কাঁচা দুধের গন্ধ : মারুফ রসূল

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

অফিসে ঢুকেই সুখবরটা পেলো মিনহাজ।

কদিন ধরেই বেশ কানাঘুষা চলছিলো, তবে আজ একেবারে পাকা খবর। বোর্ড অব ডাইরেক্টরস মিটিং থেকে রেজুলেশনটা বের হবে লাঞ্চের আগেই। মিনহাজের সহকর্মী মামুন সাহেব প্যান্টের দুপকেটে হাত ঢুকিয়ে বেশ একগাল হেসে বললেন- আজ তো অফিসেই লাঞ্চ, কাল কিন্তু ভাই ট্রিটটা দিয়ে দিবেন। নেক্সট উইক থেকে তো আপনাকে আর পাবোই না!

কথাটা শুনে মিনহাজ একটু সৌজন্যতার হাসি হাসলো। অফিসে আসার পর থেকেই দেয়ালে টাঙানো পুরোনো ক্যালেন্ডারের মতো একটা শুকনো কৃত্রিম হাসি তাকে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখতে হয়েছে। সকলেই কনগ্রেচুলেট করছেন। কাছের কলিগরা ট্রিট দেবার কথা বলছেন। ঈর্ষাকাতর কয়েকজন মুখে কিছু না বললেও দূর থেকে থাম্বআপ সাইন দেখিয়ে যেটুকু না হাসলেই নয়, সেটুকু হাসছেন। পরিবেশটা মিনহাজের অনুক‚লে থাকলেও ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে। একটু চুপচাপ বোসে থাকার জো নেই। সব ডাইরেক্টররা আজ অফিসে উপস্থিত, তাই সবার মাঝেই একটা ব্যস্ততা। এর মধ্যেই মিনহাজকে সবাই অভিনন্দন জানিয়ে যাচ্ছেন।

জিএম সাহেবের ডাক পেয়ে ইচ্ছে করেই সিঁড়ি দিয়ে নামলো সে। জিএম সাহেব বসেন তিনতলায়। মিনহাজ পাঁচতলায়। লিফটে চড়ে আরও কয়েকজনের অনিচ্ছাকৃত অভিনন্দনের যন্ত্রণা পোহানোর মানসিকতা তার নেই। ‘মে আই..’- কথাটা শেষ না করতেই জিএম সাহেব বেশ বড়োসড়ো একটা হাসি দিয়ে বললেন- এসো, এসো। কনগ্রেচুলেশন। আই অ্যাম ওভারজয়েড উইথ ইউর সাকসেস। শাইন অন!

এবার আর কথা না বলে পারলো না মিনহাজ। চেয়ারটা টেনে বোসতে বোসতে পাকা অধীনস্তের বিনয় নিয়ে বললো- স্যার, এখনও তো কিছুই সিদ্ধান্ত হয়নি। কথাটা শুনে জিএম সাহেব যেনো আকাশ থেকে পড়লেন; খানিকটা হেসে নিয়ে বললেন- মিটিং- এ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না মিনহাজ, একটা গৃহীত সিদ্ধান্তকে জাস্ট জাসটিফাই করা হয়।.. ..বাই দ্য ওয়ে, প্রেজেন্টেশনের ফাইলটা ওয়াহিদ স্যারকে একটু ই-মেইল করে দাও। উনি বোধহয় আজ থাকবেন না। সঙ্গে প্রজেক্ট এরিয়ার একটা ম্যাপ পাঠিও।.. .. আগে বোধহয় একবার দিয়েছিলে। বাট হি লস্ট ইট। ওয়াহিদ স্যারের ই-মেইল ম্যানেজমেন্ট, বোঝোই তো!

‘ওকে স্যার’- বলেই অনুমতি নিয়ে উঠে পড়লো মিনহাজ।

বাংলাদেশের অন্যতম এই গ্রুপ অব কোম্পানিতে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চাকুরি করছে সে। কর্পোরেট অফিসের হালচাল ছাত্রজীবন থেকেই তার খুব ভালো রপ্ত। তাছাড়া মানুষ হিশেবেও সে ভীষণ পরিশ্রমী। জীবনে সুযোগ যে দু বার আসে না, সেটা মিনহাজের চেয়ে ভালো কে আর বলতে পারে? যে কোনো সুযোগকেই তাই কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। গুঁড়া দুধ উৎপাদনের প্রকল্পটির সঙ্গে জিএম সাহেবের চেষ্টাতেই যুক্ত হয় মিনহাজ। সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুঁড়া দুধের কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী আর ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিনটি কারখানা চালু করেছে তারা। এখনও অবশ্য উৎপাদন শুরু হয়নি। প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকা ব্যয়ে এই কারখানাগুলো স্থাপন করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য, শুরু থেকে অনেকেই এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মিনহাজ অল্প দিনেই সবাইকে টপকে চলে আসে মালিক পক্ষের গুড বুকে। তাই বয়স খুব বেশি না হলেও ত্রিশাল কারখানার পুরো দায়িত্বটা মিনহাজ পাচ্ছে, সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্য এখনও চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি। এর আগেই সকলের এই অভিনন্দনে তাই মিনহাজ একটু বিব্রত।

ডেস্কের টেলিফোনটা দুবার বাজতেই রিসিভার তুললো সে। অপারেটরের ফোন- স্যার, আপনাকে বাসা থেকে ট্রাই করছে। ‘ওহ! আমি দেখছি’- বলেই মোবাইলটা বের করলো মিনহাজ। মিলির ছয়টা মিস্ডকল। মিলি মিনহাজের স্ত্রী। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। কল ব্যাক করতেই মিলি খানিক চিন্তিত গলায় বললো- তুমি কি মিটিং-এ?

‘না না.. ওই জিএম স্যারের রুমে যাবার সময় সাইলেন্ট করেছিলাম.. সরি’- চেয়ারে খানিকটা হেলান দিয়ে বললো মিনহাজ।

‘ইটস ওকে। অ্যানি আপডেট?’- নেটওয়ার্কে সমস্যার কারণে কথাটা মিলিকে দুবার বলতে হলো।

‘মিটিং না হওয়া পর্যন্ত ফাইনাল কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে জিএম স্যার যখন ডেকে নিয়ে কনগ্রেচুলেট করলেন.. ..’- কথাটা শেষ করতে পারলো না মিনহাজ।

‘তাহলে ফাইনাল। অ্যা বিগ কনগ্রেচুলেশন.. ..উম্মা’- বেশ একটা খুশি খুশি গলায় বায়বীয় চুমুসমেত বললো মিলি।

‘থ্যাঙ্কস.. তুমি কোথায়?’- মিনহাজ প্রসঙ্গ বদল করলো।

‘নীলয়কে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে মাত্রই এলাম। বিশ মিনিট পর ক্লাশে যাবো।.. তুমি কিন্তু ফাইনাল লেটার পাবার সাথে সাথে আমাকে জানাবে’- শেষ কথাটা বেশ একটা চাপা আনন্দ নিয়ে গলায় খানিকটা আহ্লাদ রেখে বললো মিলি।

আরও দুএকটা কথা বলে ফোন রাখলো মিনহাজ। মনিটরে কারখানার অ্যানিমেশন ভিডিওটা আবার দেখলো। বেশ বড়ো একটা জায়গা জুড়ে এই কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। চারপাশে দেয়াল তুলে বড়ো একটা কম্পাউন্ডের মতো করা হয়েছে। এর ভেতরেই বিরাট বাংলো মিনহাজের থাকার জন্য। বাংলোটার কথা ভেবে মিনহাজের এক মুহূর্তে নিজেকে খুব সুখী মোনে হলো। যদিও তিনটি কারখানার মধ্যে ত্রিশালেরটা সবচেয়ে ছোটো, তবুও ঢাকার কাছাকাছি- এটা ভাবতেই তার ভালো লাগছে। ডেস্ক ক্যালেন্ডারে আজকের তারিখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়ালো জানালার কাছে। মে মাসের তীব্র গরোমে রাস্তার পিচ যেনো গলে যাচ্ছে। রোদের তেজ প্রচণ্ড। যদিও অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বোসে এসব বোঝার কোনো উপায় নেই।

সাড়ে এগারোটায় মিটিং শুরু হবার পরই কেমন যেনো একটা অস্বস্তি বোধ হতে লাগলো মিনহাজের। সে জানে, সবকিছু ঠিকঠাক; তবুও বারবার পানির তৃষ্ণা থেকে নিজের ভেতরের টেনশনটা ভালোই আঁচ করছে। একটানা কিছুক্ষণ চেয়ারে বোসে থাকতে পারছে না। খানিকক্ষণ হাঁটছে, মিলিকে এসএমএস করছে, ফেসবুকে লগ ইন করে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনোভাবেই সময় যেনো কাটতেই চাইছে না। হঠাৎ ‘আসতে পারি’ শুনে দরোজার দিকে তাকালো মিনহাজ। ‘আসুন ইসহাক সাহেব’- বলেই একটু হাসার চেষ্টা করলো। ইসহাক সাহেব একটা চেয়ারে বোসেই বললেন- কী! চমকে উঠলেন মোনে হয়?

‘না না.. চমকাবো কেনো?’- কথাটা যদিও খুব স্বাভাবিকভাবে বললো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সত্যিই সে খুব চমকে উঠেছিলো। ইসহাক সাহেব বয়েসে মিনহাজের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড়ো। এই প্রজেক্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এই কোম্পানির বাজারজাতকৃত মিনারেল ওয়াটারের কারখানার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সেখান থেকেই এই প্রজেক্টে তাকে আনা হয়েছিলো। সকলেরই ভেবেছিলো ইসহাক সাহেব কোনো একটি কারখানার দায়িত্ব নিশ্চয়ই পাবেন। সেটা পাবার সব যোগ্যতাই তার আছে। কিন্তু শেষ ছ মাসে নানা সমীকরণ কষে মিনহাজ নিজেকে তার পর্যায়ে এনেছে। এই দিন দশেক আগেও ত্রিশাল কারখানার দায়িত্ব নিয়ে ইসহাক সাহেবের নামটাই সবার মুখে মুখে ছিলো। তখনও মিনহাজ ছিলো ওয়েটিং লিস্ট চয়েজ। সাতক্ষীরা আর সিরাজগঞ্জের কারখানা বেশ বড়ো হলেও, সেখানে কম্পিটিশন কম ছিলো। ত্রিশালের দিকেই মনোযোগ ছিলো সবার। ইসহাক সাহেব অভিজ্ঞ মানুষ। কিন্তু তারপরও মিনহাজের সঙ্গে তিনি পেরে উঠলেন না। ওয়েটিং লিস্ট থেকে একেবারে টপ চয়েজে চলে এলো মিনহাজ। এরপর থেকেই ইসহাক সাহেব তাকে একটু এড়িয়ে চলেন। মিনহাজ অবশ্য ব্যাপারটা গায়ে মাখেনি। তবে এই সময়ে হঠাৎ করে তার আগমনে মিনহাজ সত্যিই একটু চমকে উঠেছিলো। একটু ভাবার চেষ্টা করলো, ভেতর থেকে কোনো কলকাঠি নাড়ছেন না তো ইসহাক সাহেব!

‘কই, একটু কফি অর্ডার করুন। কফি খেতে খেতে আপনাকে কনগ্রেচুলেট করি’- ইসহাক সাহেব যদিও হাসতে হাসতেই কথাটা বললেন, তবে তার হাসিটাকে ঠিক হাসি মোনে হলো না মিনহাজের। ব্যাপারটায় সে কিন্তু খানিক আনন্দ পেলো। যদিও এখনও কিছুই চূড়ান্ত হয়নি, নানা রকম চিন্তায় মিনহাজ একটু বিপর্যস্তও বটে; তবুও রাইভালের হাসিটাকে কান্নার মতো শোনা গেলো বলে মিনহাজের চিরকালের মতোই হঠাৎ খুব ভালো লাগলো।

কফি খেতে খেতে কনগ্রেচুলেট করার কথা থাকলেও ইসহাক সাহেব কোনো কথাই বললেন না। ভ্রæ কুঁচকে কয়েক চুমুকে প্রায় অর্ধেকটা কফি খেয়ে বললেন- তা আপনি কি ফ্যামিলি নিয়ে যাচ্ছেন?

‘সরি..!’- কথাটা বুঝেও না বোঝার ভান করলো মিনহাজ।

এবার ইসহাক সাহেব একটু হাসলেন। কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন- শুনুন, অতো বড়ো ফ্যাক্টরির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, এসব ছেলেমানুষি ভদ্রতা আপনাকে মানায় না।

মিনহাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর মুচকি হেসে বললো- থ্যাঙ্কস ফর দ্য এডভাইস।.. .. আপনার মতো ফ্যাক্টরি চালানোর অভিজ্ঞতা তো আমার নেই। আপনার অভিজ্ঞতার হিডেন ট্রেজার থেকে কিছু উপদেশ..- ইসহাক সাহেবের হাসির জন্যে বাকি কথাগুলো বলতেই পারলো না সে। ভদ্রলোক বেশ জোরে শব্দ করে হাসতে লাগলেন। হাসি থামিয়ে ‘অভিজ্ঞতার হিডেন ট্রেজার.. .. মাই ফুট!’ কথাগুলো কয়েকবার উচ্চারণ করে আবার হাসতে লাগলেন। তারপর কোনো মতে হাসি থামিয়ে বললেন- ওয়েল সেইড মিস্টার মিনহাজ।.. .. দেখুন, আপনি আমি দুজনেই বিজনেস স্টাডিসের ছাত্র ছিলাম। তবে ওসব দিয়ে যে ফ্যাক্টরি চলে না, সেটা আপনিও জানেন। না জানলে এতোদূর আসতেন না। হিডেন ট্রেজার আপনারও আছে এন্ড দিস অল আর স্পার্কিং নাও। তবে সব সময় যে করবে তা নয়, যেমন আমারটা এবার করলো না।.. .. অ্যানি ওয়ে, থ্যাঙ্কস ফর দ্য কফি। শেষ কথাটা বলার সময় নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইসহাক সাহেব। তারপর উঠে পড়লেন। বেশ গট গট করে বেরিয়ে গেলেন মিনহাজের ঘর থেকে।

তার চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চেয়ারে হেলান দিয়ে শরীরের অনেকটা ভার ছেড়ে দিলো মিনহাজ। বেশ স্পষ্ট উচ্চারণে বললো- বাস্টার্ড।

দুই.

‘এ ছাতু কাহা.. হুনো হুনো..’- রাস্তার পাশে সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে একটু সামনে হেঁটে গেলো মোদাব্বের। ছাতু ঘোষের সঙ্গে মোদাব্বেরের সম্পর্কটা চাচা-ভাতিজার হলেও বয়সে খুব একটা ফারাক নেই। তাই কোমরে গুঁজে রাখা বিড়ির প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ছাতু ঘোষের দিকে এগিয়ে দিলো সে। দিয়াশলাইয়ের খস্ শব্দে নিজের বিড়িটা ধরিয়েই জিজ্ঞেস করলো- যাও কই?

‘বাড়িত যাই’- দুধের বালতিটা পাশে রেখে মোদাব্বেরের বিড়ি থেকে নিজের বিড়িটা ধরিয়ে বললো ছাতু ঘোষ। একটা জুতসই টান দিয়ে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তাকালো মোদাব্বেরের সাইকেলটার দিকে। বিড়িটা ঠোঁটে রেখেই লুঙ্গির গিঁটটা খুলে আবার বাঁধতে বাঁধতে বললো- তুই কি অহন হাডে যাস?

‘হ। হদাই কিনবাম’ হাঁটু মুড়ে রাস্তার ধারে বোসে কথাটা বললো মোদাব্বের। তারপর খানিকক্ষণ চুপ থেকে জোর দুই টানে বিড়িটা শেষ করে ছুড়ে ফেলে দিলো। ছাতু ঘোষও বোসেছে তার একটু সামনে। মোদাব্বের বসা অবস্থাতেই লুঙ্গিটাকে হাঁটু পর্যন্ত তুলে খানিকটা এগিয়ে গেলো। ছাতু ঘোষের বিড়িটা তখনও শেষ হয়নি। মোদাব্বের গলাটা নিচু করে বললো- কাহা! একটা বালা গাইয়ের খুঁজ দিতারবা? নগদ ট্যাহায় কিনাম। ট্যাহা বাইতোই আছে।

‘আঁৎকা গাই কিনতি ক্যারে? খালঅ মাছ ছাড়তি না?’- ছাতু ঘোষ খানিকটা অবাক হয়েই প্রশ্নগুলো করলো।

এবার মোদাব্বের বেশ গলা চড়িয়েই বললো- আরে তুমি খাল দেহো কই কাহা? হইন্নির পুৎ চেরম্যান খালডা মাডি ফালায়া নাশ কইরালছে। কনঅ মাছ ছাড়তাম?

এই কথাটায় ছাতু ঘোষ যেনো খুব চিন্তিত হয়ে পড়লো। মোদাব্বেরের অভিযোগ মিথ্যা না। এই আমিরবাড়ী ইউনিয়নের মাছ চাষের সবচেয়ে বড়ো অবলম্বন ছিলো শিমুলিয়া খাল। খিরু নদী থেকে বড়গাঁও আর কুর্শানগর গ্রামের মাঝখান দিয়ে এই খালটা বয়ে গেছে। এর দুপাশে মোদাব্বেরের মতো প্রায় দুইশ ভূমিহীন কৃষকের বাস। গেলো বছরও এখানে মাছ ছেড়েছে তারা। মাছের ব্যবসাই এদের প্রধান জীবিকা। কিন্তু এ বছর আর মাছ ছাড়তে দেয়া হয়নি। সবার চোখের সামনে মাটি ফেলে খালটা ভরাট করে ফেললো এলাকার রাজনৈতিক নেতারা। এই খালে মাছ চাষ করেই যাদের জীবন চলতো, তারা কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো। দেখা ছাড়া এদের আর কিচ্ছু করার নেই। জীবন এদের অবিরাম দেখা আর অসম্ভব সহ্য ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই যেনো দেয়নি। এদের মরচে পড়া চোখ আর কোনো মতে গড়িয়ে চলা জীবন যেনো ক্রমেই এই খিরু নদীর মতো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে। বাপ-দাদার আমলে যারা মাঠে ফসল ফলাতো, সময়ের বিবর্তনে আজ আর তাদের কোনো জমি নেই। কালে কালে এইসব ভূমিহীনরা হয় অন্যের জমিতে বর্গা খাটে, না হয় এই খালে মাছ চাষ করে। এই মাছ চাষও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যের জমিতে বর্গা খেটে এখন আর ঠিক মতো সংসার চলে না। শিমুলিয়া খালে মাছ চাষ করে অনেকেই একটু সচ্ছলতার আলো দেখেছিলো। কিন্তু যাদের জীবনের আলো-অন্ধকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্যের হাতে, কখন কোন বাতাসে তাদের সচ্ছলতার দীপ নিভে যায়- তার কী কোনো নিশ্চয়তা আছে?

আল্লাহ এদের খাবার মুখ বাড়িয়ে দেয়, পেটের ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু খাবারের সংস্থান কেড়ে নেয়। এদের ফসলি জমিতে মাদ্রাসার পাকা দালান উঠে, খাল ভরাট করা জমিতে আল্লাহর ঘর মসজিদ নির্মাণ হয়; কিন্তু আল্লাহর ঘর এদের মুখে খাবার দেয় না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেও এদের ক্ষুধার আগুন নেভে না। ক্ষুধার আগুনের সাথে যাদের নিত্য বসবাস, তাদের জাহান্নামের আগুনের ভয় দেখায় কোন কিতাব? একবেলা আধপেট খেয়ে না খেয়ে এই যে তাদের হররোজ রোযা, তাতে কি মহান আল্লাহপাক তাদের বেহেশত নসিব করবেন? যদি করেনও, সে বেহেশত কতো সুন্দর? এই মানুষগুলো ভেবে পায় না- ভাতের গন্ধের চেয়ে সুন্দর আর কী আছে? আর কী-ই বা থাকতে পারে শাদা ভাতের চেয়ে সুন্দর?

এই গ্রামে মোদাব্বেরের অবস্থা অবশ্য অনেকের চেয়ে একটু ভালো। ভিটা ছাড়াও তার সামান্য খানিকটা জমি আছে। কিন্তু তাও কতোদিন থাকবে কে জানে? আমিরবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আর রাজনৈতিক নেতারা সবে খাল দখল শুরু করেছে। মাটি ভরাট করে বাজারে দোকান দেবার জন্যে জায়গা বিক্রি করছে। এদের হাত থেকে খালই রেহাই পায় না আর মানুষের ভিটা-সম্পত্তি!

শিমুলিয়া খালের কথা উঠতেই ছাতু ঘোষের চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠলো তার ছোটোবেলার কথা। এই খালের কী জৌলুশ ছিলো এক কালে। আজ সে সব দিন আর মোনেও পড়ে না সহসা। হঠাৎ মোদাব্বেরের ডাকে ছাতু ঘোষের ঘোর কাটলো। ঝাপসা চোখে বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে। তারপর নিজেই যেনো কথার খেই খুঁজে বললো- দুধ বেইচ্যাই বা কয় ট্যাহা পাবি?

কথাটা শুনে মোদাব্বেরের হাসি পেলো। মুখে হাসিটা রেখেই বললো- ধুরো কাহা। তুমি দেহি জানোই না। সদরে বিরাট মিল বইছে। দুধের দাম অহন বাড়বো।

‘কী কস?’- কথাটা শুনে একটু নড়েচড়ে বসে ছাতু ঘোষ বললো- হাডেত্তে আইলাম, কিছু তো হুনলাম না।

‘তুমি কুন দিশায় থাহো’- কথাটা বলেই মোদাব্বের আবার নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো- কও না, বালা গাই আছেনি? হগলেই অহন গাই কিনতাছে।

কিছুক্ষণ ভেবে ছাতু ঘোষ বললো- বৈশ্যার পুতে একটা গাই বেচবো হুনছিলাম। ‘খাড়া আইজ জিগায় দেহুম নে’- কথাটা বলেই সে উঠে পড়লো। মোদাব্বেরও আর কথা না বাড়িয়ে তার সাইকেলটা নিয়ে হাটের দিকে রওনা দিলো। ছাতু ঘোষও দুধের বালতিটা নিয়ে বাড়ির পথ ধরলো। রোদের তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এক ফোঁটা বাতাস নেই। গাছের পাতাগুলো যেনো মৌনব্রত পালন করছে। খানিকটা জিরিয়ে নেবার ফলেই ছাতু ঘোষের চলনে একটা জোর এসেছে। পা চালিয়ে সে বাড়ির দিকে হাঁটছে। বড়ো রাস্তা দিয়ে সোজা হেঁটে ভাঙা কালভার্ট। সেটা পেরিয়ে ডানদিকের ঢালু রাস্তায় নেমে যায় ছাতু ঘোষ। এখান থেকেই ঘোষপাড়ার শুরু। দুইটি সুপারি গাছের মাঝখান দিয়ে হেঁটে ছাতু ঘোষের বাড়ির উঠোন। উঠোনের দক্ষিণে গোয়াল ঘর। আর গোয়াল ঘর ঘেঁষে একটা জারুল গাছ।

‘ও বিন্তা বৌ.. বিন্তা বৌ..’- বাড়িতে ঢুকেই ছাতু ঘোষ গলা ছেড়ে ডাকতে আরম্ভ করলো। বিন্তা বৌ ছাতু ঘোষের স্ত্রী। তার আসল নাম কী ছিলো তা আজ আর কারোই মোনে নেই। সেই চৌদ্দ বছর বয়সে সে এ বাড়ির বউ হয়ে আসে। তখন থেকেই সে বিন্তা বৌ। তখন এই ঘোষপাড়ার চেহারা ছিলো একেবারেই অন্য রকম। রমরমা দুধের ব্যবসা ছিলো এ পাড়ায়। সকাল হলেই লাইন পড়ে যেতো দুধ নেবার জন্যে। কী শোরগোল লেগে থাকতো দিনভর। এখন আর সে দিন নেই। ক্রমেই ঘোষপাড়াটা ছোটো হয়ে আসছে। অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে; যারা আছে, তারাও আর দুধের ব্যবসাটা তেমন করে না। ত্রিশালের অন্যান্য ইউনিয়নের চেয়ে কানিহারীর অবস্থাটা এখনও অবশ্য অনেক ভালো। সেখানে প্রায় শ খানেক পরিবার দুধের ব্যবসার সঙ্গে আছে। এর মধ্যে এই ঘোষপাড়ায় আছে প্রায় পঞ্চাশ ঘর।

‘সদরে বলে দুধের মিল বইছে’- বিন্তা বৌ গামছাটা ছাতু ঘোষের হাতে দিয়ে প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে বললো।

‘তুমিও জানো দেহি..’- ছাতু ঘোষ খানিক অবাক হয়েই তাকিয়ে রইলো বিন্তা বৌয়ের দিকে।

‘গেরামের হগলেই জানে’- ছাতু ঘোষের কথাটা যেনো পাত্তাই দিলো না বিন্তা বৌ।

‘হ। মাইনস্যে খালি গাইয়ের খোঁজ করতাছে। মোদাব্বেরেও কইলো একটা গাই দেহোনের লাইগ্যা’- ছাতু ঘোষ বেশ মোনে করে করে কথাগুলো বললো।

‘হুনেন। মোদাব্বেররে গাই একটা ব্যবস্থা কইর‌্যা দ্যান, হেয় বিফদে আছে। গড়ে পুয়াতি বউ। খালঅ বলে এইবার আর মাছ ছাড়োন যাইতো না’- ছাতু ঘোষের পাশে বোসে বললো বিন্তা বৌ। ছাতু ঘোষ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো- খাল দেখলা কই? মাডি ভইরাইলছে না। কথাটা শেষ করেই গামছাটা ঘাড়ে ফেলে পুকুরের রাস্তা ধরে বাড়ি থেকে বের হলো। খানিকটা গিয়ে হঠাৎ থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো- পুলাপান একটাও বাইত নাই?

‘বোন্দ গ্যাছে’- বলেই বিন্তা বৌ ভাতের হাঁড়িটা নামাতে চলে গেলো।

গুঁড়া দুধ উৎপাদনের ফ্যাক্টরিটা পুরো ত্রিশালের চেহারা বদলে দিয়েছে। মৃতপ্রায় ঘোষপাড়াগুলো আবার যেনো নতুন উদ্যম পেয়েছে। কেবল ঘোষপাড়া নয়, প্রত্যেক বাড়িতেই এখন খামার গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ফ্যাক্টরির উদ্বোধনের দিন বেশ জাঁকজমক অনুষ্ঠান হলো। সবগুলো ইউনিয়নে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন। এখানে এসে মিনহাজ সিদ্ধান্ত নেয়, হাটে যে ব্যাপারিরা দুধ কেনেন, তাদের মাধ্যমেই তরল দুধ কিনবে ফ্যাক্টরি। মিনহাজের ভাষায় ‘ফ্যাক্টরির অ্যানলিস্টেড ব্যাপারিরা’ নানা ধরনের সুবিধা পাবেন। একটি নিশআ পাওয়া যাবে ভেবে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই ব্যাপারিদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে লাইন ধরে ফ্যাক্টরির তালিকায় নাম লেখালেন অনেক ব্যাপারি। তাদের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা করেছে মিনহাজ। প্রতিবারই তাদের জন্যে ভালো খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করেছে মিনহাজ। তাদের জন্যে উপহার হিশেবে কোম্পানির নাম ও লোগো সম্বলিত মগ, ব্যাগ আর চাবির রিং উপহার দেয়া হয়েছে। ব্যাপারিদের কোম্পানির একটি অংশ হিশেবে বিবেচনা করে মিনহাজ বেশ হাততালিও পেয়েছে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে স্থানীয় এমপি জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন, তার যে সফল বাস্তবায়ন হচ্ছে- এ কথা জনসাধারণকে মোনে করিয়ে দিলেন। কেবল ত্রিশালেই নয়, ময়মনসিংহের অন্যান্য উপজেলাতেও বেশ সাড়া ফেলেছে এই ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি উদ্বোধনের দিন মিলি আর নীলয়ও এসেছিলো। মিনহাজের বাংলোটা দেখে মিলি তো যারপরনাই খুশি। সে নিজের হাতে বাংলোর অনেকটা গুছিয়ে দিয়েছে। এমন খোলা জায়গা দেখে নীলয়ের তো চক্ষু চড়কগাছ! তার ছুটাছুটি যেনো থামতেই চাইছে না। রাতে খাবার পর নীলয়কে ঘুম পাড়িয়ে মিলি এসে বসলো মিনহাজের পাশে। মিনহাজ তখন ল্যাপটপে বিভিন্ন সংবাদপত্রে অনুষ্ঠানের খবরগুলো খুঁজে খুঁজে পড়ছিলো। মিলি কিছুক্ষণ বোসে থেকে বললো- চারপাশটা কেমন চুপচাপ। কী শান্তি!

‘এখন মোনে হচ্ছে শান্তি, কয়েকদিন থাকলে এই নীরবতাই অসহ্য হয়ে উঠবে’- মিনহাজ ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বললো।

‘আচ্ছা, তোমার কষ্ট হবে না তো..’- মিলি যেনো খানিক চিন্তায় পড়ে গেলো।

এবার মিনহাজ তাকালো মিলির দিকে। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো- তোমার আর নীলয়ের জন্যে চিন্তা হবে এই যা। সমস্যা নেই। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে চলে যাবো।…. আসলে এমন একটা সুযোগ।

‘নিশ্চয়ই’- মিলির গলায় বেশ গাঢ় আশ্বস্তের সুর। সে মিনহাজের আরেকটু কাছে ঘেঁষে বললো- আমি জানতাম, তুমি পারবে।

‘আমিও জানি আমি পারবো। জীবনে কোনো কাজে আমি কোনোদিন পিছনে হাঁটিনি। আই হেইট টু বি লুজার’- কেমন একটা বদলে যাওয়া কণ্ঠে কথাগুলো বললো মিনহাজ। কথাগুলো শুনে মিলি একটু সরে আসলো। তার এই গলাটা সে চেনে। ভীষণ জেদি এক ক্যারিয়ারিস্টিকের গলা। তার এই কনফিডেন্সের জন্যেই একদিন তাকে ভালো লেগেছিলো মিলির। কিন্তু সংসার বড়ো আশ্চর্য জায়গা। এখানে বাজি ধরে জিতে গেলেও কেউ হাত তালি দেবার নেই। মিনহাজের সঙ্গে বারো বছর সংসার করে মিলি একটা জিনিশ বুঝেছে- জীবনের সদর দরোজা খুলে যা কিছু দেখা যায়, তাতে কেবল স্বাচ্ছন্দ্যেই থাকা যায়; মানুষের ভালোলাগার আশ্চর্য অনুভূতিগুলোর অধিকাংশই পড়ে থাকে খিড়কির দুয়ারের পাশে। ওখানে মানুষ সচরাচর যেতে চায় না, পাছে সদর দরোজাটা বন্ধ হয়ে যায়। নিজেকে ভুলিয়ে রাখার মাঝে একটা সুখ আছে, কিন্তু নিজেকে ভুলিয়ে রাখার মতো পাপ আর নেই। সুখী হতে গিয়ে মিলি কতোটা পাপী হচ্ছে প্রতিদিন?

মোবাইলে একবার সময়টা দেখে নিলো মিনহাজ। রাত আড়াইটা। মিলি ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে নীলয়কে নিয়ে সে ঢাকায় রওনা হয়ে যাবে। মিনহাজ বাংলোর বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কারখানার সার্চ লাইটের আলো অন্ধকারের পিঠে চাবুক মেরে এদিক ওদিক ঘুরছে। কম্পাউন্ডের বাইরে ঘুমন্ত ত্রিশাল নগরী। মাঝে মাঝে দূরপাল্লার কিছু গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। বারান্দার রেলিঙে হাত রেখে মিনহাজ সামনের দিকে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালো। কাল থেকে পুরোদমে অফিস, তার ক্যারিয়ারের এক নতুন অধ্যায়। অনেক বড়ো দায়িত্ব অনেককে টেক্কা মেরে ঘাড়ে নিয়েছে সে। ইতোমধ্যেই গুঁড়া দুধের কারখানাটি সারা এলাকায় বেশ সাড়া ফেলেছে। কোম্পানির দেয়া টার্গেটে তাকে পৌঁছুতে হবে। কাজের ধরন নিয়ে সামান্য একটু ভাবার চেষ্টা করলো সে। কাজের ক্ষেত্রে ভালোলাগা মন্দলাগা বিষয়টি মিনহাজের কোনো কালেই ছিলো না। সে কাজকে বিচার করে পারিশ্রমিক দিয়ে। জীবনে সে ক্যারিয়ারকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে, এখনও দেয়। ছাত্রজীবন থেকেই সে বিশ্বাস করে টাকাই হলো স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক আর টাকা দিয়ে যে কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব। এ নিয়ে তার সঙ্গে বন্ধুদের কম তর্ক হয়নি, কিন্তু তার বিশ্বাস থেকে কেউ তাকে টলাতে পারেনি। মিনহাজের বর্তমান অবস্থা এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। বন্ধুদের মধ্যে সেই একমাত্র নিজের ফ্ল্যাটে থাকে। নিজের একটা গাড়ি আছে। তার একমাত্র সন্তান নীলয় দেশের নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। বয়সের তুলনায় তার সঞ্চয়ও কম নয়। প্রতি বছরই দুবার সপরিবারে দেশের বাইরে যায়। তবে মিনহাজকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। তার উপার্জন, মোটামুটি বিলাসবহুল জীবনযাপন- কিছুতেই কোনো ফাঁক নেই। তার ইনকাম ট্যাক্সের ফাইলে কোনো ফাঁক নেই, সাংসারিক জীবনে কোনো ঝক্কি নেই- বস্তুত সময়টাকে খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভাগ করে সবকিছু ঠিকঠাক মতো করার ক্ষমতা তার আছে। এখন ঢাকার বাইরে থেকেও কোনোভাবেই যেনো ছন্দপতন না হয়, তার সমস্ত পরিকল্পনাও সে করে রেখেছে। সপ্তাহে পাঁচদিন সে অফিস করবে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর রওনা হবে ঢাকায়। অফিস থেকে একটি চার হাজার সিসির ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি দেয়া হয়েছে তাকে। সুতরাং যাতায়াতে কোনো সমস্যাই হবে না। শুক্রবার, শনিবার ঢাকায় থেকে রবিবার ভোরে রওনা হয়ে সরাসরি অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। ঢাকায় থাকার দিনগুলোতে নিজেকে সম্পূর্ণ ন্যস্ত করবে পরিবারের হাতে। প্রথম কয়েক দিন হয়তো একটু কষ্ট হবে, কিন্তু নিজেকে কড়া শাসনে রাখতে হবে। অফিসের এতো বড়ো দায়িত্ব তাকে এমনি এমনি দেয়া হয়নি। নিজেকে শাসনের সঙ্গে পরিবারকেও শাসন করতে হবে। জীবনে বড়ো হতে হলে আবেগকে অতো প্রাধান্য দিলে চলে না। তবে শাসনটা শাসনের ভঙ্গিতে করে না মিনহাজ। এসব ক্ষেত্রে সে সব সময়ই খুব বুদ্ধিমান। এ কারণেই তার বিষয়ে মিলি কিংবা নীলয় বা পরিবারের অন্য কেউ কখনোই কোনো অভিযোগ করতে পারে না।

চাকরিতে ঢুকার আগে মিনহাজকে অনেকেই ব্যবসা করার পরামর্শ দিয়েছিলো। কিন্তু সে এক বাক্যে না বলে দেয়। তার যুক্তি ছিলো- আমি কাজ করবো বেতন নেবো। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বেতন বাড়ছে কি না সেটাই আমার বিবেচ্য। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় লসও হতে পারে, কিন্তু আমার বেতন যেনো না কমে। নিজে ব্যবসা করলে লসের বোঝাটা নিজেকেই বইতে হয়, সেটা আমার ঠিক পোষাবে না।

এমন যুক্তি যার কাছে আছে তাকে আর দ্বিতীয়বার ব্যবসার কথা বলা যায় না। চাকরি জীবনে মিনহাজের উন্নতি একেবারে দেখার মতো। এমবিএ শেষ করার আগেই তার চাকরি জীবন শুরু হয়। তিনটি প্রতিষ্ঠান বদলে দেশের অন্যতম এই গ্রুপ অব কোম্পানিতে পাঁচ অঙ্কের বেতনে যোগ দেয় সে। ত্রিশালের কারখানার দায়িত্ব নেবার পর বেতন বেড়ে গেছে দ্বিগুণ।

কাজের ক্ষেত্রে তার একাগ্রতা প্রশংসনীয়। প্রতিটি কাজ করার ক্ষেত্রে তার নিজস্ব একটি স্টাইল আছে। স্টাইলটা যতোই গতানুগতিকের বাইরে হোক না কেনো, কাজটা ঠিক মতো শেষ করে সফল আউটপুটটুকু বের করাই তার লক্ষ্য। ত্রিশালের কারখানার ক্ষেত্রেও সে তার নিজের মেথডই কাজে লাগাবে। রিসার্চ গুরুত্বপূর্ণ, তবে সব সময় রিসার্চ দিয়ে কাজ করা যায় না। তরল দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জ বা সাতক্ষীরার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে ত্রিশাল। সে কারণে ফ্যাক্টরিটাও অন্য দুটোর তুলনায় ছোটো। সে হিশেবে অবশ্য তার লক্ষ্যমাত্রাও কম। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীর ফ্যাক্টরির লক্ষ্যমাত্রা যেখানে দৈনিক ৩০ মেট্রিক টন গুঁড়া দুধ, সেখানে ত্রিশালে মাত্র ১৫ মেট্রিক টন। এর জন্যে প্রতিদিন এক লক্ষ বিশ হাজার লিটার তরল দুধ লাগবে। ফ্যাক্টরি ছোটো বা লক্ষ্যমাত্রা কম বলে গা ভাসিয়ে দেবার লোক মিনহাজ নয়। পুরো প্রকল্পটিকে সে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিশেবে নিয়েছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখলো। বাংলোর বারান্দা থেকে প্রায় পুরো কম্পাউন্ডটাই দেখা যায়। চারপাশ নিস্তব্ধ। থেমে থেমে যাওয়া দূরপাল্লার গাড়ির শব্দও এখন বেশ কমে এসেছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো মিনহাজ। এই গাঢ় রাত্রির মায়াবী আবেশ তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটালো না।

তিন.

‘কই রে সুখেন.. বালতিডা নিলি না?’- ছেলেকে তাড়া দিয়ে বাছুরকে দুধ খেতে দিলো বিন্তা বৌ। ছাতু ঘোষ পুকুরে গেছে। বছরের এই সময়টায় সকাল বেলা তার কোনো কাজ থাকে না। ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে সে ভাত খায়। তারপর দু চামচ চিনি দিয়ে এক গøাস দুধ। এই দুধ কিন্তু আগের দিন জ্বাল দিয়ে রাখা দুধ না, সকালে দুধ দোহানোর পর তা জ্বাল দেয় বিন্তা বৌ। সেই দুধ স্বামী, দুই ছেলে আর নিজে খেয়ে তারপর বিক্রি করতে পাঠায়। সকালে তাই বিন্তা বৌয়ের নানা ব্যস্ততা। তার দুই ছেলে সুখেন আর রমেনও মায়ের সঙ্গে দুধ দোহানোর কাজে লেগে যায়। সুখেন বড়ো, তার বয়স কুড়ি পেরিয়েছে; রমেনের বয়স ষোলো। ছাতু ঘোষের মোট ১৪টি গাই। এর মধ্যে চারটি দেশি জাতের। এরা দুধ অবশ্য কম দেয়। তাতে কোনো সমস্যা হয় না কারণ এই দুধ বাজারে বিক্রি করে না ছাতু ঘোষ। এই দুধ থেকে সে মাখন বানায়। দেশি গাইয়ের দুধে ভালো মাখন হয়। এছাড়া জাসি, হারিয়ানা আর শাহিওয়াল জাতের গাই আছে তার। তবে সবচেয়ে বেশি দুধ দেয় বিদেশি জাতের গাভীগুলো। তার দুটো হলোস্টেন আর একটা ফ্রিজিয়ান জাতের গাই আছে। এদের দুধ বিক্রি করেই তার সংসার দিব্যি চলে যায়। চারটা দেশি গাইয়ের দুধ বিন্তা বৌ নিজের হাতে দোহায়। সকালে একটা গাই, বিকেলে বাকি তিনটা। এদের ওলানের সামনের দিকটা একটু বাড়তি। মোটা আর স্পষ্ট শিরা। একটু যতেœ না দোহালে দেশি জাতের গরু ওলানে ব্যথা পায়। তাই বিন্তা বৌ বেশ সময় নিয়ে যতœ করে এদের দুধ দোহান। সকালের দুধটুকু বাড়ির জন্যে- বিকেলের দুধ থেকে মাখন তৈরি হয়। মাখন তৈরির দুধ বিকালে দোহানোই ভালো। এই শিক্ষা বিন্তা বৌ তার শাশুড়ির কাছ থেকে পেয়েছে। এলাকায় মাখনের তেমন বিক্রি নেই। কিন্তু শহরে ছাতু ঘোষের কিছু বাঁধা ক্রেতা আছেন, তাঁরাই লোক পাঠিয়ে বাড়ি থেকে মাখন কিনে নিয়ে যান। মাখন তৈরিতে বিন্তা বৌয়ের জুড়ি নেই। বিকেলে তিনটি গাভী দোহানোর পর সে কাঁচা দুধ ঘাঁটতে বসে। যে মন্থন দণ্ডটি সে ব্যবহার করে, এক সময় তা ব্যবহার করতেন তার শাশুড়ি। এ বাড়িতে বৌ হয়ে এসে সে শাশুড়ির কাছেই কাঁচা দুধ ঘাঁটতে শিখেছে। এই কাজ অনেক পরিশ্রমের। বিন্তা বৌ আগের মতো আর পারে না। মাঝে মাঝেই শরীর খারাপ হয়ে যায়। আজকাল মাখন তৈরির নানা নতুন কায়দা বেরিয়েছে। ছাতু ঘোষ এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলেই মুখ ঝামটা দেয় বিন্তা বৌ। নাক সিঁটকে বলে- মিশিঙ্গ দিয়া অইবো ননী? বাপ-ঠাকুর্দ্দার আমল তে ননী বানানি দ্যাখতাছুইন, আমনে বুঝুইন না কুনডা বালা?

‘তা তো বুঝি কিন্তু শইলডার ফি চাইয়্যা দ্যাখছো?’- খানিক অভিমান নিয়ে বলে ছাতু ঘোষ।

এরপর বিন্তা বৌ আর কোনো কথা বলে না। এক মোনে কাঁচা দুধ ঘাঁটতে থাকে।

সুখেন আর রমেন মিলে গাইয়ের দুধ দোহানো শেষ করে। রমেন এখনও দুধ দোহানোর কায়দা পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি। তাই সে কেবল শাহিওয়াল জাতের গাইগুলোই দোহায়। এদের ওলান বেশ বড়ো আর চওড়া হয়। আকৃতিও প্রায় সমান। মেদহীন আর একটু লম্বা হবার কারণে এদের দুধ দোহানোটা সহজ হয়। তাছাড়া শাহিওয়াল গাইগুলো শান্ত। গলার কাছটা বেশ তুলতুলে ঝুলে থাকে। এই বৃহদাকার গলকম্বলে হাত রেখে আদোর করতে রমেনের খুব ভালো লাগে। বাকি গাইগুলো সুখেন দোহন করে। হারিয়ানা গাইগুলোর সামনের দিকের বাঁট পিছনের দিকের বাঁটের চেয়ে লম্বা। এগুলো দোহানোর সময় তাই বেশ কয়েকবার জায়গা বদল করতে হয় সুখেনের। তাই এই গাইগুলো সবার শেষে দোহাতে বসে।

স্নান সেরে সুখেন আর রমেনও বাবার সঙ্গে রওনা দেয় হাটে। সকালবেলা সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। গোটা ঘোষপাড়ার ছেলে বুড়ো দল বেঁধে দুধ নিয়ে হাটে যায়। আগে সকলে হেঁটেই যেতো। কারণ তখন দুধের পরিমাণ অতো ছিলো না। বাজারে দুধের কতোখানি চাহিদা, তা আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারতো তারা। তাই প্রয়োজনের বেশি দুধ নিয়ে কেউ হাটে যেতো না। অনেকে আবার হাটেও যেতো না, কেবল গ্রামে গ্রামে দুধ বিক্রি করতো। কিন্তু এখন আর আগের দিন নেই। এই কয়েক মাসেই কানিহারী উপজেলার রাস্তায় রাস্তায় সাইকেল দেখা যায়। ত্রিশালে গুঁড়া দুধের ফ্যাক্টরি হবার পর থেকে দুধের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। অনেকেই এখন আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ বিক্রি করে না। ছাতু ঘোষ অবশ্য বাড়ি বাড়ি দুধ বিক্রি বন্ধ করেনি। সে আগের মতোই বিভিন্ন বাড়িতে তার ক্রেতাদের দুধ সরবরাহ করছে। সকালের একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে ছাতু ঘোষের গাইয়ের দুধ পেঁৗঁছে যায়। সুখেন আর রমেনই দিয়ে আসে। ছাতু ঘোষ তখন হাটে দুধ বিক্রি করতে থাকে। মিষ্টির বায়না করতে কেউ এলে কথা বলে। হাট শেষ হলে গঞ্জ থেকে বাজার সেরে বাড়ি ফিরে ছাতু ঘোষ। সুখেন আর রমেনের বাড়ি ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়। বিন্তা বৌ তখন ঘর-সংসারের কাজ গুছিয়ে সবাইকে নিয়ে খেতে বসে।

নতুনবাজার আর আহম্মাদাবাদ বাজারে বসে দুধের হাট। আগে দুধের পাশাপাশি নানা কাঁচা সবজির কেনাবেচাও চলতো। কিন্তু এখন সবজিওয়ালারাও দুধ বিক্রি করতে আসে। প্রত্যেক বাড়িতেই এখন গাই পালন হচ্ছে। অনেকেই এখন নানাস্থান থেকে গাই কিনে ঘরে লালন-পালন করতে শুরু করেছেন। গেলো কয়েক মাসে এই দুই বাজারে সকালে দুধের হাটই বসে। চরবাঘাদারিয়া, ডাকবাঘাদারিয়া, বাঘাদারিয়া, থাপনহালা, গোবিন্দপুর, দেওপাড়া, কুষ্টিয়া, সুলতানপুর, বেরতা, তালতলা, কানিহারী, বরকান্দা, বহুলিয়াকান্দা গ্রামগুলো থেকেই মূলত দুধ বিক্রেতারা আসেন। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না তাদের। কারণ ফ্যাক্টরি থেকে তালিকাভুক্ত ব্যাপারি ঠিক করা আছে। দামও নির্ধারণ করা আছে। প্রায় দুই আড়াইশ মণ দুধ বিক্রি হয় এই দুই হাট থেকে। তবে সব ব্যাপারিই ফ্যাক্টরির জন্যে দুধ কিনেন না। এই দুই হাট থেকে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুরসহ নানা অঞ্চলে দুধ যায়। ফ্যাক্টরির চুক্তিভিত্তিক ব্যাপারিরা অবশ্য নিজেদের জন্যে দুধ কিনতে পারেন না। তাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়া আছে। তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ দুধ ফ্যাক্টরিতে দিয়ে আসতে হয়। সেখান থেকেই তারা কমিশনসহ তাদের টাকা পেয়ে যান।

ছাতু ঘোষ আগে দুধ বিক্রি করতো রমজান ব্যাপারির কাছে। রমজান ব্যাপারির বয়স প্রায় পঞ্চান্ন। এ এলাকায় প্রায় চার পুরুষের বাস। কাঁচা-পাকা চুল, চলাফেরায় এক ধরনের ঠাঁট আছে। ত্রিশালে গুঁড়া দুধের ফ্যাক্টরি বসার আগে রমজান ব্যাপারিই ছিলেন সবচেয়ে বড়ো ক্রেতা। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ মণ দুধ কিনতেন তিনি। ফ্যাক্টরি থেকে যখন ব্যাপারিদের নাম তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হলো বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে, তখন রমজান ব্যাপারি খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। হাটে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছিলো একদিন। বেশ বিরক্তি নিয়ে তিনি বলেছিলেন- আমাগো হাডে আইয়্যা ব্যবসা মাইরাবো আর আমাগো রে কয় তালিকায় ডুকতাম। বাহের জšে§ত্তে এই হাডো ব্যবসা করি। অহন বুইড়া বয়সে আমারে মিলর গেডো খাড়ায় থাহোন লাগবো। মাঙ্গির পুতাইনে আর কতা পায় না।

রমজান ব্যাপারির মতো আরও অনেকেই ফ্যাক্টরির তালিকায় নাম লেখাননি। এদের অনেকেই মূলত নেত্রকোনা, শেরপুর, মোহনগঞ্জ থেকে আসেন। এদের দুধের চাহিদাও ততো নয়। সুতরাং তাদের তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। কিন্তু রমজান ব্যাপারি ত্রিশালেরই মানুষ। তার অনেক বড়ো ব্যবসা। অনেক দুধ তাকে কিনতে হয়। এটা অবশ্য তার জন্যে তেমন কোনো সমস্যা নয়, কারণ এই মানুষগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক আজন্ম। ফ্যাক্টরির ব্যাপারিদের কাছে দুধ বিক্রি করলেও রমজান ব্যাপারির দুধের অভাব হয়নি। এই হাটে যারা দুধ বিক্রি করতে আসেন, প্রত্যেকেরই সুখে-দুঃখে রমজান ব্যাপারি তাদের পাশে দাঁড়ান। সুতরাং তার সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা কেবলই ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক নয়।

হাটে ছাতু ঘোষের গাইয়ের দুধ রমজান ব্যাপারি তার বাড়ির জন্যে কিনে নিয়ে যান। এই হাটে ছাতু ঘোষের গাইয়ের দুধের বেশ কদর আছে। রমজান ব্যাপারি প্রায়ই বলেন- খালি দুধ দোয়ানের লইগ্যা গাই ফালল্লে অয় না, গাইয়ের যতœ নিওন লাগে। তারে বুজান লাগে, তর দুধে আমার রিযিক অয়। ছাতু ঘোষ গাইয়ের যতœ করে, বাছুরের হক আদায় করে, হের গাইয়ের দুধের স্বাদই অন্য রহম।

পুরো হাট ঘুরতে ঘুরতে ছাতু ঘোষের কাছে এসে দাঁড়ালেন রমজান ব্যাপারি। সুখেন আর রমেন চলে গেছে বিভিন্ন গাঁয়ে, বাড়িতে বাড়িতে দুধ দিয়ে আসতে। ব্যাপারিকে দেখে ছাতু ঘোষ দু হাত জোর করে নমস্কারের ভঙ্গি করে একটু হাসলো। রমজান ব্যাপারি একটু হেসে বললেন- কী রে! তর বালতি যে ভরা? দুধ বেচোস নাই?

‘বেচ্ছি। আপনেরটা রইছে’- আগের হাসিটা ধরে রেখেই বললো ছাতু ঘোষ।

রমজান ব্যাপারি বেশ খুশি হয়ে বললেন- কইছিলাম না। রমজান ব্যাপারির দুধের অবাব অইবো না। তা বাইত্তে ঘি শ্যাষ। তুই তো জানোস, তর ঘি ছাড়া আমি খাই না।

‘এডা দিন সময় দ্যান। পরশু বেইন্নালা সুখেন গিয়া দিয়াইবো’- বলতে বলতে বালতির দুধগুলো রমজান ব্যাপারির ভ্যানে রাখা একটি খালি বালতিতে ঢালতে থাকে। ব্যাপারি নিজের হাতে বালতিটা নামিয়ে একজনের হাতে দিয়ে বলেন- এইডা বাইত দিবি। তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা বের করে ছাতু ঘোষের হাতে দিতে দিতে বললেন- ছুডু মাইয়্যাডার বিয়ার কতা অইতাছে। দহিনপাড়ার নাতু শেহের পোলা। আইজকা দেকতে আইবো।.. এই দুধ পুরাডাই বাইত যাইবো।

টাকা হাতে নিয়ে ছাতু ঘোষ আবার নমস্কারের ভঙ্গিতে দু হাত জড়ো করলো। রমজান ব্যাপারি কী যেনো ভেবে একটু থামলেন। সাথের লোকগুলোকে ভ্যান সমেত এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে তিনি ছাতু ঘোষের কাছে এসে গলা নিচু করে বললেন- ফ্যাক্টরির ব্যাপারিরা কতো কইর‌্যা দ্যায়? তর লস অয় না তো?

‘না না ব্যাপারি সাব.. দাম অহনও ঠিকই আছে’- ছাতু ঘোষ অবশ্য স্বাভাবিক গলাতেই জানালো।

খানিকটা চিন্তা করে রমজান ব্যাপারি বললেন- আইচ্ছা। লস য্যান না অয়। ফ্যাক্টরি দাম বাড়াইলে আমারে কইস।.. যাই গা রে ছাতু, ম্যালা বাজার বাহি। বিন্তা বৌয়ের শইলডা বালা?

‘আছে বালাই। তয় বয়স অইছে তো’- কোমরের গামছাটা খুলে হাত মুছতে মুছতে বললো ছাতু ঘোষ।

‘হ। বয়স তো অইবোই। তর বড়ো ছ্যাড়াডারে বিয়া করাছ না ক্যারে?’- বলতে বলতে ছাতু ঘোষের কাঁধে হাত রেখে বিদায় নিলেন রমজান ব্যাপারি- যাইগা রে!

হাট থেকে ফেরার পথে মোদাব্বের, আকছার আর মতিকে দেখে এগিয়ে গেলো ছাতু ঘোষ। সঙ্গে দেওপাড়ার ফরিদও ছিলো। এদের মধ্যে মতি আর ফরিদ ছাড়া বাকিরা কেউ আগে দুধের ব্যবসা করতো না। মোদাব্বেরের ছিলো মাছের ব্যবসা আর আকছারের সবজির। দুজনের কেউই এখন আর নিজেদের পেশায় নেই। আকছার নিজের জমিতে নানারকম সবজির চাষ করে বাজারে এনে বিক্রি করতো। ব্যবসা ভালোই ছিলো। কিন্তু জমি নিয়ে ছোটো ভাইয়ের সাথে মনোমালিন্য শুরু হয়। আকছার অবশ্য আপোসে বণ্টননামা দলিল করতে চেয়েছিলো, কিন্তু এলাকার কিছু উঠতি রাজনৈতিক নেতার পরামর্শে ছোটো ভাই আকছারের নামে মামলা করে। মামলার পরও সে সবজির কারবারটা করতো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারেনি। মামলা চালানোর মতো খরচ তার পক্ষে যেমন দেয়া সম্ভব না, তার ছোটো ভাইয়ের পক্ষেও না। কিন্তু বিস্তর দেনা করে অনর্থক দুই ভাই মামলা চালিয়েছে কিছুদিন। পরে এলাকার দরবারে ছোটো ভাই মামলা তুলে নেয় বটে, কিন্তু দেনার দায়ে নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করে দিতে হয় আগের চেয়ারম্যানের ছেলের কাছে। এই ছেলের পরামর্শেই ছোটো ভাই তার নামে জমি আত্মসাতের মামলা করেছিলো। এখন তার ভিটাটুকু ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। জমি বিক্রির সামান্য টাকার সাথে কিছু টাকা যোগ করে সে একটা গাই কিনে এখন দুধের ব্যবসা করে।

সকলে মিলে একসাথে হাঁটতে লাগলো। মোদাব্বেরকে লক্ষ্য করে ছাতু ঘোষ বললো- তর সাইকেল ক?

‘বেইচ্যা দিছি কাহা। আরেকটা গাই কিনাম’- বিড়িতে টান দিয়ে বললো মোদাব্বের।

‘কাহা, দুধের দাম বলে বাড়বো; রমজান ব্যাপারি কিছু কইছে?’- ছাতু ঘোষকে উল্লেখ করে বললো আকছার।

তবে ছাতু ঘোষের উত্তর দেবার আগেই ফরিদ বললো- অতো লাফাইছ না ছ্যাড়া। চাইরদিন অইছে না ব্যবসা ধরছোত অহনই দামের চিন্তা করছ।..

‘ব্যাডা দুধের দাম বাড়োনের সময় আছে’- ফরিদের মুখ থেকে কথাটা টেনে নিয়ে বললো মতি।

‘হেইডা তো তুমরা বালা বুঝবা। আমারে হুশেন আলী কইলো। হে তো মিল কাম লইছে’- আকছার হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে শরীরটাকে পিছনের দিকে বেঁকিয়ে ঘাড় ফুটানোর চেষ্টা করলো। তারপর ডানদিকে ঘুরে বেশ শব্দ করে নাক ঝাড়লো। নাকের এক দলা সর্দি মাটিতে ঝেড়ে ফেলে হাতটা রাস্তার পাশের আমলকী গাছে মুছে আবার হাঁটা শুরু করলো। বাকিরা এর মধ্যে খানিকটা এগিয়ে গিয়েছে। আকছার এসে যোগ দিতেই মতি বললো- হুশেন আলী মিলঅ কাম লইলো কবে? হে না স্টেশনে চা বেচতো?

‘চায়ের দুহান অহন হের বায়ে দেহে। হে মিলঅ কাম লইছে। বেতন বলে বালাই দেয়’- আকছার গামছা দিয়ে ঘাড়টা ডলতে ডলতে হাঁটছে।

‘হেরে জিগাইচ্ছেন আমার বইনের জামাইডারে একটা চাকরি দিতারবনি’- মোদাব্বের বেশ সময় নিয়ে বললো কথাটা।

‘আমিরাবাড়ীর রুবেল চেয়ারম্যানে চাকরি দিতাছে। হুনছি মিলঅ হের লুক আছে’- আকছার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ পরিবেশনের ভঙ্গিতে কথাটা বললো।

‘ধুত্তর রুবেল চেয়ারম্যানের ফুটকিও মারি না আমি। হুইত্যা মাগীর ফুত শিমুলিয়া খালডা খায়ালছে’- মোদাব্বের যেনো রাগে ফেটে পড়লো।

‘ফইসাও বানাইছে এই কয় বছরে’- মোদাব্বেরের আগুনে যেনো ঘি ঢেলে দিলো মতি।

‘আরে হের ফইসায় আমি মুতিও না। হের বাহে আছিন ফহির, বাইত্তে বাইত্তে ভিক্ষা করতো। সারাজীবন নৌহার ফুট্টিত আঙ্গুল দিয়া অহন নৌহা মার্হায় ইলেকশন মারায়’- কথাটা বলার সময় মোদাব্বের তার তর্জনী ঘুরিয়ে যে অঙ্গভঙ্গি করলো, তা দেখলে যে কোনো নৌকাপ্রেমী মানুষ ভাসমান নৌকার অদৃশ্য ছিদ্রগুলোর কথা ভেবে আঁৎকে উঠবেন।

চার.

গুঁড়া দুধ তৈরির প্রকল্পটি শুরু হবার পর প্রায় আট মাস কেটে গেছে। এখনও পর্যন্ত ত্রিশালের রিপোর্টই সবচেয়ে ভালো। কাজের খাতিরে প্রায়ই উপজেলার নানা জায়গা ঘুরে বেড়ায় মিনহাজ। এখন তার মধ্যে এক ধরনের অভ্যস্ততা চলে এসেছে। কাজের জন্যে মানুষকে কীভাবে আপন করে নিতে হয়, সেটা মিনহাজ খুব ভালো জানে। এই আট মাসে অনেকের সাথেই তার পরিচয় হয়েছে। স্থানীয় এমপি, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানার ওসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পর্যন্ত মিনহাজের পরিচিত। অবশ্য এ পরিচয়টা এমনি এমনি হয়নি। নতুন জায়গায় ব্যবসা বাড়াতে হলে কী করতে হয়, তার সব নমুনাই মিনহাজের জানা আছে। সে কেবল তার প্রয়োজনগুলো হেড অফিসে জিএম সাহেবের কাছে পৌঁছে দিতো। এই আট মাসেই মিনহাজ হয়ে উঠেছে ত্রিশাল এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একজন। কতো কতো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আর বিশেষ অতিথি যে তাকে হতে হয়, তার ইয়ত্তা নেই। অবশ্য সে জানে, কোথায় যেতে হবে আর কোথায় না গেলেও চলবে। ব্যবসার জন্যে যাকে যতোটুকু মূল্য দেয়া দরকার, তাকে ততোটুকু মূল্যই সে দেয়। মিনহাজের কাছে কিছু সম্পর্ক একেবারেই ব্যবসায়িক। এতে দোষের কিছু নেই। মানুষের সব সম্পর্ক এক রকম হয় না কখনোই।

সাধারণত সন্ধ্যার পর নিজের বাংলো থেকে খুব একটা বের হয় না মিনহাজ। আড্ডা দেবার অভ্যেসটা তার কোনো কালেই ছিলো না। তবে আজ তার একটি দাওয়াত আছে। ত্রিশালে আসার পর যে কয়েকজনের সঙ্গে তার প্রায় নিয়মিতই দেখা হয় তাদের মধ্যে আমজাদ হোসেন একেবারে পয়লা নম্বর। ভদ্রলোক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন। মাত্র দু মাস আগে ডিন হিশেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। মিনহাজের সঙ্গে যখন তার পরিচয় হয়, তখন অবশ্য তিনি ছিলেন কেবলই ফোকলোর বিভাগের একজন অধ্যাপক। মিনহাজ প্রয়োজন না হলে খবরের কাগজ পড়ে না, টেলিভিশনও দেখে না। তাই প্রথমদিকে আমজাদ হোসেন সাহেবকে সে চিনতেই পারেনি। পরে জেনেছে, তিনি দেশের বেশ প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী। লেখক ও গবেষক হিশেবে দেশের নানা মানুষ তাকে চেনে। সরকারের খুব আস্থাভাজন। গোটা ময়মনসিংহেই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকজন তাকে বেশ সমীহ করে চলে। এতো কিছু জানার পরও আমজাদ হোসেন সাহেবের সঙ্গে আলোচনায় তেমন একটা আগ্রহ ছিলো না মিনহাজের। কিন্তু ভদ্রলোক এক রকম গায়ে পড়েই সম্পর্কটা ধরে রেখেছেন। প্রায়শই তিনি মিনহাজের বাংলোতে আসেন। এটা সেটা নিয়ে আলাপ জমানোর চেষ্টা করেন। অবশেষে আধ ঘণ্টা পার না হতেই ‘উঠি তাহলে’ বলে তিনি চলে যান। মিনহাজের মদ বা সিগারেটের নেশা নেই। তাই আড্ডায় সে খুব বেমানান। তাছাড়া প্রয়োজনীয় কথার বাইরে সে খুব একটা কথাও বলে না।

আমজাদ হোসেন সাহেবের বাড়িতেই আজ রাতের দাওয়াত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ভদ্রলোকের ভাড়া বাড়ি। মিনহাজের অবশ্য যাবার তেমন কোনো আগ্রহ নেই, তবে একটা বিশেষ কারণে খানিকটা সময় হাতে রেখেই সে রওনা দিলো। ত্রিশালে নতুন ইউএনও যোগ দিয়েছেন গত সপ্তাহে। আগের ইউএনও বদলি হয়ে গেছেন বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায়। নতুন ইউএনওর সঙ্গে এখনও আলাপ হয়নি মিনহাজের। সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসে গিয়ে আলাপ জমানোর অভ্যেসটা

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj