উদার আকাশ চাই : স. ম. শামসুল আলম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

০১. নিশাত বয়স ২৬

০২. কামাল বয়স ৩২

০৩. সিফাত বয়স ২২

০৪. সাজ্জাদ বয়স ২৪

০৫. কাদির বয়স ৩৭

০৬. রহমত বয়স ৫৫

০৭. নওশের বয়স ৫৮

০৮. সরোয়ার বয়স ৫০

০৯. মাসুম বয়স ১২

১০. পিংকু বয়স ৭

১১. শামসুদ্দিন বয়স ৩৫

১২. নুরুদ্দিন বয়স ৩২

প্রথম অংক

প্রথম দৃশ্য

[একটি দোতলা বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষ। এক পাশে একটি খাট ও আলনা এবং আলনার ওপর নিশাতের কাপড়-চোপড়। পর্দা সরালে সিফাত একটি পেয়ারা হাতে ছুটে আসবে এবং মাসুম ওর পিছু পিছু ধাওয়া করতে থাকবে।]

মাসুম: আমার পেয়ারাটা দে বলছি, শিগগির দে, নইলে ভালো হবে না।

সিফাত: এটা দেব না, আরেকটি পেড়ে নিগে।

মাসুম: হুঁ-উ-হুঁ-। আমার পেয়ারা দে। হুঁ-উঁ-হুঁ- (কাঁদতে থাকে এবং মেঝেতে পা থাপড়ায়)

সিফাত: তাহলে আয় দুজন ভাগ করে নিই।

মাসুম: আচ্ছা তাই হবে। তাহলে আমার কাছে দে, আমি ভাগ করে দিই।

সিফাত: না, তুই হাতে পেলে আর দিবি না। আমি ভাগ করে দিচ্ছি।

(খাটের ওপর বসে কামড় দিয়ে পেয়ারা ভাগ করে দেয়)

মাসুম: তুই এত চালাক- (পেয়ারার ভাগ হাতে নেয়) তোর জন্য আমার বরাত ছোট, বুঝলি? আচ্ছা সিফাত আপা, তোর বিয়েটা যদি আগে হয়ে যেত-।

সিফাত: (মাসুমের পিঠে কিল দেয়) দুষ্টু কোথাকার।

মাসুম: বাঃ রে, আমি মিথ্যে বলছি নাকি? তোর বিয়ে হলে আমার কি মজাই না হতো-। ওহ্-।

সিফাত: বড় বোন রেখে-।

মাসুম: উহুঁ, তা হবে না। তাহলে চাকরি করবে কে?

সিফাত: তুই।

মাসুম: সে তো অনেক দেরি। ততদিন পেট শুকিয়ে ঝুনো নারকেল হবে। আচ্ছা, নিশাত আপা এখনো আসছে না কেন? আপাকে ছাড়া আমার ভালো লাগে না। (নিশাতকে আসতে দেখে) ঐ তো এসে গেছে আপা। (নিশাত কতকগুলি প্যাকেট হাতে প্রবেশ করে)

নিশাত: কি রে, দুজন কি করছিস এখানে?

মাসুম: কিছু না। তোমার ও প্যাকেটে কী নিশাত আপা?

নিশাত: উঁ হুঁ- বলব না।

মাসুম: (মিনতির স্বরে) প্লিজ, বল না।

সিফাত: না বললে কিন্তু কেড়ে নেব।

নিশাত: ঠিক আছে বাবা, বলছি। এগুলোর ভেতরে তোর (মাসুমকে) জামা, তোর (সিফাতকে) কামিজ আর বাবার একটা পাঞ্জাবি।

মাসুম: কি মজা, কি মজা! প্লিজ আমারটা দাও না আপা। (নিতে যায়, নিশাত উঁচু করে ধরে)

নিশাত: না দেব না। আগে বাবাকে ডাক। (বাবার প্রবেশ)

বাবা: কি রে, কী হয়েছে তোদের?

নিশাত: এই যে বাবা, তুমি এসেছ-।

সিফাত: বাবা, তোমার জন্য আপা না-।

বাবা: কি রে বলছিস না কেন?

মাসুম: পাঞ্জাবি এনেছে বাবা। (বাবা যেন একটা আঘাত পেলেন)

নিশাত: এই নাও বাবা (পাঞ্জাবির প্যাকেটটা হাতে দিল), তুমি কিছু মনে করো না। আজ চাকরির প্রথম বেতন পেলাম কিনা, তাই-।

বাবা: এটা তোর উচিত হয়নি।

নিশাত: কেন বাবা?

বাবা: এই বৃদ্ধ বয়সে তোর উপার্জনের টাকায় আমি খাব-পড়ব- কোনোদিন ভাবতেও পারিনি। আসলে বুঝলি মা, আমাদের কারো জীবনে আত্মসুখ বলে কিছু নেই। যা আছে, সবই কেমন যেন ছাড়া-ছাড়া, কেমন যেন এক একটা, এক একটা-।

নিশাত: তুমি এমন করছ কেন বাবা?

বাবা: কই, না তো! (চোখের পানি চাদরে মোছেন) তুই ঠিকই করেছিস মা। আমি খুব খুশি হয়েছি, খুব খুশি-।

(বলতে বলতে প্রস্থান)

সিফাত: তাহলে এবার আমারটা দে-না আপা।

মাসুম: আমারটা-।

নিশাত: এই নে-। (দুজনের হাতে দুটি প্যাকেট দেয়)

সিফাত: (প্যাকেট খুলে কামিজটা বের করে গলার সাথে ধরে) বাঃ কি সুন্দর। যা মানাবে না আমাকে!

মাসুম: (খুলে বের করে গায়ে দেয়) ওহ্ আপা, তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দিব-। তোমার কোলে চড়তে ইচ্ছে করছে। (বলেই দৌড়ে প্রস্থান করে। ওরা দুজন হাসতে থাকে)

সিফাত: আচ্ছা আপা, আমাদের জন্য তো এনেছিস, কিন্তু তোর জন্য কী আনলি?

নিশাত: কেন, আমার কি কিছু নেই নাকি?

সিফাত: আমার বুঝি নেই?

নিশাত: আছে, তবে তুই কলেজে যাস। একটু ভালো পোশাক না হলে-।

সিফাত: তুইও তো অফিসে যাস।

নিশাত: কিন্তু অফিস আর কলেজ তো এক নয়।

সিফাত: না হলো? ঠিক আছে, আমিও এটা পড়ব না। (রাগ করে উঠে যায়)

নিশাত: কি রে রাগ করছিস? এই দাঁড়া, শোন, শোন-।

(সিফাত ফিরে দাঁড়ায়)

সিফাত: বল, কী বলবি।

নিশাত: এদিকে আয়, বস। (সিফাত এসে নিশাতের পাশে বসে। নিশাত ওর মাথায় হাত দেয়) এভাবে রাগ করতে আছে নাকি? আমার এবার হলো না, আগামী মাসে অবশ্যই হবে। তুই কিচ্ছু ভাবিস না। বেঁচে থাকলে সবকিছুই হবে। ঝড়-ঝঞ্ঝা নিয়েই তো জীবন, এভাবেই আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে।

সিফাত: কিন্তু আমার খুব ভয় করে আপা। আমার কেবলই মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমরা যেন বারবার হেরে যাচ্ছি।

নিশাত: পাগলি! হারলেই তো জিতের প্রশ্ন ওঠে রে। জিতের জন্য প্রাণ আকুপাকু করে। তুই দেখে নিস আমরা একদিন না একদিন ঠিকই জিতব।

সিফাত: কিন্তু সে সুদিন আমাদের জীবনে কবে ফিরবে কে জানে।

নিশাত: ফিরবে নিশ্চয়ই। তুই-ই দ্যাখ, এই তো সেদিন মা মারা গেল, দেখতে দেখতে এক যুগ পার হয়ে গেল। তখন তো আমরা ভেবেছিলাম মা না-থাকা মানে আমাদের সংসারের সবাই না-থাকা। কিন্তু দ্যাখ, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে গেল, এখন মাকে আর তেমন মনেই পড়ে না। আসলে এটাই নিয়ম, বুঝলি? কিন্তু আমরা যা ভাবি, তা যে সম্পূর্ণ নিয়মের ব্যতিক্রম- এটা কিন্তু ভাবি না।

সিফাত: এসব তুই কী বলছিস আপা? বাবাও যেন আজকাল কেমন হয়ে যাচ্ছে- কী সব উদ্ভট কথা বলে।

নিশাত: যখন চেতনা সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন উদ্ভট কথা ছাড়া সে আর কী বা বলতে পারে। তোরও তো বুদ্ধি কম হয়নি সিফাত। একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবি, বাংলাদেশের কোন মানুষটা কী চায়। কেউ চায় টাকা-পয়সা, ঐশ্বর্য, কেউ চায় জায়গা-জমি, বাড়ি-গাড়ি, কেউ চায় শুধু মনুষ্যত্ব এবং মানবতা বোধ, প্রেম, ভালোবাসা। কিন্তু জানিস, কোনো কিছুতেই কেউ তৃপ্ত হয় না। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই।

সিফাত: তাই বলে আমরা কি কিছুই চাইতে পারি না আপা?

নিশাত: হ্যাঁ চাইবি, তবে পৃথিবীর কিছু নয়- একটা আকাশ, গাঢ় নীল আকাশ, উদার আকাশ।

(নিশাতের চোখে পানি আসে

সিফাত: সে কি! তুই কাঁদছিস আপা?

নিশাত: কই না তো। (হেসে চোখ মোছে)

সিফাত: আমাকে মিথ্যে বলিস না, ফের যদি তোকে কাঁদতে দেখি-। দ্যাখ আপা, তুই আমাদের দুজনের কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিস, তার মধ্য থেকেই কত কষ্ট করে লেখাপড়া শিখেছিস। এখন যদি তোর চোখে পানি দেখি-। আমরা, আমরা-।

নিশাত: (সিফাতকে ধরে) যা তো, ভেতরে যা, দ্যাখ বাবা কী করছে। কাঁদিস না, যা-।

(কোনো কথা না বলে ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সিফাত চলে যায়। নিশাত একটা বই হাতে নিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। একটু পর বাবাকে আসতে দেখে উঠে বসে)

বাবা: কি মা, এই অসময় শুয়েছিলি যে! শরীর খারাপ না তো?

নিশাত: না বাবা। সারাদিন অফিস করে, বেশ ক্লান্ত বোধ করছিলাম-। (উঠে দাঁড়ায়)

বাবা: তাই বুঝি এই সন্ধ্যায় শুতে হয়। এতে শরীর আরও খারাপ করে।

নিশাত: তুমি আমাকে নিয়ে ভেবো না বাবা।

বাবা: তোকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম মা-।

নিশাত: কী কথা বাবা!

বাবা: তুই যে অফিসে চাকরি করিস, সেখানকার লোকেরা-।

নিশাত: খুব ভালো বাবা। কোনো অসুবিধা নেই আমার। আমাদের বড় সাহেব এস. কাদির খুব ভালো লোক- আমার কাজের খুব প্রশংসা করেন তিনি।

বাবা: সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু-।

নিশাত: কিন্তু কী বাবা?

বাবা: না, মানে আমি বলছিলাম কি, আমরা আমাদের নিজেদেরই আজ পর্যন্ত ভালো করে চিনতে পারিনি। অন্য কাউকে এত সহজে চেনা বেশ দুরূহ ব্যাপার।

নিশাত: তুমি কিছু ভেবো না বাবা, আমি সব ঠিক করে নেব।

বাবা: ভাবতে চাই না, কিন্তু ভাবনা যে এসে যায় মা। জানিস মা, আমার এই ঘুণ ধরা চোখ দুটো কী যেন দেখতে পায়। আমি পরখ করতে চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না। আমি সে জিনিসগুলো দেখতে পাই না। শুধু দেখি বিশাল সমুদ্র, কী ভয়ঙ্কর তরঙ্গ- যেন, যেন ওরা আমাদের গ্রাস করতে ছুটে আসছে। আমরা পালাচ্ছি, দ্রুত পালাচ্ছি ঠিকানাহীন পথ আমাদের ধারণ করে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হয়, মনে হয় আমরা যেন অভিশপ্ত। আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের চেতনা কাঙালের মতো কাঁদছে। তবু আমরা সবাই ছুটে পালাচ্ছি, পালাচ্ছি-।

নিশাত: তুমি যে আজকাল কী সব বলতে শুরু করেছ না বাবা, তোমার কথা কিছুই বুঝি না।

বাবা: বুঝবি, বুঝবি। খুব ভালো করে বুঝবি এবং আমার কথাগুলো তুই নিজেও বারবার উচ্চারণ করবি।

নিশাত: তুমি এমন করে কথা বলো কেন বাবা?

বাবা: আমি বলি না, আমাকে দিয়ে বলানো হয়। স্বপ্ন, প্রত্যাশা, এরা সবাই এক একটি সত্তা- জানিস মা, ওরা আমাকে প্রশ্ন করে। কখনো জবাব দেই, কখনো দেই না। আমার চেতনার মধ্যে কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ঐ সমুদ্র আমি ভরাট করে ফেলি, অথবা তরঙ্গগুলোকে ভেঙে খান খান করে ফেলি, কিন্তু পারি না- শেষে যদি আমি সেখানে হারিয়ে যাই। (হেসে) আচ্ছা দ্যাখ তো মা, তোকে কী সব শেখাচ্ছি।

নিশাত: কেন বাবা, ভালোই তো লাগছে শুনতে।

বাবা: হ্যাঁ, ভালো লাগছে। না রে তুই মিথ্যে বলছিস, বাবাকে সান্ত¡না দেবার জন্য মিথ্যে বলছিস। আমি জানি পৃথিবীর কারো কাছে আমার কথা ভালো লাগে না।

নিশাত: আচ্ছা বাবা, তুমি কিছু প্রত্যাশা করো না?

বাবা: হ্যাঁ করি, তবে-, তবে-।

নিশাত: তবে কী বাবা?

বাবা: (প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে) তুই কিন্তু অনেক রাত জেগে কবিতা পড়িস।

নিশাত: তোমার ঘুমের অসুবিধা হয় বুঝি!

বাবা: ঘুমাবার আর সময় পেলাম কোথায়। বরং তোর কবিতা আমাকে চিন্তামুক্ত করে রাখে।

নিশাত: ঠিক আছে, আজ থেকে না হয় জোরে জোরে আর কবিতা পড়ব না।

বাবা: আহা! আমি কি ‘না’ করেছি নাকি?

নিশাত: বাবা, তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছো।

বাবা: ও- হ্যাঁ, হ্যাঁ-। তা কী যেন প্রশ্নটা?

নিশাত: প্রত্যাশা।

বাবা: হ্যাঁ প্রত্যাশা। প্রত্যাশা শুধু একটি জিনিসই- পৃথিবীর কেউ যা চায় না-। একটি আকাশ, গাঢ় নীল আকাশ, উদার আকাশ।

নিশাত: বাবা!

বাবা: কি মা, এমন করে উঠলি যে!

নিশাত: না বাবা, কিছু না।

বাবা: যাও, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ওজু করে নামাজ পড়ে নাও। (বলেই বাবা প্রস্থান করেন ধীরে ধীরে)

নিশাত: বাবার প্রত্যাশা, আমার প্রত্যাশা, আমাদের প্রত্যাশা- একটা আকাশ, গাঢ় নীল আকাশ, উদার আকাশ।

[পর্দা পড়বে]

দ্বিতীয় দৃশ্য

[একটি অফিস কক্ষ। পর্দা সরালে দেখা যাবে কাদির সাহেব চেয়ারে বসে কাজ করছেন। একটু পর নিশাত প্রবেশ করবে]

নিশাত: আমাকে ডেকেছেন স্যার?

কাদির: হ্যাঁ, বসুন। (নিশাত চেয়ারটা টেনে বসে) তা কাজকর্ম কেমন চলছে?

নিশাত: ভালো স্যার।

কাদির: শুনলাম আপনি নাকি আমাদের অফিসের নাটকে অভিনয় করছেন না।

নিশাত: জি না স্যার।

কাদির: কেন-? (নিশাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন)

নিশাত: স্যার বাস্তব অভিনয়টাই শুদ্ধভাবে করতে পারছি না, মিথ্যে অভিনয় করতে গেলে তো-।

কাদির: কিন্তু অনেক সময় মিথ্যে অভিনয়টাই তো বাস্তবের পথ নির্দেশ করে।

নিশাত: করতে পারে স্বীকার করি, কিন্তু অস্বীকৃত বাক্যগুলো বলতে আমার হিংসায় বুক জ্বলে স্যার। মনে হয়, মনে হয় সমস্ত যুগ-যুগান্তের ক্লান্ততা আমার মধ্যে হাহাকার ডেকে আনে, আমি যেন ঢেউয়ের তালে তালে ভাসতে থাকি।

কাদির: আপনার অসুবিধা না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমাদের অসুবিধার দিকে একবার তাকানো উচিত।

নিশাত: স্যার পৃথিবীতে ‘উচিত’ বলে অনেক কিছুই আছে যেগুলো অবহেলা না করলে জীবন সুন্দর হয় না, মনুষ্যত্ব বিকাশ হয় না, হৃদয়ের খোরাক মেটে না।

কাদির: আপনি তাহলে আপনার জীবনকে সুন্দর করতে, মনুষ্যত্ব বিকাশের লক্ষ্যে, হৃদয়ের খোরাক মেটাতে উচিতগুলোকেও অস্বীকার করছেন?

নিশাত: জি না স্যার, আমি আমার নিজের কথা বলছি না।

কাদির: তাহলে?

নিশাত: মনে করতে পারেন, আমি আপনার কথাও বলছি।

কাদির: আমার কথা!

নিশাত: কেন স্যার, আশ্চর্য হলেন নাকি?

কাদির: না, আশ্চর্যের কি আছে। কিন্তু আমার কথা সুন্দরভাবে আপনি বলতে পারবেন, তা আমি ধারণাই করতে পারিনি।

নিশাত: স্যার মাঝে মাঝে মনে হয় সুন্দর করেই বলছি, কিন্তু সেগুলো পরবর্তীকালে এত অসুন্দর রূপ নেয় যে, ভাবতেও অবাক লাগে।

কাদির: কিন্তু আমি বলছি, আপনি আমার কথা জানলেন কী করে?

নিশাত: নিজের কথা যেভাবে জেনেছি।

কাদির: নিজের কথা জানতেও কি পরিশ্রম করতে হয়?

নিশাত: হয় বৈকি! নিজেকে জানাই তো বড় কঠিন স্যার। এই কঠিনটাকে একবার তরলে আনতে পারলে পৃথিবীতে যা কিছু হয়, যা কিছু ঘটে সবই জানা যায়। কিন্তু আমরা কেউ সেটা পারি না স্যার, কেউ পারি না। আমি, আপনি সবাই কেমন যেন একটা হতাশা নিয়ে ভুগি, যার ফলে আমরা আমাদের জানতে পারি না।

কাদির: আপনি তবুও জেনেছেন কিছু, কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত কিছুই জানতে পারলাম না।

নিশাত: এটা কিন্তু আপনি হার মানা কথা বলছেন।

কাদির: (হেসে) না, না, হার মানা নয়- সত্যিই বলছি।

নিশাত: সত্য বললেও আমি বিশ্বাস করি না। কারণ, নিজের চোখের দিকে তাকালে যেমন কিছুই দেখা যায় না, তেমনি নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে কথা বললেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। তবে স্যার অনুভব করা যায়, হৃদয়ে সারাক্ষণ কম্পন চলছে, নিঃশ্বাস ওঠানামা করছে-। এই যা, দেখুন তো কী সব বাজে বলছি আপনাকে। কিছু মনে নেবেন না স্যার।

কাদির: না, না, কী মনে করব। আসলে আপনার কথাগুলো কিন্তু খুব সুন্দর।

নিশাত: আপনার কথা আরও সুন্দর।

কাদির: আচ্ছা, বলতে পারেন, এই রকম সুন্দর কথা একটা মানুষের মুখ থেকে কখন উচ্চারিত হয়?

নিশাত: যখন সে নিজের মধ্যে কতকগুলি প্রশ্ন সৃষ্টি করে, কিন্তু তার উত্তর কোথাও খুঁজে পায় না, কেবলই হাতড়াতে থাকে আর প্রশ্নগুলো প্রকাশের জন্য ছটফট করে।

কাদির: ঠিক ধরেছেন। আসলে আমি কিছুটা সেরকম হয়ে গেছি। আমি বলতে চাই, জানেন, আমি বলার জন্য ছটফট করি, কিন্তু পারি না, জোর করে বলতে গেলেও মনে হয়, মনে হয় কে যেন আমার টুঁটি চেপে ধরেছে-। এক একবার না আমার আজরাইলের কথা মনে পড়ে যায়।

নিশাত: স্যার মৃত্যুকে আপনি এত ভয় পান?

কাদির: মৃত্যুকে নয়, বলতে পারেন আমার বলাকে আমি ভয় পাই।

নিশাত: আমি জানি আপনি কী বলতে চান।

কাদির: আপনি জানেন? তাহলে বলুন না আমি কী বলতে চাই?

নিশাত: কিন্তু তার আগে আপনার জানা দরকার, এত সহজে কোনো নারী কেঁদে ফেলতে পারে না, কোনো প্রেমিক প্রেম নিবেদন করতে পারে না, কোনো যুবক প্রকৃত যৌবন পায় না। আমি এখন যাই স্যার, অনেক কাজ পড়ে আছে।

কাদির: আচ্ছা ঠিক আছে। (নিশাত উঠতে গেলে) শুনুন, যে চিঠিটা করতে বলেছিলাম, ওটা হয়েছে কী?

নিশাত: স্যার ড্রাফ্ট লিখেছি, এখন শুধু টাইপ করা বাকি। আসলে ওখানে স্যার দুজনের কাজ একা করতে হচ্ছে। তাই আমি বলছিলাম একটা লোক নিযুক্ত করলে-।

কাদির: লোকটা হ্যান্ডসাম যুবক হতে হবে বুঝি!

নিশাত: স্যার আমি কি এমন বলেছি যে ওখানে পুরুষ লোকের প্রয়োজন? আপনি ইচ্ছা করলে তো মহিলাও দিতে পারেন। ‘লোক’ বলতে তো পুরুষ বুঝায় না স্যার, ম্যানপাওয়ারের মধ্যে স্ত্রীলোকেরও অধিকার আছে।

কাদির: ঠিক আছে, অত আর লিঙ্গান্তর করে বুঝাতে হবে না, আমি মহিলাই দেব।

নিশাত: তাহলে আমি যাই স্যার (একটু গিয়ে আবার ফিরে দাঁড়ায়)। আর একটা কথা স্যার, মানে-।

কাদির: আহা, বলে ফেলুন না।

নিশাত: আপনি আমাকে ডাকিয়ে এনে এভাবে গল্প করেন, তা অফিসের লোকে কেউ পছন্দ করে না।

কাদির: কেন, কেউ কিছু বলেছে নাকি?

নিশাত: না স্যার বলেনি, তবে-।

কাদির: তবে আবার কী? সবাইকে বলে দেবেন, কারো পছন্দ অপছন্দ বিবেচনা করে এখানে চাকরি করতে আসিনি। তাছাড়া আমি তো আর আপনাকে নিয়ে প্রেমের আলাপ করছি না, জাস্ট অফিসিয়াল আলোচনা।

নিশাত: ঠিক আছে, আমি যাই স্যার। (প্রস্থান)

(কাদির একটু পর কলিং বেল টিপবেন এবং পিয়ন শামসুদ্দিন প্রবেশ করবে)

শামসু: জি স্যার।

কাদির: সরোয়ার সাহেবকে সালাম দাও-।

শামসু: যাচ্ছি স্যার। (প্রস্থান)

(হেড ক্লার্ক সরোয়ার সাহেব প্রবেশ করে সালাম দেবে)

সরোয়ার: ডেকেছেন স্যার?

কাদির: হ্যাঁ। বিলটা চেক করে হেড অফিসে পাঠানো হয়েছে?

সরোয়ার: স্যার এখন পর্যন্ত সেটা টাইপ করাই হয়নি।

কাদির: টাইপ করা হয়নি তো আপনি করলেন কী? ওদের তাগাদাও দিতে পারেন না?

সরোয়ার: পারি তো, কিন্তু স্যার আমার কথা শোনে কে? এখন কি সেই যুগ আছে? আমরা যখন আগে-।

কাদির: রাখেন আপনার আগের কথা। ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তান গেছে, এখন বাংলাদেশ, সুতরাং এই বাংলাদেশকে নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে।

সরো: তা তো ঠিকই স্যার, কিন্তু-।

কাদির: কিন্তু আবার কী? যান, ওটা তাড়াতাড়ি করতে বলুন।

সরো: যাবো স্যার, কিন্তু একটা কথা।

কাদির: কী কথা?

সরো: স্যার, মানে স্যার আপনি কোনোদিন এত ধমকিয়ে কথা বলেননি কিনা- তাই-।

কাদির: তাই কী হয়েছে? আগে ধমক দিইনি বলে এখন দেয়া যাবে না এ কথা তো কোথাও লেখা নেই। সময় বিশেষে সব কিছুই করতে হয়। যান এখন।

সরো: (কেঁপে) যাচ্ছি স্যার। (চলে যেতে উদ্যত)

কাদির: শুনুন। (সরোয়ার পেছন ফিরে দাঁড়ায়)

সরো: জি স্যার।

কাদির: আচ্ছা, সরোয়ার সাহেব, আপনি তো এই অফিসে দীর্ঘদিন কাজ করছেন এবং বেশ ধার্মিক লোক-।

সরো: জি স্যার জি, কোনো প্রমোশন-ট্রমোশন-।

কাদির: না, আমি প্রমোশনের কথা বলছি না, তবে কিছুদিনের মধ্যেই প্রমোশন আপনার হবে।

সরো: সে আপনার দয়া স্যার।

কাদির: আমি এখন বলছিলাম অফিসের কথা।

সরো: জি স্যার, অফিসের কথা।

কাদির: মানে অফিসে আমাকে আর নিশাতকে নিয়ে কোনো আলোচনা বা সমালোচনা হয় কি-না?

সরো: স্যার, স্যার-।

কাদির: স্যার স্যার করছেন কেন, বলে ফেলুন না হয় কিনা?

সরো: জি স্যার, হয় স্যার। (মাথা ঝুলিয়ে)

কাদির: কী ধরনের?

সরো: স্যার আমি তো ওদিকে খুব একটা কান দেই না। তবে যা শুনি, সবাই বলাবলি করে, বিয়েটা হলে তৃপ্তিসহ একবেলা খাওয়াটা-।

কাদির: খাওয়ার ওপরই এত লোভ?

সরো: শুধু কি খাওয়া স্যার? আমোদ-প্রমোদ-।

কাদির: চুপ করুন। (সরো চমকে ওঠে) ফের যদি অফিসে এরকম আলোচনা হয়, আমাকে বলবেন- আমি দেখব কী করা যায়। যান-।

সরো: যাচ্ছি স্যার। (প্রস্থান) (কাদির উঠে দাঁড়ান)

কাদির: নাহ, আর পারা গেল না। সবকিছুতে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভাবনার হৃৎপিণ্ড যেন বারবার ভেঙেচুরে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। অথচ এক আমি, আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছি। জীবনের যত কাক্সিক্ষত পুষ্পরাশি- ওরা সবাই আমার স্পর্শের আগেই ঝরে যাচ্ছে। আমি কী করে বলি, সে পুষ্প দিয়ে সাজাব একটি ছোট্ট ঘর, সুন্দর ঘর- যেখানে নিশাত না হোক, অন্তত একটি নারী আমার জন্য অপেক্ষমাণ।

না, তা হয় না। তা কখনো হয় না। আমাকে আমি যেভাবে পেয়ে আসছি সেভাবেই পেতে চাই। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? একটি মানুষের জীবনে কি কোনো স্বপ্নই থাকে না? কোনো প্রত্যাশাই থাকে না?

(নিশাত একটা কাগজ হাতে প্রবেশ করে)

নিশাত: কী ভাবছেন স্যার?

কাদির: কই, কিছু না তো!

নিশাত: স্যার আমার বাবাও কিন্তু অনেক কিছু লুকাতে গিয়ে ধরা পড়ে যান।

কাদির: আর আমি যদি ধরা পড়ি-?

নিশাত: ধরা তো আপনি অনেক আগেই পড়েছেন।

কাদির: তাহলে এতদিনেও সেটা চাপা আছে কেন?

নিশাত: কতকগুলি কথা আছে, চাপা থাকার জন্যেই ধরা পড়ে। এই নিন স্যার, চিঠিটা হয়ে গেছে। (কাগজটি কাদিরের হাতে দিল) দেখুন তো স্যার ঠিক আছে কিনা। (কাদির একটুক্ষণ দেখে)

কাদির: হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। (চেয়ারে বসে)

নিশাত: তাহলে আমি যাই স্যার।

কাদির: যাবেন তো বটেই, একটু বসেন না।

নিশাত: কেন, কোনো কথা আছে স্যার? (নিশাত বসে)

কাদির: থাকলেও সে কথা আপনাকে বলা যায় না, তা তো অনেকবার বলেছি। কিন্তু তবুও আপনাকে বসতে বলার উদ্দেশ্য, যদি কখনো সেই আজরাইলটাকে ধোঁকা দিয়ে একবার বলে ফেলতে পারি।

নিশাত: স্যার আপনি কি মনে করেন, আপনি বলতে পারলেই নিষ্কৃতি পেয়ে গেলেন?

কাদির: তা ঠিক মনে করি না। তবে ভাবি, দৈববশে যদি কখনো কোনো সান্ত¡নার ইঙ্গিত পাই-।

নিশাত: দৈববশে কিছুই হয় না স্যার, আর হলেও ক্ষণস্থায়ী- অকালে যার রূপ হারায়।

কাদির: তাহলে কোনো উপায় আছে কি?

নিশাত: কিসের উপায় স্যার? মানে আপনি কার কথা বলছেন?

কাদির: আমার-আপনার সবার কথা-। আচ্ছা, যদি এমন হতো আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হতো না তাহলে আমি যেমনটি ছিলাম, হয়তো সারাটা জীবন তেমন থাকতাম।

নিশাত: কিন্তু পরিচয় হওয়াতে আপনার পরিবর্তনটা কোথায়?

কাদির: পরিবর্তন ঠিক নয়, তবে কথা-।

নিশাত: কথার পরিবর্তন আমার বদলে অন্য কেউ এলেও হতো।

কাদির: হলেও অন্যভাবে। কারণ আপনার মতো কেউ বলতে পারত না।

নিশাত: স্যার আপনি কিন্তু বড্ড বাড়িয়ে বলেন।

কাদির: এতে আর বাড়িয়ে বলার কী আছে?

নিশাত: কিছু নেই জানি, তবে কোনো কিছু পাবার প্রত্যাশায় অনেকেই অনেকভাবে চেষ্টা করে।

কাদির: তাই বলে আমি যে আপনাকে-। বয়সের পার্থক্যটাও তো বিবেচনার মধ্যে থাকা দরকার, নাকি বলেন?

নিশাত: স্যার, কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

কাদির: হ্যাঁ, করুন।

নিশাত: আপনার স্ত্রী বুঝি আপনাকে ভালোবাসে না? (কাদির যেন বিরাট একটা ধাক্কা খেলেন)

কাদির: (মৃদু হেসে) বাসবে না কেন? জানেন, ও আমাকে এখনো বলে, ‘তুমি আছ তাই জীবন আছে, প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে; তুমি আছ তাই পৃথিবীতে আমার সবকিছু পড়ে আছে’।

নিশাত: তাহলে তো স্যার আপনার এমন করে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না।

কাদির: প্রশ্ন যে কেন ওঠে-। ঠিক আছে, আপনি এখন কাজ করুন গিয়ে।

নিশাত: যাচ্ছি স্যার, কিন্তু আপনি আমার কাছে অনেক কিছুই লুকোলেন যা চিরন্তন সত্য। (প্রস্থানোদ্যত)

[পর্দা পড়বে]

তৃতীয় দৃশ্য

[নিশাতদের বাড়ির ওপর তলা। কামালের কক্ষ। একটি খাট ও তার পাশে চেয়ার টেবিল পাতা। ড্রেসিং টেবিলের পাশে একটি আলনায় কামালের পোশাক পরিচ্ছদ। খাটের ওপর শুয়ে কামাল একটি উপন্যাস পড়ছে। নিশাত এসে পাশে দাঁড়াল।]

নিশাত: আমি এসেছি। (কামালের কোনো সাড়া না পেয়ে একটু জোরে বলল) আমি এসেছি।

কামাল: (বইয়ের দিক চোখ রেখেই) বসো।

নিশাত: (বসে কামালের পাশে) আপনার বাড়ি ভাড়ার টাকাটা দিতে এলাম। এই যে বাড়িওয়ালা, শুনছেন? আপনার বাড়ি ভাড়ার টাকাটা-।

কামাল: রেখে দাও।

নিশাত: কি আশ্চর্য! বাড়িওয়ালারা ঘুরে ঘুরে টাকা আদায় করতে পারে না ভাড়াটের কাছ থেকে, আর আমাদের বাড়িওয়ালা কি-না-। এই যে মশাই, শুনছেন? আপনার বাড়ি ভাড়ার টাকাটা-।

কামাল: বললাম তো, রেখে দাও।

নিশাত: কেন, হাতে নেবেন না? (কামাল কোনো কথা না বলে টাকাগুলো নিশাতের কাছ থেকে নিয়ে বালিশের নিচে রেখে আবার উপন্যাসে মন দেয়)। গুনে দেখলেন না ঠিক আছে কিনা?

কামাল: প্রয়োজন নেই। (নিশাত কিছুক্ষণ বসে থাকে)

নিশাত: আচ্ছা কামাল ভাই, আপনি এত ভাবুক কেন, বলুন তো? বাংলাদেশে কি আর কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই? দ্যাখেন গিয়ে তারা কী করছে-।

কামাল: কী করছে?

নিশাত: যারা প্রেম করেনি, প্রেম করছে; যারা বিয়ে করেনি, বিয়ে করছে। সংসার করছে, হাটবাজার করছে- করছে না-টা কী বলুন তো?

কামাল: তাহলে আমাকে এখন কী করতে বলো?

নিশাত: ঘোড়ার ডিম করতে বলি, ঘোড়ার ডিম-।

কামাল: বেশ তো, তুমি যখন বলছ, সময়-সুযোগ হলে তাই করা যাবে।

নিশাত: বড্ড বেরসিক লোক আপনি।

কামাল: কী করি বলো, রসিক হবার গুণগুলো তো খুঁজে পাই না।

নিশাত: একবার গঙ্গা-স্নান করে এলেই তো হয়।

কামাল: যাদের গায়ে ফোসকা পড়েছে, তারা গেলেই পারে-।

নিশাত: হুঁ, আমার গায়ে ফোসকা পড়তে বয়েই গেছে।

কামাল: তাহলে আর অত গঙ্গা-স্নানের প্রশ্ন কেন?

নিশাত: ডুবে মরার জন্য, বুঝলেন? ডুবে মরার জন্য।

কামাল: গঙ্গায় মরলে আবার মাটির অভাব হবে।

নিশাত: থাক হয়েছে, অত আর সাধুতা দেখাতে হবে না। এখন বলুন-

কামাল: কী বলব?

নিশাত: আমার মাথা।

কামাল: ঠিক আছে, তাই বলছি- (কবিতার সুরে বলে)

নিশাতের মাথা,

রাতদিন অকারণে করে শুধু ব্যথা।

জানি না কী চায়,

মিছে মিছে ঘোরে পিছে কার প্রত্যাশায়?

নিশাত:হুঁ, কারো পিছে ঘুরতে আমার মাথার বয়েই গেছে। তবে, মাঝে মাঝে একটু ইচ্ছে করে-।

কামাল: কী ইচ্ছে করে?

নিশাত: কাউকে ভালোবেসে ফেলি।

কামাল: বেশ তো, বাসো না?

নিশাত: কিন্তু উদাসীন মানুষ আমার একদম পছন্দ হয় না।

কামাল: তাহলে, যে উদাসীন নয়, তাকে খোঁজ করো। (এখনও পাঠে মন থাকে)

নিশাত: খোঁজ করে যে দূরে যাওয়া যায় না। খুব বেশি দূরে গেলেও নিচের তলা থেকে এই ওপর তলা পর্যন্ত ওঠা যায়।

কামাল: নিশাত! (বই রেখে দেয়)

নিশাত: আমিই ঠিকই বলছি কামাল ভাই (বিষণœতায়)। দোতলার ওপরের সিঁড়িগুলো কে যেন ভেঙে ফেলেছে, যাতে আমি আর ওপরে না উঠতে পারি।

কামাল: আমি যদি তোমার জন্য নতুন করে ওপরের সিঁড়িগুলো গড়ে দেই-।

নিশাত: সে কৃপা আমি আপনার কাছে কোনোদিন চাইব না। আমার প্রয়োজন নেই কামাল ভাই, আমার প্রয়োজন নেই।

কামাল: কিন্তু আমি এখন এই মুহূর্তে কী করতে পারি?

নিশাত: কিছু করতে পারেন না, সে আমি জানি। আবার যে, না পারেন এমনও তো কিছু নেই।

কামাল: তুমি হয়তো আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানো না।

নিশাত: অজানাও তো অনেক কিছুই নেই। (দরজার পাশে এসে দাঁড়াবে বাড়ির পুরাতন ভৃত্য রহমত আলী)

কামাল: আমিও যে আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি না নিশাত। আচ্ছা বলতে পারো, আমি কে? কী আমার পরিচয়? রহমত চাচাও কোনোদিন বলল না। (রহমতের চোখে জল আসে) আমি জানি, আমার মৃত্যু পর্যন্তও এ রহস্য থেকে যাবে।

নিশাত: না কামাল ভাই, না। দেখবেন ঠিকই একদিন না একদিন আমরা আমাদের রহস্যের সমাধান পেয়ে যাব।

কামাল: কিভাবে?

নিশাত: তা জানি না, তবে জানি সত্যের পরিচয় একদিন হবেই।

(রহমত গামছায় চোখ মোছে)

কামাল: তোমার এ আশ্বাস দেওয়া মানে অলীক আলোর পিছে ছোটা ছাড়া আর কিছু নয়।

নিশাত: অলীক আলোই তো আমাদের সব কিছুর সন্ধান দেবে কামাল ভাই।

কামাল: যতই দিক, মাকে ‘মা’ ডাকার অধিকার, বাবাকে ‘বাবা’ বলার অধিকার কোনোদিন দিতে পারবে না- আমি যাদের স্নেহের কাঙাল।

(রহমতের চোখ দিয়ে দ্রুত জল পড়তে থাকে)

তবু যদি একবার শুধু বলতে পারতাম, ‘আমি স্বপ্ন চাই না, আমি সত্য চাই।’

নিশাত: কেন? মানুষ তো শুধু স্বপ্নই দেখতে চায়।

কামাল: পৃথিবীতে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই যে, আমার সঙেঙ্গ তার উপমা চলে। আচ্ছা, সে যাকগে, তোমার চাকরি কেমন চলছে তাই বলো।

নিশাত: ভালো।

কামাল: শুনেছি বেতনও নাকি বেশ।

নিশাত: হ্যাঁ, সবকিছু মিলে দু হাজার।

কামাল: তাহলে তো ভালোই।

নিশাত: ভেবেছিলাম আপনাকে একদিন দাওয়াত করে খাওয়াব।

কামাল: তা কী হলো?

নিশাত: আপনি কথাই বলতে চান না। এই ধরেন আজ যেমন বললেন, এমন করে বললে-।

কামাল: আহা, কথা না হয় কম বলি, তাই বলে দাওয়াতটা কি মিস যাবে?

নিশাত: ঠিক আছে, একদিন আচ্ছামতো খাইয়ে দিব।

কামাল: সেটা তো পরে হবে, এখন বসো, চা খাও। (রহমতকে ডাকে)

রহমত চাচা, রহমত চাচা। (রহমত এগিয়ে কাছে আসে)

রহমত: কিছু বলছ বাবা?

কামাল: হ্যাঁ, দুকাপ চা-। (চোখের দিকে তাকিয়ে) সে কি, তুমি কাঁদছিলে বুঝি?

রহমত: না, না, কাঁদছি কই? মানে-।

কামাল: দ্যাখো, এরকম কান্নাকাটি আমি পছন্দ করি না।

রহমত: ঠিক আছে, তুমি যখন পছন্দ করো না, তখন বাদ দেব।

(রহমত ধীরে ধীরে প্রস্থান করে)

নিশাত: কী ভাবছেন কামাল ভাই?

কামাল: কিছু না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমরা যেন সবাই কেমন হয়ে যাচ্ছি। সারা বাংলাদেশটা কেমন যেন হাহাকারে ছুটছে। গ্রহ, উপগ্রহ সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওরা সবাই আমাদের কাছে কী যেন একটা প্রতিবাদ নিয়ে আসছে, আমরা ভয়ে এগুতে পারছি না। এগুতে গেলে পা যেন অবশ হয়ে আসে। আর ঐ যে শুনছ পাখির কলরব, ওটাকে আমরা বলি গান, কিন্তু আসলে জানো কী, ওটা গান নয়- আর্থিক দৈন্যে কিছু স্বার্থের উচ্চারণ। আচ্ছা নিশাত বলতে পারো, এমন হয় কেন?

নিশাত: কি জানি বাবা, আমি এতসব বুঝি-টুঝি না।

কামাল: তা ঠিক, তুমি বুঝবেও না। কারণ তুমি তো জানো না, মায়ের কোল থেকে একটা শিশুকে কেড়ে নেয়া মানে মাকে কতটা অসহায় করা আর বাড়ন্ত শিশুটিকে নৈসর্গিক নিয়মানুযায়ী বেড়ে উঠতে না দেয়া। এমন একটি শিশুকে নিয়ে যদি তার জন্মদাতা বাবার বুকে কবর দেয়া হয়। তাহলে, তাহলে কী করতে পারে সে শিশু? তার মা? তার বাবা?

নিশাত: কিছুই পারে না স্বীকার করি, তবে তারা সবাই যে প্রতিটা মানুষের কাছে প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়াতে পারে, এটা তো স্বীকার করতেই হবে।

কামাল: কিন্তু তাতে কী লাভ?

নিশাত: লাভ-লোকসানের তো প্রশ্ন নয়, এখানে হচ্ছে অধিকারের প্রশ্ন, বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

কামাল: জন্ম নেয়া মানেই তো সেদিন থেকে মৃত্যুর প্রস্তুতি নেয়া।

নিশাত: এটা চিন্তা করলে মানুষ কখনো ঐশ্বর্য চাইত না, টাকা-পয়সা, অর্থ-সামগ্রী কিচ্ছু চাইত না।

কামাল: তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ, পৃথিবীর লালসায় বাধ্যগুলোকেও আমরা ভুলে যাই। (চা নিয়ে রহমত প্রবেশ করে টেবিলের ওপর রাখে) নাও চা-টা খেয়ে নাও।

(নিশাতকে এক কাপ দিয়ে নিজেও এক কাপ নেয়। রহমত দাঁড়িয়ে থাকে)

নিশাত: আপনি (চায়ে চুমুক দিয়ে) দিনে দিনে রোগা হয়ে যাচ্ছেন-।

কামাল: কই, আমার কাছে তো তেমন লাগে না।

নিশাত: নিজেরটা কি নিজের কাছে ধরা পড়ে?

কামাল: তা অবশ্য পড়ে না, কিন্তু অনুভব তো করা যায়। আমার সে অনুভবের বোধটাও নেই। তবে জানো নিশাত, মাঝে মাঝে সেই ব্যথাটা খুব করে বেড়ে ওঠে-।

নিশাত: তাহলে আমাকে ডাকেন না কেন?

কামাল: ডাকলে তুমি তো আবার স্থির থাকো না। জল ঢালা থেকে শুরু করে সেক দেওয়া পর্যন্ত কোনোটাই বাদ রাখো না।

নিশাত: কেন, তাতে দোষের কিছু আছে নাকি?

কামাল: নেই, তবে তুমি আমাকে নিয়ে অত পরিশ্রম করবে-।

নিশাত: সেটা আপনি চান না, এই তো? ঠিক আছে, আর কোনোদিন না হয় করব না। (চায়ের পেয়ালা রাখে) আমি কাঁদি মা’র জন্য, মা কাঁদে কার জন্য, হুঁ-।

কামাল: সে কি! রাগ করছ?

নিশাত: করব না? কেন করব না?

কামাল: রহমত চাচা, ওর রাগ একটু কমাতে বল তো! (পেয়ালা রাখে)

রহমত: (নিশাতের কাছে গিয়ে) কমাও মা, কমাও।

নিশাত: (হেসে) তাহলে বলেন, আজ সন্ধ্যায় আপনি নাটক দেখতে যাবেন। (রহমত চায়ের পেয়ালা নিয়ে প্রস্থান করে)

কামাল: কোথায়?

নিশাত: মহিলা সমিতি মঞ্চে।

কামাল: জানোই তো নাটক আমি পছন্দ করি না।

নিশাত: সে জন্যেই তো আপনাকে আমার-।

কামাল: ভালো লাগে না। (মুখ এগিয়ে এনে বলে)

নিশাত: হুঁ- (কামালের পিঠে কিল দেয়)।

কামাল: (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) আমাকে যে এখন একটু বাইরে যেতে হয়।

নিশাত: অফিস নেই, চাকরি-বাকরি নেই, বাইরে এত কী?

কামাল: পত্রিকা অফিসে যাব। একটা গল্প দিয়েছিলাম, জেনে দেখি সেটা ছাপা হবে কি-না।

নিশাত: কোন গল্প?

কামাল: ঐ যে, সেদিন যেটা তোমাকে পড়ে শুনালাম- ‘সুমা কী চায়’।

নিশাত: ‘সুমা কী চায়’ তো মজার গল্প। ছাপবে না কেন? না ছাপলে সম্পাদককে খুব জোরে একটা ঘুষি মেরে দেবেন।

কামাল: (হাসি দিয়ে) তোমার যে আজকাল কী ধারণা হয়েছে না, ঠিক সুমার মতোই কিছু চাওয়ার প্রত্যাশা।

নিশাত: হুঁ, ওরকম জোর করে ভালোবাসা চাইতে নিশাত পারে না, বুঝলেন?

কামাল: আচ্ছা না পারলে, কায়দা-কৌশল করে তো পারবে। (হাসি)

নিশাত: শুধু ঠাট্টা-। (কামাল নিজের ডান পা ডলে)

কামাল: আজ অমাবস্যা না-কি?

নিশাত: (কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে) না তো!

কামাল: তাহলে-।

নিশাত: মানে সেই পুরনো ব্যথাটা-। (পায়ে হাত দেয়)

নিশাত: ব্যথাটা বেড়েছে না-কি? কই দেখি, দেখি-।

কামাল: আরে না, না, বাড়েনি, কেমন যেন চিবুচ্ছে। রহমত চাচা, রহমত চাচা, আমার মালিশের কৌটাটা নিয়ে এসো তো।

(রহমত কৌটা নিয়ে প্রবেশ করবে)

রহমত: কত করে বললাম, একটা ডাক্তার দেখাও। তা নয়, শুধু মালিশ ঘষো, মালিশ ঘষো-। আরে মালিশে কি ব্যথা যায় নাকি? (নিশাতকে) তুমিই কও তো মা, মালিশে কি ব্যথা যায়?

নিশাত: যায়। দিন আমার কাছে দিন (হাত বাড়িয়ে কৌটা নেয়) আমি ডলে দিচ্ছি। (কৌটা খুলে মালিশ হাতে নেয়) কী হলো মশাই, পা’টা এগোন না?

কামাল: তুমি-।

নিশাত: কেন, লজ্জা করছে? অসুখের কাছে লজ্জা নেই, বুঝলেন? সম্বন্ধ আর স্পর্শের সম্পর্কও নেই। (পা’টা জোর করে টেনে নিয়ে মলম দিয়ে মালিশ করতে থাকে)। আপনি কী বলেন রহমত চাচা? আমি কি মিথ্যে বলছি? (ডলতে থাকে)

রহমত: মিথ্যে হবে কেন? ঠিকই। তুমি ঐ উল্লুক ছোড়ার কথা শুনো না তো মা? ডলতে থাকো, ডলতে থাকো, ভালো করে ডলতে থাকো। (বলতে বলতে রহমতের প্রস্থান। নিশাত ডলতেই থাকবে।)

[পর্দা পড়বে]

সংযোজিত দৃশ্য

[কাদির সাহেবের দোতলা বাড়ির নিচতলার ড্রয়িং রুম। পেছনে দেয়ালে টাঙানো কতকগুলি ছবি এবং একটি বাঁধাই করা মহিলার ছবি। বিভিন্ন রকম জিনিস দিয়ে প্রয়োজনীয় সাজে সজ্জিত। পর্দা সরালে দেখা যাবে সিফাত ও সাজ্জাদ একটা সোফার ওপর পাশাপাশি বসে হাসছে। উভয়ের হাতে চায়ের কাপ।]

সিফাত: তুমি আসলে দারুণ রসিক।

সাজ্জাদ: আর তুমি? তুমি হলে, ‘অরুণ রাঙা গোলাপ কলি’।

সিফাত: থাক, থাক, হয়েছে। অত আর গানের ছন্দ বলতে হবে না। এবার বল, কী করবে? (পেয়ালা রাখে)

সাজ্জাদ: কী করব মানে? কিসের কী করব?

সিফাত: ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কিন্তু-।

সিফাত: দ্যাখো, ঐ ‘কিন্তু’ শব্দটা আমি মোটেই পছন্দ করি না।

সাজ্জাদ: তবে-।

সিফাত: ‘তবে’ও পছন্দ করি না।

সাজ্জাদ: তুমি পছন্দ করো কোনটা তাই বলো তো! (পেয়ালা রাখে)

সিফাত: আমি কিছুই পছন্দ করি না। তুমি যাবে কি-না তাই বলো?

সাজ্জাদ: যাব, কিন্তু তোমার আপা যদি-।

সিফাত: আবার ‘যদি’? আপা কী বলবে না বলবে সেটা আমি দেখব।

সাজ্জাদ: তাহলে যাওয়া যায়। কিন্তু তোমার আপা নিজেই আজ পর্যন্ত বিয়ে করল না, তার কাছে তোমার আলোচনা নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? তার চেয়ে আমি বলি কি, তোমার আপাকে আগে একটা বিয়ে করতে বলো।

সিফাত: আপা যদি সারাজীবন বিয়ে না করে থাকতে পারে, আমিও কি-।

সাজ্জাদ: তোমাকে আমি কি থাকতে বলছি?

সিফাত: তাহলে আমার সাথে যাবে না কেন?

সাজ্জাদ: তুমি একা বলাতে দোষের কী?

সিফাত: ওমা!- আপা আমার মুখ টেনে ছিঁড়ে ফেলবে না? আর তুমি যদি সাথে থাকো-।

সাজ্জাদ: ঠেকিয়ে দিতে পারব, এই তো? নিজের বলার সাহস নেই, তার মধ্যে আবার আমাকে নিয়ে যত দোষ সব আমার ঘাড়ে চাপানো, তাই না?

সিফাত: (রেগে উঠে পড়ে) ঠিক আছে, তুমি তোমার দোষ-গুণ নিয়েই ভাবো, আমি চললাম।

সাজ্জাদ: আরে, আরে রাগ করছ কেন? (টেনে বসিয়ে দেয়) আজ না হয়, দুদিন পরে হবে। ভালোবাসা তো আর মুছে যাবার জিনিস নয়।

সিফাত: (হেসে) তাহলে এক কাজ করলে কেমন হয়? তোমার বড় ভাই যখন তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করে না, তাকেই না হয় সঙ্গে নিয়ে যাও না।

সাজ্জাদ: তোমার ভিমরতিতে ধরছে কি-না, বুঝতে পারছি না। আসলে রবীন্দ্রনাথ কথাটা মিথ্যে বলেননি, ‘মেয়েরা ভালোবাসা সবুর করতে পারে না’। ঠিক আছে, একদিন যাওয়া যাবে। এবার হলো তো?

সিফাত: হলো, বড় কষ্টে। (ডাকতে ডাকতে পিংকুর প্রবেশ)

পিংকু: কাকু, কাকু-। (কাছে চলে আসে)

সাজ্জাদ: কি রে, কোথায় গিয়েছিলি পিংকু?

পিংকু: খেলতে। (পেছনে গিয়ে সাজ্জাদের গলা ধরে) উনি তোমার কী হয় কাকু ?

সাজ্জাদ: কিছু না, মানে ইয়ে হয়-।

পিংকু: ও- বুঝতে পেরেছি। আন্টি-।

সাজ্জাদ: হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বুঝেছিস। এদিকে আয়, দুষ্টু কোথাকার-।

(সামনের দিকে নিয়ে আসে)

সিফাত: ও বুঝি তোমার ভায়ের ছেলে?

সাজ্জাদ: হ্যাঁ।

সিফাত: (পিংকুকে) এসো, আমার কাছে এসো। (পিংকু সাজ্জাদের দিকে তাকায়)

সাজ্জাদ: যা, তোর আনটি ডাকছে। (পিংকু সিফাতের কাছে যায়)

সিফাত: তুমি কোন ক্লাসে পড়?

পিংকু: ক্লাস টু-।

সিফাত: ভালো। তা মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, কেমন-।

পিংকু: জি আচ্ছা। আপনি আমাদের বাড়ি আসেন না কেন আন্টি?

সিফাত: এতদিন তো তোমার সঙ্গে পরিচয় ছিল না-।

পিংকু: এখন তো হলো। আপনি রোজ আসবেন।

সিফাত: আচ্ছা আসব।

পিংকু: আমি এখন যাই আন্টি। হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসব।

সিফাত: আচ্ছা যাও।

পিংকু: কাকু, তুমি আন্টির কাছ থেকে নতুন গল্প শিখে রাখবে। রাতে কিন্তু আমাকে বলতে হবে। (বলেই দৌড়ে প্রস্থান। ওরা হাসে)

সিফাত: তোমার ভাইপোটি কিন্তু খুব সুন্দর।

সাজ্জাদ: আল্লাহ রহম করলে তোমারও-।

সিফাত: (কিল দিয়ে) যাহ্, দুষ্টু কোথাকার।

সাজ্জাদ: নাও, নাও, হয়েছে। আমি তো আর মিথ্যে বলছি নে, কদিন পরেই দেখা যাবে কোলের মধ্যে ক্যাঁ, ক্যাঁ করছে।

সিফাত: (মুখ ভ্যাঙায়) ক্যাঁ ক্যাঁ করছে।

সাজ্জাদ: মুখ ভ্যাঙালে কিন্তু তোমার মুখটা বেশ লাগে।

সিফাত: ঠিক আছে, এখন থেকে সব সময় ভ্যাঙাবো। এবার আমি উঠি, সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

সাজ্জাদ: চল, রিকশায় তুলে দিয়ে আসি। (উভয়ে ওঠে)

(চাকরকে ডাকে) নুরুদ্দিন, নুরুদ্দিন, কাপগুলো ভেতরে নিয়ে যা। (সিফাত ও সাজ্জাদ একদিক দিয়ে প্রস্থান করে এবং অন্যদিক থেকে নুরুদ্দিন প্রবেশ করে কাপ, কেতলি গোছাতে গোছাতে বলে)

নুরু:প্রেম করে ছোট সাহেব, কাজ করতে হয় আমার। যতসব! দৈনিক কারে নিয়ে আসে, আর অর্ডারের পর অর্ডার- বানাও চা, আনো চা, ঢেলে দাও চা, দোকানে যাও, বিস্কুট আনো। যেন একটা বিয়ে বাড়ির ধুম লেগে যায়। (কাদির প্রবেশ করে)

কাদির: কি রে, কী হয়েছে রে নুরুদ্দিন?

নুরু: কিছু না। আমি ছোট সাহেবের কথা বলছিলাম। খালি গেস্টো নিয়ে আসে। (সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে প্রস্থান)

কাদির: কেউ আসলে কাজ করতে চায় না। (পিংকু দৌড়ে এল)

পিংকু: জানো আব্বু, কাকু না আজ আন্টি নিয়ে এসেছিল।

কাদির: আন্টি! কার আন্টি?

পিংকু: কাকু বলল, আমার আন্টি। (সাজ্জাদের প্রবেশ)

সাজ্জাদ: থামলি? আবার বুঝি আব্বুকে সব বলা হচ্ছে?

পিংকু: বাঃ রে, আমার কি দোষ, তুমিই তো বললে, ঐ মেয়েটি আমার আন্টি হয়।

সাজ্জাদ: গেলি এখান থেকে? (পিংকু দৌড়ে ওপরতলায় ওঠে)

কাদির: সত্য কথাটা আমাকে বলাতে আর আপত্তির কী আছে? আমি তো বলেছি, যা ইচ্ছে করবি, আমি তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে যাব না। তবে আমি চাই না যে, তোর জন্য সৈয়দ বংশে কালি পড়–ক। (এই বলে কাদির চলে যেতে পা বাড়ায়। সাজ্জাদ ডাকে)

সাজ্জাদ: ভাইয়া। (কাদির ফিরে দাঁড়ায়)

কাদির: কিরে, কিছু বলবি?

সাজ্জাদ: (ভাবির ছবির দিকে তাকিয়ে) ভাবি আমাকে কতটুকু ভালোবাসতো সেটা তোমার অজানা নেই, তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো, তাও আমি জানি।

কাদির: আহা, আসল কথাটা বল না?

সাজ্জাদ: আমি, আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসি।

কাদির: (হেসে) সে তো ভালো কথা। তা আমার কাছে ভালোবাসার কথাটা উত্থাপন না করে বিয়ের তারিখটা বললেই আরো খুশি হতাম। ঠিক আছে, যখন প্রয়োজন হয়, টাকা-পয়সা, শাড়ি-গয়না যা লাগে, চেয়ে নিস। (কাদির চলে যায়)

সাজ্জাদ: (পিংকুকে ডাকে) পিংকু, পিংকু (খুশির ডাক শুনে পিংকু ছুটে আসে)

পিংকু: কী বলছ কাকু? (সাজ্জাদ পিংকুকে কাঁধে তুলে গান ধরে)

সাজ্জাদ: কাকু, তোমার আন্টি

ঘোমটা দিয়ে বধূ সেজে

আমার ঘরে আসবে।

তোমায় নিয়ে শুতে গিয়ে

নতুন নতুন গল্প করে

তোমায় ভালোবাসবে। (২)

হা-হা- তোমায় ভালোবাসবে।

(গানে গানে পিংকুকে নিয়ে সাজ্জাদ নাচতে থাকবে)

[পর্দা পড়বে]

দ্বিতীয় অংক

প্রথম দৃশ্য

[সিফাতের কক্ষ। খাটের পাশে চেয়ার টেবিল এবং টেবিলের ওপর সিফাতের বইখাতা। সিফাত শুয়ে শুয়ে একটি গান করছে। নিশাত প্রবেশ করে।]

নিশাত: কিরে সিফাত, মনের আনন্দে গান ধরেছিস যে। ভালো, ভালো, মাঝে মাঝে এমন আনন্দে থাকা ভালো। (সিফাত নিশাতের কণ্ঠ শোনার সাথে সাথে গান বন্ধ করে) উঠে মার্কেটের লিস্টটা কর তো, আমি বলে দিচ্ছি। মাসুমকে এখুনি বাজারে পাঠাতে হবে।

সিফাত: আমি পারব না। কামাল ভাইকে দাওয়াত করেছিস তুই, খাওয়াবি তুই, এখন বাজারের লিস্টও করবি তুই। তোর ঝামেলার মধ্যে আমি জড়াতে যাব কেন?

নিশাত: আহ্, আস্তে বল না, বাবা শুনতে পাবে।

সিফাত: শুনলে কিছুই বলবে না, তুই লিখে দে তো?

নিশাত: ঠিক আছে, তুই যখন হাত দিবি না (চেয়ারে বসে খাতা ও কলম নিয়ে খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়তে যায়) তখন আর কি করার আছে, আমিই লিখছি। (খাতার মধ্যে সাজ্জাদের ছবি পেয়ে চমকে ওঠে নিশাত। কলমটাও সিফাতের নিজের নয়)। হ্যাঁরে সিফাত, এ কলমটা কার?

সিফাত: কলম, মানে কলম, -ইয়ে মানে আমার এক বান্ধবীর কলম আপা (মৃদু হাসে)

নিশাত: হুঁ, কলমটা না হয় বান্ধবীর, এই ছবিটা? (ছবি ধরে)

সিফাত: ছবি! মানে ছবি-।

নিশাত: (একটু রেগে) এসব কবে থেকে শুরু করেছিস? আমি তোর বড় বোন, আমি এখনো যেসব চিন্তা-ভাবনা করতে পারিনি, আর শেষে তুই কি-না-। এ জন্যেই কি দেহের রক্ত পানি করে, সারাদিন খাটাখাটনি করে তোদের খাওয়াচ্ছি, পড়াচ্ছি? কোনো কিছু করবার আগে ভাববারও কি প্রয়োজন পড়ে না? বাবার শিখানো আদর্শ, চরিত্র যদি এভাবে আমরা নষ্ট করে ফেলতে পারি, তাহলে এমন বাবার ঘরে জন্ম নেবার আমাদের কী অধিকার ছিল? বল? চুপ থাকিস না, জবাব দে?

সিফাত: কোনো জবাব আমি দিতে পারব না আপা, তোর যা ইচ্ছে বল (প্রায় কেঁদে), যা ইচ্ছে কর, আমি কিচ্ছু বলব না।

নিশাত: সবকিছু তাহলে আমার ইচ্ছের ওপরই নির্ভর করছে?

সিফাত: হ্যাঁ-। কিন্তু একটি কথা জানিয়ে রাখছি; আমি সাজ্জাদকে ভালোবাসি।

নিশাত: ‘ভালোবাসি’-বাঃ কি সুন্দর কথা। এ কথা বলতে তোর মুখে বাধল না?

সিফাত: আমার ভালোবাসা ঠুনকো ভঙ্গুর নয় যে মুখে বাধবে।

নিশাত: সিফাত (জোরে বলে মুখে একটা চড় মারে। সিফাত মুখ ধরে)

সিফাত: তুই আমাকে মারলি আপা? তুই আমাকে মারলি? (আর একটু এগিয়ে যায়) নে, মার, আরো মার, যত খুশি মার (অশ্রæযুক্ত চোখে বলতে থাকে। নিশাত জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়)। দাঁড়িয়ে থাকলি কেন? মার?

নিশাত: (কেঁদে) আমি কি তোকে সাধ করে মারি রে, আমি কি তোকে সাধ করে মারি? মা মারা যাবার পর কোনোদিন তোর পিঠে একটা আঁচড় দেইনি। আর আজ, আমি তোকে মারলাম সিফাত, আমি তোকে মারলাম (কেঁদে ভেঙে পড়ে সিফাতকে জড়িয়ে ধরে)। তোকে নিয়ে আমারও তো কত স্বপ্ন, কত প্রত্যাশা- তুই লেখাপড়া শিখে মানুষ হবি, বড় হবি-।

সিফাত: তোর সে প্রত্যাশা মিথ্যে হবে না আপা, শুধু দোয়া করিস।

নিশাত: পাগলি (কান্নামিশ্রিত হাসিতে)! আমি কি তোর জন্য দোয়া না করে পারি? (বাবা নওশের প্রবেশ করেন)

বাবা: কি রে, কী হয়েছে তোদের? (দুজনে নিজ নিজ চোখের পানি মোছে)

নিশাত: কই, কিছু না তো! তুমি ঘুমাওনি বাবা?

বাবা: সব কিছুই আমাকে তোরা লুকোতে চেষ্টা করিস। তা তো নিশ্চয়ই করবি। আমি আর এখন এ সংসারে কে যে আমাকে সব বলতে হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে সংসারের দায়িত্ব সন্তানের ওপরই- আমি আর এখন এ সংসারে কে? শুধু দুবেলা দুটো খাব, আর ঘুমোব।

নিশাত: বাবা!

বাবা: যতই লুকোতে চেষ্টা করিস না কেন, আমি সব বুঝি রে, আমি সব বুঝি। কিন্তু, কিন্তু বুঝেও কিছু করার নেই। কারণ, শক্তি নেই, সাহস নেই, অর্থ নেই- আমার বলতে শুধু আমিই। ভেবেছিলাম তোদের আমি আকাশটার লাগাম ধরিয়ে দিয়ে যাব, কিন্তু তা বোধহয় আর পারব না রে নিশাত। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। যতই গুছিয়ে আনতে চেষ্টা করছি, ততই যেন ছাড়া ছাড়া, ততই যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

নিশাত: তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো তো বাবা।

বাবা: আমি আবার অশান্ত হলাম কবে। তোর মা মারা যাবার পর একটু উদাসীন হয়ে গিয়েছিলাম, এখন তো সব ঠিক হয়ে গেছে। ঠিক আছে, আমি যাই- নামাজের সময় হয়ে গেছে। (ধীরে প্রস্থান)

নিশাত: আ

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj