড়িয়ে আমরা তা প্রত্যক্ষ করলাম।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj